অন্ধকার থেকে আলোর পথে নাজমুল ইসলাম অপু

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৭:৫৬ | অনলাইন সংস্করণ

  আল-মামুন

পড়ালেখার চেয়ে খেলাধুলাই বেশি প্রিয় ছিল নাজমুল ইসলাম অপুর। ছাত্র হিসেবেও তেমন ভালো না হওয়ায় সারাক্ষণ খেলাধুলা নিয়েই মেতে থাকতেন। ছেলেকে অনেক মারধর করেও পড়ার টেবিলে বসাতে না পেরে বাধ্য হয়েই বিকেএসপিতে ভর্তি করে দেন অপুর মা। খেলাধুলার জন্য বাড়ি ছাড়লেও দেশের একমাত্র ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ক্রিকেট শেখা হয়নি অপুর। 

বিকেএসপি ছেড়ে বাড়ি ফিরে খেলাই ছেড়ে দেন। কিন্তু কোচ গোলাম রসুলের অনুপ্রেরণায় ফের নতুন উদ্যমে শুরু করেন, ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন আগামীর তারকা। একটা সময়ে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া অপুই এখন পতাকা উড়াচ্ছেন বাংলাদেশের। যুগান্তরকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিজের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্প শুনাচ্ছেন আগামীর সম্ভাবনাময়ী এই ক্রিকেটার। তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল-মামুন


 
যুগান্তর: আপনার অভিষেক নিয়ে যদি বলেন।

নাজমুল ইসলাম অপু: অবশ্যই ভালো লাগছে। কারণ অভিষেক নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আল্লাহর রহমতে ভালো হয়েছে (হাসি)। মাঠে বল করার সময় রিয়াদ ভাই (মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ) আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। উনি বলেছেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওনার দেয়া প্লান মতো বল করেছি। তাছাড়া মাশরাফি (মাশরাফি বিন মুর্তজা) ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর উনি আমাকে টি-টোয়েন্টিতে বোলিং করার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। ওনার সঙ্গে কথা বলার পর আমার কাছে মনে হয়েছে আমি পারব। 

যুগান্তর: আমরা কি বলতে পারি মাশরাফির পরামর্শে সফল অপু?

নাজমুল ইসলাম অপু: হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলতে পারেন (হাসি)। তবে প্রথম ম্যাচে অভিষেক হওয়ার পর ড্রেসিংরুমে সাকিব ভাই এসেছেন। ওনাকে পেয়ে অনেক খুশি হয়েছি। উনি আমাকে বলেছেন, বেশি কিছু করা লাগবে না, স্বাভাবিক বোলিং কর, তবে সিঙ্গেলের বেশি নিতে দিবি না। আমি উইকেট টু উইকেট বোলিং করেছি, সাফল্যও পেয়েছি।

যুগান্তর: প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানরা যখন একের পর এক বাউন্ডারি হাঁকাতে ব্যস্ত সেই সময় বোলিং করাটা কতটা চ্যালেঞ্জিং?

নাজমুল ইসলাম অপু: আসলে আমার প্রথম ম্যাচ ছিল তো। তাই আমি এত কিছু চিন্তা করিনি। শুধু আমি আমার নিজের কাজটা করার চিন্তায় ছিলাম এত কিছু বুঝি নাই। আমি ব্যাটসম্যানদের পায়ের কাছে বোলিং করেছি। আমার চিন্তা ছিলো আমি ভালো জায়গায় বোলিং করব। তবে ওরা জোর করে যদি কিছু করতে পারে তাহলে আমার ব্যাড ডে হবে। তা না হলে আমি সফল হব। এটাই পরিকল্পনা ছিল। 

যুগান্তর: অভিষেকের চেয়েও আপনার নাগিনী উদযাপন বেশ নজর কেড়েছে... 

নাজমুল ইসলাম অপু: ইনজয় করেই এটা করা। বিপিএলে রাজশাহী কিংসের হয়ে খেলার সময় একদিন ডেসিংরুমে বলাবলি হচ্ছিল, যে স্পিনারের লাইফ হবে সাপের মতো। যখনি সুযোগ হবে উইকেট তুলে নেয়া। সেদিন টিম মিটিংয়ে আমি সাপের মতো করে ছোবল দিয়েছিলাম। সেই ফানি থেকেই মাঠে চলে এসেছে। তারপর থেকে খুব মজা পাচ্ছিলাম। সর্বশেষ বিপিএলেও রংপুর রাইডার্সের হয়ে খেলার সময় উইকেট পাওয়ার পর এমন উদযাপন করেছি। তো হোটেলে ফেরার পর মাশরাফি ভাইয়ের মেয়ে আমায় বলেছে, চাচ্চু তোমার উদযাপনটা ভালো লাগে। তুমি এটা সব সময় কর। এটা আসলে আমার উইকেট পাওয়ার ক্ষুধা থেকে করা।


  
যুগান্তর: আপনার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শুরু নিয়ে যদি বলেন।

নাজমুল ইসলাম অপু: সব কিছুর পেছনেই আমার আম্মা। স্কুলজীবন থেকেই পড়াশোনায় তেমন আগ্রহী ছিলাম না। পড়াশোনা না করে খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকায়, কীভাবে যেন মা বিকেএসপির খোঁজ পান। তারপর আমাকে নিয়ে ভর্তি করে দেন। 

যুগান্তর: কখন বিকেএসপিতে ভর্তি হন?

নাজুল ইসলাম অপু: ১৯৯৯ সালে। আমি তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। মা আমাকে নিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির পরিবর্তে ক্লাস সেভেনে ভর্তি করে দেন। ক্লাসে গিয়ে দেখি আমার সঙ্গে যারা ছিল তারা আমার তুলনায় অনেক লম্বা। যে কারণে আমি ওদের ভাই ভাই বলতাম। 

যুগান্তর: বিকেএসপির জীবন নিয়ে যদি বলেন।

নাজমুল ইসলাম অপু: বিকেএসপিতে আমাদের কোচ ছিলেন হাসান স্যার। আমাদের ব্যাসের মেধাবী এবং দুর্বলদের নিয়ে তিনি দুটি  আলাদা টিম করেন। আমি দুর্বল টিমে পড়ে যাই। আমাদের দলের নাম ছিল সুপ্রিম পাওয়ার। কাম কিছুই ছিল না। আমাদের নিয়ে তেমন প্রাকটিস হতো না। একদিন আমাদের ব্যাসের মেধাবীদের নিয়ে বাইরে যাওয়ার কথা ছিল। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে সেই প্রাকটিসে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে সবার আগে রানিং করে আবার চলে এসেছি। স্যার অবশ্য আমাকে দেখে অনেক খুশি হয়েছেন।

যুগান্তর: বিকেএসপিতে আপনার ব্যাসের কেউ জাতীয় তারকা হয়নি?

নাজমুল ইসলাম অপু: হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি যখন ছোট ছিলাম। ক্লাস সেভেনে আমি ফেল করায় আমার ব্যাসের যারা ছিল- তারা উপরে উঠে যায়। আমি নিচের ব্যাস মুশফিকদের সঙ্গে পড়তে থাকি। ওদের সঙ্গে আর পড়া হয়নি। আমি দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে চলে এসেছি। মুশফিকরা তো বিকেএসপি থেকেই জাতীয় দলের তারকা হয়েছে। 

যুগান্তর: বিকেএসপিতে থেকে চলে এসে কি স্থানীয় লিগে খেলেছেন?

নাজমুল ইসলাম অপু: হ্যাঁ, কিন্তু নারায়ণগঞ্জে গোলাম রসুল নামে আমার একজন কোচ ছিলেন। উনি আমাকে একটা ম্যাচ ডেকে নিয়ে খেলান। ২০০৭ সালে ওই ম্যাচে আমি ৭ উইকেট পাই। পরের বছর উনি আমাকে নারায়ণগঞ্জের লিগে খেলান। সেখানে আমি সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হই। এরপর দ্বিতীয় বিভাগে একটা ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দেন, সেই ম্যাচে আমি ৫ উইকেট পাই। পরের বছর আমার ওল্ড ডিওএইচএসের সাইফুল ভাইকে রসুল স্যার আমাকে পরিচয় করে দেন। উনি নেটে আমার বোলিং দেখে পছন্দ করেন। কোনো পারিশ্রমিকের কনটাক হয়নি।

যুগান্তার: বিনা পারিশ্রমিকে খেলেছেন কখনও?

নাজমুল ইসলাম অপু: হ্যাঁ, ২০০৯ সালে সাইফুল ভাই আমাকে অগ্রণী ব্যাংক দলে খেলার সুযোগ করে দেন। অগ্রণী ব্যাংকের হয়ে ৪/৫টা ম্যাচ খেলার পর আমি ইনজুরিতে পড়ে যাই। পরের বছর রসুল স্যার আমাকে প্রিমিয়ারে ওরিয়েন্ট ক্লাবে খেলান। ২০১০ সালের প্রিমিয়ারে আমি লিগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হই। আবাহনীর সঙ্গে আমাদের একটা খেলা ছিল। সেই ম্যাচে আমি ১৫ রান দিয় ৪ উইকেট পেয়েছিলাম। তখন আবাহনীর কোচ ছিলেন সারোয়ার ইমরান স্যার। ওনার সঙ্গে আমাকে রসুল স্যার পরিচয় করিয়ে দেন।

যুগান্তর: আপনি তো ২০১২ সালের সাফ গেমসেও খেলেছেন।

নাজমুল ইসলাম অপু: হ্যাঁ, সাফ গেমসের জন্য ইমরান স্যার আমাকে এবং সোহরাওয়ার্দী শুভকে ডাকেন। বলে দেন তোমাদের দুজনের মধ্য থেকে একজনকে নেয়া হবে। তো আমার বোলিং-ফিল্ডিং দেখে আমাকেই নেন। সাফ গেমসে আমরা শ্রীলংকাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হই। এরপর ইমরান স্যার আমাকে একাডেমির টিমে রাখেন। তখন দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে আমাদের মাঠে ওয়ানডে সিরিজ খেলি। সেখানে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই। এরপর তিন বছর একাডেমিতে ছিলাম। 

যুগান্তর: যাদের সঙ্গে সাফ গেমসে খেলেছেন, তাদের অনেকেই আরও আগে জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছে। এটা নিয়ে কখনও হতাশা কাজ করেনি?

নাজমুল ইসলাম অপু: হ্যাঁ, নাসিরসহ অনেকেই ছিল। তারা জাতীয় দলে অনেক আগেই সুযোগ পেয়েছে। তবে ক্ষুধা তো অবশ্যই ছিল। হচ্ছে না কেন! আব্দুর রাজ্জাকসহ অনেক সিনিয়র ক্রিকেটারের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছিলাম। কেন জাতীয় দলে ডাক পাচ্ছি না। তবে সাকলাইন মুস্তাক বোলিং কোচ হিসেবে কাজ করতে বাংলাদেশে আসার পর ওনার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছি। উনি আমায় বলেছেন, দেখ তুমি অন্ধকার থেকে আলোতে এসেছে। এখন তোমার তাকাতে একটু কষ্ট হবে। আর তুমি যদি আলোতেই থাক তখন সূর্যের আলো যদি ধীরে ধীরে বাড়েও তাহলে তুমি বুঝতে পারবে না আলো যে বাড়ছে। তোমরা এমন একটা স্টেজে আছ, এখানে এত কম কম উন্নতি হবে যা চোখে পড়বে না। কিন্তু আত্মবিশ্বাস রাখ। তাছাড়া সর্বশেষ বিপিএলে আমাদের দলে (রংপুর রাইডার্সে) টম মুডি (কোচ), মাশরাফি বিন মুর্তজা, ক্রিস গেইল, ব্রান্ডন ম্যাককালাম, রবি বোপারা ছিলেন। ওনারা আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। ওনাদের উৎসাহে আমার কাজটা আরও সহজ হয়ে যায়। বিপিএলে খেলে আমি এই জিনিসগুলো শিখেছি। 

যুগান্তর: আপনার ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে কার অবদান বেশি?

নাজমুল ইসলাম অপু: প্রথমে আমার আম্মার কথা বলব। কারণ আমি পড়াশোনা তেমন করতাম না। বিলে বিলে খেলতাম, ঘুড়ি ওড়াতাম। এভাবেই আমার দিন কাটত। মা আমাকে বিকেএসপিতে ভর্তি করে দেন। পরের অবদান গোলাম রসুল স্যার এবং ইমরান স্যারের। ওনাদের কারণেই আমি জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছি। 

যুগান্তর: আপনার পছন্দের ক্রিকেটার কে?

নাজমুল ইসলাম অপু: আমার পছন্দের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। উনার বোলিং আমার ভালো লাগে। আর আমি লাকি যে আমার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অভিষেক ম্যাচে ড্রেসিংরুমে উনাকে পেয়ে গেলাম। উনার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মাঠে নেমেছি। আসলে মেজিকের মতো আরকি! যা চাইছি তাই হয়েছে।

যুগান্তর: সাকিব আল হাসানের ইনজুরির কারণেই কি আপনার ভাগ্য খুলে যায়?

নাজমুল ইসলাম অপু: এটা নিয়ে সাকিবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।উনি আমায় বলেছেন, তুই বিপিএলে ভালো বোলিং করেছিস। বিপিএলে যেহেতু টি-টোয়েন্টি ফর্মেটে খেলার অভ্যাস হয়েছে তো এখানে চিন্তার কিছু নেই। প্রেসার নেয়ার কিছু নেই রবং ইনজয় করে খেল।  

যুগান্তর: ক্রিকেট খেলার জন্য কখনও মার খেয়েছেন?

নাজমুল ইসলাম অপু: খেলাধুলার জন্য এমন অনেক দিন মার খেতে হয়েছে। রাতে বাসায় ফেরার সময় মার খাওয়ার ভয়ে থাকতাম। মায়ের হাতে মার খাওয়া থেকে বাঁচার জন্য একদিন ভূতে ধরার অভিনয়ও করেছিলাম। এটা আসলে ছোটবেলার কাহিনি। মা ওই দিন আর মারেনি। তার এক বছর পর বিকেএসপিতে ভর্তি হয়ে গেলাম।    

যুগান্তর: জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার চেয়েও বেশি চ্যালেঞ্জিং টিকে থাকা, সেই চ্যালেঞ্জ নেয়ার জন্য আপনি কতটা প্রস্তুত?

নাজমুল ইসলাম অপু: যখন যে কাজটা আসবে চেষ্টা করব শতভাগ করার। আর আল্লাহ যদি না চান, তাহলে আমি শত চেষ্টা করলেও হবে না। আমি আমার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। যে সুযোগ পেয়েছি টেষ্টা করব। সেটা কাজে লাগাতে। তাছাড়া  নারায়ণগঞ্জের ফরাজিকান্দায় আমার বাড়ি। নদীর ওপার থেকে আমিই প্রথম জাতীয় দলে সুযোগ পেলাম। আমি ভালো দেশের ক্রিকেটে অবদান রাখতে চাই। 

যুগান্তর: আপনি নিজেকে কোন জায়গায় দেখতে চান?

নাজমুল ইসলাম অপু: আমি নিজে এখনও পর্যন্ত তো কিছুই না! আল্লাহর রহমতে দেশের জন্য কিছু করতে চাই। বাংলাদেশ দলের জন্য এমন কিছু করতে চাই যেন মানুষ সব সময় মনে রাখতে পারে। মানুষের মুখে প্রশংসা পাই। সবার কাছে দোয়া চাই যেন দেশের ক্রিকেটে অবদান রাখতে পারি। মন খুলে কিছু করতে চাই।