Logo
Logo
×

স্মরণীয়-বরণীয়

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

Icon

ড. মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাচীনকালে আসামের নাম ছিল কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষপুর, সীতাকুণ্ডের নাম ছিল চন্দ্রনাথ। ৬২৯-৬৪৫ সালে যখন হিউয়েন সাঙ ভারত ভ্রমণ করেন, তখন চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাই ছিল প্রধান সম্প্রদায়। তার সময় চট্টগ্রাম অঞ্চল ছিল প্রাগজ্যোতিষপুরের অধীন, চন্দ্রনাথ ছিল বিখ্যাত বৌদ্ধ তীর্থ। নাথ সম্প্রদায়ের প্রবল প্রতাপের সময় তীর্থস্থানের নামকরণ করা হয় চন্দ্রনাথ। হিন্দু পুরাণ ও তান্ত্রিক গ্রন্থগুলোতে সীতাকুণ্ডের নাম ছিল চন্দ্রশেখর, ছুটিখানি মহাভারতেও চন্দ্রশেখর নাম দেখা যায়। শুধু মোগল আমলে রামাইত সম্প্রদায়ের লোকেরা স্থাননাম রামায়িত করে, চন্দ্রনাথের নাম হয় সীতাকুণ্ড।

বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তার প্রথম যৌবনে সীতাকুণ্ডে আসেন, সীতাকুণ্ড হাই স্কুলে যোগ দেন ১৯১৪ সালে। উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে এটি ছিল জুনিয়র হাই স্কুল, পরিচালিত হতো চট্টগ্রাম জেলা বোর্ডের তত্ত্বাবধানে। প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৩ সালের ২৫ জানুয়ারি, জেলা কালেক্টরেট খেলার মাঠে। কাঠের তৈরি স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (১৫ মার্চ ১৯১৪-৩১ মার্চ ১৯১৫)। স্কুলের নতুন প্রধান শিক্ষক এ সময় ছিলেন সদ্যপ্রতিষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সম্পাদক।

সে সময়টা ছিল নতুন নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষিত যুবকদের স্কুলে শিক্ষকতার যুগ। এর আগে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন সীতাকুণ্ড জুনিয়র হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। চট্টগ্রাম জেলা বোর্ড পরিচালিত স্কুলে সাহিত্যবিশারদ দায়িত্ব পালন করেন ১৯০৭-১৯০৮ সালে। তিনি ১৮৯৪ সাল থেকে প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহে এক বিশেষ কর্মযজ্ঞের সূচনা করেন।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রেসিডেন্সি বিভাগ থেকে ট্রেনযোগে আসেন হাজার মাইল দূরবর্তী চট্টগ্রাম বিভাগে, যার ভাষা কলকাতার প্রমিত বাংলা ভাষা থেকে আরও দূরবর্তী। কলকাতার ভাষার সঙ্গে অসমিয়া ভাষার যে পার্থক্য, চট্টগ্রামের প্রান্তীয় ভাষার পার্থক্য তার চেয়েও বেশি। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মতে, চাটগাঁইয়া ভাষার রয়েছে অসমিয়ার মতো পৃথক ভাষা হওয়ার ক্ষমতা। ড. শহীদুল্লাহ্ এসে উপস্থিত হলেন এমন এক সীমান্ত বিভাগে, যেখানে (চট্টগ্রাম, আরাকান ইত্যাদি স্থান) আশ্রয় নিয়ে বৌদ্ধরা তাদের জীবন ও ধর্মগ্রন্থগুলো কিছু পরিমাণে রক্ষা করতে সক্ষম হন। সীতাকুণ্ড এমন কিছু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে উপহার দেয়, যেখানে রচিত হয় তার গবেষণার শ্রেষ্ঠ ভিত।

চর্যাপদের কবি কাহ্ন ও সরহের দোহাকোষে প্রাকৃত পিঙ্গলে গৌড় অপভ্রংশের নমুনা দেখেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলা ভাষার উৎস যে গৌড় অপভ্রংশ, এই মতবাদ উত্থাপন করেন। এক প্রবন্ধে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেন, ‘কাহ্ন, সরহ, ভুসুকু প্রভৃতির ভাষা প্রাচীন বাংলা বা বঙ্গকামরূপী।’ গৌড়ী প্রাকৃত থেকে গৌড়ী অপভ্রংশের (মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা) মধ্য দিয়ে এসেছে বঙ্গ-কামরূপী। আদি বাংলা ভাষার গবেষণায় এটি ছিল নতুন তত্ত্ব। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তার পিএইচডি গবেষণার বিষয় হিসাবে বেছে নেন এই শিরোনাম : Les Chants Mystiques: de Kanha et de Saraha (প্যারিস থেকে প্রকাশিত, ১ জানুয়ারি ১৯২৮)। নতুন তত্ত্বের উদ্ভাবনে নিশ্চয়ই সীতাকুণ্ডের ভূমিকা ছিল সবার উপরে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।

ড. মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, মিরপুর কলেজ, ঢাকা

mahmoodnasirjahangiri@gmail.com

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম