পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতীক
jugantor
সংসদে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম
পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতীক

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

২৬ জুন ২০২২, ২০:২০:২৩  |  অনলাইন সংস্করণ

সালমা, ইসলাম

পদ্মা সেতু দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান, জাতীয় মহিলা পার্টির আহবায়ক এবং সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি। তিনি বলেন,পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে। এ সেতু নিয়ে কথা বলতে গেলে অবশ্যই বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম আসবেই। নিঃসন্দেহে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেন।

রোববার জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অংশ নিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, শুধু দক্ষিণবঙ্গের মানুষের জীবনে ব্যাপক উন্নতি ও সমৃদ্ধ বয়ে আনবে না, দেশের সার্বিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এই সেতু।

সালমা ইসলাম এমপি বলেন, আমরা যত ভালো বাজেট পেশ করি না কেন, যদি দেশের সত্যিকার অর্থে সর্বত্র সুশাসন নিশ্চিত না হয় তাহলে কোনো অর্জন চূড়ান্ত সাফল্যের মুখ দেখবে না। আমি মনে করি, সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা এবং শক্ত হাতে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুর্নীতি বন্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

তিনি বলেন, ঋণখেলাপি এবং নানাভাবে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে এই মহান সংসদে এ যাবত কম কথা হয়নি। বলতে বলতে সবাই এখন ক্লান্ত। কিন্তু খেলাপিরা ক্লান্ত হয়নি। মাঝে-মধ্যে চুনোপুঁটিদের শাস্তি হলেও প্রভাবশালী খেলাপিরা আছেন বহাল তবিয়তে। বিশেষ করে প্রভাবশালীরা কখনো খেলাপি হন না। তারা প্রভাব খাটিয়ে দফায় দফায় ঋণ পুনর্গঠন করে নেন। ফলে খেলাপির খাতায় তাদের নাম আর ওঠে না।

প্রস্তাবিত বাজেটে রপ্তানির সোর্স ট্যাক্স দ্বিগুণ করা, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) ও অ্যাডভান্সড ট্যাক্স প্রত্যাহার না করা ঠিক হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, রপ্তানির সোর্স ট্যাক্স বিদ্যমান ০.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করায় রপ্তানি আয় ধাক্কা খাবে। এই দ্বিগুণ করের কারণে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে রপ্তানি খাত। ফলে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা না হলে রপ্তানি আয় আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কোম্পানির জন্য কিছু শর্তে করপোরেট কর হারে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে না। কারণ কর্পোরেট কর হারে ছাড় দেওয়া হলে এ আয়টি ও এটির মাধ্যমে তা আবার নিয়ে নেওয়া হবে। এতে ছাড়ের চেয়ে নিয়ে যাওয়া হবে বেশি। এ কারণেই করপোরেট কর ছাড়ের সুবিধা করদাতাদের জন্য বিশেষ কোনো সুফল বয়ে আনবে না। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সার, জ্বালানি, তেল, এলএনজি ও বিদ্যুতের ওপর ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে- এটি ভালো পদক্ষেপ।

সিগারেটের দাম আরও বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, সিগারেটের দাম ৩৯ টাকা থেকে ৪০ টাকা করা হয়েছে, যা হাস্যকর। সিগারেটের দাম ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা করার প্রস্তাব করছি।

সংসদে দেওয়া অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপির পূর্ণাঙ্গ বক্তৃতা:

মাননীয় স্পিকার, আমাকে ২০২২-২৩ বাজেট বক্তৃতায় আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় প্রথমেই আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। শুকরিয়া আদায় করছি মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে, যার অসীম কৃপায় আজ আমরা এই মহান সংসদে উপস্থিত হতে পেরেছি। একইসঙ্গে গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। নানা কারণে তারই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ। এছাড়া এই মহান সংসদে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি আমার দল জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সফল রাষ্ট্রনায়ক মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। সেই সাথে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বেগম রওশন এরশাদের সুস্থতা কামনা করছি। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা রইল আমার দলের সুযোগ্য চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের প্রতিও। নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও যিনি জনগণের পাশে থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গঠনমূলক ভূমিকা রেখেই চলেছেন।

মাননীয় স্পিকার
বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের প্রকোপ এখনো কমেনি। দেশ কয়েক মাস করোনায় মৃত্যুশূন্য থাকলেও এখন আবার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। যা নতুন করে সবার মধ্যে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। এই করোনাভাইরাস বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের অর্থনীতিকেও একরকম পঙ্গু করে দিয়েছে। অনেকে বলতে চান, আমরা করোনা পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবেলা করে সৃষ্ট সংকট কাটিয়ে উঠেছি। কিন্তু আমি বলব, কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ করোনার আঘাতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, শিল্প, কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান এখনো ব্রেকইভেনে আসতে একেবারেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। যাই হোক, আমি প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কথা বলতে চাই।

মাননীয় স্পিকার
আমি মনে করি, জনসংখ্যার সার্বিক চাহিদার ভিত্তিতে প্রতি বছর বাজেটের আকার বাড়বেই। এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা যত ভালো বাজেট পেশ করি না কেন, যদি দেশের সত্যিকার অর্থে সর্বত্র সুশাসন নিশ্চিত না হয় তাহলে কোনো অর্জন চূড়ান্ত সাফল্যের মুখ দেখবে না। আমি মনে করি, সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা এবং শক্ত হাতে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুর্নীতি বন্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

মাননীয় স্পিকার
আমরা প্রতিনিয়ত দাবি করছি, দেশে আইনের শাসন বহাল আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি দেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচার অব্যাহতই আছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর পড়ে জানলাম, সুইস ব্যাংকে ২০০৪ সালে ৩৬৫ কোটি টাকা থাকলেও ২০২১ সালে ব্যাংকটিতে বাংলাদেশের টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। নিশ্চয়ই এ বছর আরও বাড়বে।

প্রশ্ন হলো, যদি সুইস ব্যাংকে এই পরিমাণ টাকা গিয়ে থাকে তাহলে পৃথিবীর আর কোন কোন দেশে কত টাকা চলে গেছে। তবে আমি মনে করি, কারা কীভাবে এসব টাকা পাচার করেছে সেই বিষয়ে সরকারের কাছে নিশ্চয়ই পর্যাপ্ত তথ্য আছে।

মাননীয় স্পিকার
ঋণখেলাপি এবং নানাভাবে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে এই মহান সংসদে এ যাবৎ কম কথা হয়নি। বলতে বলতে সবাই এখন ক্লান্ত। কিন্তু খেলাপিরা ক্লান্ত হয়নি। মাঝেমধ্যে চুনোপুঁটিদের শাস্তি হলেও প্রভাবশালী খেলাপিরা আছেন বহাল তবিয়তে। বিশেষ করে প্রভাবশালীরা কখনো খেলাপি হন না। তারা প্রভাব খাটিয়ে দফায় দফায় ঋণ পুনর্গঠন করে নেন। ফলে খেলাপির খাতায় তাদের নাম আর ওঠে না। এছাড়া নামে বেনামে মোটা অংকের ঋণ নিয়ে কীভাবে কোন পদ্ধতিতে বিদেশে অর্থ পাচার করছে তা অনেকে না জানলেও কিছু লোক তো জানে।

মাননীয় স্পিকার
এবার প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আমি দুটি কথা বলতে চাই। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের আকার ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। মোট আয় ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭১ কোটি টাকা এবং ঘাটতি হচ্ছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রস্তাবিত বাজেটে মোটা অংকের ঘাটতি রয়েছে। আমি মনে করি, সরকারকে ধীরে ধীরে ঘাটতির বাজেট কমিয়েই আনতে হবে। এছাড়া সরকার নিজে যদি ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে।

মাননীয় স্পিকার
প্রস্তাবিত বাজেটে রপ্তানির সোর্স ট্যাক্স দ্বিগুণ করা, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) ও অ্যাডভান্সড ট্যাক্স প্রত্যাহার না করা ঠিক হয়নি। রপ্তানির সোর্স ট্যাক্স বিদ্যমান ০.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করায় রপ্তানি আয় ধাক্কা খাবে। এই দ্বিগুণ করের কারণে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে রপ্তানি খাত। ফলে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা না হলে রপ্তানি আয় আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কোম্পানির জন্য কিছু শর্তে করপোরেট কর হারে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে না। কারণ করপোরেট কর হারে ছাড় দেওয়া হলে এ আয়টি ও এটির মাধ্যমে তা আবার নিয়ে নেওয়া হবে। এতে ছাড়ের চেয়ে নিয়ে যাওয়া হবে বেশি।

মাননীয় স্পিকার
এ কারণেই করপোরেট কর ছাড়ের সুবিধা করদাতাদের জন্য বিশেষ কোনো সুফল বয়ে আনবে না। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সার, জ্বালানি, তেল, এলএনজি ও বিদ্যুতের ওপর ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে- এটি ভালো পদক্ষেপ।

মাননীয় স্পিকার
সিগারেটের দাম ৩৯ টাকা থেকে ৪০ টাকা করা হয়েছে, যা হাস্যকর। সিগারেটের দাম ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা করার প্রস্তাব করছি।

মাননীয় স্পিকার
পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং অবশেষে এর উদ্বোধন নিয়ে দুটি কথা বলতেই হবে। এই সেতুর প্রধানত দুটি দিক আছে। একটি রাজনৈতিক অপরটি অর্থনৈতিক। এছাড়া এই সেতু অবশ্যই বাংলাদেশের মর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে। রাজনৈতিক দিক থেকে এই সেতু নিয়ে কথা বলতে গেলে অবশ্যই বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম আসবেই। নিঃসন্দেহে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেন। তবে এই সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, একেবারেই বাস্তব। আমি যখন সংসদে বক্তব্য দিচ্ছি তখন সেতু উদ্বোধনের পরের দিন। আজ রোববার থেকে টোল দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে। তাই এটিও একটি গৌরবের দিন। পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক দিকটি খুবই প্রণিধানযোগ্য।

মাননীয় স্পিকার
এটি শুধু দক্ষিণবঙ্গের মানুষের জীবনে ব্যাপক উন্নতি ও সমৃদ্ধ বয়ে আনবে না, দেশের সার্বিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এই সেতু।

মাননীয় স্পিকার
বক্তব্য আর আমি বেশি দীর্ঘায়িত করতে চাই না। সবশেষে আমি একটি কথা বলতে চাই, আমরা যে যাই বলি না কেন, দিনশেষে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদই শেষ কথা। গণতান্ত্রিকপন্থায় রাজনীতিবিদদের দেশ পরিচালনা করতেই হবে। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে গণতন্ত্র ও শক্তিশালী বিরোধী দলের কোনো বিকল্পই নেই। সঙ্গত কারণেই ভবিষ্যতে সুযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য আমাদের সুদূর পদক্ষেপ নিতেই হবে।

মাননীয় স্পিকার
এছাড়া আমরা যারা রাজনীতি করি, তাদের অবশ্যই সৎ হতে হবে। এর কোনো বিকল্পই নেই। রাজনীতিবিদরা সৎ ও যোগ্য না হলে গণতন্ত্র কখনো শক্তিশালী হবে না। রাজনীতিবিদরা দুর্বল ও অসৎ হলে কর্মচারীরা রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণ করার সাহস দেখাবে।

মাননীয় স্পিকার
বয়স হয়েছে। আমরা একসময় পৃথিবীতে থাকব না। কিছু সত্য কথা সাহস করে কাউকে না কাউকে বলতেই হয়, তাই আমি বলে গেলাম।

সংসদে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতীক

 যুগান্তর প্রতিবেদন 
২৬ জুন ২০২২, ০৮:২০ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
সালমা, ইসলাম
রোববার জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখছেন অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি।

পদ্মা সেতু দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান, জাতীয় মহিলা পার্টির আহবায়ক এবং সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে। এ সেতু নিয়ে কথা বলতে গেলে অবশ্যই বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম আসবেই। নিঃসন্দেহে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেন।

রোববার জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অংশ নিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, শুধু দক্ষিণবঙ্গের মানুষের জীবনে ব্যাপক উন্নতি ও সমৃদ্ধ বয়ে আনবে না, দেশের সার্বিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এই সেতু।

সালমা ইসলাম এমপি বলেন, আমরা যত ভালো বাজেট পেশ করি না কেন, যদি দেশের সত্যিকার অর্থে সর্বত্র সুশাসন নিশ্চিত না হয় তাহলে কোনো অর্জন চূড়ান্ত সাফল্যের মুখ দেখবে না। আমি মনে করি, সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা এবং শক্ত হাতে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুর্নীতি বন্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

তিনি বলেন, ঋণখেলাপি এবং নানাভাবে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে এই মহান সংসদে এ যাবত কম কথা হয়নি। বলতে বলতে সবাই এখন ক্লান্ত। কিন্তু খেলাপিরা ক্লান্ত হয়নি। মাঝে-মধ্যে চুনোপুঁটিদের শাস্তি হলেও প্রভাবশালী খেলাপিরা আছেন বহাল তবিয়তে। বিশেষ করে প্রভাবশালীরা কখনো খেলাপি হন না। তারা প্রভাব খাটিয়ে দফায় দফায় ঋণ পুনর্গঠন করে নেন। ফলে খেলাপির খাতায় তাদের নাম আর ওঠে না।

প্রস্তাবিত বাজেটে রপ্তানির সোর্স ট্যাক্স দ্বিগুণ করা, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) ও অ্যাডভান্সড ট্যাক্স প্রত্যাহার না করা ঠিক হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, রপ্তানির সোর্স ট্যাক্স বিদ্যমান ০.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করায় রপ্তানি আয় ধাক্কা খাবে। এই দ্বিগুণ করের কারণে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে রপ্তানি খাত। ফলে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা না হলে রপ্তানি আয় আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কোম্পানির জন্য কিছু শর্তে করপোরেট কর হারে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে না। কারণ কর্পোরেট কর হারে ছাড় দেওয়া হলে এ আয়টি ও এটির মাধ্যমে তা আবার নিয়ে নেওয়া হবে। এতে ছাড়ের চেয়ে নিয়ে যাওয়া হবে বেশি। এ কারণেই করপোরেট কর ছাড়ের সুবিধা করদাতাদের জন্য বিশেষ কোনো সুফল বয়ে আনবে না। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সার, জ্বালানি, তেল, এলএনজি ও বিদ্যুতের ওপর ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে- এটি ভালো পদক্ষেপ।

সিগারেটের দাম আরও বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, সিগারেটের দাম ৩৯ টাকা থেকে ৪০ টাকা করা হয়েছে, যা হাস্যকর। সিগারেটের দাম ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা করার প্রস্তাব করছি।

সংসদে দেওয়া অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপির পূর্ণাঙ্গ বক্তৃতা:

মাননীয় স্পিকার, আমাকে ২০২২-২৩ বাজেট বক্তৃতায় আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় প্রথমেই আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। শুকরিয়া আদায় করছি মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে, যার অসীম কৃপায় আজ আমরা এই মহান সংসদে উপস্থিত হতে পেরেছি। একইসঙ্গে গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। নানা কারণে তারই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ। এছাড়া এই মহান সংসদে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি আমার দল জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সফল রাষ্ট্রনায়ক মরহুম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। সেই সাথে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বেগম রওশন এরশাদের সুস্থতা কামনা করছি। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা রইল আমার দলের সুযোগ্য চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের প্রতিও। নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও যিনি জনগণের পাশে থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গঠনমূলক ভূমিকা রেখেই চলেছেন।

মাননীয় স্পিকার
বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের প্রকোপ এখনো কমেনি। দেশ কয়েক মাস করোনায় মৃত্যুশূন্য থাকলেও এখন আবার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। যা নতুন করে সবার মধ্যে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। এই করোনাভাইরাস বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের অর্থনীতিকেও একরকম পঙ্গু করে দিয়েছে। অনেকে বলতে চান, আমরা করোনা পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবেলা করে সৃষ্ট সংকট কাটিয়ে উঠেছি। কিন্তু আমি বলব, কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ করোনার আঘাতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, শিল্প, কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান এখনো ব্রেকইভেনে আসতে একেবারেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। যাই হোক, আমি প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ে কথা বলতে চাই।

মাননীয় স্পিকার
আমি মনে করি, জনসংখ্যার সার্বিক চাহিদার ভিত্তিতে প্রতি বছর বাজেটের আকার বাড়বেই। এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা যত ভালো বাজেট পেশ করি না কেন, যদি দেশের সত্যিকার অর্থে সর্বত্র সুশাসন নিশ্চিত না হয় তাহলে কোনো অর্জন চূড়ান্ত সাফল্যের মুখ দেখবে না। আমি মনে করি, সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা এবং শক্ত হাতে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের দুর্নীতি বন্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

মাননীয় স্পিকার
আমরা প্রতিনিয়ত দাবি করছি, দেশে আইনের শাসন বহাল আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি দেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচার অব্যাহতই আছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর পড়ে জানলাম, সুইস ব্যাংকে ২০০৪ সালে ৩৬৫ কোটি টাকা থাকলেও ২০২১ সালে ব্যাংকটিতে বাংলাদেশের টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। নিশ্চয়ই এ বছর আরও বাড়বে।

প্রশ্ন হলো, যদি সুইস ব্যাংকে এই পরিমাণ টাকা গিয়ে থাকে তাহলে পৃথিবীর আর কোন কোন দেশে কত টাকা চলে গেছে। তবে আমি মনে করি, কারা কীভাবে এসব টাকা পাচার করেছে সেই বিষয়ে সরকারের কাছে নিশ্চয়ই পর্যাপ্ত তথ্য আছে।

মাননীয় স্পিকার
ঋণখেলাপি এবং নানাভাবে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে এই মহান সংসদে এ যাবৎ কম কথা হয়নি। বলতে বলতে সবাই এখন ক্লান্ত। কিন্তু খেলাপিরা ক্লান্ত হয়নি। মাঝেমধ্যে চুনোপুঁটিদের শাস্তি হলেও প্রভাবশালী খেলাপিরা আছেন বহাল তবিয়তে। বিশেষ করে প্রভাবশালীরা কখনো খেলাপি হন না। তারা প্রভাব খাটিয়ে দফায় দফায় ঋণ পুনর্গঠন করে নেন। ফলে খেলাপির খাতায় তাদের নাম আর ওঠে না। এছাড়া নামে বেনামে মোটা অংকের ঋণ নিয়ে কীভাবে কোন পদ্ধতিতে বিদেশে অর্থ পাচার করছে তা অনেকে না জানলেও কিছু লোক তো জানে।

মাননীয় স্পিকার
এবার প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আমি দুটি কথা বলতে চাই। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের আকার ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। মোট আয় ৪ লাখ ৩৬ হাজার ২৭১ কোটি টাকা এবং ঘাটতি হচ্ছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রস্তাবিত বাজেটে মোটা অংকের ঘাটতি রয়েছে। আমি মনে করি, সরকারকে ধীরে ধীরে ঘাটতির বাজেট কমিয়েই আনতে হবে। এছাড়া সরকার নিজে যদি ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে।

মাননীয় স্পিকার
প্রস্তাবিত বাজেটে রপ্তানির সোর্স ট্যাক্স দ্বিগুণ করা, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) ও অ্যাডভান্সড ট্যাক্স প্রত্যাহার না করা ঠিক হয়নি। রপ্তানির সোর্স ট্যাক্স বিদ্যমান ০.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করায় রপ্তানি আয় ধাক্কা খাবে। এই দ্বিগুণ করের কারণে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে রপ্তানি খাত। ফলে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা না হলে রপ্তানি আয় আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কোম্পানির জন্য কিছু শর্তে করপোরেট কর হারে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে না। কারণ করপোরেট কর হারে ছাড় দেওয়া হলে এ আয়টি ও এটির মাধ্যমে তা আবার নিয়ে নেওয়া হবে। এতে ছাড়ের চেয়ে নিয়ে যাওয়া হবে বেশি।

মাননীয় স্পিকার
এ কারণেই করপোরেট কর ছাড়ের সুবিধা করদাতাদের জন্য বিশেষ কোনো সুফল বয়ে আনবে না। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সার, জ্বালানি, তেল, এলএনজি ও বিদ্যুতের ওপর ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে- এটি ভালো পদক্ষেপ।

মাননীয় স্পিকার
সিগারেটের দাম ৩৯ টাকা থেকে ৪০ টাকা করা হয়েছে, যা হাস্যকর। সিগারেটের দাম ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা করার প্রস্তাব করছি।

মাননীয় স্পিকার
পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং অবশেষে এর উদ্বোধন নিয়ে দুটি কথা বলতেই হবে। এই সেতুর প্রধানত দুটি দিক আছে। একটি রাজনৈতিক অপরটি অর্থনৈতিক। এছাড়া এই সেতু অবশ্যই বাংলাদেশের মর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে। রাজনৈতিক দিক থেকে এই সেতু নিয়ে কথা বলতে গেলে অবশ্যই বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম আসবেই। নিঃসন্দেহে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেন। তবে এই সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, একেবারেই বাস্তব। আমি যখন সংসদে বক্তব্য দিচ্ছি তখন সেতু উদ্বোধনের পরের দিন। আজ রোববার থেকে টোল দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে। তাই এটিও একটি গৌরবের দিন। পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক দিকটি খুবই প্রণিধানযোগ্য।

মাননীয় স্পিকার
এটি শুধু দক্ষিণবঙ্গের মানুষের জীবনে ব্যাপক উন্নতি ও সমৃদ্ধ বয়ে আনবে না, দেশের সার্বিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এই সেতু।

মাননীয় স্পিকার
বক্তব্য আর আমি বেশি দীর্ঘায়িত করতে চাই না। সবশেষে আমি একটি কথা বলতে চাই, আমরা যে যাই বলি না কেন, দিনশেষে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদই শেষ কথা। গণতান্ত্রিকপন্থায় রাজনীতিবিদদের দেশ পরিচালনা করতেই হবে। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে গণতন্ত্র ও শক্তিশালী বিরোধী দলের কোনো বিকল্পই নেই। সঙ্গত কারণেই ভবিষ্যতে সুযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য আমাদের সুদূর পদক্ষেপ নিতেই হবে।

মাননীয় স্পিকার
এছাড়া আমরা যারা রাজনীতি করি, তাদের অবশ্যই সৎ হতে হবে। এর কোনো বিকল্পই নেই। রাজনীতিবিদরা সৎ ও যোগ্য না হলে গণতন্ত্র কখনো শক্তিশালী হবে না। রাজনীতিবিদরা দুর্বল ও অসৎ হলে কর্মচারীরা রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণ করার সাহস দেখাবে।

মাননীয় স্পিকার
বয়স হয়েছে। আমরা একসময় পৃথিবীতে থাকব না। কিছু সত্য কথা সাহস করে কাউকে না কাউকে বলতেই হয়, তাই আমি বলে গেলাম।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন