পল্লীবন্ধু এরশাদের ৯১তম জন্মদিন আজ

  খন্দকার দেলোয়ার জালালী ২০ মার্চ ২০২০, ০১:৪৬:২০ | অনলাইন সংস্করণ

সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

নয়ন তোমারে পায়না দেখিতে, রয়েছো নয়নে নয়নে,
হৃদয় তোমারে পায়না জানিতে হৃদয়ে রয়েছো গোপনে।

আজ ২০ মার্চ। সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ৯১তম জন্মদিন।

দীর্ঘ ৯০ বছরে এই প্রথম পল্লীবন্ধুকে ছাড়াই তার জন্মদিন পালন করছেন লাখো ভক্ত-অনুরাগী। এই প্রথম ২০ মার্চ লাল পাঞ্জাবীতে পরিপাটি পল্লীবন্ধুর হাসোজ্জ্যল মুখটি দেখতে পাবেন না দেশবাসী। জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা পিতৃতুল্য এরশাদকে পাবেন না জন্মদিনের জমকালো আয়োজনে।

১৯৩০ সালের ২০ মার্চ সাবেক সফল রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের উন্নয়নের মহান রুপকার, আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও বাংলাদেশের ইতিবাচক রাজনীতির কিংবদন্তি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কুড়িগ্রাম শহরের “লাল দালান” বাড়ি খ্যাত নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক কীর্তি গড়েছেন পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য রাজনীতিবিদ। সামরিক বাহিনী থেকে রাজনীতিতে এসে দেশ পরিচালনা করে ক্ষমতা হস্থান্তরের পরেও বিরোধী রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন।

যদিও সেনাবাহিনী থেকে রাজনীতিতে এসে ক্ষমতা হস্থান্তরের পরে জনপ্রীয়তার শীর্ষে থাকার উদাহরণ নেই বললেই চলে।

আবার ক্ষমতা হস্থান্তরের পরে দীর্ঘ ৬ বছর কারাগারে ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্থান্তরের কয়েকদিনের মাথায় গ্রেফতার হন তিনি। ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

কারাগারে থাকাকালীন ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ৫টি করে আসনে জয়ী হন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জেলে থেকে নির্বাচনের এমন বিজয় সাফল্যের নজিরও নেই ইতিহাসে। কোনো নির্বাচনে না হারার রেকর্ডও আছে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের।

পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে গড়া রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি বর্তমান সংসদে প্রধান বিরোধী দল। দশম জাতীয় সংসদেও প্রধান বিরোধী দলও ছিল জাতীয় পার্টি।

১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনন্য রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় দলটি। তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলো জাতীয় পার্টি। এরপর থেকে প্রতিটি সংসদেই প্রতিনিধিত্ব ছিল জাতীয় পার্টির।

এছাড়া প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের পরে সরকার গঠনেও জাতীয় পার্টি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচে বেশি দেশী-বিদেশী অনেক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে জাতীয় পার্টি। একাধিক বড় ধরনের ভাঙ্গনের পরও জাতীয় পার্টির উজ্জল অবস্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উন্নয়নের ধারা ব্যাহত করতেই বারবার জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছে।

তারা মনে করেন, ষড়যন্ত্রের শিকার না হলে জাতীয় পার্টি এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতো। জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র না হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত।

রাজনীতি সচেতনদের ধারণা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দিলে পল্লীবন্ধুর বিজয়রথ ঠেকান সম্ভব হতোনা। তাই পল্লীবন্ধুকে ঠেকাতেই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তিত হয়।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পর সরকার গঠনে জাতীয় পার্টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

নির্বাচনে বিএনপি ১১৬টি আসনে জয়ী হয়, ঐ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী জিতেছিল ৩টি আসন। আর জাতীয় পার্টি জিতেছিল ৩২টি আসনে। বিএনপি আর জামায়াতের সাথে জাতীয় পার্টি যোগ দিলেই আসন সংখ্যা হয় ১৫১। জাতীয় পার্টির সমর্থন পেলে সরকার গঠনে কোনো বাঁধা ছিলোনা বিএনপির। তখন বিএনপি’র পক্ষ থেকেও জাতীয় পার্টির কারাবন্দি নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছে সরকার গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়। যাতে একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় আসতে না পারে।

কিন্তু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকার গঠন না করে, আওয়ামী লীগকে শর্তহীন সমর্থন দেন। দীর্ঘ একুশ বছর পর আবারো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

নতুন সমীকরণ তৈরী হয় বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে। ৭৫ এর ১৫ আগষ্টের পরে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠন হয় সরকার। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি আবারো ক্ষমতাসীন হয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে। এরপর থেকে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি প্রতিটি নির্বাচনে একে অপরের পরিপূরক হয়ে নির্বাচন করছে।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই পর্যন্ত জীবদ্দশায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় নেতা ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি দেশের যেকোন প্রান্তে উপস্থিত হয়েছেন, সেখানেই লাখো মানুষের ঢল নেমেছে। ন’বছরের সফল রাষ্ট্র প্রধানকে এক নজর দেখতে মানুষের স্রোত দেখা যেত। এতেই প্রমাণ হয়েছে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছিলেন অন্যতম জনপ্রিয় রাজণীতিবিদ।

পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন উন্নয়ন আর মানবিক অসংখ্য কর্মকান্ডের জন্য। ৯ বছরের দেশ পরিচালনায় পল্লীবন্ধু এক সাগর কীর্তি গড়েছেন। সব কিছু লিখে তুলে ধরা সম্ভব নয়, তালিকা করাও সম্ভব নয়। তাই মোটা দাগে কিছু উন্নয়নের ছোঁয়ায় কিছুটা দৃষ্টিপাত করা হল।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতা গ্রহণ থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা হস্তান্তর পর্যন্ত ৯ বছরে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এর উন্নয়ন কর্মকান্ড স্তিমিত করতে পারেনি একটুকু। তার নয় বছরের উন্নয়ন কর্মকান্ড অস্বীকার করা যাবেনা বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে। ৯১ সাল থেকে বাংলাদেশে যে উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার মূল ভিত্তি তৈরি করেছিলেন পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

১৯৮২ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৮৩ সালের ৭ নভেম্বর পর্যন্ত থানাগুলোকে ৪৬০টি উপজেলা পরিষদে উন্নীত করেছেন। যাতে প্রশাসনিক কর্মকান্ড সাধারণ মানুষের দোড় গোড়ায় পৌঁছে। সে সময় সকল বিরোধী শক্তি উপজেলা পরিষদ গঠনের বিরোধীতা করেছিল, হরতাল পর্যন্ত করেছিল।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অনন্য র্কীর্তি হিসেবে উপজেলা পরিষদ সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব রাখছে। ৪২টি মহাকুমাকে জেলায় উন্নীত করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এতে বাংলাদেশের জেলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৪টিতে। সকল রাজনৈতিক দলের সমালোচনা ও হরতাল কর্মসূচি উপক্ষো করে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে সৈন্য প্রেরণ করেন। যা দেশ ও সেনাবাহিনীর জন্য অত্যন্ত সম্মানের।


শূন্য পদ পূরণের জন্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ক্যাডারভূক্ত অফিসার নিয়োগের ব্যবস্থা করেছিন তিনি। অস্থায়ী ভিত্তিতে সরকারী কর্মচারীদের চাকরি নিয়মিত করেন।

সব ধরনের নিয়োগ বিধিও চুড়ান্ত করেন। রাজধানী ঢাকা শহরের নামের ইংরেজী বানান ভুল ছিলো। উধপপধ থেকে উযধশধ করেছেন। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে পবিত্র জুমার নামাজ আদায় নির্ঝঞ্জাট করতে সাপ্তাহিক ছুটি রোববার থেকে শুক্রবার করেছেন। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা করেছেন। বিচার ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে রংপুর, যশোর, কুমিল্লা, বরিশাল, সিলেট এবং চট্টগ্রামে ৬টি হাই কোর্টের বেঞ্চে সম্প্রসারণ করেন।

বিচার ব্যবস্থা দ্রুত করতে ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি দন্ডবিধি এবং ১৯০৮ সালের দেওয়ানী কার্যবিধি সংশোধন করেন। একই উদ্দেশ্যে প্রতিটি উপজেলায় মুন্সেফ কোর্ট স্থাপন করেন।
চট্টগ্রাম পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। আত্মসমর্পনকারী পাবর্ত্য বিপথগামী উপজাতীয়দের সাধারন ক্ষমা এবং পুনর্বাসনে বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করেছেন।
গণমাধ্যমের জন্য জাতীয় প্রেস কমিশন গঠন করেন।

এছাড়া রেডিও এবং টেলিভিশন একত্রিকরণের মাধ্যমে জাতীয় সম্প্রচার সেল গঠন করেন। সরকার নিয়ন্ত্রিত দি বাংলাদেশ অবজারভার এবং চিত্রালীতে পূর্বতন মালিকানায় ফিরিয়ে দেন। দৈনিক বাংলা, বিচিত্রা এবং বাংলাদেশ টাইমস-এর স্বাধীন ব্যবস্থাপনার জন্য “দৈনিক বাংলা ট্রাস্ট” ও “বাংলাদেশ টাইমস ট্রাস্ট” নামে ২টি ট্রাস্ট গঠন করেন।

সাভারে জনপ্রশাসনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেন। পাসপোর্ট প্রদানের জটিলতা দূর করেছেন। শিল্প শ্রমিকদের জন্য বেতন এবং উৎপাদন কমিশন গঠন করেন। অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম, যৌথ দর-কষাকষির এজেন্ট নির্ধারণ এবং ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচনের অনুমতি দেন তিনি। অধিক হারে বিদেশে চাকরি প্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি এবং রিক্রুটিং এজেন্টদের হয়রানী বন্ধে অধ্যাদেশ জারি করেন। এছাড়া বিদেশে চাকরীর সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট লিঃ (বোয়েলস) নামে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী গঠন করেন।

অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করতে নানামুখি কর্মমূচি বাস্তবায়ন করেছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অধিকতর সুষ্ঠু ও ন্যায় সঙ্গত কর-কাঠামো প্রবর্তন করেছেন। স্টক এক্সেঞ্জ পুনরুজ্জীবিত করেন। যাকাত তহবিল এবং যাকাত বোর্ড গঠন করেন। ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে হিন্দু ধর্মকল্যাণ ট্রাষ্ট এবং বৌদ্ধ ও খৃষ্টান ধর্মের প্রত্যেকটির জন্য ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে দুটি পৃথক কল্যাণ ট্রাষ্ট গঠন করেন। দেশের উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে স্বল্প সুদে গৃহ নির্মাণ ঋণ এর ব্যবস্থা করেন। উল্লেখযোগ্য হারে কৃষিঋণ বাড়িয়ে দেন তিনি।

বেকরকারী পর্যায়ে শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দিতে ৩৩টি পাটকল এবং ২৫টি বস্ত্রমিল থেকে পূঁজি প্রত্যাহার করে সেগুলো বাংলাদেশি মালিকদের কাছে প্রত্যার্পন করেন। এতে অন্তত ২০ ভাগ উৎপাদন বেড়ে যায়। বিদ্যমান দু’টি কর্পোরেশনের পাশাপাশি জীবন ও সাধারণ বীমা ব্যবসা চালানোর অনুমতি দেন। চট্টগ্রামে রফতানী প্রক্রিয়াজাতকরণ জোনের কাজ শুরু করেন। নতুন শিল্পের মঞ্জুর দানে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করেন। ক্ষুদ্র, কুটির এবং হস্থচালিত তাঁত শিল্পের জন্য উৎসাহ প্রদান করেন। স্থানীয় শিল্প উৎসাহিত করতে ৪৪টি আইটেমের দ্রব্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ইটের ভাটায় কাঠের পরিবর্তে কয়লা ব্যবহার উৎসাহ প্রদান করেন। কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করতে নানামুখি কর্মসূচি হাতে নেন।

স্বাস্থ্য খাতেও ব্যাপক কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করেছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনে কার্যকর উদ্যোগ তার আমলেই শুরু হয়েছিলো। উপজেলা পর্যায়ে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে ৩ জন বিশেষজ্ঞসহ ৯ জন ডাক্তার নিয়োগ দিয়েছিলেন। পল্লী এলাকার ৩৯৭ টি উপজেলার মধ্যে ৩৩৩টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। প্রতিটি ইউনিয়নে পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র স্থাপন করে সেখানে ঔষুধ ও কর্মচারী নিশ্চিত করেছিলেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তারদের ১ বছর মেয়াদী চাকরি বাধ্যতামূলক করেছিলেন। সরকারী হাসপাতালগুলোতে পথ্যের জন্য বরাদ্দ ৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার করেন। সারাদেশে ২৫ হাজার দাইকে প্রশিক্ষনের আওতায় আনেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন কৃষিকে। সেচ প্রকল্পাধীন চাষাবাদ বাড়ান হয়েছিলো দ্বিগুন। সেচের জন্য ১৯৮৪ সালেই ১৭ হাজার ৩শ গভীর নলকূপ, ১ লাখ ২৬শ অগভীর নলকূপ, ৪২ হাজার লো-লিফট পাম্প বসান। সহজ শর্তে কৃষি ঋণ বিতরণ করেন। গমের উৎপাদন বৃদ্ধি করেন ৫ গুন বেশি।

শিক্ষা ক্ষেত্রে অসাধারন কাজ করেছেন পল্লীবন্ধু। সার্বজনীন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের পদক্ষেপ নেন। শিক্ষাকে বাস্তবমূখি, বিজ্ঞান ভিত্তিক এবং অর্থনৈতিক চাহিদার পূর্ন উপযোগী হিসেবে ঢেলে সাজান। প্রতি ২ কিলোমিটার এলাকা বা ২ হাজার মানুষের বসবাস এলাকায় একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের কাজ শুরু করেন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্য বই বিতরণ শুরুই করেন তিনি। চারটি শিক্ষা বোর্ডের পরিক্ষা একই দিনে নেয়া শুরু করেন। প্রতিটি উপজেলায় একটি বালক ও একটি বালিকা বিদ্যালয় এবং জেলা সদরে একটি কলেজকে আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। ২১টি কলেজকে জাতীয় করণ করেন। ৯টি কলেজকে বিশ^বিদ্যালয়ে উন্নীত করেন। ইসলামী বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজ শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা ৭০ ভাগ বৃদ্ধি করেন। ৬টি বিশ^দ্যিালয় হল এবং ১৭টি কলেজ হোস্টেল নির্মাণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দো-তলা বাস সহ অতিরিক্ত বাসের ব্যবস্থা করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণ করেন। “পে অ্যাজ ইউ আর্ন” প্রকল্পে স্কুটার বরাদ্দ দিয়ে ছাত্রদের সম্পূরক আয়ের ব্যবস্থা করেন। কারিগরি শিক্ষা উন্নয়নে নানা কর্মসূচি নেন। প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন।


সড়ক পথে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক উন্নয়ন করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ২ বছরে ২০৬টি উপজেলা সড়ক যোগাযোগের আওতায় আসে। ঢাকা-মাওয়া বিকল্প সড়ক দ্রুততার সাথে এগিয়ে নেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নিন্মাঞ্চলীয় রাস্তা নির্মাণ করেন। চীনের সহায়তায় বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করেন। জাপানের সহায়তায় মেঘনা এবং মেঘনা-গোমতী সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা চুড়ান্ত করেন। খুলনা-মংলা এবং কুমিল্লা-চান্দিনা বাইপাস সড়ক নির্মাণ করেন। সিলেট থেকে ভৈবর হয়ে ঢাকা সড়ক নির্মাণ করেন। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় গ্রামঞ্চলের রাস্তা-ঘাটের ব্যপক উন্নয়ন করেন। রেলওয়ে বোর্ড বিলুপ্ত করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল এবং রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল নামে দুটি সংস্থা গঠন করেন। রেলওয়ের ৩০টি ইঞ্জিন, ১২ শো ৫৫টি মালবাহি বগি সংগ্রহ করেন। এবং ১০৬টি যাত্রীবাহী বগি সংগ্রহের উদ্যোগ নেন।

বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। রাজশাহী বিমান বন্দরের কাজ সমাপ্ত করেন। সিলেট ওসমানী বিমান বন্দর সম্প্রসারণ করেন। চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে বোয়িং ওঠা-নামার জন্য রানওয়ে সম্প্রসারণ করেন। ৪টি আধুনিক ডিসি ১০-৩০ বিমান ক্রয় করেন।
২শ ১২ কোটি টাকা ব্যায়ে ২১২টি উপজেলায় উন্নত ডাক ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ টেলিফোনে সরাসরি আন্তর্জাতিক ডায়ালিং করতে সমর্থ হয়। ১৯৮৩ সালে ৭৮টি উপজেলায় ৩০ লাইনের মেগনেটো এক্সেঞ্জ স্থাপন করেন।

আশুগঞ্জে ৬০ মেগাওয়াট শক্তি সম্পন্ন একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট চালু করেন। চট্টগ্রাম, কাপ্তাই, বরিশাল, ঘোড়াশাল এবং আশুগঞ্জে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্টেশন নির্মান সমাপ্ত করেন। ১২৬টি উপজেলায় বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু করেন। ২ বছরে পল্লীবিদ্যুতায়ন বোর্ডের মাধ্যমে ৫ হাজার মাইল বিতরণ লাইন নির্মাণ করেন। বাখরাবাদ গ্যাস ক্ষেত্রের সাথে তিতাস গ্যাসের সংযোগের জন্য ৩২ মাইলব্যাপী ২০ ইঞ্চি লাইন স্থাপনের কাজ শুরু করেন। জয়পুরহাট কঠিন শিলা খনি এবং সিমেন্ট উৎপাদন প্রকল্পের অনুমতি দেন। তিতাস গ্যাসের ৬ নম্বর কূপ চালু এবং ৭ ও ৮ নম্বর কূপের সারফেজ গ্যাদারিং ফ্যাসিলিটিজ সংক্রান্ত দরপত্র আহবান করেন। সীতাকুন্ডে কূপের খনন কাজ দ্রুততার সাথে শুরু করেন।

ন্যাশনাল ওয়াটার মাষ্টার প্ল্যান প্রনয়ন করেন। ১৯৮৫ সালের লক্ষমাত্র নির্ধারণ করে তিস্তা বাঁধ প্রকল্প নির্মাণ এগিয়ে নেন। মুহুরী এবং মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প নির্মাণ কাজ শেষ করেন।
মুজিবনগরে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। পুরনো গণভবনকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে রুপান্তর করেন। মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা ও জেলা সদর দপ্তর নির্মাণ করেন।

রাজধানী ঢাকাতে এরশাদের কীর্তির অসংখ্য স্মৃতি অক্ষয় হয়ে আছে। স্বল্প সময়ে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর সম্প্রসারণ করেন। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ভবন সম্প্রসারণ এবং সৌন্দর্যবর্ধন করেন। সংসদ ভবন এলাকার উন্নয়ন ও রমনায় জাতীয় তিন নেতার মাজার নির্মাণ সম্পন্ন করেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ভিআইপি টার্মিনাল নির্মান করেন। জাতীয় ঈদগাহ এবং সচিবালয়ের সামনে নাগরিক সংবর্ধনা কেন্দ্র নির্মাণ করেন। নর্থ সাউথ ও ওয়ারী খাল রোড নির্মান করেন। মিরপুর-আগারগাঁও রোড প্রকল্প শুরু করেন। মিরপুর ও গুলশান পৌরসভাকে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভূক্ত করেন। উত্তরা ও বারিধারায় নতুন প্লট বরাদ্দ দেন। পুরান ঢাকার ৩টি খেলার মাঠ এবং ২৮০টি বিপণী বিশিষ্ট ধুপখোলা কমপ্লেক্স তৈরি করেন।

রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলো ভেঙে আধুনিক ও বহুতল বিশিষ্ট ভবন তৈরী করেন। ফুলবাড়িয়া কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের ভীড় কমাতে তেজগাঁও, গাবতলী ও যাত্রাবাড়ীতে তিনটি বাস টার্মিনাল নির্মাণ করেন। ঢাকায় এক ডজনের বেশি শিশু পার্ক নির্মাণ করেন। যানজট নিরসনে ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করেন। ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিল সংস্কার করেন। নগরীর পানি ও বিদ্যুত লাইনের উন্নয়ন করেন। প্রতিটি সড়ক ও অলিগলিতে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা করেন। নগরীতে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। নগর ভবন ও পুলিশ সদর দফতর নির্মাণ করেন। পান্থপথ ও রোকেয়া স্মরনী সড়ক নির্মাণ করেন। মিরপুরে দ্বিতীয় জাতীয় স্টেডিয়াম এবং ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মান করেন। দেশের একমাত্র ক্রিড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপি প্রতিষ্ঠা করেন। বনানীতে আর্মি স্টেডিয়াম নির্মাণ করেন। ঢাকা বন্যা নিরোধ বাঁধ নির্মান করেন। পথকলি ট্রাষ্ট গঠন করেন।

এছাড়া উপজেলা ভিত্তিক তিন স্তরের প্রশাসন ব্যবস্থা চালু করেন। যৌতুক নিরোধ আইন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, মুসলিম পারিবারিক আইন, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন জারি করেন। বিসিএস একাডেমি ও লোক প্রশাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বন্ধ থাকা পদোন্নতি চালু করেন। গেজেটেড পদে মহিলাদের জন্য ২০ ভাগ পদ সংরক্ষণ করেন।

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ৫০ ভাগ নারীদের জন্য সংরক্ষণ করেন। মেয়েদের জন্য পৃথক ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৮ থেকে ৯০ সালে সারা দেশে ৫৬৮টি গুচ্ছগ্রাম স্থাপন করে ২১০০০ ছিন্নমূল ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসিত করেন। চট্টগ্রামে ইউরিয়া ও যমুনা (তারাকান্দি) সার কারখানা স্থাপন করেন।

৮ হাজার কিলোমিটার পাকা সড়ক এবং ১৭ হাজার কিলোমিটারের বেশি কাঁচারাস্তা নির্মাণ করেন। ছোট-বড় ৫৮০টি সেতু নির্মাণ করেন। ২৮৭টি উপজেলায় হেলিপ্যাড নির্মাণ করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পরিবারের জন্য রাজধানীর বনানীতে বাড়ি বরাদ্দ দেন।
নয় বছর রাষ্ট্র পরিচলানাকালে পল্লীবন্ধু অজস্ত্র কল্যাণময় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যার সুফল দেশ ও জাতি সম্মানের সাথে আজীবন উপভোগ করবে।

* খন্দকার দেলোয়ার জালালী, লেখক- সাংবাদিক এবং জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত