নির্বাচনের প্রথম পূর্বশর্ত খালেদা জিয়ার মুক্তি: বিএনপি

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৮, ২১:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

বিএনপির সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন মির্জা ফখরুল। ছবি-যুগান্তর

কারাবন্দি দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিকেই একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের এক নম্বর পূর্বশর্ত বলে ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। পাশাপাশি দলটি এও দাবি করেছে, নির্বাচনের আগে বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে।

শুক্রবার বিকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এক সমাবেশে বিএনপির সিনিয়র নেতারা এসব শর্তের কথা বলেন। 

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে সমাবেশের আয়োজন করে বিএনপি। দীর্ঘ আড়াই বছর পর রাজধানীতে এই সমাবেশ করে দলটি। 

ঢাকা মহানগর পুলিশ বিকাল ৫টার মধ্যে সমাবেশ শেষ করা সহ ২৩টি শর্তে তাদের এই সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়। 

সমাবেশ ঘিরে সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীদের আনাগোনা শুরু হয়। তবে পুলিশের শর্তের কারণে নেতাকর্মীরা সমাবেশে আসতে শুরু করেন দুপুরে জুমার নামাজের পর। খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।  

আড়াইটার দিকে প্রখর রোদের মধ্যেই হাজারো নেতাকর্মীদের পদচারণায় ফকিরাপুল মোড় থেকে কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই ধার কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। তাদের হাতে দেখা যায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবিসংবলিত ফেস্টুন ও ব্যানার। 

‘মুক্তি মুক্তি মুক্তি চাই, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগানে সমাবেশস্থল মুখরিত করে তুলেন নেতাকর্মীরা। বিকাল পৌনে ৩টায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ট্রাকের ওপর বানানো অস্থায়ী মঞ্চ থেকে এই সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়।

সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে দেশে কোনও নির্বাচন হবে না। নির্বাচন করতে হলে এক নম্বর শর্ত খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। সংসদ ভেঙে দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করতে হবে। 

তিনি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য এবং সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সব দল ও সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বর্তমান সরকারের দুঃশাসন যেভাবে বুকে চেপে আছে তার থেকে মুক্তির জন্য জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।

৮ বাম দলের সমন্বয়ে গঠিত জোটকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে অন্যান্য সব দলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। স্ব-স্ব ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে জগদ্দল পাথরের মতো বুকে চেপে বসে থাকা সরকারকে সরাতে আন্দোলনে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে বাংলাদেশে কোনও নির্বাচন জনগণ হতে দেবে না উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন,  বর্তমান সরকার অনির্বাচিত ও অবৈধ। এদের হাত থেকে দেশের মানুষ মুক্তি চায়। এরা দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতির মাধ্যমে ভয়ের রাজ্য তৈরি করেছে। দেশের প্রতিটি মানুষ অনিরাপদ। মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চায়।

কোট সংস্কারের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের তুলে নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মির্জা ফখরুল।


সমাবেশের মঞ্চ

তিনি বলেন, এরপর মিথ্যা মামলা দিয়ে রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের মায়েরা বলছেন- ‘আমাদের চাকরি লাগবে না। আমাদের ছেলেদের মুক্তি দেন।’  আজকে দেশের কোনো মানুষ নিরাপদ নয়। দেশে অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাস থেকেও বলা হচ্ছে অন্যায় করা হচ্ছে। এগুলো বন্ধ করুন। 
আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হোক তা আওয়ামী লীগ চায় না বলে দাবি করেন বিএনপির মহাসচিব। 

তিনি বলেন, কারণ সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এবং বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে ২০ আসনও পাবে না। তাই তারা আবারও ৫ জানুয়ারি মার্কা নির্বাচন করতে চায়।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে আজকে সরকার একটি মাত্র উদ্দেশ্য মিথ্যা মামলায় কারাগারে বন্দি রেখেছে। সরকার খালেদা জিয়াকে ভয় পায়, রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চায়। তারা খালেদা জিয়াকে আটকে রেখে ফের নির্বাচনের নামে সাজানো নাটক করতে চায়।


সমাবেশের একাংশ

দেশের মানুষ পরিবর্তন চায় মন্তব্য করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, দেশের মানুষ আইনের শাসন পাচ্ছে না। রাজনীতিবিদরা কথা বলতে পারছেন না। এই ধরনের অবস্থা চলতে পারে না। জাতীয় ঐক্যর মাধমে আন্দোলন গড়ে তুলে এই সরকারকে বিদায় করতে হবে। ক্ষমতার জন্য নয়, বিএনপির আন্দোলন করছে দেশের মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনতে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের অধীনে আগামীতে জাতীয় নির্বাচন হবে না। কারণ তাদের অধীনে কোনও সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না তার প্রমাণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো। 

নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া ও দলীয় নেতাকর্মীদের মুক্তি দিতে হবে এবং সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে বলেও দাবি করেন মোশাররফ হোসেন। 


বিএনপির সমাবেশ

তিনি বলেন, সোজা আঙুলে ঘি উঠে না। আমাদের আন্দোলনের মাধ্যমে এসব দাবি আদায় করতে হবে। আর আন্দোলনের জন্য দেশের মানুষ ও বিএনপি প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ দেশের মানুষ এই স্বৈরচার সরকারের অবসান ঘটাতে চায়।

স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, অন্যায়ভাবে জোর করে আজ সরকার দেশ পরিচালনা করছে। একদলীয় এবং কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। সেজন্য এই সরকারকে অপসারণ করতে হবে। দেশের একটি সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটি করতে হলে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। যদি আইনি প্রক্রিয়ায় তা সম্ভব না হয় তাহলে রাজপথেই হবে একমাত্র পথ। সে জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রস্তুত থাকতে হবে। 

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, খালেদা জিয়াকে নিয়েই আমরা নির্বাচনে যাব। কেউ যদি মনে করেন ফাঁকা মাঠে গোল দেবেন সেই আশা করবেন না। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আমরা নির্বাচনে যাব। 

স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, এই সরকারের অধীনে বাংলাদেশে আর কোনো নির্বাচন নয়। কারণ এই সরকার এই দেশের সরকার নয়। এই সরকারের সঙ্গে আরেক পার্টনার আছে। তারা যা চায় তাই বর্তমান সরকার করে। সরকারের পার্টনারকে বলতে চাই এক ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা মানে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব নয়। একজনকে ক্ষমতায় রাখার চক্রান্ত গণতন্ত্রকে সম্মান করা নয়।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কোনো ভিন দেশ ছিনিমিনি খেলবেন না। বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধ করে পাকিস্তান থেকে দেশ স্বাধীন করেছে। অন্য কোনো দেশের গোলামি করার জন্য নয়। বাংলাদেশ এ দেশের মানুষ শাসন করবে। এই দেশে পার্লামেন্ট হবে মানুষের ভোটে। অন্য কোনো ভিন দেশের চোখ রাঙানি ইশারা বাংলাদেশের মানুষ তোয়াক্কা করে না। 

তিনি বলেন, সারা দেশের মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হন। সেই আন্দোলনে বিএনপি অবশ্যই সামনে থাকবে। জনগণের আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে খালেদা জিয়া মুক্ত হবে। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, আজকে সরকার বুঝতে পেরেছে এ দেশে যদি কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয় এবং সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি অংশ নেয় তাহলে তারা সংসদে ১০টি আসনও পাবে না। এ জন্য খালেদা জিয়াকে বন্দি রেখে একটি সাজানো নির্বাচন করতে চায়। এই পাতানো নির্বাচনের চক্রান্ত কোনোদিন সফল হবে না। 

বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও সহপ্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীমের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ভাইস চেয়ারম্যান এজেডএম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, জয়নুল আবদিন ফারুক, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের কাজী আবুল বাশার, উত্তরের আহসানউল্লাহ হাসান।

এছাড়াও বক্তব্য দেন- যুবদলের মোরতাজুল করীম বাদরু, নুরুল ইসলাম নয়ন, এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন, রফিকুল ইসলাম মজনু, স্বেচ্ছাসেবক দলের শফিউল বারী বাবু, আবদুর কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, শ্রমিক দলের নুরুল ইসলাম খান নাসিম, জাসাসের হেলাল খান, ছাত্রদলের রাজীব আহসান, আকরামুল হাসান, এজমল হোসেন পাইলট প্রমুখ। 

আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু, নিতাই রায় চৌধুরী, মসিউর রহমান, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, সালাহউদ্দিন আহমেদ, আফরোজা আব্বাস, আসাদুল হাবিব দুলু, শামা ওবায়েদ, এম এ মালেক, শিরিন সুলতানা, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, মীর সরফত আলী সপু, সেলিম ভুঁইয়া, আমিনুল হক, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, নাজিমউদ্দিন আলম, অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ, শামীমুর রহমান শামীম, তাইফুল ইসলাম টিপু, বেলাল আহমেদ, তকদির হোসেন জসিম, নীলুফার চৌধুরী মনি, শায়রুল কবির খান প্রমুখ।

সমাবেশ বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে শেষ হয়। সমাবেশ চলাকালে নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের দুটি সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ ছিল। এতে করে আশেপাশের এলাকায় গাড়ির জট ছড়িয়ে পড়ে। যে কারণে দুর্ভোগে পড়ে নয়াপল্টন এলাকা দিয়ে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ। 

এদিকে সমাবেশকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, পল্টন মোড়, ফকিরাপুল মোড়সহ এর আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও উপস্থিতি ছিল।