খুলনায় নির্বাচন রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আ’লীগের অনাস্থা

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৯ মে ২০১৮, ২১:৫০ | অনলাইন সংস্করণ

খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন
খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন

খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ এনে তার প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এমনকি ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্টতারও অভিযোগ এনেছে দলটি।

বুধবার বিকালে নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠকে এ অভিযোগ আনেন আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদল। তবে তারা নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় রিটার্নিং কর্মকর্তার পদত্যাগ চাননি। ওই বৈঠকে খুলনা সিটি নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড না থাকা, রাজনৈতিক দলের আড়ালে বিভিন্ন মামলার আসামি ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের প্রচারে অংশ নেয়া, আ’লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ধর্মকে ব্যবহার করে অপপ্রচারসহ ১২ দফা অভিযোগ করেছেন তারা।

আওয়ামী লীগের এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে ইসি।

এমনকি নির্বাচন মনিটরিংয়ে ইসির যুগ্ম সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাকে বুধবার খুলনায় পাঠানো হয়েছে। যুগ্ম সচিব পর্যায়ের আরেকজন কর্মকর্তার বৃহস্পতিবার খুলনায় যাওয়ার কথা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, আগামী ১৫মে খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। উচ্চ আদালতের রায়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থগিত হয়ে যাওয়ায় সবার দৃষ্টি এখন খুলনা সিটি নির্বাচনে। ইতিমধ্যে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন বিএনপি নেতারা। এবার সরকারি দলের নেতারাও নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ করলেন।

খুলনা সিটি নির্বাচন সামনে রেখে বুধবার বিকালে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রাশিদুল আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ও আবদুর রহমান, দফতর সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাম এবং কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রিয়াজুল কবীর কাওছার নির্বাচন কমিশনে যান। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্য তিন নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে তারা বৈঠক করেন।

বৈঠক শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী প্রসঙ্গে এইচ টি ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, রিটার্নিং অফিসার অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট। তিনি যেসব কার্যকলাপ করেছেন ও যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেগুলোর অনেক কিছু আপত্তিকর। এগুলো কমিশনকে বলেছি।

এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইসি আমাদের জানিয়েছেন, তারা ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার ওপর মনিটরিং করতে একজন সিনিয়র অফিসারকে নির্বাচন কমিশন থেকে খুলনায় পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, (রিটার্নিং কর্মকর্তা) এরকম একজন পক্ষপাতদুষ্টু, যার যার অতীত সুস্পষ্টভাবে একেবারে কালিমালিপ্ত, যিনি একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, শুধু তাই নয় অত্যন্ত শক্তিশালী দলীয় ক্যাডার হিসেবে কাজ করেছেন, তার আচার আচরণে কথা বার্তায় তিনি এখনো সেই রকম ব্যবহার করছেন।

এ রিটার্নিং কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ দলীয় একজন সংসদ সদস্যের মেয়ের জামাই- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এইচ টি ইমাম বলেন, আমরা আত্মীয়তা নিয়ে কিছু বলব না। কে কার আত্মীয়, কার জামাই বা ভাইবোন এসব বিসয় নয়। বিষয় হলো তার রাজনৈতিক মতাদর্শ কী। যদি এ রকম হয় বাংলাদেশের সংবিধানের প্রতি তার আস্থা নেই। যদি এমন হয় তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনার বিরোধী, তাহলে আপনি কী বলবেন।

তিনি বলেন, আমরা চাইছি রিটার্নিং কর্মকর্তা তার কাজ সংবিধান, আইন অনুযায়ী করেন এবং কারো প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করেন। তিনি যাতে ঠিকমতো কাজ করেন সেজন্য আমাদের আবেদন। নির্বাচন খুব কাছে তাই তাকে বদলানোর প্রশ্ন ওঠে না। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সবকিছু মিলে তার উপর অনাস্থাই হলো।

বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে এইচ টি ইমাম বলেন, আমরা খুলনা সিটি নির্বাচন, নির্বাচন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, প্রচারণা সবকিছু মিলিয়ে দেখছি, সেখানে ঠিক লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের গোচরীভূত করেছি। সেখানে মানুষের চলাচলের সমস্যা ও প্রিসাইডিং অফিসারের তালিকা নিয়ে কথা হয়েছে।

তিনি বলেন, মূলত বলেছি যে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই আরপিও চলে না। আমাদের অনেক বড় নেতা যারা এমপি, তারা নির্বাচনে প্রচারে অংশ নিতে পারেন না। অন্য দলের সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এর ফলে অসমতল ব্যবস্থা। এটির প্রতিকার করা দরকার। ভবিষ্যতে যাতে এ রকম না হয় সেটিও আমরা অনুরোধ করেছি।

আরপিও সংশোধনের বিষয়ে বলেন, আগামী অধিবেশনে হতে পারে সময় কম থাকলে অর্ডিন্যান্স হতে পারে। এসব বিষয়ে কমিশন আমাদের বলেছেন, তারা বিষয়গুলো ভেবেচিন্তে দেখবেন। আমরা আরও বলেছি, বর্তমানে নির্বাচন পরিচালনায় প্রিসাইডিং অফিসারদের অনেকের ব্যাপারে আমাদের আপত্তি ছিল। খুলনায় চলাচলের জন্য রিকশা চলে না, ইজিবাইক চলে। নির্বাচনে এটি চলতে পারে কিনা সে বিষয়ে বলেছি। এছাড়া ধর্মকে ব্যবহার করে অপপ্রচার সম্পর্কেও বলেছি।

তিনি বলেন, সন্ত্রাসের জনপদ বলে পরিচিত ছিল খুলনা। এখন সুযোগ বুঝে দলের ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসীরা ঢুকে পড়ছেন। এদের সম্পর্কে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়- তা কমিশনকে বলেছি; যাতে নর্বাচনকে বিঘ্নিত করতে না পারে। আমরা চাই ইসি তার ক্ষমতা প্রয়োগ করুক। আরও শক্তিশালী হোক। ইসিকে শক্তিশালী করতে যতগুলো আইন সব হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তারা চান এসবের প্রয়োগ হোক।

বিএনপির অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, তাদের অভিযোগ সর্বৈভ মিথ্যা। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে প্রত্যেকে চিহ্নিত দাগী আসামি। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মামলা আছে। সুনির্দিষ্ট মামলা আগে থেকে আছে নতুন নয়। এমন কিছু যদি হতো এখন তাদের ধরা হচ্ছে। এরা তো দলীয় নয়। সন্ত্রাসী সন্ত্রাসীই, তাদের আবার দল কিসের?

এক প্রশ্নের জবাবে এইচ টি ইমাম বলেন, বিশেষ একটি সময়ে ২০০২-০৩ সাল বা তার পরে ৩০০ জনের বেশি কর্মকর্তা হাওয়া ভবনের তালিকায় নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এ নিয়োগ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। সাবেক সিইসি ড. শামসুল হুদা পরীক্ষা নিয়ে অনেককে বাদ দিয়েছিলেন। তারপরও যারা একেবারে গোড়া কট্টর যারা শিবিরের কাজ করত বা স্বাধীনতাবিরোধী কাজে লিপ্ত ছিল তাদের বাছাই করতে হবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা কর্মচারী সংবিধান ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারেন না।

আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে চলে যাওয়ার পর বৈঠক সম্পর্কে ব্রিফিং করেন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন খুলনায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হচ্ছে না। কারণ ওখানে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরা যেতে পারছেন না। কিন্তু বিপরীতে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতারা দলে দলে ওখানে গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। যার ফলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা আরও বলেছেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র সন্ত্রাসী ও অস্ত্রবাজ এসে নির্বাচনের পরিবেশ কলুষিত করার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেছেন। এছাড়া ধর্মীয় অপপ্রচারের মাধ্যমে তাদের দলীয় প্রার্থীর ফিল্ড নষ্ট এবং খালিসপুরে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে মোটরসাইকেল শোডাউন করার কথা বলেছেন। প্রিসাইডিং ও সহাকারি প্রিসাইডিং অফিসার যাতে নিরপেক্ষ থাকে সে জন্য সুপারিশ করেছেন।

খুলনা সিটি নির্বাচন নিয়ে আ’লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়ে সচিব বলেন, নির্বাচনে পক্ষে বিপক্ষে এ ধরনের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ আসবে। ইসি তলিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে।

রিটার্নিং অফিসার প্রসঙ্গে আ’লীগের অভিযোগ স্বীকার করে ইসি সচিব বলেন, তাকে যাতে সহায়তা করা হয়, এবং তার যাতে ভুলভ্রান্তি না হয় সেজন্য ইসি থেকে একজন যুগ্ম সচিব সেখানে পাঠিয়েছি। যেহেতু সে প্রথমবারের মত এ ধরনের একটি নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বপালন করছেন। যাতে ভবিষ্যতে আর ভুলভ্রান্তি না হয়, সবাইকে সমভাবে আচরণ করে, নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন করতে পারে- সেজন্য ওই কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগে অভিযোগ ছিল না। যেহেতু অভিযোগ এসেছে তাকে অধিকতর সহায়তার জন্য ঢাকা থেকে একজন কর্মকর্তা পাঠানো হয়েছে। এটা করার আইনি সুযোগ আছে।

এদিকে ইসিকে দেয়া আওয়ামী লীগের ১২ দফা অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জামায়াত একটি নিবন্ধনবিহীন ও নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল হলেও এ দলটির বিভিন্ন জেলা-উপজেলার নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে নির্বাচনে প্রচার চালাচ্ছে। খুলনার বিভিন্ন ওয়ার্ডে হিজাব ও বোরখা পরিহিত বহিরাগত মহিলাদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। খুলনার বর্তমান মেয়র মনিরুজ্জামান সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ে বসে সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন অসত্য তথ্য দিয়ে খুলনাবাসীকে বিভ্রান্ত করছেন। বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ঘটছে। নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিও হয়েছে, যা নাগরিকদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করেছে।

ঘটনাপ্রবাহ : খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter