বছর ঘুরতেই হেফাজতের চার শীর্ষ নেতার মৃত্যু!
jugantor
কওমি অঙ্গনে শোকের ছায়া
বছর ঘুরতেই হেফাজতের চার শীর্ষ নেতার মৃত্যু!

  আবু তালেব, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি  

২৯ নভেম্বর ২০২১, ২২:৫৫:২০  |  অনলাইন সংস্করণ

কওমি অঙ্গনে শোকের ছায়া

বিগত ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৯ নভেম্বর। মাত্র এক বছর দুই মাসে বছর ঘুরতেই একে একে চলে গেলেন কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন বলে দাবিদার হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের চার শীর্ষ আলেম।

এতে করে সংগঠনটির নেতৃত্বে অপূরণীয় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। যেসব শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার মতো নয় বলে জানিয়েছে সংগঠনটির নেতারা।

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যু দিয়ে কওমী অঙ্গণে শোকের ছায়া নামে। তিনি এমন সময় কওমি অঙ্গনের হাল ধরেছিলেন যখন পারস্পরিক অনৈক্য, অনাস্থা ও বিভেদের জেরে দেশের মাদ্রাসা শিক্ষায় বিপর্যয় নেমে এসেছিল।
ধর্মপ্রাণ মানুষ চরম হতাশায় পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি মাঠে এসে শুধু ধর্মপ্রাণ মানুষই নয় বরং দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসেন।

শুধু তাই নয় মাদ্রাসা শিক্ষায় আমূল সংস্কার সাধনসহ কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি আদায়ে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। যদিও পরবর্তী সময়ে আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্বে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শোকরানা মাহফিলকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের মাঝে দ্বিধাবিভক্তি স্পষ্ট হয়।

গত বছরের ১৫ নভেম্বর আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যুর পর হেফাজতে ইসলামের কাউন্সিলে সাবেক মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে সংগঠনটির নতুন আমির এবং ঢাকার জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়। এক মাসের মাথায় ১৩ ডিসেম্বর আল্লামা কাসেমী না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

এরপর ২৬ ডিসেম্বর সংগঠনটির মহাসচিব নির্বাচিত হন ঢাকার খিলগাঁও আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী।

এদিকে, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন কমিটিতে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক আলেমরা প্রাধান্য পাওয়ার অভিযোগ উঠে। মূলত তাদের কারণে হেফাজত ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী অবস্থানে চলে যায় এবং নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের মার্চের ২৫, ২৬ ও ২৭ তারিখ দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৭ জন মারা যান।

এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলায় হেফাজতের অর্ধশতাধিক নেতা গ্রেফতার হন। তাদের অনেকেই এখনও কারাগারে রয়েছেন।

প্রচণ্ড চাপের মুখে ২৫ এপ্রিল কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে একটি আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে হেফাজত। পরে ৭ জুন ৩৩ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে সেই কমিটিতে জায়গা পাননি রাজনৈতিক নেতা এবং বিতর্কিতরা।

এরমধ্যে চলতি বছরের ১৯ আগস্ট হেফাজতের সাবেক আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর হেফাজতের আমির হন বাবুনগরীর মামা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসার পরিচালক আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। তার বয়স নব্বইয়ের বেশি। আমির হওয়ার পর দুইবার তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তবে বর্তমানে তিনি অনেকটা সুস্থ।

এরমধ্যে সোমবার রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদীর। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।

এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস বলেন, হুজুর ইন্তেকাল করেছেন। তার শূন্যতা কখনও পূরণ করার নয়। একে একে এতিম করে গত এক বছরে হেফাজতে ইসলামের দুই কেন্দ্রীয় আমির ও দুই মহাসচিব আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

এছাড়া হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আল্লামা মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া বলেন, সংগঠনটির নেতৃবৃন্দের মাঝে অপূরণীয় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। বিগত নেতারা কওমি অঙ্গনের হাল ধরেছিলেন যখন পারস্পরিক অনৈক্য, অনাস্থা ও বিভেদের জেরে দেশের মাদ্রাসা শিক্ষায় বিপর্যয় নেমে এসেছিল। তারা জীবদ্দশায় দেশের কওনি অঙ্গনের ধর্মপ্রাণ হতাশাগ্রস্থ মানুষকে এক কাতারে নিয়ে এসেছিলেন।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হেফাজতে ইসলাম প্রথমবারের মতো ব্যাপক আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে।

এছাড়া ২০১১ সালে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা’ ঘোষিত হওয়ার পরপরই সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে সংগঠনটি।

পাশাপাশি দেশে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে তারা ১৩ দফা উত্থাপন করে। দাবিগুলোর বেশ কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৩ দফা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে প্রথমে সংগঠনটি ২০১৩ সালের ৫ এপ্রিল ঢাকা অবরোধ ও ৫ মে শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডাকে।

কওমি অঙ্গনে শোকের ছায়া

বছর ঘুরতেই হেফাজতের চার শীর্ষ নেতার মৃত্যু!

 আবু তালেব, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 
২৯ নভেম্বর ২০২১, ১০:৫৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
কওমি অঙ্গনে শোকের ছায়া
ছবি: সংগৃহীত

বিগত ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৯ নভেম্বর। মাত্র এক বছর দুই মাসে বছর ঘুরতেই একে একে চলে গেলেন কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন বলে দাবিদার হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের চার শীর্ষ আলেম। 

এতে করে সংগঠনটির নেতৃত্বে অপূরণীয় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। যেসব শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার মতো নয় বলে জানিয়েছে সংগঠনটির নেতারা। 

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যু দিয়ে কওমী অঙ্গণে শোকের ছায়া নামে। তিনি এমন সময় কওমি অঙ্গনের হাল ধরেছিলেন যখন পারস্পরিক অনৈক্য, অনাস্থা ও বিভেদের জেরে দেশের মাদ্রাসা শিক্ষায় বিপর্যয় নেমে এসেছিল। 
ধর্মপ্রাণ মানুষ চরম হতাশায় পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি মাঠে এসে শুধু ধর্মপ্রাণ মানুষই নয় বরং দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসেন। 

শুধু তাই নয় মাদ্রাসা শিক্ষায় আমূল সংস্কার সাধনসহ কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি আদায়ে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। যদিও পরবর্তী সময়ে আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্বে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শোকরানা মাহফিলকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের মাঝে দ্বিধাবিভক্তি স্পষ্ট হয়।   

গত বছরের ১৫ নভেম্বর আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যুর পর হেফাজতে ইসলামের কাউন্সিলে সাবেক মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে সংগঠনটির নতুন আমির এবং ঢাকার জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়। এক মাসের মাথায় ১৩ ডিসেম্বর আল্লামা কাসেমী না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। 

এরপর ২৬ ডিসেম্বর সংগঠনটির মহাসচিব নির্বাচিত হন ঢাকার খিলগাঁও আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী।

এদিকে, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন কমিটিতে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক আলেমরা প্রাধান্য পাওয়ার অভিযোগ উঠে। মূলত তাদের কারণে হেফাজত ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী অবস্থানে চলে যায় এবং নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের মার্চের ২৫, ২৬ ও ২৭ তারিখ দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৭ জন মারা যান। 

এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলায় হেফাজতের অর্ধশতাধিক নেতা গ্রেফতার হন। তাদের অনেকেই এখনও কারাগারে রয়েছেন।

প্রচণ্ড চাপের মুখে ২৫ এপ্রিল কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে একটি আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে হেফাজত। পরে ৭ জুন ৩৩ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে সেই কমিটিতে জায়গা পাননি রাজনৈতিক নেতা এবং বিতর্কিতরা। 

এরমধ্যে চলতি বছরের ১৯ আগস্ট হেফাজতের সাবেক আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর হেফাজতের আমির হন বাবুনগরীর মামা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসার পরিচালক আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। তার বয়স নব্বইয়ের বেশি। আমির হওয়ার পর দুইবার তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তবে বর্তমানে তিনি অনেকটা সুস্থ।

এরমধ্যে সোমবার রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদীর। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। 

এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মীর ইদ্রিস বলেন, হুজুর ইন্তেকাল করেছেন। তার শূন্যতা কখনও পূরণ করার নয়। একে একে এতিম করে গত এক বছরে হেফাজতে ইসলামের দুই কেন্দ্রীয় আমির ও দুই মহাসচিব আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। 

এছাড়া হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আল্লামা মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া বলেন, সংগঠনটির নেতৃবৃন্দের মাঝে অপূরণীয় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। বিগত নেতারা কওমি অঙ্গনের হাল ধরেছিলেন যখন পারস্পরিক অনৈক্য, অনাস্থা ও বিভেদের জেরে দেশের মাদ্রাসা শিক্ষায় বিপর্যয় নেমে এসেছিল। তারা জীবদ্দশায় দেশের কওনি অঙ্গনের ধর্মপ্রাণ হতাশাগ্রস্থ মানুষকে এক কাতারে নিয়ে এসেছিলেন। 

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হেফাজতে ইসলাম প্রথমবারের মতো ব্যাপক আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে। 

এছাড়া ২০১১ সালে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা’ ঘোষিত হওয়ার পরপরই সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে সংগঠনটি। 

পাশাপাশি দেশে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে তারা ১৩ দফা উত্থাপন করে। দাবিগুলোর বেশ কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৩ দফা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে প্রথমে সংগঠনটি ২০১৩ সালের ৫ এপ্রিল ঢাকা অবরোধ ও ৫ মে শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডাকে।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন