ঘুমের ঘোরে ফুটবল খেলে পা ভাঙ্গার কথা এখনও মনে পড়ে

  রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে ০৪ জুলাই ২০১৮, ১৮:০১ | অনলাইন সংস্করণ

ঘুমের ঘোরে ফুটবল খেলে পা ভাঙ্গার কথা এখনও মনে পড়ে
ঘুমের ঘোরে ফুটবল খেলে পা ভাঙ্গার কথা এখনও মনে পড়ে

আমার ছোটমামা জাহাঙ্গীর কবীর খেলাধুলা পছন্দ করেন। তবে তিনি নিজে কোনদিন কিছু খেলেছেন বলে আমার জানা নেই। ১৯৮২ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করা কালীন সময়ে মামা সুইডেনে “সামার জব” করতে আসতেন।

মামা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ সালে এমএসসি শেষ করে ১৯৮৪ সালে গেস্ট স্টুডেন্ট হিসেবে সুইডেনে পড়তে আসেন এবং লেখাপড়া শেষে তিনি স্থায়ী ভাবে সুইডেনেই আছেন।

মামা রাজনীতির সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই জড়িত। তাই খেলাধুলা করার সুযোগ মনে হয় হয়ে ওঠেনি। তবে খেলা দেখা বা খেলার ব্যাপারে সাহায্য করা এবং মন-প্রাণ দিয়ে সময় দেওয়া ও খেলা উপভোগ করা তাঁর বহু দিনের শখ। ঘটনাটা হবে ১৯৮৬ সালের, বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা চলছে। মামা, আমি স্টকহোমে “সামার জব” করছি এবং সময় করে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখছি। ম্যারাডোনা পৃথিবীর সব মানুষের পুরো মনের জায়গাটা তখন দখল করে নিয়েছেন।

আমার মামাও তাঁর ভীষণ ভক্ত। সেদিন খেলা দেখছি সবাই এক হোটেলে বসে, হোটেলের নাম জেরুম। খেলা শেষে সবাই যার যার মত করে ঘুমোতে গেলো। সকালেই আবার কাজ।

মামা আর আমি এক জায়গাতেই কাজ করি। কিন্তু মামা কাজে আসেননি, ব্যাপার কি! ফোন করলে তিনি বললেন “বাবা, আমি হাসপাতালে ভর্তি আছি। ডান পায়ে ব্যান্ডেজ করেছে। চলাফেরা করা কয়েক দিনের জন্য বন্ধ”।

কারণ কী জানতে চাইলাম? উনি বললেন “একটি বল আমাকে ম্যারাডোনা পাস দিলে আমি গোলে কিক করি। হঠাৎ পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা। জ্ঞান ফিরে পেলে দেখি বইয়ের টেবিলসহ বই-পুস্তক সব উল্টে পড়েছে আমার ওপর, সে অবস্থায় তাড়াতাড়ি অ্যাবুলেন্সে ফোন করলে তারা আমাকে হাসপাতালের নিয়ে আসে”।

মামা স্বপ্নে ফুটবল খেলা শুরু করায় তাঁর সেদিন সেই করুণ পরিনতি হয়েছিল। ঘুমের ঘোরে ফুটবল খেলে পা ভাঙ্গার সেই কথা মনে পড়ে গেলো অনেকদিন পরে।

এইতো সেদিনের কথা, জুন মাস, ২০১৮ সাল। ঈদের দিন, ছেলে-মেয়ে স্পেনের অ্যালসে টেনিস একাডেমিতে আমি এবং মারিয়া বাসাতে সঙ্গে ভাগ্নী মোনিকা।

এদিকে মামী ফোন করে বলছেন তাঁদের বাড়িতে আসতে, গেলাম সেই মামা বাড়িতে ঈদের দিনে। এবারের ঈদ কিছুটা ভিন্ন ধরনের, চলছে ঈদের দিনে ২০১৮ বিশ্বকাপ ফুটবল। আমাদের আগমনে দরজার সামনে সবাই এসে হাজির।

ঈদের আলিঙ্গন বা কোলাকুলি হচ্ছে। মামা বসে দিব্বি ফুটবল খেলায় মগ্ন! আমরা যে ঢুকলাম তিনি তা খেয়াল করলেন না! খেলা চলছে স্পেনের সঙ্গে পর্তুগালের।

মামার বাড়িতে অনেক চেনা অচেনা মেহেমানে ভরা, তার মধ্যে সবচেয়ে ছোট্টে মেহেমানটি হবে বয়স আনুমানিক ৩-৪ মাস। বেশ আনন্দের সঙ্গে চলছে ঈদের দিনে।

মামীদের আদর যত্ন এদিকে ফুটবল খেলা, বেশ লাগছে। হঠাৎ ভয়ঙ্কর শব্দ “গোল“। সঙ্গে সঙ্গে সেই ছোট্ট বাচ্চাটির কী এক মর্মান্তিক কাঁন্না, ভয়ে বেচারা কাঁপছে। তাকে সান্ত্বনা দিতে তার বাবা-মার সঙ্গে আরো অনেকে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

মামা মনে হলো এই প্রথম আমাদের দেখলেন। তাড়াতাড়ি উঠে সবার সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ থেকে শুরু করে বেশ লজ্জিত অনুভব করা এবং ক্ষমা চাইতেও শুরু করলেন।

যদিও আমার কাছে মামার ফুটবল খেলার এ ধরনের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। পা ভাঙ্গা থেকে শুরু করে একবার এক পাকিস্তানিকে ধোলায় দেওয়া স্টকহোমে খেলার মধ্যে ইত্যাদি স্মরণীয় কাজ রয়েছে তাঁর।

স্টকহোমে ওই পাকিস্তানি কিছু খারাপ মন্তব্য করেছিল সেদিন বাংলাদেশেকে নিয়ে খেলাধুলার ওপর। আবার আজ ছোট্ট একটি মেহমানের জীবনের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা নতুন কিছু নয়, শুধু পুনরাবৃত্তি মাত্র।

আমার ভাবনা আজ এইক্ষণে, কেনো মামার মত কোটি কোটি লোক হঠাৎ করে “হেয়ার অ্যান্ড নাও কনসেপ্টে” এমনভাবে জড়িয়ে পড়েন ফুটবল খেলার জগতে?

লেবু যারা একবার খেয়েছে পৃথিবীর যে কোন জায়গা থেকে যদি বলি লেবু চিপে রস বের করছি এটা যেই শুনুক, দেখুক বা পড়ুক না কেন, জিভ থেকে পানি বা লালার সৃস্টি হবেই। কী জাদু আছে এই লেবুর সাথে মানুষের ইন্ট্রাকশনের?

প্রকৃতি থেকে দেখেছি এবং শিখেছি ফুল থেকে ফল হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে অনুভূতির সঙ্গে অনুভব করছি ভাললাগা থেকে ভালবাসা হয়। ফুটবলের সঙ্গে মানবজাতির তেমন একটি ইন্ট্রাকশন যা সত্যি ভাববার বিষয়!

হোক না সে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার লক্ষ্য একটাই তা হলো “গোল” এবং সেই মুহুর্তটি। আমাদের ধানে, জ্ঞানে, মনে ও প্রাণে হঠাৎ এই ফুটবল যেন “হেয়ার অ্যান্ড নাও কনসেপ্টের” সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে জীবনের সমস্ত কিছুকে স্তব্ধ করে দেয় ক্ষনিকের জন্য।

অথচ শিক্ষাঙ্গনে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ও বেশি সময় ব্যয় করা সত্ত্বেও পারছি কি এমন একটি ইন্ট্রাকশন তৈরি করতে?

ঘরে ঘরে শিক্ষা দান করা, বাবা-মার ২৪ ঘন্টা মাথার ঘাম পায়ে ফেলা, পুঁথিগত বিদ্যার সমন্বয় তৈরি করা। ভুরি ভুরি শিক্ষাঙ্গন তৈরি করা হয়েছে। অথচ পারছি কি ফুটবলের মত ১০০% জড়িত হতে বা করতে একজন শিক্ষক বা শিক্ষায়ত্রীকে সুশিক্ষার সাথে?

খেলার সঙ্গে মানবজাতির যে ইন্ট্রাকশন তৈরি হয়েছে তেমনটি কেন হচ্ছে না শিক্ষার সঙ্গে? কী কারণ থাকতে পারে তৈরি না হবার পেছনে? হচ্ছে না কেন শিক্ষার সঙ্গে এমনটি আবেগময় ভাললাগা বা ভালবাসা?

আমরা কি জানি কীভাবে ভাল লাগাকে ভালবাসায় পরিণত করা যায়? জানতে হলে শিখতে হবে ভাল লাগা থেকে ভালবাসা পৌছানোর উপায়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা জোর করে কিছু করাতে যাওয়া হতে পারে কি এর জন্য দায়ী?

যে পরিমাণ সময় ব্যয় করছে মানবজাতি পুঁথিগত শিক্ষার ওপর তার ৫% মত সময় ব্যয় করা হয় খেলাধুলার ওপর। পুঁথিগত বিদ্যার ওপর সময়টির বেশির ভাগই হচ্ছে ইচ্ছার বিরুদ্ধে।

খুব কম সময়ই বাবা-মা বলে থাকেন তাঁদের ছেলে-মেয়েকে “বাবা যাও তোমার বন্ধু বা বান্ধবীর সঙ্গে গিয়ে খেল” বরং বলা হয় খেলাধুলা বাদ, যাও বই নিয়ে বস!

খেলাধুলা যখন বাদই হবে তবে কেন এই খেলাধুলা এত বড় প্রভাব বিস্তার করছে মানবজাতির ওপর? তাহলে কি আমরা জোর করে ভাললাগা বা ভালবাসার ওপর শিক্ষা প্রয়োগ করছি?

নাকি ভাললাগা থেকে ভালবাসা হয় এই ব্যপারে সঠিক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে সক্ষম হচ্ছি না? নাকি আমরা আন্দাজের ওপর আমাদের অণুকরন বা অণুসরন করছি? আমাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ কর্তৃপক্ষ কি এমন ভাবে ভাবছেন নতুন প্রজন্মকে নিয়ে?

ফুটবল যদি পারে ক্রীড়ার জগতে পরিবর্তন আনতে তাহলে কেনো পারবে না বাংলাদেশ তৈরি করতে একটি ফুটবল টিম? বিশেষায়িত স্পোর্টস প্রশিক্ষণ একাডেমি দিতে পারে এর সমাধান।

আর তা পেতে হলে সমন্বয়ের সঙ্গে সম্প্রীতির মিলন ঘটাতে হবে। সুশিক্ষার সঙ্গে স্পোর্টসের ইন্ট্রাকশন তৈরি করতে হবে এবং তখনই সম্ভব হবে মাথার চিন্তাকে পায়ে লাগানো ফুটবলের জগতে।

যে খেলা মাথার চিন্তাকে পায়ে লাগিয়ে বিনোদন দিতে পারে সে খেলার জন্য কি পারবে না বাংলার মানুষ ভাবতে নতুন করে?

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন অনুকরণ ও অনুসরণের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে পারে ভাললাগা থেকে ভালবাসা, বিনিময়ে দিতে পারে জাতিকে একটি বিশ্বকাপ ফুটবল টিম।

শুধু লেখাপড়া নয় সুশিক্ষার জন্য একই সঙ্গে দরকার খেলাধুলা করা। খেলাধুলা জাতির মধ্যে ঐক্য, নৈতিকতা, হৃদ্যতা, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং স্বাধীন দেশের সৎ নাগরিক হতে সাহায্য করবে।

রহমান মৃধা, পরিচালক ও পরামর্শক, সুইডেন থেকে, [email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter