খালেদা জিয়াকে জোর করে আদালতে হাজির করা হয়েছে: জয়নুল আবেদীন

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৯:০৭ | অনলাইন সংস্করণ

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। ফাইল ছবি

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হুইলচেয়ারে জোর করে কারা আদালতে হাজির করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন।

বুধবার বিকালে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাকক্ষে কারা আদালতে খালেদা জিয়ার বিচার বিষয়ে করণীয় বিষয়ক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ অভিযোগ করেন।

সরকার দেশের আইনকানুন না মেনে বেআইনিভাবে গেজেট নোটিফিকেশন করেছে উল্লেখ করে বিএনপির এই আইনজীবী বলেন, মঙ্গলবার হঠাৎ করে অন্ধকার কারাঘরে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিচারের জন্য একটি আদালত গঠন করে। অতীতে আমরা কখনো দেখিনি এবং বাংলাদেশে কেন, পাকিস্তানের ইতিহাসেও নেই যে সাংবিধানিকভাবে কারাগারে কোনো আদালত হতে পারে।

তিনি বলেন, দেশে যদি সামরিক শাসন হয় সে ক্ষেত্রে যা ইচ্ছা তা করতে পারে। কিন্তু সংবিধান মোতাবেক কারাগারে কোনো আদালত স্থাপন করা যায় না। তার কারণ হলো সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিচার হতে হবে প্রকাশ্যে এবং জনগণের উপস্থিতিতে। অর্থাৎ যেখানে জনগণের উপস্থিতি থাকবে না, সেখানে বিচার করা যাবে না।

সরকার দেশের আইনকানুন মানে না উল্লেখ করে জয়নুল আবেদীন বলেন, আমাদের একজন প্রতিনিধি ওই আদালতে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখেছে একটি অন্ধকার কূপ, একটি গুহা। ২৪ ফুট বাই ২৪ ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের আদালত কক্ষ। এই অবস্থার মধ্যে একটি আদালত বসিয়েছে এবং খালেদা জিয়া এত অসুস্থ যে তিনি আসতে পারেননি। তবুও তাকে হুইলচেয়ারে করে জোর করে নিয়ে এসেছে।

জয়নুল আবেদীন আরও বলেন, সংবিধানে উল্লেখ আছে জোর করে অসুস্থ মানুষকে নিয়ে আসা যাবে না। অথচ খালেদা জিয়াকে জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে। এসব বিষয় নিয়েই আমরা আলোচনা করেছি।।

তিনি বলেন, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসেছিলেন এ নিয়ে আমাদের মতামত নেয়ার জন্য। এখানে অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। খালেদা জিয়ার জন্য যে আদালত গঠন করা হয়েছে তা আইনগত কিনা, সে বিষয় নিয়েই আমরা আলোচনায় বসেছিলাম। আমরা আলোচনা করেছি। আমরা বলেছি, এই যে আদালত করা হয়েছে, এটা বেআইনি আদালত। তাই এটার পরবর্তী কী পদক্ষেপ হবে সেটা আমরা আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব এবং আপনাদের জানাব।

‘ফৌজদারি কার্যবিধির ৯ ধারা অনুসারে কারাগারে খালেদা জিয়ার জন্য আদালত গঠন করা হয়েছে এবং এখানে সংবিধান লঙ্ঘনের কিছুই ঘটেনি’ আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের এ বক্তব্যের জবাবে জয়নুল আবেদীন বলেন, তাহলে কি দেশে এখন সামরিক শাসন চলছে? এটা আইনমন্ত্রী জবাব দেবেন। কর্নেল তাহেরের যখন বিচার হয়েছে তখন দেশে সামরিক আইন ছিল। সেখানে কোনো সাংবিধানিক আইন ছিল না। তাহলে বুঝতে হবে তারা আইন মানে না। আইনমন্ত্রী যদি দেশের আইন না মানেন তাহলে সে দেশে বিচারব্যবস্থা কীভাবে চলবে?

এর আগে, দুপুরে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারের ভেতরে বিশেষ জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাস বসিয়ে জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার বিচার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মামলার প্রধান আসামি বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নিজের অসন্তোষ ব্যক্ত করেন।

আদালতে বিচারককে খালেদা জিয়া বলেন, আপনার যত দিন ইচ্ছা সাজা দিন, আমি এ অবস্থায় আসতে পারব না। এ আদালতে আমার ন্যায়বিচারও হবে না।

খালেদা জিয়া বলেন, আমি অসুস্থ। আমি বারবার আদালতে আসতে পারব না। আর এভাবে বসে থাকলে আমার পা ফুলে যাবে।

তিনি বলেন, আমার সিনিয়র কোনো আইনজীবী আসেনি। এটি জানলে আমি আসতাম না।

আদালতের বিচারক ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান। বেলা ১১টার দিকে তিনি আদালতে আসেন। খালেদা জিয়াকে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আদালতে হাজির করা হয়। হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাকে আনা হয়।

পরনে ছিল বেগুনি রঙের শাড়ি। চেয়ারে বসা অবস্থায় তার পায়ের ওপরের অংশ থেকে নিচ পর্যন্ত সাদা চাঁদর দিয়ে ঢাকা ছিল।

আধা ঘণ্টারও কম সময় আদালতের কার্যক্রম চলার পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা না থাকায় শুনানি মুলতবি করে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ ঠিক করে দেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান।

আদালতকে খালেদা জিয়া বলেন, আমাকে জেলে রাখতেই এ আয়োজন করা হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। তার আইনজীবীদের আসতে দেয়া হচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।

জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার শুনানি এত দিন চলছিল কারাগারের কয়েকশ গজ দূরে বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসাসংলগ্ন কারা অধিদফতরের মাঠে বিশেষ এজলাসে।

নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের ৭ নম্বর কক্ষকে আদালত ঘোষণা করে সেখানেই দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার শুনানি করার নির্দেশ দেয়।

এ কারাগারেই আরেকটি ভবনের দোতলার একটি কক্ষে গত সাত মাস ধরে বন্দি রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এতিমখানা দুর্নীতির মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি একই বিচারক তাকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেন।

আদালতে এসেছিলেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তাফা খান। বিএনপিপন্থী এই আইনজীবী আদালতে খালেদা জিয়ার কোনো আইনজীবী দেখতে না পেয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেন।

পরে তিনি আদালতের অনুমতি নিয়ে বলেন, আমি এখানে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে এসেছি। খালেদা জিয়ার মামলা পরিচালনা করেন, এমন কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত হননি।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী কারাগারে আদালত বসবেন-এ ধরনের প্রজ্ঞাপন গত রাতে আসামিপক্ষের এক আইনজীবীর কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এটি যথাযথভাবে আসামিপক্ষকে জানানো হয়নি। তাই আদালতকে সার্বিক বিবেচনায় নতুন তারিখ ধার্য করতে অনুরোধ জানান তিনি।

দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতকে বলেন, আজ এ মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য ছিল। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হয়। এরপর থেকে অসুস্থতার কারণে খালেদা জিয়াকে এখন পর্যন্ত আদালতে হাজির করা যায়নি। তার অসুস্থতা ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কারাগারে আদালত বসানোর বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

তিনি বলেন, প্রজ্ঞাপনটি যথাযথভাবে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়াকে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। আর অন্য আইনজীবীদের ব্যক্তিগতভাবে আজকের শুনানির বিষয়ে জানানো হয়েছে।

এমনকি বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসাসংলগ্ন অস্থায়ী আদালত যেখানে বসত, সেখানেও তা টানিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর তিনি আদালতের কার্যক্রম শুরুর আরজি জানান।

আদালত থেকে যাওয়ার সময় খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমার কোনো সিনিয়র আইনজীবী আদালতে ছিল না। তাদের যথাযথভাবে নোটিশ দেয়া হয়নি। যে প্রজ্ঞাপন গত রাতে করা হয়েছে, তা সাত দিন আগে কেন করা হয়নি। আদালতকে জানিয়েছি- আমি অসুস্থ, বারবার আসতে পারব না।

ঘটনাপ্রবাহ : কারাগারে খালেদা জিয়া

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter