বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী
মোহাম্মদ জহিরুল আলম
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে যে কজন মানুষের নাম অবিনাশী নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল, মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী তাদের মধ্যে অন্যতম। যার সঠিক নেতৃত্ব এবং অদম্য দেশপ্রেমের ওপর ভর করে ১৯৭১ সালে নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালি জাতি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তিনি আমাদের এ প্রিয় বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী। আজ ১৬ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুবার্ষিকীতে বর্ণাঢ্য জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশপ্রেম আর আপসহীনতার এক অনন্য নজির তিনি স্থাপন করে গেছেন।
ওসমানীর জন্ম হয়েছিল এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। পিতার সরকারি বাসভবন সুনামগঞ্জে জন্ম নিলেও তার পৈতৃক নিবাস ছিল সিলেটের বালাগঞ্জ থানার দয়ামীর গ্রামে। বংশপরম্পরায় তিনি ছিলেন হজরত শাহজালাল (রহ)-এর সহচর নিজাম উদ্দিন ওসমানীর উত্তরসূরি। শৈশব থেকেই তিনি মেধা ও মননের স্বাক্ষর রেখেছেন। শিলংয়ের পাহাড়ঘেরা পরিবেশে প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হওয়ার পর সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মেট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। এরপর আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার সময় থেকেই তার মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হতে থাকে। ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর নিজের অসামান্য মেধা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি দ্রুত পদোন্নতি লাভ করেন এবং মাত্র ২৩ বছর বয়সে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্বকনিষ্ঠ মেজর হওয়ার বিরল রেকর্ড সৃষ্টি করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন তিনি অনুভব করেছিলেন বাঙালির প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বিমাতাসুলভ আচরণ। এ কারণেই তিনি বাঙালি সন্তানদের নিয়ে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠনের মূল কারিগর হিসাবে আবির্ভূত হন। তার এ দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলেই বাঙালিরা সামরিক প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়; যা পরবর্তী সময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। এজন্যই তাকে পরম শ্রদ্ধায় ‘ফাদার অব দ্য রেজিমেন্ট’ বলা হয়।
ওসমানীর জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর আক্রমণের পর যখন বাঙালির পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায়, তখন এ প্রবীণ সমরনায়ক সব মোহ ত্যাগ করে দেশমাতৃকার আহ্বানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর তাকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীসহ মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
যুদ্ধের ময়দানে তিনি যেমন কঠোর ছিলেন, রাজনীতির ময়দানে তিনি ছিলেন ঠিক ততটাই গণতান্ত্রিক ও নীতিমান। স্বাধীনতার পর তিনি সরকারের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করলেও কখনোই ক্ষমতার মোহ তাকে অন্ধ করতে পারেনি। ১৯৭৪ সালে যখন একদলীয় শাসনব্যবস্থা বা বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন তিনি তার প্রতিবাদে সংসদ সদস্য পদ এবং আওয়ামী লীগের সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এটি ছিল রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল এক সততা ও সাহসিকতার দৃষ্টান্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন, জনগণের মৌলিক অধিকার এবং আইনের শাসনে। জীবনের শেষ দিনগুলোয় তিনি ছিলেন একজন নিঃস্বার্থ জনদরদি মানুষ। উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন গেলেও ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী সিলেটের পুণ্যভূমি হজরত শাহজালাল (রহ)-এর দরগাহসংলগ্ন কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। মৃত্যুপরবর্তী সময়ে সরকার তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। বঙ্গবীর ওসমানী কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি বাঙালি জাতির সাহসের এক অবিনাশী আলোকবর্তিকা।
শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
