|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের দেখা হওয়া মানেই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এই দ্বৈরথের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধের ইতিহাস, রাজনৈতিক উত্তাপ, প্রতিশোধের গল্প, আবার অবিশ্বাস্য ফুটবল-নৈপুণ্যেরও স্মৃতি। ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ আর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’- সব মিলিয়ে এই লড়াই বারবার ছাপিয়ে যায় নিছক ৯০ মিনিটের হিসাব।
এবারের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালও ব্যতিক্রম নয়। তবে ইতিহাসের পুরোনো অধ্যায়ের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে নতুন এক সম্ভাবনা। ইংল্যান্ডের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে টমাস টুখেল অপেক্ষায় আছেন প্রায় এক শতাব্দীর পুরোনো এক রেকর্ড ভাঙার।
বিশ্বকাপের বয়স ৯৬ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক দেশই শিরোপা জিতেছে, অনেক কিংবদন্তি কোচ ইতিহাস লিখেছেন। কিন্তু একটি জায়গায় ইতিহাস আজও অপরিবর্তিত- নিজ দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশের দায়িত্ব নিয়ে কোনো কোচ বিশ্বকাপ জিততে পারেননি।
জার্মান নাগরিক টুখেলের সামনে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার সুযোগ। তবে ইতিহাস কাউকে সহজে জায়গা ছেড়ে দেয় না। টুখেলকে আগে পেরোতে হবে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে। এরপর ফাইনালে অপেক্ষা করবে স্পেন।
দুটি জয়ই কেবল তাকে পৌঁছে দিতে পারে এমন এক উচ্চতায়, যেখানে আগে কোনো বিদেশি কোচের পা পড়েনি।
শুধু শিরোপার স্বপ্ন নয়, ইংল্যান্ডের অপেক্ষাটাও কম দীর্ঘ নয়। ১৯৬৬ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জয়ের পর আর কখনও ফাইনালে ওঠেনি তারা। প্রায় ছয় দশকের সেই আক্ষেপ ঘোচানোর দায়িত্বও এখন টুখেলের কাঁধে।
অবশ্য বিদেশি কোচ হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানোর নজির একেবারে নেই, তা নয়।
১৯৫৮ সালে ইংলিশ কোচ জর্জ রেইনার সুইডেনকে তুলেছিলেন ফাইনালে। ১৯৭৮ সালে অস্ট্রিয়ান আর্নস্ট হাপেলের অধীনে ফাইনাল খেলেছিল নেদারল্যান্ডস। ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়াকে শিরোপার লড়াইয়ে তুলেছিলেন বসনিয়ায় জন্ম নেওয়া জ্লাতকো দালিচ।
তবে শেষ পর্যন্ত তাদের কারও হাতেই ওঠেনি বিশ্বকাপ।
ক্লাব ফুটবলে টুখেলের সাফল্যের ঝুলি সমৃদ্ধ। বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, পিএসজি, চেলসি ও বায়ার্ন মিউনিখ- ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর ডাগআউটে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে চেলসিকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানো তার কোচিং ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অর্জন।
তবে জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ জিততে পারলে, সেই সাফল্য তাকে নিয়ে যাবে সম্পূর্ণ নতুন এক উচ্চতায়।
অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল স্কালোনি। তার লক্ষ্যও কম ঐতিহাসিক নয়। কাতারে শিরোপা জয়ের পর আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। সেই সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখতে চান টানা দুইবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা।
সবশেষ এই কীর্তি দেখিয়েছিল ব্রাজিল- ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে। এর আগে ইতালি টানা শিরোপা জিতেছিল ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে।
তাই এই সেমিফাইনাল শুধু একটি ফাইনালের টিকিটের লড়াই নয়। একদিকে আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার অভিযাত্রা, অন্যদিকে ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসানের স্বপ্ন।
আর এই দুই গল্পের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন টুখেল- যার সামনে সুযোগ, বিশ্বকাপের প্রায় শতবর্ষের ইতিহাসে এমন একটি অধ্যায় লেখার, যা এখন পর্যন্ত কেবল অসম্পূর্ণ স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেছে।

