আব্দুল মতিন খসরুর শূন্যতায় প্রার্থী হতে চান যারা
jugantor
আব্দুল মতিন খসরুর শূন্যতায় প্রার্থী হতে চান যারা

  সৌরভ মাহমুদ হারুন, ব্রাহ্মনপাড়া (কুমিল্লা)  

২৩ এপ্রিল ২০২১, ২৩:০৪:০৯  |  অনলাইন সংস্করণ

কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া) সংসদীয় আসন। সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিতে অনেকটা অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা ছিলেন প্রয়াত এমপি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু।

গত ১৪ এপ্রিল এই নেতার মৃত্যু পরই শূন্য হওয়া আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আলোচনায় এসেছে কমপক্ষে ১৮ জনের নাম। তারা হচ্ছেন- প্রয়াত নেতার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, সহোদর, দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, রাজনৈতিক শিষ্য, সরকারি অবসরপ্রাপ্ত আমলা বা আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক।

বিগত প্রায় চার দশক ধরে এই আসনের প্রার্থী ৫ বারের সংসদ সদস্য প্রয়াত নেতার সাম্প্রতিক সময়ে করোনায় অসুস্থতার পর থেকেই মুলতঃ অনেকে এই আসনের বিকল্প প্রার্থী হিসেবে নিজেদের ভাবতে শুরু করেছেন। ফলে ১৪ এপ্রিল ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর থেকেই নানাভাবে আলোচনায় আসতে থাকে এসব নাম।

দীর্ঘদিনের একক রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব থেকে আবারো ক্ষমতার মোহে বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া আসনটিতে একাধিক প্রার্থীর উঁকিঝুঁকি নতুন করে গ্রুপিং সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ নেতাকর্মীদের মনোবল নষ্ট করে দিতে পারে।

তবে প্রয়াত এমপির অন্যতম রাজনৈতিক শিষ্য সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমরা বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ মিলে সিদ্ধান্ত নিব। তবে এ কথায় কেউ ভরসা করতে পারছেন না। ফলে অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেছে একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন দৌড়ের বিষয়টি।

কুমিল্লার ভারত সীমান্তবর্তী বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া সংসদীয় আসনটি স্বাধীনতার আগ থেকেই আওয়ামী লীগের সমর্থন পুষ্ট এলাকা। বুড়িচংয়ের ৯টি এবং ব্রাহ্মণপাড়ার ৮টিসহ মোট ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই দুটি উপজেলার সংসদীয় আসনের মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষাধিক। স্বাধীনতা পরবর্তী এই আসনটি থেকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মতিন খসরু ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৯, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে (মোট ৫ বার) সংসদ সদস্য নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন।

গত ১৪ এপ্রিল তিনি মারা যাওয়ার পর আলোচনায় আসতে থাকে শূন্য আসনের নেতৃত্বে ইচ্ছুক একাধিক প্রার্থীর নাম। এ তালিকায় প্রথমে সাবেক বুড়িচং উপজেলা চেয়ারম্যান ও বর্তমানে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনের নাম শোনা গেলেও এমপির স্নেহভাজন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা অধ্যক্ষ আবু সালেহ মোহাম্মদ সেলিম রেজা সৌরভ, বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও কুমিল্লা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল হাসেম খান, এমপি মতিন খসরুর ছেলে মুনেফ ওয়াসিফ, মেয়ে ডা. উম্মে হাবিবা দিলশাদ মুনমুন, প্রয়াত এমপির সহোদর কুমিল্লা বারের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল মমিন ফেরদৌস, স্ত্রী সালমা সোবহান খসরু, ওষুধ প্রশাসনের ডিজি (সাবেক) মেজর জেনারেল (অব.) মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বর্তমান বুড়িচং উপজেলা চেয়ারম্যান আখলাক হায়দার, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য আবদুস সালাম বেগ, ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল বারী, কুমিল্লা জেলা পরিষদ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) সদস্য তারিক হায়দার, অধ্যক্ষ মো. আলী চৌধুরী মানিক, ইঞ্জিনিয়ার আল-আমীন, শাহজালাল মজুমদার, অধ্যাপক এমএ মতিন, কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা এহতেশামুল হাসান ভূঁইয়া রুমীর নাম।

এদিকে প্রয়াত নেতার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে অপ্রকাশ্যে সীমান্তবর্তী বুড়িচং, ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলায় শূন্য আসনের নেতৃত্ব পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে উল্লেখিত নেতাসহ বিভিন্ন স্বজনরা। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাইলে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সবাই কমবেশি আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন নানা ভাবে।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, নেতার শূন্য হওয়া স্থানটি পূরণ হওয়ার নয়। তবুও এগিয়ে যেতে হবে। নিজে প্রার্থিতা হওয়ার ইচ্ছের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এজন্য তিনি বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলার দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, প্রয়াত এমপির স্ত্রী, ভাই, সেলিম রেজা সৌরভসহ নেতৃত্বে থাকা অন্যান্যদের নিয়ে পরামর্শ করবেন। তবে সবচেয়ে বড় কথা নেত্রী যাকে মনোনয়ন দেন তার পক্ষে কাজ করার অঙ্গীকার করেন তিনি।

বুড়িচং উপজেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাশেম মনোনয়ন প্রত্যাশার আগ্রহ ব্যক্ত করে বলেন, প্রয়াত এমপি মতিন খসরুর সঙ্গে আমার পথ চলা ১৯৬৯ সাল থেকে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৫২ বছর আমাদের একসঙ্গে রাজনীতি। একদিনের জন্যও কেউ কাউকে ছেড়ে যাইনি।

বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো. আল আমিন বলেন, প্রয়াত এমপি আব্দুল মতিন খসরুর সঙ্গে থেকে আমি দীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছি। আমি একজন দলীয় প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন প্রত্যাশী।

বুড়িচং উপজেলা চেয়ারম্যান ও বুড়িচং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আখলাক হায়দার বলেন, প্রয়াত এমপি পরিবারের ৪ জন রয়েছেন। যদি তাদের কেউ নির্বাচনে না আসেন, তাহলে আমরা সবাই বসে সিদ্ধান্ত নিব। দল যাকে মনোনয়ন দেয় আমরা তার পক্ষে কাজ করবো। এসময় তিনি নিজেও প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছের কথা জানান।

আবু সালেহ মোহাম্মদ সেলিম রেজা সৌরভ শূন্য হওয়া আসনটিতে নিজেকে প্রার্থী করার আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন।

ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী প্রার্থিতা হতে নিজের ইচ্ছের কথা জানিয়ে বলেন, দল যদি মনোনয়ন দেয়, তবে আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে রাজী আছি।

ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বারী প্রার্থিতার ইচ্ছের কথা জানিয়ে বলেন, দল চাইলে আমি অবশ্যই প্রার্থী হতে রাজী আছি। দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থেকে ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলার মানুষের সেবা করছি।

বুড়িচং আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আল-আমিন প্রয়াত নেতার মৃত্যু পরবর্তী শূন্য আসনটিতে মনোনয়ন প্রত্যাশা করে বলেন, নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি অবশ্যই প্রার্থী হতে ইচ্ছুক।

প্রয়াত নেতার সহোদর আবদুল মমিন ফেরদৌস শূন্য আসনটিতে প্রার্থিতার বিষয়ে তিনি বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে তার ছেলে মুনেফ ওয়াসিফ ও কন্যা ডা. উম্মে হাবিবা দিলশাদ মুনমুন যদি প্রার্থী না হয় তবে আমি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছে আছে।

অধ্যক্ষ মো. আলী চৌধুরী মানিক মনোনয়ন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, আমি বিগত তিনবার মনোনয়ন চেয়ে পাইনি। এবারো চাইবো। যদি পাই তবে প্রয়াত এমপি মতিন খসরু অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করবো।

মেজর জেনারেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান শূন্য আসনটিতে উপনির্বাচনে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। তিনি দলের হাইকমান্ডের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমি প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। দল মনোনয়ন দিলে অবশ্যই আমি নির্বাচন করবো।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, আমি গতবার মনোনয়ন চেয়ে পাইনি। জননেত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করার ইচ্ছে আছে। এবার ইনশাআল্লাহ শতভাগ নিশ্চিত।

আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদের সহসভাপতি শাহজালাল মজুমদার প্রার্থিতা হতে ইচ্ছের কথা জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ দিন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছি। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অবশ্যই আমাকে মূল্যায়ন করবেন। আমি এই আসনে দলের পক্ষে নির্বাচনে প্রার্থী হতে মনোনয়ন চাইবো।

সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার সোহরার খান চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছি। আমি একজন দলীয় প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন প্রত্যাশী। আমি এই উপনির্বাচনে দল মনোনয়নের বিষয় নেত্রীর ওপর আস্থা রাখছি। এসময় তিনি নিজেও প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছের কথা জানান।

বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা এমএ মতিন (এমবিএ) শূন্য আসনটিতে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে বলেন, মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হলে আমি অবশ্যই কেন্দ্রের কাছে মনোনয়ন চাইবো। আশা করি দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।

বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক, কুমিল্লা জেলা পরিষদ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) সদস্য তারিক হায়দার বলেন, আমি এই দুটি উপজেলা নিয়ে যে সংসদীয় আসন তারই জেলা পরিষদের সদস্য। আমি নিজেকে এই আসনের যোগ্য প্রার্থী মনে করি। তবে যদি প্রয়াত এমপি পরিবারের বাহিরে কেউ নির্বাচনে আসে তাহলে আমারও প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা আছে।

বাংলাদেশ যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হাসান ভূঁইয়া রুমি বলেন, নেত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি যাকে প্রার্থী মনোনয়ন দিবেন আমরা তার পক্ষে কাজ করবো। তবে আমিও ইচ্ছুক। আমি প্রার্থী হয়ে প্রয়াত নেতা আব্দুল মতিন খসরুর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে চাই।

প্রয়াত এমপির ছেলে মুনেফ ওয়াসিফ, মেয়ে বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা.উম্মে হাবিবা দিলশাদ মুনমুন, ভাই অ্যাডভোকেট ফেরদৌস নিশ্চিত এর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।

এদিকে প্রয়াত এমপির স্ত্রী সেলিনা সোবহান খসরু যুগান্তরকে জানান, আমি শোকাহত। এ বিষয় নিয়ে এখনো চিন্তা করি নাই। তবে আগামীতে কেন্দ্র ও দুই উপজেলার নেতৃবৃন্দসহ জনগণ যদি আমাকে প্রয়োজন মনে করে তবে বিষয়টা আমি ভেবে দেখবো।

আরেক জন মনোনয়ন প্রত্যাশী আব্দুল জলিল বলেন, আমি দীর্ঘদিন ছাত্ররাজনীতি করে আসছি। এছাড়া দলীয় সকল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমি সব সময় জড়িত আছি ।সামাজিক কাজে এলাকায় মানুষের পাশে সব সময় ছিলাম থাকবো ।দল ও জনগণ চাইলে আমি নির্বাচন করার ইচ্ছা আছে।

এ অবস্থায় দীর্ঘ দিনের একক নেতৃত্বে থাকা আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসেবে পরিচিত বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া আসনটিতে মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব বা গ্রুপিং আগামীতে স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাড় করাবে বলে সাধারণ নেতাকর্মীদের ধারনা।

আব্দুল মতিন খসরুর শূন্যতায় প্রার্থী হতে চান যারা

 সৌরভ মাহমুদ হারুন, ব্রাহ্মনপাড়া (কুমিল্লা) 
২৩ এপ্রিল ২০২১, ১১:০৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া) সংসদীয় আসন। সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিতে অনেকটা অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা ছিলেন প্রয়াত এমপি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু।

গত ১৪ এপ্রিল এই নেতার মৃত্যু পরই শূন্য হওয়া আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আলোচনায় এসেছে কমপক্ষে ১৮ জনের নাম। তারা হচ্ছেন- প্রয়াত নেতার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, সহোদর, দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, রাজনৈতিক শিষ্য, সরকারি অবসরপ্রাপ্ত আমলা বা আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক।

বিগত প্রায় চার দশক ধরে এই আসনের প্রার্থী ৫ বারের সংসদ সদস্য প্রয়াত নেতার সাম্প্রতিক সময়ে করোনায় অসুস্থতার পর থেকেই মুলতঃ অনেকে এই আসনের বিকল্প প্রার্থী হিসেবে নিজেদের ভাবতে শুরু করেছেন। ফলে ১৪ এপ্রিল ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর থেকেই নানাভাবে আলোচনায় আসতে থাকে এসব নাম।

দীর্ঘদিনের একক রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব থেকে আবারো ক্ষমতার মোহে বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া আসনটিতে একাধিক প্রার্থীর উঁকিঝুঁকি  নতুন করে গ্রুপিং সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ নেতাকর্মীদের মনোবল নষ্ট করে দিতে পারে।

তবে প্রয়াত এমপির অন্যতম রাজনৈতিক শিষ্য সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমরা বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ মিলে সিদ্ধান্ত নিব। তবে এ কথায় কেউ ভরসা করতে পারছেন না। ফলে অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেছে একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন দৌড়ের বিষয়টি।

কুমিল্লার ভারত সীমান্তবর্তী বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া সংসদীয় আসনটি স্বাধীনতার আগ থেকেই আওয়ামী লীগের সমর্থন পুষ্ট এলাকা। বুড়িচংয়ের ৯টি এবং ব্রাহ্মণপাড়ার ৮টিসহ মোট ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই দুটি উপজেলার সংসদীয় আসনের মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষাধিক। স্বাধীনতা পরবর্তী এই আসনটি থেকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মতিন খসরু ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৯, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে (মোট ৫ বার) সংসদ সদস্য নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন।

