Logo
Logo
×

স্মরণীয়-বরণীয়

মুনশি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ

Icon

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মুনশি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ (১৮৬১-১৯০৭) ছিলেন কবি, ধর্মপ্রচারক, সমাজ-সংস্কারক। ১৮৬১ সালে যশোর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ঘোপ গ্রামে মাতুলালয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস একই এলাকার ছাতিয়ানতলায়। মেহেরুল্লাহ যশোরের মৌলবি মোসহারউদ্দীনের কাছে ধর্মশিক্ষা এবং মৌলবি মোহাম্মদ ইসমাইলের কাছে আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষা ও সাহিত্যে শিক্ষালাভ করেন। এ সময় তিনি কুরআন-হাদিস ও ফারসি সাহিত্যেও বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন। দারিদ্র্যের কারণে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ সম্ভব হয়নি। তিনি কিছুকাল সরকারি চাকরি করার পর দর্জিবিদ্যায় প্রশিক্ষণ নিয়ে যশোরে দর্জির দোকান খুলে স্বাধীন ব্যবসা শুরু করেন। ওই সময় খ্রিষ্টান পাদ্রিরা ইসলাম ও হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করলে মেহেরুল্লাহ বক্তৃতা ও লেখার মাধ্যমে তার প্রতিবাদ করেন। এ ব্যাপারে পাদ্রিদের সঙ্গে একাধিকবার প্রকাশ্য বিতর্কেও অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। একপর্যায়ে তিনি ধর্মপ্রচারে আত্মনিয়োগ করেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি একজন ভালো বক্তা হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

মেহেরুল্লাহ ইসলামের ঐতিহ্য সম্পর্কে বাংলা ও আসামের বিভিন্ন ধর্মীয় জনসভায় বক্তৃতা দিয়ে দরিদ্র, হতাশাগ্রস্ত মুসলমান সমাজকে জাগানোর চেষ্টা করেন। কলকাতার সুধাকর, ইসলাম প্রচারক প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। ধর্ম ও সমাজসংক্রান্ত তার কয়েকটি গ্রন্থ হলো-খ্রীষ্টীয় ধর্মের অসারতা, বিধবাগঞ্জনা ও বিষাদভান্ডার এবং মুসলমান ও খ্রীষ্টান তর্কযুদ্ধ। তিনি ১৯০৭ সালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক মৌ ব্যানার্জি তার এক প্রবন্ধে মুনশি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘মেহেরুল্লাহর মৃত্যুর পর তার মুরিদ জমিরুদ্দিন তার গুরুকে নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত জীবনীমূলক প্রবন্ধ লেখেন, যা ইসলাম প্রচারক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। মেহের চরিত নামে পরিচিত এই জীবনীটি মেহেরুল্লাহর জীবন ও শ্রমের সবচেয়ে খাঁটি সমসাময়িক রেকর্ড এবং জলপাইগুড়ির আসিরুদ্দিন প্রধান এবং হাবিবুর রহমান কর্তৃক রচিত মেহেরুল্লাহর পরবর্তী দুটি জীবনীগ্রন্থের উৎস উপাদান হিসেবে কাজ করে। ... আমরা দেখতে পাই যে, মেহেরুল্লাহ কীভাবে তার চেয়েও বেশি কিছু হয়ে ওঠেন, কেবল একজন ক্যারিশম্যাটিক স্ব-শিক্ষিত দর্জিই ছিলেন না যিনি খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচার এবং ধর্মান্তরের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধে বাঙালি মুসলমানদের মুখপাত্রের ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন...।’

মুনশি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ সম্পর্কে মৌ ব্যানার্জি আরও বলেছেন, ‘মেহেরুল্লাহর মৃত্যুতে শোকের ঢেউ যশোর থেকে ঢাকা এবং তারপর কলকাতায় ছড়িয়ে পড়ে। শেখ আবদুর রহিম কর্তৃক প্রকাশিত প্রখ্যাত বাঙালি-মুসলিম সাপ্তাহিক পত্রিকা মিহির-ও-সুধাকর শোকাহত শোকবার্তার নেতৃত্ব দেয়। সাময়িকীটি একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে যেখানে বাংলার, বিশেষ করে পূর্ব বাংলার নিম্ন-অবস্থার বাঙালি-মুসলিম সমাজের ভাগ্যের জন্য শোক প্রকাশ করা হয়েছিল : “... ধর্ম ও সমাজের উন্নতি ও সংস্কারের জন্য যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এবং বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একটি নতুন জীবন সঞ্চার করেছিলেন, ইসলামের প্রকৃত মূল্যবোধের প্রচারক মুন্সি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ আর নেই। খ্রিস্টান পাদ্রিরা যখন তাকে ইসলামের পক্ষে কথা বলতে শুনে ভয়ে কেঁপে ওঠেন। তাঁর পরামর্শে অনেক খ্রিষ্টান ধর্মান্তরিত ব্যক্তি ফিরে আসেন।” ... এই শোকবার্তাগুলির সুর থেকে এটা খুব স্পষ্ট যে, মুন্সি মেহেরুল্লাহ তাঁর অত্যন্ত বিনয়ী জন্মের সীমা ছাড়িয়ে বাঙালি মুসলমানদের একটি বৃহৎ অংশের জন্য সংস্কারক এবং সামাজিক বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, শ্রেণী ও সাম্প্রদায়িক পার্থক্যের বর্ণালী পেরিয়ে, জনসাধারণ থেকে শুরু করে অভিজাত আশরাফ পর্যন্ত।’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম