নতুন কমিটি হলেই পাল্টা কমিটির হুমকি দেয় শফীপন্থীরা!
jugantor
নতুন কমিটি হলেই পাল্টা কমিটির হুমকি দেয় শফীপন্থীরা!

  আবু তালেব, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি  

০৮ জুন ২০২১, ১৭:৫২:১৮  |  অনলাইন সংস্করণ

নেতৃত্বে রাজনীতিকরাই  নতুন কমিটি হলেই পাল্টা কমিটির হুমকি দেয় শফীপন্থীরা!

নতুন কমিটি ঘোষণার মাধ্যমে আবারও আলোচনায় এসেছে ধর্মভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সম্প্রতি সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ফের প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে।

অবশ্য সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা আহমদ শফীর জীবদ্দশাতেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ পেয়েছিল। সেসময় সংগঠনটির বর্তমান আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এবং শফীপুত্র আনাস মাদানীর মধ্যে হাটহাজারী মাদ্রাসা ও হেফাজত কেন্দ্রীক বিভিন্ন কোন্দলের খবর বাইরে এসেছে অনেকবার।

এরমধ্যে আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর গত বছরের ১৫ নভেম্বর হেফাজতের তৎকালীন মহাসচিব বাবুনগরী কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্বের কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেন। যেটিতে শফীপুত্র আনাস ও তাদের অনুসারীদের বাদ দেওয়ায় সংগঠনটির কোন্দল প্রকাশ্যে রূপ নেয়।

সেসময় আল্লামা শফীর অনুসারীরা ওই কমিটিকে বাবুনগরীর ‘ফটিকছড়ি কমিটি’ ও ‘রাজনৈতিক কমিটি’ আখ্যা দেয় এবং অচিরেই আল্লামা শফীর নীতি আদর্শকে ধারণ করে নতুন কমিটি করার ঘোষণা দেন।

এরমধ্যে গত ২৬ মার্চ ও এর পরবর্তী সময়ে হেফাজতে ইসলামের সহিংস কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে দেশব্যাপী নেতাদের গ্রেফতার ও নানামুখী চাপে ২৫ এগ্রিল রাতে হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন বাবুনগরী।

পরে ৫ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির নাম ঘোষণা করার পরপর ফেসবুক লাইভে এসে একই সুরে কথা বলেন শফিপন্থী হিসেবে পরিচিত হেফাজতের প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম মহাসচিব মাঈনুদ্দিন রুহী। তবে এতদিনেও কোনো কমিটি দেননি তারা।

এরমধ্যে সোমবার (৭ জুন) ঢাকার খিলগাঁওয়ের মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে আমির পদে আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী ও মহাসচিব পদে মাওলানা নুরুল ইসলাম জেহাদীসহ ৩৩ সদস্যের নতুন কমিটিতে ফের বাদ পড়েছেন শফীপন্থীরা। তবে ওই কমিটিতে আল্লামা শফীর বড় ছেলে মাওলানা ইউসুফ মাদানীকে রাখা হয়। যদিও ইউসুফ মাদানী ওই কমিটি প্রত্যাখান করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, আমি এ কাজের মানুষ না। কমিটিতে রাখার বিষয়ে আমার সঙ্গে কেউ কথা বলেনি। আমার অনুমতি না নিয়ে কমিটিতে রাখাটা অন্যায়। আমি তো কোনো কমিটিতে থাকার মানুষ নই। জীবনে কখনো আমি ছিলাম না, থাকবও না। রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক কোন সংগঠনের সঙ্গে আমি জড়িত নই।

এরপর বিষয়টিতে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি হওয়ায় পূর্বের সেই পুরানো সুরে কথা বলতে শুরু করেন শফিপন্থীরা। এরমধ্যেই তাদের পাল্টা কমিটি গঠনের প্রস্তুতির খবর মিলেছে। এক্ষেত্রে তারা পাল্টা কমিটি দেওয়ার প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মাওলানা আনাস মাদানী মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, আল্লামা আহমদ শফী যে উদ্দেশ্য নিয়ে হেফাজত গঠন করেছিলেন ঘোষিত কমিটিতে তার আদর্শের প্রতিফলন ঘটেনি। তার চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কমিটির মিল নেই। বিতর্কিত, বিভিন্ন মামলার আসামি এমনকি উগ্রবাদী অনেককে নতুন কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে হেফাজত গঠিত হয়েছিল এ কমিটি দিয়ে তা পূরণ হবে না। তাই আমরা এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করছি।

বড় ভাই মাওলানা ইউসুফকে কমিটিতে পদ দেয়া নিয়ে আনাস মাদানি আরও বলেন, বড় ভাই ইউসুফকে কমিটিতে রাখা নিয়ে প্রতারণা করেছে। উনি বারবার বলার পরেও উনাকে রাখা হয়েছে। এ কমিটিতে রাখার মাধ্যমে তাকে উল্টো বিব্রত করা হয়েছে।

পাল্টা কমিটি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এ ব্যাপারে প্রস্তুতি নিচ্ছি। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে আপনাদের জানাব। এছাড়া যেসব ব্যক্তিদের কমিটিতে রাখা হয়েছে তাদের বেশিরভাগই বিতর্কিত এবং রাজনৈতিক পরিচয়ধারী বলে মনে করেন আনাস মাদানী।

তিনি বলেন, এরকম বিতর্কিত ব্যক্তিদের দিয়ে এত বড় সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব হয় না। হেফাজতের নেতাকর্মীদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি।

এদিকে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের পদে না রাখার কথা বলা হলেও ঘোষিত নতুন কমিটিতে তার প্রতিফলন ঘটেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

নতুন কমিটিতে রাজনীতিকদের মধ্যে আছেন—নায়েবে আমির আতাউল্লাহ হাফেজ্জি, যিনি খেলাফত আন্দোলনের আমির। যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আনোয়ারুল করিম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহ-সভাপতি পদে আছেন। দাওয়া বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সোবহানী হলেন খেলাফত মজলিসের নেতা। সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস খেলাফত আন্দোলনের নেতা। জামায়াতে ইসলামের কোনও পদে না থাকলেও হেফাজতের প্রচার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী জামায়াতভিত্তিক ওলামা মাশায়েখ ও মসজিদ মিশন কেন্দ্রিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া তিনি ইসলামী ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডের সদস্য।

আলেমদের অভিযোগ, হেফাজতে ইসলামের এই কমিটি গঠনের নামে স্বজনপ্রীতি আর আত্মীয়করণ করা হয়েছে। হেফাজত আমির মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী ও প্রধান উপদেষ্টা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হচ্ছেন আপন মামা-ভাগ্নে।

কওমি মাদ্রাসার আলেমরা বলছেন, নতুন কমিটি গঠনের নামে মূলত হাস্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ—রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি কওমি শিক্ষায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড আছে, ঘোষিত কমিটিতে এখন সেই বোর্ডের কর্তাদের সামনে আনা হয়েছে। এতে মাদ্রাসা শিক্ষার ওপরে প্রভাব পড়বে।

যদিও বর্তমান কমিটির নেতারা এসব অভিযোগকে আমলে নিতে রাজি নন। নাম প্রকাশ না করে কমিটির এক নেতা বলেন, সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা মাওলানা আনাস মাদানী ও মাওলানা মাঈনুদ্দিন রুহীসহ কয়েকজনের নাম নতুন কমিটিতে না থাকায় তারা ফের আজেবাজে কথা বলা শুরু করেছ। এটা তাদের পুরানো অভ্যাস।

অবশ্য একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, শফীপন্থীরা অভিমান ভুলে সদ্য ঘোষিত কমিটিতে ফিরতে রাজি আছেন। তবে শর্ত হচ্ছে, সদ্য ঘোষিত কমিটি সংস্কার করতে হবে এবং আল্লামা শফীর নীতি আদর্শে ফিরে আসতে হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম মহাসচিব মাঈনুদ্দিন রুহী সদ্য ঘোষিত কমিটিকে পুরান বউকে নতুন শাড়ি পড়ানোর মতো একটি কমিটি বলে আখ্যা দেন।

তিনি বলেন, বাবুনগরী পুরান কমিটির নেতাদের নিয়ে এদিক-ওদিক করে নতুন কমিটি করেছে। যে কমিটি হয়েছে তা জাতির সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। আমি বলব, এটা পুরানো কমিটিই। আমি আগে বলেছি, এখনও বলছি, এটি একটি ফটিকছড়ি সমিতি।

পাল্টা কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে মাঈনুদ্দিন রুহী বলেন, আমরা অবশ্যই কমিটি করব। তার মানে আমরা কমিটি সংস্কার করব। কারণ আল্লামা শফী বেঁচে থাকতেই ২০১ সদস্যের একটি কমিটি চূড়ান্ত করে দিয়েছেন। ওই কাগজে আহমদ শফী ও জুনায়েদ বাবুনগরীর যৌথ স্বাক্ষর রয়েছে। তবে শেষ মুহূর্তে হাটহাজারী মাদ্রাসা কেন্দ্রীক অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকট হলে ওই কমিটি ঘোষণা করা হয়নি।
কবে নাগাদ ওই কমিটি প্রকাশ করা হবে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, আমরা নতুন কমিটি পর্যবেক্ষণ করছি। তাছাড়া কমিটির বিষয়ে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগও করেনি। আমরাও তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করিনি।

এছাড়া আগামী ১৭ জুন ঢাকার কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে দেশের চলমান সংকট থেকে উত্তরণ ও আল্লামা শাহ আহমদ শফীর জীবন-কর্ম শীর্ষক একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে আগত মুরুব্বিদের সঙ্গে কথা বলে নতুন কমিটি তথা কমিটি সংস্কারের বিষয়টি আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ করে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে তিনি জানান।

এদিকে, হেফাজতের কমিটি কীভাবে গঠিত হবে, তার দিক-নির্দেশনা সংগঠনের গঠনতন্ত্রে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সদ্য ঘোষিত কমিটির প্রচার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী। আর এসব মেনেই নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে দাবি তার।

মঙ্গলবার যুগান্তরকে তিনি বলেন, শফীপন্থীরা কেন পাল্টা কমিটি করবে? সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়েছে। এখানে তো কারো কোন রাজনৈতিক অভিলাষ নেই। হেফাজত ১৩ দফা দাবিকে সামনে রেখে আখিরাত ও পরকালের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আমি মনে করি, মুসলমান হিসেবে আমার, আপনার এমনকি দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিরোধী দলের নেতাসহ সবাই হেফাজতের কর্মী।

পাল্টা কমিটি গঠনের কথাটা তাদের পুরনো অভ্যাস এমনটা দাবি করে তিনি আরও বলেন, তারা আসলে আমাদের কমিটি গঠনের পর এভাবে একটু নড়েচড়ে বসে এবং পাল্টা কমিটি করার হুমকি-ধামকি দেয়। তাই তাদের উদ্দেশ্যে বলবো, আপনারা আবেগের বশবর্তী হয়ে দেশ ও মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি হয় এমন কোন কাজে আশাকরি জড়াবেন না।

প্রসঙ্গত, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক একটি ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন হিসেবে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে এর যাত্রা শুরু হয়। হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা।

২০১১ সালে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা’ ঘোষিত হওয়ার পরপরই সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে সংগঠনটি।

২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের বিরোধিতা করে আলোচনায় আসে সংগঠনটি। এছাড়া ১৩ দফা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে প্রথমে সংগঠনটি ২০১৩ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকা অবরোধ ও ৫ মে শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার পর সংগঠনটি দেশে-বিদেশে আলোচনায় আসে।

নতুন কমিটি হলেই পাল্টা কমিটির হুমকি দেয় শফীপন্থীরা!

 আবু তালেব, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 
০৮ জুন ২০২১, ০৫:৫২ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
নেতৃত্বে রাজনীতিকরাই  নতুন কমিটি হলেই পাল্টা কমিটির হুমকি দেয় শফীপন্থীরা!
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

নতুন কমিটি ঘোষণার মাধ্যমে আবারও আলোচনায় এসেছে ধর্মভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সম্প্রতি সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ফের প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। 

অবশ্য সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা আহমদ শফীর জীবদ্দশাতেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ পেয়েছিল। সেসময় সংগঠনটির বর্তমান আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এবং শফীপুত্র আনাস মাদানীর মধ্যে হাটহাজারী মাদ্রাসা ও হেফাজত কেন্দ্রীক বিভিন্ন কোন্দলের খবর বাইরে এসেছে অনেকবার। 

এরমধ্যে আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর গত বছরের ১৫ নভেম্বর হেফাজতের তৎকালীন মহাসচিব বাবুনগরী কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্বের কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেন। যেটিতে শফীপুত্র আনাস ও তাদের অনুসারীদের বাদ দেওয়ায় সংগঠনটির কোন্দল প্রকাশ্যে রূপ নেয়। 

সেসময় আল্লামা শফীর অনুসারীরা ওই কমিটিকে বাবুনগরীর ‘ফটিকছড়ি কমিটি’ ও ‘রাজনৈতিক কমিটি’ আখ্যা দেয় এবং অচিরেই আল্লামা শফীর নীতি আদর্শকে ধারণ করে নতুন কমিটি করার ঘোষণা দেন। 

এরমধ্যে গত ২৬ মার্চ ও এর পরবর্তী সময়ে হেফাজতে ইসলামের সহিংস কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে দেশব্যাপী নেতাদের গ্রেফতার ও নানামুখী চাপে ২৫ এগ্রিল রাতে হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন বাবুনগরী। 

পরে ৫ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির নাম ঘোষণা করার পরপর ফেসবুক লাইভে এসে একই সুরে কথা বলেন শফিপন্থী হিসেবে পরিচিত হেফাজতের প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম মহাসচিব মাঈনুদ্দিন রুহী। তবে এতদিনেও কোনো কমিটি দেননি তারা।  

এরমধ্যে সোমবার (৭ জুন) ঢাকার খিলগাঁওয়ের মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে আমির পদে আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী ও মহাসচিব পদে মাওলানা নুরুল ইসলাম জেহাদীসহ ৩৩ সদস্যের নতুন কমিটিতে ফের বাদ পড়েছেন শফীপন্থীরা। তবে ওই কমিটিতে আল্লামা শফীর বড় ছেলে মাওলানা ইউসুফ মাদানীকে রাখা হয়। যদিও ইউসুফ মাদানী ওই কমিটি প্রত্যাখান করেছেন। 

তিনি জানিয়েছেন, আমি এ কাজের মানুষ না। কমিটিতে রাখার বিষয়ে আমার সঙ্গে কেউ কথা বলেনি। আমার অনুমতি না নিয়ে কমিটিতে রাখাটা অন্যায়। আমি তো কোনো কমিটিতে থাকার মানুষ নই। জীবনে কখনো আমি ছিলাম না, থাকবও না। রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক কোন সংগঠনের সঙ্গে আমি জড়িত নই।

এরপর বিষয়টিতে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি হওয়ায় পূর্বের সেই পুরানো সুরে কথা বলতে শুরু করেন শফিপন্থীরা। এরমধ্যেই তাদের পাল্টা কমিটি গঠনের প্রস্তুতির খবর মিলেছে। এক্ষেত্রে তারা পাল্টা কমিটি দেওয়ার প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছেন বলে জানা গেছে। 

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মাওলানা আনাস মাদানী মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, আল্লামা আহমদ শফী যে উদ্দেশ্য নিয়ে হেফাজত গঠন করেছিলেন ঘোষিত কমিটিতে তার আদর্শের প্রতিফলন ঘটেনি। তার চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কমিটির মিল নেই। বিতর্কিত, বিভিন্ন মামলার আসামি এমনকি উগ্রবাদী অনেককে নতুন কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে হেফাজত গঠিত হয়েছিল এ কমিটি দিয়ে তা পূরণ হবে না। তাই আমরা এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করছি। 

বড় ভাই মাওলানা ইউসুফকে কমিটিতে পদ দেয়া নিয়ে আনাস মাদানি আরও বলেন, বড় ভাই ইউসুফকে কমিটিতে রাখা নিয়ে প্রতারণা করেছে। উনি বারবার বলার পরেও উনাকে রাখা হয়েছে। এ কমিটিতে রাখার মাধ্যমে তাকে উল্টো বিব্রত করা হয়েছে।

পাল্টা কমিটি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এ ব্যাপারে প্রস্তুতি নিচ্ছি। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে আপনাদের জানাব। এছাড়া যেসব ব্যক্তিদের কমিটিতে রাখা হয়েছে তাদের বেশিরভাগই বিতর্কিত এবং রাজনৈতিক পরিচয়ধারী বলে মনে করেন আনাস মাদানী।  

তিনি বলেন, এরকম বিতর্কিত ব্যক্তিদের দিয়ে এত বড় সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব হয় না। হেফাজতের নেতাকর্মীদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি।

এদিকে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের পদে না রাখার কথা বলা হলেও ঘোষিত নতুন কমিটিতে তার প্রতিফলন ঘটেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। 

নতুন কমিটিতে রাজনীতিকদের মধ্যে আছেন—নায়েবে আমির আতাউল্লাহ হাফেজ্জি, যিনি খেলাফত আন্দোলনের আমির। যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আনোয়ারুল করিম,  জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের  সহ-সভাপতি পদে আছেন। দাওয়া বিষয়ক সম্পাদক  মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সোবহানী হলেন খেলাফত মজলিসের নেতা। সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস খেলাফত আন্দোলনের নেতা। জামায়াতে ইসলামের কোনও পদে না থাকলেও হেফাজতের প্রচার সম্পাদক  মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী জামায়াতভিত্তিক ওলামা মাশায়েখ ও মসজিদ মিশন কেন্দ্রিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া তিনি ইসলামী ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডের সদস্য।

আলেমদের অভিযোগ, হেফাজতে ইসলামের এই কমিটি গঠনের নামে স্বজনপ্রীতি আর আত্মীয়করণ করা হয়েছে। হেফাজত আমির মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী ও প্রধান উপদেষ্টা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হচ্ছেন আপন মামা-ভাগ্নে।

কওমি মাদ্রাসার আলেমরা বলছেন, নতুন কমিটি গঠনের নামে মূলত হাস্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ—রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি কওমি শিক্ষায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড আছে, ঘোষিত কমিটিতে এখন সেই বোর্ডের কর্তাদের সামনে আনা হয়েছে। এতে মাদ্রাসা শিক্ষার ওপরে প্রভাব পড়বে।

যদিও বর্তমান কমিটির নেতারা এসব অভিযোগকে আমলে নিতে রাজি নন। নাম প্রকাশ না করে কমিটির এক নেতা বলেন, সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা মাওলানা আনাস মাদানী ও মাওলানা মাঈনুদ্দিন রুহীসহ কয়েকজনের নাম নতুন কমিটিতে না থাকায় তারা ফের আজেবাজে কথা বলা শুরু করেছ। এটা তাদের পুরানো অভ্যাস। 

অবশ্য একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, শফীপন্থীরা অভিমান ভুলে সদ্য ঘোষিত কমিটিতে ফিরতে রাজি আছেন। তবে শর্ত হচ্ছে, সদ্য ঘোষিত কমিটি সংস্কার করতে হবে এবং আল্লামা শফীর নীতি আদর্শে ফিরে আসতে হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম মহাসচিব মাঈনুদ্দিন রুহী সদ্য ঘোষিত কমিটিকে পুরান বউকে নতুন শাড়ি পড়ানোর মতো একটি কমিটি বলে আখ্যা দেন। 

তিনি বলেন, বাবুনগরী পুরান কমিটির নেতাদের নিয়ে এদিক-ওদিক করে নতুন কমিটি করেছে। যে কমিটি হয়েছে তা জাতির সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। আমি বলব, এটা পুরানো কমিটিই। আমি আগে বলেছি, এখনও বলছি, এটি একটি ফটিকছড়ি সমিতি।

পাল্টা কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে মাঈনুদ্দিন রুহী বলেন, আমরা অবশ্যই কমিটি করব। তার মানে আমরা কমিটি সংস্কার করব। কারণ আল্লামা শফী বেঁচে থাকতেই ২০১ সদস্যের একটি কমিটি চূড়ান্ত করে দিয়েছেন। ওই কাগজে আহমদ শফী ও জুনায়েদ বাবুনগরীর যৌথ স্বাক্ষর রয়েছে। তবে  শেষ মুহূর্তে হাটহাজারী মাদ্রাসা কেন্দ্রীক অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকট হলে ওই কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। 
কবে নাগাদ ওই কমিটি প্রকাশ করা হবে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, আমরা নতুন কমিটি পর্যবেক্ষণ করছি। তাছাড়া কমিটির বিষয়ে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগও করেনি। আমরাও তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করিনি। 

এছাড়া আগামী ১৭ জুন ঢাকার কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে দেশের চলমান সংকট থেকে উত্তরণ ও আল্লামা শাহ আহমদ শফীর জীবন-কর্ম শীর্ষক একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে আগত মুরুব্বিদের সঙ্গে কথা বলে নতুন কমিটি তথা কমিটি সংস্কারের বিষয়টি আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শ করে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে তিনি জানান। 

এদিকে, হেফাজতের কমিটি কীভাবে গঠিত হবে, তার দিক-নির্দেশনা সংগঠনের গঠনতন্ত্রে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সদ্য ঘোষিত কমিটির প্রচার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী। আর এসব মেনেই নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে দাবি তার।  

মঙ্গলবার যুগান্তরকে তিনি বলেন, শফীপন্থীরা কেন পাল্টা কমিটি করবে? সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়েছে। এখানে তো কারো কোন রাজনৈতিক অভিলাষ নেই। হেফাজত ১৩ দফা দাবিকে সামনে রেখে আখিরাত ও পরকালের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আমি মনে করি, মুসলমান হিসেবে আমার, আপনার এমনকি দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিরোধী দলের নেতাসহ সবাই হেফাজতের কর্মী। 

পাল্টা কমিটি গঠনের কথাটা তাদের পুরনো অভ্যাস এমনটা দাবি করে তিনি আরও বলেন, তারা আসলে আমাদের কমিটি গঠনের পর এভাবে একটু নড়েচড়ে বসে এবং পাল্টা কমিটি করার হুমকি-ধামকি দেয়। তাই তাদের উদ্দেশ্যে বলবো, আপনারা আবেগের বশবর্তী হয়ে দেশ ও মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি হয় এমন কোন কাজে আশাকরি জড়াবেন না। 

প্রসঙ্গত, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক একটি ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন হিসেবে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে এর যাত্রা শুরু হয়। হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা। 

২০১১ সালে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা’ ঘোষিত হওয়ার পরপরই সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে সংগঠনটি। 

২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের বিরোধিতা করে আলোচনায় আসে সংগঠনটি। এছাড়া ১৩ দফা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে প্রথমে সংগঠনটি ২০১৩ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকা অবরোধ ও ৫ মে শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার পর সংগঠনটি দেশে-বিদেশে আলোচনায় আসে। 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : হেফাজতে অস্থিরতা