বিশেষ সাক্ষাৎকার

প্রযুক্তির খাতের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছি: মোস্তাফা জব্বার

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০১৮, ১৫:৫৯ | অনলাইন সংস্করণ

  এম মিজানুর রহমান সোহেল

মোস্তাফা জব্বার

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বারকে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। মোস্তাফা জব্বার সংসদ সদস্য না হওয়ায় তাঁকে মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট হিসেবে নেয়া হয়েছে। বুধবার দপ্তর বন্টনে মোস্তাফা জব্বারকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। এতদিন মন্ত্রণালয়টি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিল। এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমকে সরিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একই মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির দায়িত্ব পালন করছেন জুনাইদ আহমেদ পলক। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যকে শপথ পড়ান। মোস্তাফা জব্বারসহ চারজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। শপথ অনুষ্ঠান শেষ করেই তিনি চলে আসেন চারবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিসি) অফিসে। সেখানে মন্ত্রী হওয়া অনুভূতি এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন।  

যুগান্তর: নতুন মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর আপনার অনুভূতি কী?
মোস্তাফা জব্বার:
এটি নিঃসন্দেহে একটি গৌরবের বিষয়। কারণ গত ৩০ বছর ধরে আমরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি বলে আজ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ হয়েছে। এ জন্য আমি একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছি। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি ২০০৮ সালে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগান জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। আমরা এখন শিল্পযুগের চতুর্থ স্তরে বসবাস করছি। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে শিল্প-কলকারখানা ছিল না, যা ছিল তা অবাঙালিদের হাতে। যার কারণে বঙ্গবন্ধু সেগুলো জাতীয়করণ করেন। ৪৬ বছর পর আজকের বাংলাদেশে আমরা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী নিজেরা উৎপাদন করতে পারি। কিন্তু এটি তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের শেষ স্তর। এখন যেখানে যাওয়ার সময় সেটি হচ্ছে- ডিজিটাল শিল্প বিপ্লব। এখন যদি সঠিকভাবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে না পারি, তা হলে পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ দেশে পরিণত হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সৌভাগ্য ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সেই শিল্প বিপ্লবের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা অবকাঠামো তৈরি, অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং শিল্প খাতকে সহায়তা করার ব্যাপারে সরকারের সহায়তা পেয়ে আসছি। 

যুগান্তর: ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য এখন পর্যন্ত সরকার কোনগুলোকে সাফল্য মনে করছেন? 
মোস্তাফা জব্বার:
বিশেষ করে ২০১৭ সালে সরকারের দুটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা বলতে পারি। একটি হচ্ছে- রফতানির জন্য ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা। অন্যটি হচ্ছে- যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে করের হার শতকরা একভাগে নিয়ে আসা। যন্ত্রাংশের শুল্কহার কমিয়ে দেওয়ার কারণে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য তৈরির জায়গায় পৌঁছে গেছি। আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষের জন্য যদি ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদন করতে পারি, তা হলে একদিকে আমদানির বিকল্প তৈরি হবে; অন্যদিকে নিজেদের দেশের নেটওয়ার্ক তৈরির ক্ষেত্রটি শক্তিশালী করতে পারব। 

যুগান্তর: তথ্যপ্রযুক্তি রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতদূর এগোলো? 
মোস্তাফা জব্বার:
রফতানির জায়গায় আমরা একসঙ্গে সফটওয়্যার, সার্ভিস ও হার্ডওয়্যার রফতানির ক্ষেত্রে নগদ সহায়তার জায়গা তৈরি করতে পেরেছি। ফলে সরকার ও বেসিস মিলে ২০২১ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানির যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছি, তা আমি নিশ্চিতভাবেই করতে পারব। 

যুগান্তর: মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পেছনের গল্প কী?
মোস্তাফা জব্বার:
ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমি বেসিসের সভাপতি হিসেবে ১৮ মিনিটের একটি বক্তব্য দিয়েছিলাম। সেখানে আমি প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছিলাম যে, তিনি যদি সহযোগিতা করেন তা হলে আমরা ৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করতে পারব। তিনি কিন্তু সেদিনই প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই ৫ বিলিয়ন করতে হলে আমাকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হবে। এই বাড়তি দায়িত্ব পালন করার জন্য তিনি যে আমাকে আজকে মন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করিয়েছেন। এর জন্য আমি তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। প্রকৃতপক্ষে আমি ব্যক্তি মোস্তাফা জব্বারকে প্রতিনিধিত্ব করছি না। আমি আমাদের দেশের তথ্যপ্রযুক্তির খাত পুরোটার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছি। আমি মনে করি, মোস্তাফা জব্বার মন্ত্রী হয়নি; এ দেশের আইসিটি খাত মন্ত্রী হয়েছে। আমার জন্য যে জায়গাটি সহজ মনে হবে সেটি হচ্ছে- প্রকৃতপক্ষে একটি সরকার যখন ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে যায়,  তখন যদি তাকে যথাযথভাবে পরিচালনা করা না যায়, তা হলে কিন্তু পুরো সরকার ডিজিটাল হওয়াটা কঠিন হয়ে যায়। আমার দায়িত্ব হবে, আমাকে যেখানে যেই দায়িত্বই দেওয়া হোক না কেন, আমি চেষ্টা করব আমাদের সরকারকে ডিজিটাল রূপান্তর এবং ডিজিটাল শিল্প খাতে যেন বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিতে পারে সে জায়গাটি প্রস্তুত করা। 

যুগান্তর: সরকারের হাতে এক বছরেরও কম সময় আছে। এই স্বল্প সময়ে আপনি কোন বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেবেন?
মোস্তাফা জব্বার:
যদিও নির্বাচনের এক বছর বাকি আছে; কিন্তু আমরা তো ৯ বছর কাজ করেছি। এই সময়ের মধ্যে যে ভিত্তি তৈরি করার কথা ছিল, সেটি হয়ে গেছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় আমাদের গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে। একটি হচ্ছে- আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব ঠিকমতো উপস্থাপন করা। বিশেষ করে সফটওয়্যার ও সেবা খাতের দিকে গুরুত্ব দিতে চাই। আমাদের সরকারের ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্ব পায় না। আমাদের চেষ্টা হবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন সরকারের কাজ করার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠান কোনো কাজ করতে না পারে। 

যুগান্তর: তবে মন্ত্রী হওয়ার পর বিশেষ কোনো কিছুকে গুরুত্ব দিতে চান কিনা?
মোস্তাফা জব্বার: 
চারটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই। সেগুলো হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ বাজার, ইন্টারনেট, পুরো সরকারকে ডিজিটাল করা এবং শিক্ষা খাতে ডিজিটাল রূপান্তর। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ডিজিটাল না করতে পারলে আমাদের দেশে বর্তমানে পাঁচ কোটি শিক্ষার্থীকে ডিজিটাল যুগের বাসিন্দা করতে পারব না। 

যুগান্তর: ইন্টারনেট নিয়ে আপনার ভাবনা কী? 
মোস্তাফা জব্বার:
ডিজিটাল শিল্প বিপ্লবের বাহক হচ্ছে- ইন্টারনেট। আমি তৃণমূল থেকে দেখে আসছি, ইন্টারনেটের মূল্য, ইন্টারনেটের গতি এবং ইন্টারনেটের সেবার ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। ইন্টারনেট যেন জনগণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, সেখানে আমি চেষ্টা করব। 

যুগান্তর: একসময় ইন্টারনেটের দাম কমানোর জন্য আন্দোলন করেছেন। এখন আপনি নিজেই নীতিনির্ধারক। সে ক্ষেত্রে কবে ইন্টারনেটের মূল্য কমানোর জন্য পদক্ষেপ নেবেন?
মোস্তাফা জব্বার:
বাস্তবিক অর্থে আমি এ মুহূর্তে এখনও কোনো দফতরের দায়িত্বের মধ্যে থাকিনি। আমি আশা করি, প্রধানমন্ত্রী কাল নাগাদ (আজ) কোনো একটা দায়িত্ব দেবেন। এবং সেই দায়িত্ব যেটিই দিন না কেন- ‌‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান বানে’ আমার অবস্থাও হবে তাই। যে দায়িত্বই আমি পাই না কেন, আমার কিছু অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করার বিষয় আছে- সেগুলো আমি করব। যদি সরাসরি এই দায়িত্বের মধ্যে থাকি, তা হলে সরাসরি কাজগুলো করব, আর না থাকলে পরোক্ষভাবে করব। আমি মনে করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রযুক্তিবান্ধব মানুষ এবং আমাদের অর্থমন্ত্রীও প্রযুক্তিবান্ধব মানুষ। আমাদের পুরো মন্ত্রিসভা এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন। 

যুগান্তর: প্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহার নিয়েও আপনি অনেক কাজ করেছেন। আগামী দিনে এ নিয়ে কিছু করার ইচ্ছা আছে কি? 
মোস্তাফা জব্বার:
আমি কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাব জানি না। তবে আমার মন্ত্রণালয়ে কোনো ইংরেজি চিঠি আসতে পারবে না। সেটি যাই পাঠাক না কেন, দ্বিভাষা ব্যবহার করা যাবে, তবে বাংলা বাদ দিয়ে না। আমার মন্ত্রণালয় থেকে এটি শুরু করব; এর পর দেখা যাক। প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদ থাকলে পুরো দেশেই এটি কার্যকর করা যাবে। 
 
এক নজরে মোস্তাফা জব্বার
৬৮ বছর বয়সী মোস্তাফা জব্বারকে ২০১৫ সালের আগস্টে  দোয়েল ল্যাপটপ প্রকল্পসহ দেশীয় ডিজিটাল ডিভাইস তৈরির উদ্যোগের ব্যর্থতা কাটাতে টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেসিস) দায়িত্ব দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত নানা কারণে তা হয়নি। মোস্তাফা জব্বার এখন বেসিসের সভাপতি। তিনি ১৯৮৭ সালের ২৮ এপ্রিল কম্পিউটার ব্যবসায়ে প্রবেশ করেন। সেই বছরের ১৬ মে কম্পিউটারে কম্পোজ করা বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা আনন্দপত্র প্রকাশ করেন। ১৯৮৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশ করেন বিজয় বাংলা কীবোর্ড ও সফটওয়্যার। সেটি প্রথমে মেকিন্টোস কম্পিউটার ও পরে ১৯৯৩ সালের ২৬ মার্চ উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের জন্যও বিজয় বাংলা কিবোর্ড ও সফটওয়্যার প্রকাশ করেন। মোস্তাফা জব্বার বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল বাংলা নিউজ সার্ভিস আনন্দপত্র বাংলা সংবাদ বা আবাস এর চেয়ারম্যান ও সম্পাদক। ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সসহ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক অনেক কমিটির সদস্য তিনি। কপিরাইট বোর্ড এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কাউন্সিল সদস্যও এই তথ্যপ্রযুক্তিবিদ।