গত ১৪ এপ্রিল তিনি মারা যাওয়ার পর আলোচনায় আসতে থাকে শূন্য আসনের নেতৃত্বে ইচ্ছুক একাধিক প্রার্থীর নাম। এ তালিকায় প্রথমে সাবেক বুড়িচং উপজেলা চেয়ারম্যান ও বর্তমানে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেনের নাম শোনা গেলেও এমপির স্নেহভাজন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা অধ্যক্ষ আবু সালেহ মোহাম্মদ সেলিম রেজা সৌরভ, বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও কুমিল্লা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল হাসেম খান, এমপি মতিন খসরুর ছেলে মুনেফ ওয়াসিফ, মেয়ে ডা. উম্মে হাবিবা দিলশাদ মুনমুন, প্রয়াত এমপির সহোদর কুমিল্লা বারের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল মমিন ফেরদৌস, স্ত্রী সালমা সোবহান খসরু, ওষুধ প্রশাসনের ডিজি (সাবেক) মেজর জেনারেল (অব.) মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বর্তমান বুড়িচং উপজেলা চেয়ারম্যান আখলাক হায়দার, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য আবদুস সালাম বেগ, ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল বারী, কুমিল্লা জেলা পরিষদ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) সদস্য তারিক হায়দার, অধ্যক্ষ মো. আলী চৌধুরী মানিক, ইঞ্জিনিয়ার আল-আমীন, শাহজালাল মজুমদার, অধ্যাপক এমএ মতিন, কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা এহতেশামুল হাসান ভূঁইয়া রুমীর নাম।

এদিকে প্রয়াত নেতার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে অপ্রকাশ্যে সীমান্তবর্তী বুড়িচং, ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলায় শূন্য আসনের নেতৃত্ব পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে উল্লেখিত নেতাসহ বিভিন্ন স্বজনরা। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাইলে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সবাই কমবেশি আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন নানা ভাবে।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, নেতার শূন্য হওয়া স্থানটি পূরণ হওয়ার নয়। তবুও এগিয়ে যেতে হবে। নিজে প্রার্থিতা হওয়ার ইচ্ছের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এজন্য তিনি বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলার দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, প্রয়াত এমপির স্ত্রী, ভাই, সেলিম রেজা সৌরভসহ নেতৃত্বে থাকা অন্যান্যদের নিয়ে পরামর্শ করবেন। তবে সবচেয়ে বড় কথা নেত্রী যাকে মনোনয়ন দেন তার পক্ষে কাজ করার অঙ্গীকার করেন তিনি।

বুড়িচং উপজেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাশেম মনোনয়ন প্রত্যাশার আগ্রহ ব্যক্ত করে বলেন, প্রয়াত এমপি মতিন খসরুর সঙ্গে আমার পথ চলা ১৯৬৯ সাল থেকে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৫২ বছর আমাদের একসঙ্গে রাজনীতি। একদিনের জন্যও কেউ কাউকে ছেড়ে যাইনি।

বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো. আল আমিন বলেন, প্রয়াত এমপি আব্দুল মতিন খসরুর সঙ্গে থেকে আমি দীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছি। আমি একজন দলীয় প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন প্রত্যাশী।

বুড়িচং উপজেলা চেয়ারম্যান ও বুড়িচং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আখলাক হায়দার বলেন, প্রয়াত এমপি পরিবারের ৪ জন রয়েছেন। যদি তাদের কেউ নির্বাচনে না আসেন, তাহলে আমরা সবাই বসে সিদ্ধান্ত নিব। দল যাকে মনোনয়ন দেয় আমরা তার পক্ষে কাজ করবো। এসময় তিনি নিজেও প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছের কথা জানান। 

আবু সালেহ মোহাম্মদ সেলিম রেজা সৌরভ শূন্য হওয়া আসনটিতে নিজেকে প্রার্থী করার আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন।

ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী প্রার্থিতা হতে নিজের ইচ্ছের কথা জানিয়ে বলেন, দল যদি মনোনয়ন দেয়, তবে আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে রাজী আছি।

ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বারী প্রার্থিতার ইচ্ছের কথা জানিয়ে বলেন, দল চাইলে আমি অবশ্যই প্রার্থী হতে রাজী আছি। দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থেকে ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলার মানুষের সেবা করছি।

বুড়িচং আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আল-আমিন প্রয়াত নেতার মৃত্যু পরবর্তী শূন্য আসনটিতে মনোনয়ন প্রত্যাশা করে বলেন, নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি অবশ্যই প্রার্থী হতে ইচ্ছুক।

প্রয়াত নেতার সহোদর আবদুল মমিন ফেরদৌস শূন্য আসনটিতে প্রার্থিতার বিষয়ে তিনি বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে তার ছেলে মুনেফ ওয়াসিফ ও কন্যা ডা. উম্মে হাবিবা দিলশাদ মুনমুন যদি প্রার্থী না হয় তবে আমি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছে আছে। 

অধ্যক্ষ মো. আলী চৌধুরী মানিক মনোনয়ন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, আমি বিগত তিনবার মনোনয়ন চেয়ে পাইনি। এবারো চাইবো। যদি পাই তবে প্রয়াত এমপি মতিন খসরু অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করবো। 

মেজর জেনারেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান শূন্য আসনটিতে উপনির্বাচনে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। তিনি দলের হাইকমান্ডের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমি প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। দল মনোনয়ন দিলে অবশ্যই আমি নির্বাচন করবো।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, আমি গতবার মনোনয়ন চেয়ে পাইনি। জননেত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করার ইচ্ছে আছে। এবার ইনশাআল্লাহ শতভাগ নিশ্চিত।

আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদের সহসভাপতি শাহজালাল মজুমদার প্রার্থিতা হতে ইচ্ছের কথা জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ দিন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছি। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অবশ্যই আমাকে মূল্যায়ন করবেন। আমি এই আসনে দলের পক্ষে নির্বাচনে প্রার্থী হতে মনোনয়ন চাইবো।

সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার সোহরার খান চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছি। আমি একজন দলীয় প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন প্রত্যাশী। আমি এই উপনির্বাচনে দল মনোনয়নের বিষয় নেত্রীর ওপর আস্থা রাখছি। এসময় তিনি নিজেও প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছের কথা জানান।

বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা এমএ মতিন (এমবিএ) শূন্য আসনটিতে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে বলেন, মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হলে আমি অবশ্যই কেন্দ্রের কাছে মনোনয়ন চাইবো। আশা করি দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।

বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক, কুমিল্লা জেলা পরিষদ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) সদস্য তারিক হায়দার বলেন, আমি এই দুটি উপজেলা নিয়ে যে সংসদীয় আসন তারই জেলা পরিষদের সদস্য।  আমি নিজেকে এই আসনের যোগ্য প্রার্থী মনে করি। তবে যদি প্রয়াত এমপি পরিবারের বাহিরে কেউ নির্বাচনে আসে তাহলে আমারও প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা আছে।

বাংলাদেশ যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হাসান ভূঁইয়া রুমি বলেন, নেত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি যাকে প্রার্থী মনোনয়ন দিবেন আমরা তার পক্ষে কাজ করবো। তবে আমিও ইচ্ছুক। আমি প্রার্থী হয়ে প্রয়াত নেতা আব্দুল মতিন খসরুর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে চাই।

প্রয়াত এমপির ছেলে মুনেফ ওয়াসিফ, মেয়ে বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা.উম্মে হাবিবা দিলশাদ মুনমুন, ভাই অ্যাডভোকেট ফেরদৌস নিশ্চিত এর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।

এদিকে প্রয়াত এমপির স্ত্রী সেলিনা সোবহান খসরু যুগান্তরকে জানান, আমি শোকাহত। এ বিষয় নিয়ে এখনো চিন্তা করি নাই। তবে আগামীতে কেন্দ্র ও দুই উপজেলার নেতৃবৃন্দসহ জনগণ যদি আমাকে প্রয়োজন মনে করে তবে বিষয়টা আমি ভেবে দেখবো।

আরেক জন মনোনয়ন প্রত্যাশী আব্দুল জলিল বলেন, আমি দীর্ঘদিন ছাত্ররাজনীতি করে আসছি। এছাড়া দলীয় সকল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমি সব সময় জড়িত আছি ।সামাজিক কাজে এলাকায় মানুষের পাশে সব সময় ছিলাম থাকবো ।দল ও জনগণ চাইলে আমি নির্বাচন করার ইচ্ছা আছে।

এ অবস্থায় দীর্ঘ দিনের একক নেতৃত্বে থাকা আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসেবে পরিচিত বুড়িচং-ব্রাহ্মনপাড়া আসনটিতে মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব বা গ্রুপিং আগামীতে স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাড় করাবে বলে সাধারণ নেতাকর্মীদের ধারনা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন