ঋণ খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কট করা উচিত
jugantor
সংসদে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম
ঋণ খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কট করা উচিত

  সংসদ প্রতিবেদক  

১৪ জুন ২০২১, ১৬:২৫:৪০  |  অনলাইন সংস্করণ

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি বলেছেন, দেরিতে হলেও সরকার বুঝতে পেরেছে, বেসরকারিখাতকে সত্যিকারার্থে চাঙ্গা করতে না পারলে দেশ সামনের দিকে এগোবে না। কারণ, ঋণের বোঝা বাড়িয়ে উন্নয়ন করা হলে সেখানে এসডিজি অর্জিত হবে না। প্রবাসী আয় দিয়ে রিজার্ভ বাড়িয়েও লাভ নেই। রিজার্ভ দিয়ে অর্থনীতির চাকাকে বেগবান করা যায় না। এছাড়া সরকার চাইলেও ২০ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে না। বাকি ৮০ কর্মসংস্থান বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে। তাই বেসরসকারি খাত যত শক্তিশালী ও স্বনির্ভর হবে, দেশ তত তাড়াতাড়ি উন্নত হবে।

সোমবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এসব কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, এখন প্রশ্ন হল- বেসরকারি খাতকে ড্রাইভিং সিটে বসানোর জন্য অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেটে যে রূপরেখা দিয়েছেন তা কতখানি বাস্তবসম্মত? এ বিষয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত হলো- পুরো বাজেট ব্যবসা বান্ধব। বাজেটে অনেক কর্মসংস্থান বাড়বে বলেও আশার ফানুস দেখানো হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর রোডম্যাপের কথা বলা নেই। কারা, কিভাবে সত্যিকারার্থে কর্মসংস্থান বাড়াতে পারবে; সেই সঠিক পথনকশা স্পষ্ট করা দরকার।

যথাযথ মনিটরিং ও কার্যকর রূপরেখা না থাকায় সরকারের অনেক সুবিধা কাজে আসে না দাবি করে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা না করেও এক শ্রেণির সুযোগ সন্ধানীরা সব সময় অসৎ উপায়ে সরকারের সুবিধা হাতিয়ে নেয়। এজন্য আমার কথা হল, যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা সরকারের ইতিবাচক রাজস্ব নীতির সুফল ভোগ করতে পারে- তার গ্যারান্টি নিশ্চিত করা। ব্যাংকগুলোতে আদায় না হওয়া ঋণগুলো তামাদি করে ঋণ অবলোপনের খাতায় স্থানান্তর করা হয়েছে। এর অর্থ হল- এই ঋণ আর আদায় হবে না। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল- কারা এসব ঋণ নিয়ে গেল? তাদের পরিচয় কী? না নিজেরা ভুয়া ঋণ নিয়ে এভাবে অবলোপনের খাতায় তুলে দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত করা উচিত।

ঋণ খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কট করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমার মতে যারা ঋণ খেলাপি, তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করা উচিত। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে তাদেরকে আমন্ত্রণ জানানো ঠিক হবে না। বিশেষ করে যারা বড় বড় ঋণ খেলাপি তারা যাতে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাদের কাছে বিমান টিকিট বিক্রি নিষিদ্ধ করতে হবে। দামি গাড়ি থাকলে সেটির লাইসেন্স বাতিল করা উচিত। এছাড়া তাদের সব সম্পদ জব্দ করে ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।

আলোচনার শুরুতেই তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। স্মরণ করেন ৯ বছরের সফল রাষ্ট্রনায়ক, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সরকার প্রধান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের প্রতি।

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, সংশোধন হওয়ার মতো এখনো অনেকগুলো যৌক্তিক বিষয় থাকা সত্ত্বেও এবারের বাজেট অবশ্যই নতুন একটি মাইলফলক ছুঁতে সমর্থ হয়েছে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিকে সামনে এনে প্রথমবারের মতো বেসরকারি খাতকে অর্থনীতির ড্রাইভিং সিটে বসানোর নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি সফল করতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে কর ও ভ্যাটে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এজন্য আমি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, ভ্যাট আদায় প্রক্রিয়া আরও ব্যবসা বান্ধব করা দরকার। এ নিয়ে অনেক অভিযোগও আছে। যেমন একটি মার্কেটের সব দোকানে ভ্যাট মেশিন নেই। ফলে এখানে বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া বড় বড় রেস্তরাঁসহ শপিংমলে কেনাকাটা করতে গেলে ক্রেতাদের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ হারে যে ভ্যাট আদায় করা হয়, তা আদৌ সরকারের কোষাগারে জমা হয় কিনা তা নিয়ে ক্রেতাসাধারণের মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এজন্য ভ্যাট আদায়ে পদ্ধতিগত সংস্কার আনা খুবই জরুরি। অর্থাৎ ভ্যাট প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতার মোবাইল ফোনে ভ্যাট অফিস থেকে ভ্যাট প্রাপ্তির ম্যাসেস আসতে হবে।

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম দাবি করেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন কিছু নয়। তিনি বলেন, আমার মতে যারা অনেক আগেই কর দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন, কিন্তু কর দিচ্ছেন না- তাদেরকে করের আওতায় আনতে হবে। এজন্য সরকার উপজেলা থেকে একেবারে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কর অফিস ওপেন করতে পারে। এতে মানুষ প্রত্যক্ষভাবে কর দেওয়া শিখবে এবং করদাতা হিসেবে গর্ববোধ করতে পারবে। এভাবে কর আদায় ও কর ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হলে রাজস্ব আদায় দ্বিগুণ হবে। সরকারের বাজেট ঘাটতি ও ঋণের বোঝা কমে আসবে।

বিদ্যমান ভ্যাট আইনে বন্ড সংক্রান্ত নতুন করে একটি বিধি যুক্ত করার সমালোচনা করে এবং এটি সংশোধনের দাবি জানিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের মধ্যে বিদ্যমান ভ্যাট আইনে বন্ড সংক্রান্ত নতুন করে একটি বিধি যুক্ত করা হয়েছে। বিধি ১৮(গ) তে বলা হয়েছে, যেসব গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স নেই, তাদের কাছে টেক্সটাইল মালিকরা কাপড় বিক্রি করতে পারবেন না। যদি তারা করেন, তাহলে সেটি রফতানি হিসেবে গণ্য করা হবে না। এরফলে এই পণ্য স্থানীয় কাপড় বিক্রির হিসাবে যুক্ত করা হলে সেখানে সরকারকে ভ্যাট দিতে হবে। এতে করে চরম বিপাকে পড়বে টেক্সটাইল খাত। বিশেষ করে কাপড় বিক্রি করলে টেক্সটাইল মালিকদের ভ্যাট গুনতে হবে। কেননা, আমাদের দেশে এমন অনেক গার্মেন্টস এবং নিট ফ্যাক্টরি আছে, যাদের বন্ড লাইসেন্স নেই। তাই এই বিধি যদি বলবৎ থাকে তাহলে টেক্সটাইল শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। যারা উৎপাদনে আছেন তারাও বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবেন না। কেননা, আমাদেরকে দক্ষ শ্রমিক, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালসহ বেশির ভাগ জিনিসই আমাদানি করতে হয়। ফলে অসম বাজার প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। আমি আশা করব, সরকার জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি বিবেচনা করবে।

করোনাকালীন সঙ্কট থেকে উত্তোরণে বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কবলে পড়ে গত দেড় বছর ধরে দেশের সামগ্রিক অথনীতি এক রকম তছনছ হয়ে গেছে। একেবারে খেটে খাওয়া দিনমজুর থেকে শুরু করে শিল্পপতি পর্যন্ত সবাইকে চরমভাবে ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। মোটকথা- ক্ষতির মধ্যে বহু মানুষ তার কাজ হারিয়েছে। লকডাউনের প্রভাবে চাকরি ও কাজ হারা মানুষগুলো দেনার ভারেও এখন ভারাক্রান্ত। গত বছরের টানা তিন মাসের লকডাউনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতে এবার করোনার দ্বিতীয় আঘাতে তাদের একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে যাওবার অবস্থা। সবকিছু মিলিয়ে সরকারি-বেসরকারি সব খাতে চাকরি বাজার এক রকম বন্ধ রয়েছে। চাকরিপ্রার্থী কর্মদক্ষ নতুন বেকাররাও দিশেহারা। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এই কঠিন পরিস্থিতিতে সরকার কী এগিয়ে আসেনি? উত্তর- অবশ্যই এসেছে। কিন্তু খতিয়ে দেখতে হবে- সরকার যেসব সহায়ক কর্মসূচির প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তা বাস্তবে কতখানি কার্যকর হয়েছে। ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে যাদের যত দ্রুত যেভাবে সহায়তা পাওয়ার কথা, তারা তা পেয়েছেন কিনা?

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে একজন শিল্পপতি হিসেবে আমার দাবি থাকবে- যে ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা ও যেভাবে বাস্তবায়ন করলে শিল্পউদ্যোক্তারা এই কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবে, সাধারণ ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবে, সেভাবে সরকার এগিয়ে আসুক।

তিনি বলেন, গতবারের করোনা পরিস্থিতি সামাল দিয়ে যখন শিল্পউদ্যোগক্তারা নানা প্রতিকূলতার মধ্যে এবার ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন তখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা বহাল রাখাসহ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও বিপণন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বর্ধিত করা একান্ত জরুরি। বিশেষ করে যারা কোনোদিন খেলাপি হননি তাদের এ সুবিধা দেওয়া উচিত। পাশাপাশি করোনা পরিস্থিতির মধ্যে এখন পর্যন্ত যতরকম সুযোগ সুবিধা সরকার দিয়েছেন তার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই।

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, যেহেতু আমি রাজনীতি করি। তাই সবশেষে রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে দু’একটি কথা বলতে চাই। আমি মনে করি, গণতন্ত্রের ভিত শক্তিশালী করতে হলে বিরোধী দল ও গণমাধ্যমকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। বাক স্বাধীনতাসহ সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করার সব ধরনের গণতান্ত্রিক চর্চার পথ উন্মুক্ত রাখা দরকার।

তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি, সমালোচনা মেনে নেওয়ার মতো মহৎ কাজ আর নেই। যে কোনো সমালোচনাকে সাধুবাদ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ায় হবে সঠিক কাজ। তাছাড়া জনগণ এখন অনেক সচেতন। আমি মনে করি বিরোধী দলের মতামত ও গণমাধ্যমের সঠিক সংবাদগুলোকে আমলে নিলে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের লাল সবুজের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।

সংসদে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম

ঋণ খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কট করা উচিত

 সংসদ প্রতিবেদক 
১৪ জুন ২০২১, ০৪:২৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি
জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি। ফাইল ছবি

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি বলেছেন, দেরিতে হলেও সরকার বুঝতে পেরেছে, বেসরকারিখাতকে সত্যিকারার্থে চাঙ্গা করতে না পারলে দেশ সামনের দিকে এগোবে না। কারণ, ঋণের বোঝা বাড়িয়ে উন্নয়ন করা হলে সেখানে এসডিজি অর্জিত হবে না। প্রবাসী আয় দিয়ে রিজার্ভ বাড়িয়েও লাভ নেই। রিজার্ভ দিয়ে অর্থনীতির চাকাকে বেগবান করা যায় না। এছাড়া সরকার চাইলেও ২০ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে না। বাকি ৮০ কর্মসংস্থান বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে। তাই বেসরসকারি খাত যত শক্তিশালী ও স্বনির্ভর হবে, দেশ তত তাড়াতাড়ি উন্নত হবে। 

সোমবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এসব কথা বলেন। 

তিনি আরও বলেন, এখন প্রশ্ন হল- বেসরকারি খাতকে ড্রাইভিং সিটে বসানোর জন্য অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেটে যে রূপরেখা দিয়েছেন তা কতখানি বাস্তবসম্মত? এ বিষয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত হলো- পুরো বাজেট ব্যবসা বান্ধব। বাজেটে অনেক কর্মসংস্থান বাড়বে বলেও আশার ফানুস দেখানো হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর রোডম্যাপের কথা বলা নেই। কারা, কিভাবে সত্যিকারার্থে কর্মসংস্থান বাড়াতে পারবে; সেই সঠিক পথনকশা স্পষ্ট করা দরকার।

যথাযথ মনিটরিং ও কার্যকর রূপরেখা না থাকায় সরকারের অনেক সুবিধা কাজে আসে না দাবি করে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা না করেও এক শ্রেণির সুযোগ সন্ধানীরা সব সময় অসৎ উপায়ে সরকারের সুবিধা হাতিয়ে নেয়। এজন্য আমার কথা হল, যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা সরকারের ইতিবাচক রাজস্ব নীতির সুফল ভোগ করতে পারে- তার গ্যারান্টি নিশ্চিত করা। ব্যাংকগুলোতে আদায় না হওয়া ঋণগুলো তামাদি করে ঋণ অবলোপনের খাতায় স্থানান্তর করা হয়েছে। এর অর্থ হল- এই ঋণ আর আদায় হবে না। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল- কারা এসব ঋণ নিয়ে গেল? তাদের পরিচয় কী? না নিজেরা ভুয়া ঋণ নিয়ে এভাবে অবলোপনের খাতায় তুলে দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত করা উচিত।

ঋণ খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কট করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমার মতে যারা ঋণ খেলাপি, তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করা উচিত। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে তাদেরকে আমন্ত্রণ জানানো ঠিক হবে না। বিশেষ করে যারা বড় বড় ঋণ খেলাপি তারা যাতে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাদের কাছে বিমান টিকিট বিক্রি নিষিদ্ধ করতে হবে। দামি গাড়ি থাকলে সেটির লাইসেন্স বাতিল করা উচিত। এছাড়া তাদের সব সম্পদ জব্দ করে ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। 

আলোচনার শুরুতেই তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। স্মরণ করেন ৯ বছরের সফল রাষ্ট্রনায়ক, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সরকার প্রধান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের প্রতি। 

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, সংশোধন হওয়ার মতো এখনো অনেকগুলো যৌক্তিক বিষয় থাকা সত্ত্বেও এবারের বাজেট অবশ্যই নতুন একটি মাইলফলক ছুঁতে সমর্থ হয়েছে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিকে সামনে এনে প্রথমবারের মতো বেসরকারি খাতকে অর্থনীতির ড্রাইভিং সিটে বসানোর নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি সফল করতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে কর ও ভ্যাটে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এজন্য আমি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। 

তিনি বলেন, ভ্যাট আদায় প্রক্রিয়া আরও ব্যবসা বান্ধব করা দরকার। এ নিয়ে অনেক অভিযোগও আছে। যেমন একটি মার্কেটের সব দোকানে ভ্যাট মেশিন নেই। ফলে এখানে বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া বড় বড় রেস্তরাঁসহ শপিংমলে কেনাকাটা করতে গেলে ক্রেতাদের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ হারে যে ভ্যাট আদায় করা হয়, তা আদৌ সরকারের কোষাগারে জমা হয় কিনা তা নিয়ে ক্রেতাসাধারণের মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এজন্য ভ্যাট আদায়ে পদ্ধতিগত সংস্কার আনা খুবই জরুরি। অর্থাৎ ভ্যাট প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতার মোবাইল ফোনে ভ্যাট অফিস থেকে ভ্যাট প্রাপ্তির ম্যাসেস আসতে হবে। 

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম দাবি করেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন কিছু নয়। তিনি বলেন, আমার মতে যারা অনেক আগেই কর দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন, কিন্তু কর দিচ্ছেন না- তাদেরকে করের আওতায় আনতে হবে। এজন্য সরকার উপজেলা থেকে একেবারে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কর অফিস ওপেন করতে পারে। এতে মানুষ প্রত্যক্ষভাবে কর দেওয়া শিখবে এবং করদাতা হিসেবে গর্ববোধ করতে পারবে। এভাবে কর আদায় ও কর ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হলে রাজস্ব আদায় দ্বিগুণ হবে। সরকারের বাজেট ঘাটতি ও ঋণের বোঝা কমে আসবে। 

বিদ্যমান ভ্যাট আইনে বন্ড সংক্রান্ত নতুন করে একটি বিধি যুক্ত করার সমালোচনা করে এবং এটি সংশোধনের দাবি জানিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের মধ্যে বিদ্যমান ভ্যাট আইনে বন্ড সংক্রান্ত নতুন করে একটি বিধি যুক্ত করা হয়েছে। বিধি ১৮(গ) তে বলা হয়েছে, যেসব গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স নেই, তাদের কাছে টেক্সটাইল মালিকরা কাপড় বিক্রি করতে পারবেন না। যদি তারা করেন, তাহলে সেটি রফতানি হিসেবে গণ্য করা হবে না। এরফলে এই পণ্য স্থানীয় কাপড় বিক্রির হিসাবে যুক্ত করা হলে সেখানে সরকারকে ভ্যাট দিতে হবে। এতে করে চরম বিপাকে পড়বে টেক্সটাইল খাত। বিশেষ করে কাপড় বিক্রি করলে টেক্সটাইল মালিকদের ভ্যাট গুনতে হবে। কেননা, আমাদের দেশে এমন অনেক গার্মেন্টস এবং নিট ফ্যাক্টরি আছে, যাদের বন্ড লাইসেন্স নেই। তাই এই বিধি যদি বলবৎ থাকে তাহলে টেক্সটাইল শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। যারা উৎপাদনে আছেন তারাও বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবেন না। কেননা, আমাদেরকে দক্ষ শ্রমিক, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালসহ বেশির ভাগ জিনিসই আমাদানি করতে হয়। ফলে অসম বাজার প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। আমি আশা করব, সরকার জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি বিবেচনা করবে। 

করোনাকালীন সঙ্কট থেকে উত্তোরণে বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কবলে পড়ে গত দেড় বছর ধরে দেশের সামগ্রিক অথনীতি এক রকম তছনছ হয়ে গেছে। একেবারে খেটে খাওয়া দিনমজুর থেকে শুরু করে শিল্পপতি পর্যন্ত সবাইকে চরমভাবে ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। মোটকথা- ক্ষতির মধ্যে বহু মানুষ তার কাজ হারিয়েছে। লকডাউনের প্রভাবে চাকরি ও কাজ হারা মানুষগুলো দেনার ভারেও এখন ভারাক্রান্ত। গত বছরের টানা তিন মাসের লকডাউনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতে এবার করোনার দ্বিতীয় আঘাতে তাদের একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে যাওবার অবস্থা। সবকিছু মিলিয়ে সরকারি-বেসরকারি সব খাতে চাকরি বাজার এক রকম বন্ধ রয়েছে। চাকরিপ্রার্থী কর্মদক্ষ নতুন বেকাররাও দিশেহারা। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এই কঠিন পরিস্থিতিতে সরকার কী এগিয়ে আসেনি? উত্তর- অবশ্যই এসেছে। কিন্তু খতিয়ে দেখতে হবে- সরকার যেসব সহায়ক কর্মসূচির প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তা বাস্তবে কতখানি কার্যকর হয়েছে। ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে যাদের যত দ্রুত যেভাবে সহায়তা পাওয়ার কথা, তারা তা পেয়েছেন কিনা? 

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে একজন শিল্পপতি হিসেবে আমার দাবি থাকবে- যে ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা ও যেভাবে বাস্তবায়ন করলে শিল্পউদ্যোক্তারা এই কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবে, সাধারণ ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবে, সেভাবে সরকার এগিয়ে আসুক। 

তিনি বলেন, গতবারের করোনা পরিস্থিতি সামাল দিয়ে যখন শিল্পউদ্যোগক্তারা নানা প্রতিকূলতার মধ্যে এবার ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন তখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা বহাল রাখাসহ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও বিপণন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা বর্ধিত করা একান্ত জরুরি। বিশেষ করে যারা কোনোদিন খেলাপি হননি তাদের এ সুবিধা দেওয়া উচিত। পাশাপাশি করোনা পরিস্থিতির মধ্যে এখন পর্যন্ত যতরকম সুযোগ সুবিধা সরকার দিয়েছেন তার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই।

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, যেহেতু আমি রাজনীতি করি। তাই সবশেষে রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে দু’একটি কথা বলতে চাই। আমি মনে করি, গণতন্ত্রের ভিত শক্তিশালী করতে হলে বিরোধী দল ও গণমাধ্যমকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। বাক স্বাধীনতাসহ সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করার সব ধরনের গণতান্ত্রিক চর্চার পথ উন্মুক্ত রাখা দরকার। 

তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি, সমালোচনা মেনে নেওয়ার মতো মহৎ কাজ আর নেই। যে কোনো সমালোচনাকে সাধুবাদ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ায় হবে সঠিক কাজ। তাছাড়া জনগণ এখন অনেক সচেতন। আমি মনে করি বিরোধী দলের মতামত ও গণমাধ্যমের সঠিক সংবাদগুলোকে আমলে নিলে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের লাল সবুজের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও খবর