'জীবন নিয়ে হলে ফিরতে পারব কিনা, তাও জানি না'

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৮, ২০:৩৪ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

ফেসবুক থেকে নেয়া ছবি
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া এক করুণ কাহিনী তুলে ধরেছেন তাসনিম আফরোজ ইমি নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। রোববার রাতে ছাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনা স্বচক্ষে দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তুলে ধরেন ওই ছাত্রী। ইমির ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসটি যুগান্তর পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো: রাত প্রায় ১টা। কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবিতে রোকেয়া, বঙ্গমাতা, মৈত্রী হলের আপুরা তখন বাইরে। আমাদের হলের মেয়েরাও বাইরে আন্দোলনের জন্য যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্ত হলগেট খোলার জন্য স্লোগান দিচ্ছে। কিন্ত কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। প্রায় ঘণ্টাখানেক চেষ্টা করার পর অবশেষে হলগেট খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম আমরা। সেখানে প্রায় ঘণ্টাখানেক রাজু ভাস্কর্যের সামনে স্লোগান দিতে থাকি আমরা। হঠাৎ মহসিন হলের দিক থেকে কারা যেন ছুটে আসে আমাদের দিকে। অনবরত ইট ছুড়তে থাকে। জ্বি হ্যাঁ, মেয়েদের দিকেই ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে সোনার ছেলেরা। পুলিশও ছিল না তখন। আমরা এলোমেলোভাবে টিএসসির দিকে ছুটতে থাকি। দিগ্বিদিক ছুটতে ছুটতে আমি পড়ে যাই একেবারে পেছনে। টিএসসির গেটে ঢুকতে গিয়ে আটকে যাই। তখনো পেছন দিয়ে ইট মেরেই যাচ্ছে। আমার ঠিক পেছনেই এক ভাইয়া ছিল। ইট লাগে তার মাথায়। বলা যায়, আমাদের, মানে মেয়েদের বাঁচাতে গিয়েই ইট লাগে উনার মাথায়। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মুখ, আমি হতভম্বের মতো তাকিয়ে আছি। ভেতরেও ঢোকা যাচ্ছে না। একপর্যায়ে পড়ে যাই মাটিতে। ভাইয়া চিৎকার করছে, ভাই আমার মাথা ফাটছে, ভাই আমারে বাঁচান। অসহায়ের মত পড়ে থাকি। নড়ার মতোও অবস্থা ছিল না তখন। অনেক কষ্টে যতক্ষণে টিএসসির ভেতরে ঢুকতে পারি, ততক্ষণে দুই পা রীতিমতো পিষ্ট, হাঁটার মতো শক্তি নাই। অসহ্য যন্ত্রণা। যখন আটকা পড়েছিলাম, তখন যে বেঁচে ফিরতে পারব এই আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভাবছিলাম বোধহয় মারা যাচ্ছি। আমার পেছনে ভাইয়াটা। ইট লাগে ঠিক তার মাথার পেছনে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি তাকে ভেতরে নেয়া হলো। মাথায় কাপড় দেয়ার পরেও রক্ত বন্ধ হয় না। আরো একটা কাপড় বেঁধে দেয়া হলো। ততক্ষণেও থামে না। তারপর আমি আমার ওড়না দিয়ে দিলাম। রক্ত তখনও থামছে না। মানুষটা কি করুণভাবে বলে যাচ্ছিল, আমাকে বাঁচান ভাই। আম্মুকে ডাকছিল। প্রায় ১৫ মিনিট এভাবেই থাকে। তারপর পেছনের দরজা দিয়ে কোনোমতে তাকে মেডিকেলে পাঠানো হয়। বাইরে তখন তুমুল সংঘর্ষ। আর টিএসসির ভেতর গুরুতরভাবে আহত কিছু রক্তাক্ত শরীর। তাদের চিকিৎসার জন্য বাইরে পাঠানো হবে, এমন অবস্থাও নেই। না প্রেস, আর না কোনো নেট সংযোগ। যাদের দেখলাম, তাদের প্রায় সব মুখ চেনা। ক্যাম্পাসের বড়, ছোট ভাইবোন। চেতনাবাজরা এদেরকেই কি নির্দ্বিধায় আজেবাজে ট্যাগ লাগিয়ে, নিজেরাই আক্রমণ করে এখন আবার ফেসবুকে সুশীলতা দুচাচ্ছে! নিজের চোখে পুরো ঘটনা না দেখলে হয়তো আমিও চেতনাবাজদের রাতকে দিন বানানোর কেচ্ছা বিশ্বাস করে বসতাম। ভাবতাম আন্দোলন না, সহিংসতা হচ্ছে। আর উনারা উদ্ধার মারাতে এসেছেন! ফ্রেন্ডলিস্টে উনাদের সংখ্যাটাই বেশি কিনা! আমার হঠাৎ করে মনে হলো, একাত্তরে হানাদারদের চাইতে রাজাকাররা আমাদের ক্ষতি করেছিল বেশি। ঠিক যেমন নব্য রাজাকাররা মেয়েদের পর্যন্ত রেহাই দেয়নি। ইটপাটকেল ছুড়েছে, রক্তাক্ত করেছে! যাই হোক, টিএএসসির ভেতর ঢুকে দেখলাম আমার হলের এক আপুর মাথা ফেটে গেছে। ইট লেগেছে মাথার মাঝ বরাবর। মৈত্রী হলের এক আপু গুরুতর আহত। যে ভাইয়াটা আমার পেছনে ছিল, উনার ইট লেগেছিল মাথার পেছনে। অনেক ভাইয়ার পা রক্তাক্ত। ফুঁপিয়ে রইলাম টিএএসসির ভেতর। সকাল পর্যন্ত জীবন নিয়ে হলে ফিরতে পারব কিনা, তাও জানি না তখন। এমন সময় পোক্টর এলেন। বোধহয় ভুল করেই চলে এসেছিলেন। ছাত্ররা তাকে তাদের দাবিদাওয়া বলল, দোষীদের বিচার চাইল। তিনি কিছুক্ষণ অহেতুক আস্ফালন করে বিদায় হলেন। এমন সময় ছোটবোন মৌসুমি কান্নাকাটি শুরু করল, ওর রুমমেট হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে। সঙ্গে সঙ্গে রওনা দিলাম ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশে। এসে দেখি আপুর মাথায় বিশটা সেলাই! কর্তব্যরত ডাক্তার বললেন, রাত থেকে প্রায় ৬০ জনকে চিকিৎসা দিয়েছেন তিনি। সবাই আমার ক্যাম্পাসের। ভোর পাঁচটায় যখন এই পোস্ট লিখতে শুরু করি, তখনও মেডিকেলের ভেতর চোখ জ্বলছে। বাইরে টিয়ারগ্যাস ছোড়া হয়েছে। হাসপাতালের সাধারণ রোগী, ডাক্তার সবাইকে মাশুল দিতে হচ্ছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের! এখনো মেডিকেলে আছি। পাঁচটার দিকে এক ভাইয়াকে আনা হলো তার মাথার পেছনে ফাটা, নাক ফাটা, হাতে রক্ত পায়ে রক্ত! কাঁদতে কাঁদতে তাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি দেখলাম। এখন সিটিস্ক্যান করতে দিয়েছে। আক্ষেপ একটাই। কোনো মিডিয়াকে দেখলাম না আসল ঘটনা প্রকাশ করতে, কোনো রাজপথের সৈনিক এগিয়ে এল না মেয়েদের বাঁচাতে! অবশ্য অপরদিক দিয়ে ইট ছুড়ে দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করেছিল বটে! আর ফেসবুকে তাদের একএকজনের খাড়াইয়া যাওয়া চেতনা, বিশ্লেষণ দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম! এরাই ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবে দেশকে! যে পাঁচ শতাধিক ছাত্রছাত্রী (যার দুই তৃতীয়াংশের বেশি ছাত্রী ছিল) চরম অনিশ্চয়তার ভেতর ছিলাম, অন্তত একজনের অভিশাপ ঠিকঠাকমতো লাগলেও যেন সব কিছু ধ্বংস হয়ে যায়। সবকিছু!