‘এই সংকটে সহযোগিতা করুন, ভবিষ্যতে অ্যাথলেটরা দেশের জন্য জীবন দেবে’

  আল-মামুন ১৭ মে ২০২০, ২১:২৯:১২ | অনলাইন সংস্করণ

করোনাভাইরাসের এই সংকটমুহূর্তে দেশের ক্রীড়াঙ্গনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ শ্যূটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের সাধারণ সাম্পাদক ইন্তেখাবুল হামিদ অপু। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছে স্পোর্টস রিপোর্টার আল- মামুন

যুগান্তর: করোনার এ সংকটে কেমন আছেন?

ইন্তেখাবুল হামিদ অপু: আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমতে ভালোই আছি। আমি আমার পরিবারের সবাই ভালো আছে। লকডাউনে ঘরেই আছি, এভাবেই দিন যাচ্ছে।

যুগান্তর: করোনার সংক্রমণ এড়াতে আপনি নিজে কি করছেন?

ইন্তেখাবুল হামিদ অপু: সারা বিশ্বে করোনা পরিস্থিতি যেভাবে মেইনটেইন করছে আমরাও সেভাবে করছি। আমি অ্যাথলেটদের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের মাঝেও এই মেসেজটা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি, তারা যাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলে, পরিস্কার পরিছন্ন থাকে, যেভাবে সাবধানে থাকা যায়।

যুগান্তর: শ্যুটার যারা আছেন তাদের তো বাসায় প্রাকটিসের সুযোগ নেই..?

ইন্তেখাবুল হামিদ অপু: হ্যাঁ আপনারা জানেন, শ্যুটিং প্রাকটিস করতে হলে শ্যুটিংয়ের যে সরঞ্জাম আছে সেগুলো বাসায় নিয়ে যেতে হয়। যেহেতু আমাদের দেশে লাইসেন্সবিহীন অস্ত্র ঘরে রাখার কোনো বৈধতা নেই, অস্ত্র বাসায় রাখলে মামলা হয়ে যাবে। তাই চাইলেও শ্যুটিংয়ের সরঞ্জাম খেলোয়াড়রা বাসায় রাখতে পারবে না, বা ফেডারেশন থেকে নিয়ে যেতে পারবে না। তবে বডি ফিটনেস ঠিক রাখার জন্য তারা বাসায় এখন কিছু ব্যায়াম করে যেতে পারে।

অ্যাথলেটদের ফিটনেস ধরে রাখতে অনুশীলনের বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। যাতে বাসায় থেকে তারা অনুশীলন করে যেতে পারে। আপাতত তারা ডায়েট কন্ট্রোল করতে পারে। আরেকটা ব্যাপার হলো এখন বাসায় থাকাও কিন্তু অনেক বড় চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। এখন কোনো খেলা নেই, কোনো কিছু নেই। মাঠে তো খেলতেও যেতে পারবে না। বাসায় থেকেই ব্যক্তিগতভাবে অনুশীলন করে যেতে হবে।

যুগান্তর: ক্রিকেট-ফুটবলারদের চেয়েও কি শ্যুটারদের এখন স্কিল ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং?

ইন্তেখাবুল হামিদ অপু: হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। শ্যূটিংটা এমন একটা জিনিস যেমন সাঁতারু যতই ব্যায়াম করে কাজ হবে না, তাকে সুইপিমং পুলে নেমে সাঁতার কাটতে হবে। তা না হল তার পারফরম্যান্স কমে যায়। সুইমিংটা যেমন আমাদের শ্যুটিংটাও কিন্ত একই রকম। শ্যূটিং প্রাকটিস না করলে অবশ্যই পারফরম্যান্স কমে যাবে। করোনা পরবর্তীতে আবার শ্যুটিংটা কবে শুরু করতে পারি, এই প্রশিক্ষণটা টোটালি একটা ডিফেন্ড প্রশিক্ষণ হতে হবে। কারণ আমাদের যদি আগের অবস্থানে ফিরে যেতে হয়, কত দ্রুত ফিরে যেতে পারি সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

হয়তো কোভিড-১৯ সমস্যা কেটে গেলে বিভিন্ন ইন্টারন্যাশনাল প্রতিযোগিতাগুলো শুরু হবে। কারণ এখন তা পেন্ডিং হয়ে আছে। এই কমপিটিশনে অংশ নিয়ে আমরা সাধারণত যে স্কোরটা করি সেটা কিভাবে তুলে আনতে পারি, সেই চিন্তাই এখন করছি। অ্যাথলেটরা যখন ট্রেনিংয়ের মধ্যে থাকবে তখন তাদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট হয়ে যাবে। কিন্তু তারাতো একা একা বাসায় ট্রেনিং করতে পারবে না।

যুগান্তর: করোনায় আপনাদের কোনো টুর্নামেন্ট কি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে?

ইন্তেখাবুল হামিদ অপু: আমাদের যতো ধরনের ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্ট আছে সবইতো বন্ধ। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আমরা প্রথমবার বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে চেয়েছিলাম সেটাও করতে পারিনি, আমরা সেটা ডিলে করে রেখেছি। তবে আমার মনে হয় না সেটা আর করতে পারব। কারণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও অনেক টুর্নামেন্ট শুরু হবে তখন বিদেশিদের আমন্ত্রণ পাঠালেও তারা আসবে না।

যুগান্তর: করোনায় খেলাধুলা বন্ধ থাকায় ক্রিকেট-ফুটবলসহ অন্যান্য ফেডারেশন আর্থিকভাবে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে, আপনাদের কি আর্থিক কোনো ক্ষতি হয়েছে?

ইন্তেখাবুল হামিদ অপু: আর্থিকভাবে তো আমরা তেমন ক্ষতিগ্রস্ত না। মেইন জিনিস হলো আমাদের অ্যাথলেটদের যেভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত রেখেছিলাম, সেটা এখন ব্যাহত হয়েছে। আপনারা জানেন, আমরা কমনওয়েলথ গেমস এবং এসএ গেমসেও মেডেল পেয়েছি। আমাদের যারা হাই পারফর্মার রয়েছে- বাকি, শাকিল, অর্নব এরা বিভিন্ন টুর্নামেন্টে যেভাবে পারফর্ম করে আসছিল সেটা মনে হয় থেমে গেল, একটা বাধার সম্মুক্ষিণ হলাম।

ছেলেরা যেভাবে পারফর্ম করে ভালো একটা পজিশনে ছিল, এখন তারা হয়তো সেই আগের পজিশনে নেই। কারণ এটাতো একটা পারফরম্যান্সের ব্যাপার, প্রতিদিন প্রাকটিস করতে হয়, অনুশীলনের পেছনে লেগে থাকতে হয়। শুধু আমরা না, পৃথিবীর সব ফেডারেশনই এখন থমকে পড়েছে।

যুগান্তর: আপনাদের কোনো খেলোয়ার আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল হয়ে পড়েছে কি?

ইন্তেখাবুল হামিদ অপু: হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনি জানেন সারা পৃথিবীতে সব অ্যাথলেটদেরই টানাপোড়নের মধ্যে জীবন পার করতে হয়। ক্রিকেট, ফুটবলে যেমন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রিচ অ্যাথলেট আছে, শ্যূটিংয়ে রিচ (ধনী) অ্যাথলেট হয় না। কারণ এখানে স্পন্সর পাওয়া খুব মুশকিলের ব্যাপার। এটা ক্রিকেট আর ফুটবলের মতো জনপ্রিয় খেলা না, এটা হাইলি টেকনিক্যাল খেলা। এটা দর্শকভিত্তিক খেলা না, যারা শুধু টেকনিক বুঝে একমাত্র তারাই শ্যূটিংয়ে আসে। এজন্যই বললাম আমাদের অ্যাথলেটরা অতো ধনী না।

একজন ক্রিকেটার হলে তার স্বপ্ন পূরণ হয়ে যায়, তার লাইফ পুরো চেঞ্জ হয়ে যায়। আমাদের কোনো অ্যাথলেট যদি দেশের জন্য পাঁচটা গোল্ড মেডেলও আনে তারপর তার লাইফ সেটেল হয় না। সো এই জিনিসটা শ্যূটিংয়ের জন্য খুবই আফসোসের ব্যাপার। এই দিক থেকে শ্যূটার এবং ফেডারেশন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তবে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে প্রায় এক হাজার অসহায় অ্যাথলেটদেরকে মাসিক সম্মানী দেবেন।

যুগান্তর: আমিই ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর ইন্টারভিউটা নিয়েছিলাম, তিনি বলেছেন মুক্তিযোদ্ধা এবং বয়স্কদের মতো অ্যাথলেটদেরও ভাতার সিস্টেম চালু করবেন, আপনার ফেডারেশনে যারা আর্থিকভাবে দুর্বল তাদের জন্য মন্ত্রীর কাছে কী প্রত্যাশা থাকবে?

ইন্তেখাবুল হামিদ অপু: মন্ত্রী মহোদয় যা করছেন তা অসাধারণ, জাহিদ আহসান রাসেল ভাই খুব ভালো মনের মানুষ। আমি শ্যুটিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গত ৮ বছর ধরে আছি, আমিতো অনেক মন্ত্রী দেখেছি, তবে ওনার মতো এত ভালো মনের মানুষ আগে দেখিনি। সত্যিই উনি প্রশংসা করার মতো কাজ করছেন। আমাদের অ্যাথলেটদের যদি উনি সহযোগিতা করেন তাহলে খুব উপকৃত হব। আমরা অতীতে অবশ্য আমাদের সাবেক অ্যাথলেটদের জন্য মন্ত্রণলয় থেকে কোনো সাহায্য পাইনি, আমরা হয়তো মন্ত্রণালয়ের ওই তালিকায় নেই।

যুগান্তর: শ্যূটিংয়ে যারা পদক জিতে দেশর সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখেছেন তাদের জন্য ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে আপনাদের কী চাওয়া থাকবে?

ইন্তেখাবুল হামিদ অপু: অবশ্যই আমাদের তো চাওয়া থাকবেই। যেহেতু উনি নিজ থেকেই আপনাদের যুগান্তরকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অ্যাথলেটদের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা বলেছেন, শুধু দুস্থ্য কেন সব অ্যাথলেটকেই যদি সহযোগিতা করেন তাহলে মন্ত্রীর জন্যও একটা ইতিহাস হয়ে থাকবে। তাছাড়া করোনার এই কঠিন সময়ে যদি হেল্প না করেন তাহলে আর কবে করবেন! কারণ এই হেল্পটাইতো মানুষের সারা জীবন মনে থাকবে। এখানে পাঁচ হাজার বা দশ হাজার টাকা দেক, সেটা কোনো বিষয় না বেঁচে থাকাটাই বড় চ্যালেঞ্জের ব্যাপার।

অনেক গরীব অ্যাথলেট আছে, হয়তো তাদের ঘরে ৫ থেকে ৬টা মেডেলও আছে, কিন্তু তার কাছে কোনো টাকা নেই। আমরা আগে শুনেছি, অ্যাথলেটরা মেডেল বিক্রি করে মায়ের চিকিৎসা করাচ্ছেন। অনেক তারকা প্লেয়ার আছে যাদের পকেটে পাঁচ টাকাও নেই। তাদেরকে যদি এই সংকটে একটু সহযোগিতা করা যায়, আমার মনে হয় তারা ভবিষ্যতে দেশের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে তাদের জীবন দিয়ে দেবে।

যুগান্তর: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ইন্তেখাবুল হামিদ অপু: আপনাকেও ধন্যবদ, ভালো থাকবেন।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত