পদত্যাগ করতে হলো না, একেবারেই চলে গেলেন বাদল

  যুগান্তর ডেস্ক    ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ১১:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

পদত্যাগ করতে হলো না, একেবারেই চলে গেলেন বাদল
মঈন উদ্দিন খান। ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রীকে করজোড়ে বলেছি, প্রতিদিন ৫০ হাজার মানুষ আমার মাকে গালি দেয়। আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি ব্রিজটা করে দেন।’

‘কালুরঘাট নতুন সেতুটির জন্য আমি এলাকায় মুখ দেখাতে পারি না। মানুষ আমার মরা মা তুলে গালি দেন। আমি এটি আর সহ্য করব না। যদি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কালুরঘাট সেতুর কোনো সুরাহা না হয়, তা হলে আমি এ সংসদ থেকে পদত্যাগ করব।’

কথাগুলো চট্টগ্রাম-৮ আসনের সদ্য প্রয়াত সংসদ সদস্য মাঈনউদ্দীন খান বাদলের। কালুরঘাট সেতু না হওয়ায় আক্ষেপ করে গত ৯ আগস্ট চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে কালুরঘাট সড়ক-কাম রেল সেতু নির্মাণের দাবিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে কথাগুলো বলেছিলেন তিনি।

বাদল স্বভাবসুলভ চাটগাইয়্যা ভাষায় বলেছিলেন- ‘ডিসেম্বরের মধ্যে কিছু ন গইল্ল্যে আই যাইয়ুম গুই’ (অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যে যদি কিছু না হয়, তা হলে আমি চলে যাব)।

এই মুক্তিযোদ্ধা তার কথা রেখেছেন! তবে পদত্যাগ করতে হয়নি তাকে। কালুরঘাট সেতু নিয়ে সরকারি ঘোষণা আসার আগেই শুধু সংসদ থেকেই নয়, চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

ওই অনুষ্ঠানে মাঈনউদ্দীন খান বলেছিলেন, ‘এই শেষ জীবনে আমার আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। প্রেমের টানে মানুষ জাত-কূল-মান বিসর্জন দেয়। আমি এবার জনগণের প্রেম রক্ষায় নিজের জাত ছেড়ে প্রয়োজনে আওয়ামী লীগে যাব। সেতু ছাড়া আমার আর কিছুই চাই না।’

কালুরঘাট সেতুর জন্য প্রয়োজনে নিজের চিরজীবনের রাজনৈতিক আদর্শ পাল্টে প্রয়োজনে আওয়ামী লীগে যাওয়ার কথাও বলেছিলেন বাদল। ‘আমি সরকারি জোটের এমপি ব্রিজের জন্য যদি আমাকে আওয়ামী লীগ করতে হয়, প্রয়োজনে সেটিও করতে রাজি। ... প্রধানমন্ত্রীকে করজোড়ে বলেছি, প্রতিদিন ৫০ হাজার মানুষ আমার মাকে গালি দেয়। আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি ব্রিজটা করে দেন।’

এমপি বাদল বলেছিলেন, ‘আমার জীবদ্দশায় কালুরঘাট সড়ক-কাম রেল সেতুটির বাস্তবায়ন দেখে যেতে চাই। এ সেতুর জন্য আমি আমার ‘সবেধন নীলমণি' রাজনৈতিক জীবনের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি এমপি পদ থেকে অব্যাহতি নেয়ার কথা পর্যন্ত বলেছি। আমার দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর জন্য আমি তো আর কিছু চাইনি।’

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বাদল বলেছিলেন, আপনি চট্টগ্রামের দায়িত্ব হাতে নিয়েছেন। এ চট্টগ্রামের উন্নয়নে আপনি হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছেন। সর্বশেষ দক্ষিণ এশিয়ার সর্বপ্রথম উদ্যোগ কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ করছেন। চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেললাইন করতে কালুরঘাট রেল সেতু নির্মাণ করা হবে। আমার দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর একমাত্র দাবি- শুধু রেল সেতুর সঙ্গে সড়ক সংযুক্ত করা। এ সড়ক-কাম রেল সেতুটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সঙ্গে সমগ্র দেশের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

এর আগেও ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে চট্টগ্রামে কালুরঘাট সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছিলেন। সেতুর সুরাহা না হলে সংসদ থেকে বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

শেষ পর্যন্ত না পাওয়া সেতুর সেই বেদনা নিয়েই সবার মাঝ থেকে চলে গেলেন সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা মাঈনউদ্দীন খান বাদল।

বৃহস্পতিবার ভোরে বেঙ্গালুরুর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৬৭ বছর বয়সী এ রাজনীতিক।

মৃত্যুর পর বাদলের এই ‘শেষ ইচ্ছা’র কথা চট্টগ্রামে তার রাজনৈতিক বন্ধু-প্রতিপক্ষ এমনকি সাধারণ মানুষের আলোচনায়।

সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক জানানোর পাশাপাশি এই মুক্তিযোদ্ধার শেষ ইচ্ছা পূরণে কালুরঘাট সেতুর নির্মাণকাজ অবিলম্বে শুরুর বিষয়টিও এসেছে।

বাদলের পদত্যাগের ঘোষণার পর ২৭ অক্টোবর চট্টগ্রামে সড়ক ভবনে এক অনুষ্ঠানে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, কালুরঘাটে রেল ও সড়ক দুটি সেতু হবে।

ওবায়দুল কাদেরের সেই বক্তব্যের ভিডিও বাদলের ফেসবুক পেজ থেকে শেয়ারও করা হয়। এর ১০ দিনের মাথায় পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন তিনি।

বন্ধুর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, শেষ একটা ইচ্ছা ছিল তার- কালুরঘাট সেতু। উনিই আমাকে এটার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী আমার সামনে বলেছেন- আপনার ব্রিজ আমি করে দেব। ইনশাল্লাহ্ ব্রিজ হবে। বাদল ব্রিজের জন্য সংসদ থেকে পদত্যাগ করতে চেয়েছিল। ব্রিজের কাজ করতে করতে সে দুনিয়া থেকে চলে গেল।’

চট্টগ্রাম-৮ আসনে বাদলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ একাদশ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান বৃহস্পতিবার ফেসবুকে স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘ডিসেম্বর ২০১৯-এর মধ্যে কালুরঘাট ব্রিজের কাজ শুরু না হলে তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সরকারের কাছে দাবি অনতিবিলম্বে এই ব্রিজের কাজ শুরু করুন। অন্তত উনার বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে।’

উল্লেখ্য, নগরীর সঙ্গে বোয়ালখালী উপজেলার সংযোগ স্থাপনকারী বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতুটি ৮৯ বছরের পুরনো। এই সেতুর স্থলে একটি নতুন সেতুর দাবিতে সংসদে সোচ্চার ছিলেন বাদল। সেতু নির্মাণের দাবিতে আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে এবং বিভিন্ন সময় নানা বক্তব্য দিয়ে তিনি নিজের ক্ষোভ ও আক্ষেপের কথাও জানান।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×