‘তিনি কাঁপছিলেন আর বলছিলেন, গোলাগুলি হচ্ছে ওখানে যেও না’

  স্পোর্টস ডেস্ক ১৫ মার্চ ২০২০, ১৬:০৪:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

২০১৯ সালের এই দিনটি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য স্মরণীয় একটি দিন। তা অবশ্য মাঠের কোনো ঘটনা নয় বা কোনো সিরিজ জেতার সুখকর স্মৃতি নয়।

সে বছরের ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদে জুমার নামাজ চলাকালীন ঘটে যাওয়া ভয়াবহ একটি ঘটনা। এক শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীর আচমকা গুলিবর্ষণে প্রাণ হারান ৫০ জন মুসল্লি। গুরুতর আহত হন কমপক্ষে ৫০ জন।

আর ভয়াল সেই ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন টাইগাররা। সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি তামিম-রিয়াদ-মমিনুলরা।
ভোলার কথাও নয়। মাত্র ৫ মিনিট দেরি করায় সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।


ওই সময় ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভালে নিউজিল্যান্ড দলের বিপক্ষে মাঠে নামার কথা ছিল বাংলাদেশের। শুক্রবার এলে যথারীতি ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে জুমা পড়ার উদ্দেশে রওনা দেন তামিমরা। তবে তামিমরা পৌঁছার কয়েক মিনিট আগেই ঘটে যায় ক্ষক্তক্ষয়ী সেই ঘটনা।

তামিমের ভাষায়– খুব কাছ থেকে সেদিন মৃত্যুকে দেখেছেন তিনি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা ভয়ানক সেই ঘটনার বর্ণনা ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে শুনিয়েছেন তামিম ইকবাল।

পাঠকের উদ্দেশে তামিমের বলা সেই লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরা হলো –

‘বাসে ওঠার আগে কি হয়েছিল সেটি বলি। দুই বা তিন মিনিট আমাদের জীবনে কত বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল, সেটা বুঝতে আপনাদের সহজ হবে তা হলে। সাধারণত মুশফিক (রহিম) ও রিয়াদ ভাই (মাহমুদউল্লাহ) খুতবার সময়ও উপস্থিত থাকতে চান। এ জন্য আগভাগেই আমরা জুমার নামাজে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম।’

‘বাস ছাড়ার কথা ছিল বেলা দেড়টার সময়, কিন্তু রিয়াদ ভাই সংবাদ সম্মেলনে গিয়েছিলেন। ওখানে কিছু সময় বেশি গেছে এবং সংবাদ সম্মেলন শেষে তিনি ড্রেসিংরুমে যান।’

‘ড্রেসিংরুমে আমরা ফুটবল খেলায় মেতেছিলাম। তাইজুল হারতে চায় না, কিন্তু সবাই ওকে হারাতে চাচ্ছিল। তাইজুল আর মুশফিক ওয়ান-ওয়ান গেম খেলছিল, এতে কয়েক মিনিট দেরি হয়। এই ছোটখাটো বিষয়গুলোই শেষ পর্যন্ত আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।’

‘এর পর আমরা বাসে উঠি। পরিকল্পনা ছিল– নামাজ শেষ করে দলের সবাই হোটেলে ফিরব। এ জন্য শ্রী (দলের ভিডিও বিশ্লেষক শ্রীনিবাস চন্দ্রশেখর) ও সৌম্য সরকার আমাদের সঙ্গে গেছে। অনুশীলনটা ছিল ঐচ্ছিক, যারা প্র্যাকটিসে যায়নি তারা হোটেলে ছিল। যারা করতে চায় তারা মাঠে আসবে।’

‘আমি সব সময় বাঁ পাশের ছয় নম্বর আসনে বসি। মসজিদের কাছাকাছি পৌঁছালে আমার ডান পাশের সবাই জানালা দিয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করি। দেখলাম মেঝেতে একটা দেহ পড়ে আছে। আমরা ভেবেছিলাম সে মাতাল অথবা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।’

‘বাস এগিয়ে গিয়ে মসজিদের কাছাকাছি দাঁড়াল। কিন্তু সবার মনোযোগ ছিল মেঝেতে পড়ে থাকা দেহটি ঘিরে। এ অবস্থায় আরেকটি লোককে দেখলাম। রক্তমাখা শরীর, ধীরে ধীরে পড়ে যাচ্ছে। সবার মধ্যে ভয়টা তখনই দানা বেঁধে উঠতে শুরু করে।’

‘মসজিদের কাছাকাছি একটি গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় আমাদের বাস। আমরা দেখলাম, বাসচালক এক নারীর সঙ্গে কথা বলছেন, যিনি কাঁপছিলেন ও কাঁদছিলেন। তিনি বলছিলেন, গোলাগুলি হচ্ছে– ওখানে যেও না। ওখানে যেও না।’

‘বাসচালক বললেন, ওরা মসজিদে যাচ্ছে। তিনি (নারী) বললেন, না না মসজিদে যেও না। গোলাগুলি মসজিদে হচ্ছে। এর পর তিনি আবারও কাঁদতে শুরু করলেন। সবাই তার কথা শুনেছে ও দেখেছে। ভয়টা আরও বাড়ল। তখন মসজিদ থেকে আমরা মাত্র ২০ গজ দূরে। বাস থেকে নেমে মসজিদে ঢুকব আরকি। দেখলাম, মসজিদের আশপাশে বেশ কিছু রক্তমাখা শরীর পড়ে আছে।’

‘যখন আরও লাশ দেখলাম, বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কী করা উচিত। অনেকেই ভয়ে মাথা থেকে নামাজের টুপি খুলে ফেলল। মানে বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা ঘটছে। যারা পাঞ্জাবি পরেছিল, ওপরে জ্যাকেট পরে নিল। আর কী করার আছে? এর পর আমরা বাসের মেঝেতে শুয়ে পড়ি।’

‘এভাবে সাত-আট মিনিট কাটল। ঠিক কী ঘটছে তা বুঝতে পারছিলাম না তবে সহিংস কিছু যে ঘটছে, তা টের পেয়েছি। ভীষণ ভয় পেতে শুরু করি। আমরা বাসচালককে বললাম, এখান থেকে বের করুন। কিছু একটা করুন। কিন্তু তিনি নড়ছিলেন না। সবাই চিৎকার করে তাকে বললাম। আমিও চিৎকার করেছি। ওই ছয়-সাত মিনিট কোনো পুলিশ ছিল না।’’

‘হঠাৎ করেই পুলিশ এলো। ওদের বিশেষ বাহিনী যেভাবে ঝড়ের বেগে মসজিদে ঢুকল, আমরা ভাষাহীন হয়ে যাই। প্রায় অনুভূতিশূন্য অবস্থা। শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। রক্তমাখা শরীর নিয়ে আরও অনেকে বের হতে শুরু করে মসজিদ থেকে। তখন আর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। চিৎকার করতে শুরু করি ‘আমাদের যেতে দিন, যেতে দিন।’

‘কেউ একজন বলল, বাসে থাকলে আমরা বিপদে পড়ব। আমারও তাই মনে হলো– বাস থেকে বের হতে পারলে পালানোর সুযোগ পাব। বাসে আমরা সহজ লক্ষ্যবস্তু। কিন্তু যাব কোথায়? দুটি দরজাই বন্ধ।’

‘ঠিক সেই মুহূর্তে বাসচালক ১০ মিটারের মতো বাসটি এগিয়ে নেন। জানি না তিনি এই কাজটা কেন করলেন। আমরা তখন ভেঙে পড়েছি। সবাই প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছে। মাঝের দরজায় ধাক্কা ও লাথি মারছি। বাসচালক দরজা খুললেন।’

‘বাসটা তিনি (চালক) যখন সামনে নিচ্ছেন, তখন আপনাকে (প্রতিবেদককে) ফোন করেছিলাম। আপনি ভেবেছিলেন মজা করছি। কিন্তু আমি কতটা সিরিয়াস, তা বলা কিংবা বোঝানোর মতো অবস্থায় ছিলাম না।’

‘প্রায় আট মিনিট পর বাস থেকে শেষ পর্যন্ত নামা হলো। সবাই বলছিল, পার্ক দিয়ে দৌড় দিই। কেউ বলল, পার্কে আমরা সহজ লক্ষ্যে পরিণত হব। বন্দুকধারী যদি আমাদের দেখে গুলি করতে শুরু করে?’’

‘আমার কাছে যেটা সবচেয়ে ভয় লাগছিল, পুলিশ আমাদের দৌড়াতে দেখে কী ভাববে? এর মধ্যে দেখলাম আপনারা তিনজন (প্রতিবেদক মোহাম্মদ ইসাম, উৎপল শুভ্র ও মাজহারউদ্দিন) আসছেন। তখন বুঝতে পারিনি। কিন্তু কাল রাতে বুঝলাম, আপনারা কত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন।’

‘অনেক কম মানুষই এমন ঝুঁকি নেয়। ওই রকম পরিস্থিতিতে কাছের মানুষেরাও হয়তো আপনাদের মতো ভূমিকা নেয় না। আসলে আপনাদের দেখে কিছুটা শান্ত হই এবং হাঁটতে শুরু করি। কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর সবাই মাঠের দিকে দৌড়াতে শুরু করে।’

‘মৃত্যুকে নিজের চোখে দেখেছি। শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। এটি এমন কিছু যা আমরা সারা জীবনে ভুলতে পারব না। দলের সবারই এই এক কথা। সবার মুখে কিছুটা হাসি ফিরেছে ঠিকই কিন্তু ভেতরে-ভেতরে বিধ্বস্ত।’

‘আমরা হোটেলে ফিরে সোজা রিয়াদ ভাইয়ের কামরায় চলে যাই। বন্দুকধারীর ভিডিও দেখি। খেলোয়াড়েরা কাঁদতে শুরু করে। ড্রেসিংরুমে আমরা সবাই কেঁদেছি। একটা কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি, এই ঘটনা ভুলতে অনেক সময় লাগবে। পরিবারের সাহায্য লাগবে। চোখ বুজলেই দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে।’

‘কাল রাতে বেশিরভাগ ক্রিকেটার একসঙ্গে ঘুমিয়েছে। আমি ঘুমিয়েছি মিরাজ ও সোহেল ভাইয়ের সঙ্গে। স্বপ্নে দেখেছি, বাইকে করে ওরা গুলি করছে। বিমানবন্দরে আসার পথে আমরা একে অপরকে বলছিলাম– একটু এদিক-সেদিক হলেই আমরা নয়, লাশগুলো ঘরে ফিরত। মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যাপার।’

তথ্যসূত্র: ক্রিকইনফো

ঘটনাপ্রবাহ : নিউজিল্যান্ডে মসজিদে এলোপাতাড়ি গুলি

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত