• শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭
যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ও এম. মিজানুর রহমান সোহেল    |    
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০:০০ | অাপডেট: ০৮ নভেম্বর, ২০১৬ ০২:১৮:৪৯ প্রিন্ট
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাড়ছে অসামাজিক কর্মকাণ্ড
বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ফেসবুক। বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ২ কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করেন। বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে ফেসবুক। ফেসবুক তার বিভিন্ন কার্যকরী ফিচার দিয়ে যেমন দূরত্বকে কমিয়ে এনেছে, ঠিক তেমনি ফেসবুকের এই জনপ্রিয়তা এবং সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর অসাধু চক্র মেতে উঠেছে নানা অসামাজিক কার্যকলাপে। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ, পেজ এবং ব্যক্তিগত প্রোফাইলের মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে যৌনতা। বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে, নোংরা ছবি আপলোড করে, গোপন ভিডিও আপলোড করে প্রতিনিয়ত নারীদের হয়রানি করা হচ্ছে, নারীদের পণ্য হিসেবে ব্যবহার করেও সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন সার্ভিসের নামে চলছে জমজমাট যৌন এবং মাদকের ব্যবসা। ফেসবুকের বিভিন্ন দিক নিয়ে লিখেছেন -

বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়ছে। বাড়ছে নতুন নতুন সম্ভাবনা। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল সেবার আড়ালে বাড়ছে অন্ধকার জগতের বিস্তৃতি। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাদক ও যৌন ব্যবসা চলছে প্রকাশ্যে। তরুণ-যুব সমাজ ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নজরদারি না থাকার কারণে ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে অন্ধকারে।

বিভিন্ন গ্রুপে বিকৃত যৌন চর্চা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপে চলছে বিকৃত যৌন চর্চা। অনেক সময় গ্রুপ পাবলিক রেখে বা ক্লোজড করে দিয়ে একটা সংঘবদ্ধ চক্র যৌনাচার করছেন। এসব গ্রুপে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মেয়ের নোংরা-নগ্ন ছবি পোস্ট করে নানারকম মন্তব্য করতে বলা হয়। অনেক সময় গোপনে ধারণ করা ছবিও পোস্ট করা হয়। এরকম কয়েকটি গ্রুপ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাতের গভীরতা বাড়লেই এসব গ্রুপের সদস্যরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অনেক সময় প্রকাশ্যেই বলা হয়, এখন কি কেউ জেগে আছেন? সেক্স চ্যাট করতে চাই। অনেক সময় বিভিন্ন মেয়ের আইডি থেকে উত্তেজক ছবি পোস্ট করে ফোন নাম্বার দিয়ে দেয়া হয়। অনেকে আবার প্রতি ঘণ্টা বা রাতের হিসাব করে যৌন কাজের জন্য মূল্য নিধারণ করে দেন। গ্রুপগুলোতে এক ধরনের পোস্ট প্রায়ই দেখা যায়। যেমন, একটি স্বল্প বসনা নারীর ছবি দিয়ে বলা হয়, জামাটি খুব সুন্দর। আবার বিভিন্ন রাস্তাঘাট, শপিংমলে ঘুরতে বের হওয়া অপ্রস্তুত অবস্থায় ধারণ করা মেয়েদের ছবি পোস্ট করে বলা হয় ‘কার কার লাগবে এমন জিনিস’। এভাবে ওই মেয়ে বা মহিলার অজান্তেই ছড়িয়ে পড়ছে ওই মেয়ের ছবি। অনেকে আবার সেক্স চ্যাট করার জন্য প্রকাশেই পাটনার খুঁজছেন। ফেসবুকে ইংরেজি বা বাংলা দুইভাবেই সার্চ দিলে এরকম অসংখ্য গ্রুপ বা প্রোফাইল খুঁজে পাওয়া যাবে। এরমধ্যে কয়েকটি হল, Night Sex Chat only BD Boy & girl, real sex group BD, Bd Sex Chat, Sex chat online, BDSM Sex Romania

গত ১২ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে নারী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে ‘ডেসপারেটলি সিকিং আনসেন্সরড (ডিএসইউ)’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপের তিনজন অ্যাডমিনকে গ্রেফতার করেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। পরে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন জানান, রাজধানীর পান্থপথের একটি ফ্লাটে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। তারা দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি, অভিনেতা-অভিনেত্রী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মেয়েদের অনলাইনে লাঞ্ছনার শিকার করে আসছিলেন। তারা যে কোনো অপরিচিত মানুষের ছবি, গোপনে ধারণকৃত ভিডিও লিংক ফেইসবুকে শেয়ার করে তাতে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে আসছিলেন। সমালোচিত ওই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা এক লাখ ২২ হাজার, যার প্রতিষ্ঠাতা মালয়েশিয়া প্রবাসী মোহাম্মদ রাউল চৌধুরী। সম্প্রতি এই গ্রুপটি ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া এক তরুণীর ব্যক্তিগত ভিডিও ইন্টারনেটে তুলে দিয়েছিল। এই ফেইসবুক গ্রুপটি সম্পর্কে বিভিন্ন ভিকটিমের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

ডজন ডজন এস্কর্ট সার্ভিস

ঢাকা এস্কর্ট সার্ভিস, ঢাকা এন্টারটেইনমেন্ট সার্ভিস-লাভ ডেন, বাংলাদেশ এস্কর্ট, বাংলাদেশ এস্কর্ট এজেন্সি, ঢাকা এস্কর্ট, ঢাকা এস্কর্ট এজেন্সি, বাংলাদেশ এস্কর্ট গার্ল, বাংলাদেশ হাই ক্লাস এস্কর্ট, ঢাকা কল গার্ল এজেন্সি, বাংলাদেশ টপ এস্কর্ট এজেন্সি, কল গার্ল ঢাকা, হোম সেক্স সার্ভিস ইন চট্টগ্রাম অ্যান্ড ঢাকা, মেম্বার্স অব মেল অ্যান্ড ফিমেল এস্কর্ট এজেন্সি ফর গার্ল অ্যান্ড লেডিস, সেক্স ইন ঢাকা, বনবিথি কেন্দ্র, ঢকা এস্কর্ট লিমিটেড, খুলনা কল গার্ল সার্ভিস, ঢাকা হট গার্লস, কল গার্ল ওয়ান্টেড ইন ঢাকা, হোম কল গার্ল প্রোভাইডার ইন ঢাকা, কল বয় ঢাকা সিটি, ভাইয়ের মাল সরষ ইত্যাদি নামের ডজন ডজন এস্কর্ট সার্ভিসের নামে যৌন ব্যবসায় পরিচালনার আড়ালে সেক্স ট্রাফিকিংয়ে যুক্ত সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যক্রমের প্রতিবাদে গত ১৩ অক্টোবর বিভিন্ন ব্লগ সাইটে লেখা পোস্ট করেন মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী শাহানূর ইসলাম সৈকত। এরপর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। তবে এখন পর্যন্ত এসব অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার খবর পাওয়া যায়নি। শাহানূর ইসলাম সৈকত জানান, ‘কল গার্ল ঢাকা’ অনলাইনে কল গার্ল, বডি ম্যাসেজ ও ফরেনার এস্কর্ট সরবরাহ করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি ফেসবুক পেজ। কল গার্ল ক্লাব, ঢাকা, পাওয়ার্ড বাই এস্কর্ট রেইন ঢাকা কর্তৃক পরিচালিত কল গার্ল সাপ্লায়ার-বডি ম্যাসেজ-ফরেনার এস্কর্ট-অনলাইন বেইজ সার্ভিস প্রদানকারী তথাকথিত এজেন্সিটির ঠিকানা গুলশান ১, ঢাকা এবং কনটাক্ট পার্সন জনৈক রিগান। ফেসবুক পেজে বিভিন্ন চটকদার পোস্টের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রমের প্রচার চালাচ্ছে কোন বাঁধা-নিষেধ ছাড়াই। ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে পেজটি তাদের নরমাল ক্যাটাগরি এস্কর্টের রেট, জায়গা, বুকিং সিস্টেম প্রকাশ করছে এবং এ ক্যাটাগরির সেবা নিতে আগ্রহী হলে কি করতে হবে তাও বর্ণনা করেছে। পেজটি কলাবাগান, ধানমন্ডি, ধানমন্ডি-২৭ এবং মধ্যবাড্ডায় তাদের নরমাল ক্যাটাগরি এস্কর্ট সেবার স্থান, রেট ও যোগাযোগ নাম্বার প্রকাশ করেছে। সর্বশেষ এস্কর্ট সরবরাহকারী পেজটি এস্কর্ট রিক্রুইটিং এজেন্ট, নারী এস্কর্ট এবং পুরুষ এস্কর্ট নিয়গের জন্য পেজটিতে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। বিজ্ঞাপনগুলোতে কাজ করতে আগ্রহীদের যোগ্যতা, কাজ সম্পর্কে ধারণা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পারিশ্রমিক এবং যোগাযোগের ঠিকানা বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কলগাল, বিডি সেক্স, এসকট ইত্যাদি বিভিন্ন কি ওয়াড দিয়ে বিভিন্নভাবে সার্চ দিলে সহজেই এরকম অসংখ্য পেজ পাওয়া যাবে। যৌনকর্মীর পাশাপাশি ফেসবুকের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে বিভিন্নরকম সেক্সটয়। ফেসবুকে সেক্সটয় ইংরেজিতে লিখে সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে এরকম অসংখ্য পেজ। বিভিন্ন দামে এসব পণ্য দেশব্যাপী সরবরাহ করছে চক্রটি।

নারীদের জন্য রয়েছে আকর্ষণীয় অফার

‘যদি গোপনীয়তার সঙ্গে কোনো মেয়ে সেক্স করতে চান। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছে কিন্তু লজ্জায় কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কারো সঙ্গে সেক্স করতে পারছেন না। লজ্জার কিছু নাই সম্পূর্ণ গোপন ভাবে আপনি যোগাযোগ করতে পারেন। আপনার স্বামী বিদেশে থাকে বা আপনাকে সেটিস্ফাইড করতে পারছে না। একাকিত্বে ভুগছেন। কথা বলার কেউ নেই। যাদের সেক্সপার্টনার প্রয়োজন কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না অথবা পারসনাল কাউকে নিজের শারীরিক চাহিদার কথা বলতে পারছেন না তারা আমাদের ইনবক্স করুন।’ এমন ভাষা দিয়েই ফেসবুকের বিভিন্ন পেজে যৌন ব্যবসার ফাঁদ পাতা হচ্ছে।

ছবি জোড়া লাগিয়ে হয়রানি

ফেসবুকে আরেক আতংক ফটোশপ। অর্থাৎ সফটওয়্যারের মাধ্যমে মাথা কেটে অন্য ছবিতে জোড়া লাগিয়ে তা আপলোড করা। এই ধরনের হয়রানির সবচেয়ে বেশি শিকার হন স্কুল পড়ুয়া কিশোরিরা। জানা গেছে, অপরাধীরা বিভিন্ন কোমলমতি মেয়েদের ছবির মাথা কেটে পর্নো তারকাদের নগ্ন ছবিতে জোড়া দেন। এতে করে স্বাভাবিক চোখে মনে হবে নগ্ন ছবিটি ওই মেয়েটিরই। সাধারণত প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কিশোররা বা অনেক সময় কোনো মেয়ের উপর কারো আক্রোশ থাকলে ছবি এডিট করে এই ধরনের হয়রানি করা হয়। তবে কেউ কোনো কারণ ছাড়াই শুধু বিকৃত আনন্দ লাভের জন্য এসব কাজ করেন। সাম্প্রতিক দেশব্যাপী আলোচিত একটি ঘটনা হল, ছাত্রলীগ নেতা বদরুলের চাপাতির কোপে গুরুতর আহত কলেজ ছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিস। ঘটনার পর বদরুল দাবি করে খাদিজার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। প্রেমের সম্পর্ক প্রমাণ করতে বদরুল তার ফেসবুকে খাদিজার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় একটি ছবি প্রকাশ করে। পরে দেখা যায়, এটি প্রকৃতপক্ষে খাদিজা নয়। আরেক মেয়ের সঙ্গে ছবি তুলে বদরুল ফটোশপের মাধ্যমে প্রতারণা করেছে। বর্তমানে খাদিজা রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আর থানা হাজতে আছে বদরুল।

ওয়ালজুড়ে বিভিন্ন নোংরা বিজ্ঞাপন

ফেসবুকে ইদানীং বিভিন্ন ধরনের নুড বিজ্ঞাপন দেখা যায়। এসব বিজ্ঞাপনের প্রচ্ছদে থাকে নানারকম নগ্ন, অর্ধনগ্ন উত্তেজক ছবি। কোনো কারণে অথবা কৌতূহলবশত যদি একবার সেই ধরনের বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে বসেন তাহলে নানাভাবে হয়রানি হতে পারেন। আপনার বন্ধু তালিকায় থাকা প্রায় সবার কাছে চলে যেতে পারে এরকম স্পাম ভিডিও। কিংবা ঘুরেফিরে আপনার ওয়ালে বারবার এরকম নগ্ন ছবি বা গেমসের বিজ্ঞাপন আসতেই থাকবে। যা সামাজিকভাবে আপনার জন্য সম্মানহানিকর। কিছুদিন আগে এক সরকারি চাকরিজীবী ট্যাবে ফেবসুক খোলা রেখে পারিবারিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পরে তার ছোট্ট মেয়ে সেই ট্যাবে চাপাচাপি করে ওসব বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে। পরে ওই ভদ্রলোক অফিসে ফেসবুক চালালে তার ওয়ালে নোংরা ছবিগুলো দেখতে পান। সহকর্মীদের সামনে কিছুটা বিব্রতও হন। পরে তিনি জানতে পারেন ইন্টারনেটের বিভিন্ন স্পাম লিংকে ক্লিক করার কারণে তার এই দশা হয়েছে।

ছড়ানো হচ্ছে ধর্মীয় বিদ্বেষ

দেশে এখন সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় মন্দির ও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর লুটপাট। জানা গেছে, একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করেই এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। এলাকাবাসী জানায়, গত ২৯ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুসলমানদের পবিত্রস্থান পবিত্র কাবা শরিফ নিয়ে ব্যাঙ্গচিত্র করে এক হিন্দু ছেলে পোস্ট দেন। এরপর এই ঘটনার প্রতিবাদে ৩০ অক্টোবর সকালে নাসিরনগরের স্থানীয় ডিগ্রি কলেজ মোড়ে আহলে সুন্নত ওয়াল জমা’আত এবং স্থানীয় খেলার মাঠে খাঁটি আহলে সুন্নত ওয়াল জমা’আত দুটি পৃথক সমাবেশ আহ্বান করে। সেই সমাবেশ থেকেই মূলত হিন্দুদের মন্দির এবং বাড়িঘরে আক্রমণের ঘটনা ঘটে। ফেসবুক পোস্ট দেয়াকে কেন্দ্র করে ওইদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে প্রায় ১৫টি মন্দির ও শতাধিক হিন্দু বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার তিনদিন পর আবারও ৬টি হিন্দু বাড়ি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ভিডিও ফুটেজ দেখে সেই হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫৩ জনকে গ্রেফতার করেছে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফেসবুকে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগে ২০১২ সালের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুকে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননা করে ছবি সংযুক্ত করায় রামু উপজেলার বৌদ্ধ বসতি এলাকায় চালানো হয় তাণ্ডব। এ সময় ১২টি বৌদ্ধ মন্দির এবং বৌদ্ধদের ৩০টি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছিল। এছাড়াও শতাধিক ঘরবাড়ি এবং দোকানপাটে হামলা ও লুটপাট চালায় সুযোগসন্ধানীরা।

প্রশ্ন ফাঁসের বিড়ম্বনা

ফেসবুক ব্যবহার করে অভিনব কায়দায় মেডিকেলসহ বিভিন্ন পাবলিক ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন, এসএসসি, এইচএসসি এমনকি জেডিসি বা জেএসসি পরীক্ষারও প্রশ্ন ফাঁস করে আসছে একটি চক্র। আগ্রহীরা ফেইসবুকে বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন পেজে পোস্ট বা ভুয়া প্রোফাইল থেকে এই ধরনের অসাধু কাজ সম্পাদন করে থাকেন। অনেক সময় প্রশ্নপত্র মিললেও বেশিরভাগ সময় ভুয়া প্রশ্নপত্র দিয়ে হাজার হাজার টাকা লুটে নেয় চক্রটি। ফেসবুকে কোনো নির্দিষ্ট আইডি থেকে ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে মূলত উত্তরসহ প্রশ্নপত্র দেয়া হয়। এর আগে নেয়া হয় টাকা। এমনই একটি চক্রের তিন সদস্যকে গত ৭ অক্টোবর দিবাগত রাতে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ডিএমপির ডিবি (পশ্চিম) বিভাগের একটি টিম ওইদিন রাতে রাজধানীর শাহবাগ থানার পাবলিক লাইব্রেরির সামনে থেকে তাদের গ্রেফতার করে। তবে সেখান থেকে আরও ৪/৫ জন পালিয়ে যায়। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন জানান, চক্রটির সদস্যরা 'Sam Nilim', 'Aronnokhan Vai' নামে ছদ্মনামে ফেইসবুক ব্যবহার করত। তারা ফেসবুকে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা, নিয়োগ পরীক্ষা এবং পরীক্ষার ফলাফল পরিবর্তন ও প্রশ্নফাঁসের বিজ্ঞাপন দিত। নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করে বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেন শেষে ইনবক্সে যোগাযোগ করে প্রশ্নপত্র দিয়ে দিত।

আইনে যা আছে

সংবিধানের ৪০নং অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিককে পেশা বা বৃত্তি গ্রহণের স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনের দ্বারা আরোপিত বাঁধানিষেধ-সাপেক্ষে কোনো পেশা বা বৃত্তি গ্রহণের কিংবা কারবার বা ব্যবসায়-পরিচালনার জন্য আইনের দ্বারা কোনো যোগ্যতা নির্ধারিত হইয়া থাকিলে অনুরূপ যোগ্যতাসম্পন্ন প্রত্যেক নাগরিকের যে কোনো আইনসঙ্গত পেশা বা বৃত্তি-গ্রহণের এবং যে কোনো আইনসঙ্গত কারবার বা ব্যবসা পরিচালনার অধিকার থাকিবে। কিন্তু সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ম্যান্ডেট প্রদান করা হয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্র প্রকাশ্যে গণিকাবৃত্তি ও অশ্লীল কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেছে। দণ্ডবিধির ২৯০, ২৯২ ও ২৯৪ ধারায় উপরোল্লিখিত কার্যক্রমগুলো আইনগতভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে অপরাধীর জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান করেছে। তাছাড়া, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬-এর ৭৪ ধারায় পতিতা বৃত্তির জন্য কাউকে আহ্বান করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে অপরাধীর কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। ১২নং ধারায় বলা হয়েছে, (১) কোনো ব্যক্তি পতিতালয় স্থাপন বা পরিচালনা করিলে অথবা তাহা স্থাপন বা পরিচালনা করিতে সক্রীয়ভাবে সহায়তা বা অংশগ্রহণ করিলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বছর এবং অন্যূন ৩ (তিন) বছর সশ্রম কারাদণ্ডে এবং ইহার অন্যূন ২০ (বিশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। (২) কোনো ব্যক্তি, যিনি (ক) ভাড়াটিয়া, ইজারাদার, দখলদার বা কোনো স্থান দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, জানিয়া-শুনিয়া উক্ত স্থান বা এর কোনো অংশবিশেষ পতিতালয় হিসেবে ব্যবহার করিবার অনুমতি প্রদান করিলে; অথবা (খ) কোনো বাড়ির মালিক, ইজারা দাতা অথবা জমির মালিক অথবা উক্ত মালিক বা ইজারা দাতার কোনো প্রতিনিধি উক্ত বাড়ি অথবা উহার কোনো অংশবিশেষ পতিতালয় হিসেবে ব্যবহৃত হইবে তাহা জানা সত্ত্বেও উক্ত বাড়ি বা জমি ভাড়া প্রদান করিলে; তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বছর এবং অন্যূন ৩ (তিন) বছর সশ্রম কারাদণ্ডে এবং অন্যূন ২০ (বিশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। আইনের ১৩নং ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি রাস্তায় বা জনসাধারণের ব্যবহার্য স্থানে অথবা গৃহ অভ্যন্তরে বা গৃহের বাহিরে পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যে মুখের ভাষায় বা অংগভঙ্গি করিয়া বা অশালীন ভাব-ভঙ্গি দেখাইয়া অন্য কোনো ব্যক্তিকে আহ্বান করিলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বছর সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অনধিক ২০ (বিশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

ফেসবুকে মদের রমরমা ব্যবসা

ই-কমার্সের এই যুগে এখন সব কিছু পাওয়া যায় ঘরে বসেই। এই তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে দেশী-বিদেশী মদ। ফেসবুকে ‘অনলাইন বার বিডি’ নামের একটি পেজ প্রকাশ্যে মাদক দ্রব্যের অবৈধ রমরমা ব্যবসা করছে। বিকাশে পেমেন্ট দিলে ঘরে বসেই মদের বোতল পেয়ে যাচ্ছেন আগ্রহীরা। আবার পেমেন্ট দিয়ে আবার অনেকে প্রতারিতও হচ্ছেন। তবে নানা কারণে সেসব প্রতারণার কথা পুলিশের গোচরে আনছেন না সংশ্লিষ্টরা। অনলাইন বার বিডি নামে (fb.com/onlinebarbd) ওই পেজে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে একটি মোবাইল নম্বর। যে নাম্বারটিতে যোগাযোগ করে লোকেশন দিয়ে মদের অর্ডার দেয়া যায়। পেজটি জুড়ে দেশী-বিদেশী নানা ব্র্যান্ডের ছবি রয়েছে। সঙ্গে দেয়া হয়েছে অফারও। ওই পেজে যে মোবাইল নম্বর দেয়া হয়েছে তাতে যোগাযোগ করা হলে নাজিব নামে এক ব্যক্তি রিসিভ করে বলেন, স্যার বলুন, আপনার জন্য কী করতে পারি? কৌশলী ভূমিকায় হুইস্কি চাইলে তিনি বলেন, বিকাশ নাম্বারে ফিফটি পারসেন্ট টাকা পেমেন্ট দিতে হবে। এরপর কাঙ্ক্ষিত লোকেশনে পৌঁছে দেয়া হবে হুইস্কির বোতল। বিকাশ নম্বর চাইলে তিনি বলেন, আগে নিজে নিশ্চিত হোন, কোন লোকেশনে হুইস্কি পাঠাতে হবে তারপর বিকাশের নাম্বার দেয়া হবে। নাজিব নামে ওই ব্যক্তি আরও জানান, রাসেল নামে এক যুবক আপনার দেয়া ঠিকানায় হুইস্কি পৌঁছে দেবেন। মাদক দ্রব্য বহন কিংবা অনুমিত স্থানের বাইরে মাদক নেয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সেখানে অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে ফেসবুক পেজ খুলে প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি চলছে। আপনারা কি কোনো লাইসেন্স নিয়েছেন? জানতে চাইলে অনলাইন বার বিডির ওই নাম্বারধারি ব্যক্তি জানান, তাদের লাইসেন্স আছে। লাইসেন্সের কপি দেখতে চাইলে তিনি রেগে গিয়ে গালিগালাজ করতে থাকেন।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by