ফ্রান্সের অঘটনের খলনায়ক ব্রুনো মেটসো!

  ডা. মো. সাঈদ এনাম ০৭ জুলাই ২০১৮, ২২:৪৮ | অনলাইন সংস্করণ

সেনেগালের সুদর্শন কোচ ব্রুনো মেটসো।
সেনেগালের সাবেক কোচ ব্রুনো মেটসো। ছবি: মিরর

বিশ্বকাপ ফুটবলের অনেক ম্যাচ রয়েছে যা নিয়ে দর্শকরা নানান প্রশ্ন তুলেন। সেরকম একটি ম্যাচ হলো ১৯৭৮ এর বিশ্বকাপ।

গ্রুপ পদ্ধতির সে খেলায় একই গ্রুপে ছিলো ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। ফাইনালের উঠার আগে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা উভয়ের পয়েন্ট দাঁড়ায় ৩। ফাইনালে ঊঠতে আর্জেন্টিনার শেষ ম্যাচটি ছিল পেরুর সঙ্গে। আর ব্রাজিলের ছিল পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে।

দু'টো ম্যাচ একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবার কথা থাকলেও তা হয়নি। আর্জেন্টিনার ম্যাচের ঘণ্টা তিনেক আগে রহস্যময় কারণে ব্রাজিলের ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়। ব্রাজিল পোল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারায় ফলাফল দাঁড়ায় ফাইনালে যেতে হলে শক্তিশালী পেরুকে আর্জেন্টিনা কমপক্ষে ৫ গোলের ব্যবধানে হারাতে হবে।

পেরু তখন লাতিন আমেরিকার ফুটবলে তৃতীয় শক্তিধর দেশ। আর্জেন্টিনার কাছে তাদের ৫ গোল খাওয়ার প্রশ্নই আসে না। এদিকে পোল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারানোর পর ব্রাজিলের অনেক জায়গায় শুরু হয়ে যায় ফাইনালে ওঠার উৎসব উদযাপন।

কিন্তু আর্জেন্টিনা পেরুর ম্যাচে ঘটে যায় অকল্পনীয় ঘটনা। পেরু ঠিকই আর্জেন্টিনার কাছে ৬ গোল খেয়ে হেরে বসে। আর সে মোতাবেক পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত চলে যায় আর্জেন্টিনা। ব্রাজিল ছিটকে যায়।

ফাইনালে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী নেদারল্যান্ড। সেখানেও তারা হারায় নেদারল্যান্ডকে। এদিকে সব হারিয়ে অপরাজিত ব্রাজিল হয় তৃতীয়।

যাইহোক ফিরে আসি ৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে। ফ্রান্স ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে কাপ তাদের ঘরে তুলে বেশ উৎসব নিয়ে। অপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকে ব্রাজিল। সময় যায়, চার বছর পর আবার আসে বিশ্বকাপ ২০০২।

ফ্রান্স এবারও টপ ফেভারিট। অনেকের ধারণা, ফ্রান্স বিশ্বকাপ তাদের ঘরে তুলবে। তাদেরও তেমন প্রস্তুতি। ওদিকে ব্রাজিলের ৩-০ গোলে হারার প্রতিশোধ নেবার পালা।

শুরু হয় ২০০২ বিশ্বকাপ। প্রথম রাউন্ডে প্রথম খেলা ফ্রান্স ও সেনেগাল। দুর্বল প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত সেনেগাল প্রথমবারের মতো খেলতে আসা আনকোরা এক টিম। ফ্রান্সের সবাই উচ্ছ্বসিত। কত গোলের ব্যবধানে জিতব ফ্রান্স সমর্থকরা কেবল সে হিসেবেই মগ্ন।

ম্যাচের আগে দেখা গেল নবাগত খেলোয়াড়দের কিছুটা ভীত সন্ত্রস্ত। কেবল একজন ছাড়া। তিনি হলেন তাদের কোচ ব্রুনো মেটসো।

ফ্রান্স তার চিরাচরিত ছন্দে আক্রমণের পর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একি! সেনেগালের খেলোয়াড়রা শক্ত ডিফেন্স গড়ে সব প্রতিহত করে দিচ্ছে একে একে।

শুধু তাই নয় মাঝেমধ্যে সাইড লাইনে বসে থাকা তাদের কোচের ইশারা ইঙ্গিত আর সাহসী সমর্থনে পাল্টা আক্রমণেও যাচ্ছে তারা।

কোচের আসনে হিসেব নিকেশ এ চরম ব্যস্ত বাবরি চুলওয়ালা। অনেকটা খেয়ালি, সেনেগালের সুদর্শন কোচ ব্রুনো মেটসো। তার চোখেমুখে নেই ভয়। তীক্ষ্ণভাবে ফ্রান্সের আক্রমণ অবলোকন করছেন। আর সময় সময় চিৎকার করে বা ইশারা করে তার খেলোয়াড়দের নির্দেশনা দিয়েই যাচ্ছেন।

সুযোগ পেলে কখনো পিঠ চাপড়ে মনোবলও চাঙ্গা করে দিচ্ছেন। যেন তিনি বলছেন, ‘এগিয়ে যাও সিংহের শাবকরা, তোমাদের হারাবার কিছু নেই। বিশ্বকাপে তোমরা নতুন দল।’

শেষ মুহূর্তে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে দেয় সেনেগাল। সেনেগালের জন্যে এ জয় যেনো বিশ্বকাপ জয়। দারুণভাবে উদ্বেলিত হয় তারা।

আর এদিকে একটা নতুন টিমের সাথে লজ্জাজনক পরাজয়ে ফেভারিট ও সাবেক চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের খেলোওয়াড়রা নিদারুণ অপমানিত, হতাশ বটে।

এ জয়ে সেনেগালকে নিয়ে মেতে উঠলো বিশ্ব মিডিয়া। জয়ের নায়ক ব্রুনো মেটসোকে নিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যম বিভিন্ন স্টোরি বা প্রকাশ করে।

সেনেগালের খেলার ছন্দে অনেকেই অভিভূত। আমরা তখন ঢাকা মেডিকেলে ইন্টার্ন করছি। সবাই খেলাটি দেখছিলাম, আমরাও অনেকেই ছিলাম তখন বিশ্বকাপের নতুন মুখ সেনেগালের পক্ষে।

যাইহোক, মেটসোর সেনেগাল ফ্রান্স, সুইডেন, ডেনমার্ক উরুগুয়ে এসব ঝানু ঝানু টিমকে পিছনে ফেলে অঘটনের পর অঘটন ঘটিয়ে একেবারে ২০০২ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে।

সেনেগালের এ কৃতিত্বের মূল নায়ক হলেন তাদের কোচ ঝাকড়া চুলের কবি,দার্শনিক ও কোচ ব্রুনো মেটসো। আর ওদিকে দুর্ভাগ্য তাড়া করা ফ্রান্স সেনেগালের সঙ্গে হেরে মনোবল হারিয়ে প্রথম রাউন্ডেই বিদায়।

কে এই ব্রুনো মেটসো?

সেনেগালের কোচ ব্রুনো মেটসো ছিলেন মূলত ফ্রান্সের এক কালের খেলোয়াড়। পরে তিনি ফ্রান্সের জাতীয় ও বিভিন্ন ক্লাব টিমের কোচের দায়িত্ব পালন করেন। অনেকটা বনিবনা না হওয়ায় তিনি চলে আসেন সেনেগালে। দায়িত্ব নেন সেনেগালের জাতীয় টিমের। দায়িত্ব নিয়েই সবাইকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন, সেনেগালকে তিনি বিশ্বকাপে নিয়ে যাবেন। সেনেগালবাসীর কাছে তা স্বপ্নের মতোই মনে হয়।

সবাই ভাবলো এ স্বপ্ন সত্যি হবার নয়। কিন্তু না, ব্রুনো মেটসো সেনেগালের নতুন অল্প বয়সী সব খেলোয়াড় দের নিয়ে সাজালেন তার মিশন।

মাত্র দু বছরের মাথায় অবিশ্বাস্যভাবে তিনি সেনেগালকে নিয়ে গেলেন আফ্রিকান নেশনস কাপের ফাইনালে। আর ২০০২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলে। ব্রুনো মেটসো হয়ে উঠলেন সেনেগালের জাতীয় বীর।

সেনেগালের নাগরিকত্ব ও জাতীয় বীরের মর্যাদা

সেনেগালের প্রেসিডেন্ট ব্রুনো মেটসোকে নাগরিকত্ব দিলেন। দিলেন জাতীয় বীরের মর্যাদা। সেনেগালের আপামর জনসাধারনের অপার ভালোবাসায় সিক্ত হলেন মেটসো।

এরই মধ্যে কবি, দার্শনিক ও কোচের প্রেমে পড়ে যান সেনেগালের এক সুন্দরী তরুণী মডেল। মেটসো ও অবশেষে সাড়া দিলেন তার প্রেমে। তারা পরস্পর ভালোবেসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

ইসলাম ধর্ম গ্রহণ

এত কিছু ঘটার আগ থেকেই কবি সাহিত্যিক, দার্শনিক ও কোচ মেটসো গোপনে ইসলাম ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করতে থাকেন। অবশেষে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। নাম বদলে রাখেন আব্দুল করিম মেটসো।

বেশ ক'বছর সেনেগাল মিশন শেষ করে এরপর মেটসো দায়িত্ব নেন কাতার আরব আমিরাত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের নামিদামী অনেক ক্লাব ফুটবল টিমের। সবক্ষেত্রেই মেটসো সফলতার সাক্ষর রাখেন সে সময়ের সেরা কোচ মেটসো।

বুদ্ধির খেলা ফুটবল

মেটসো সব সময় একটি কথাই বলতেন, ফুটবল হলো বুদ্ধির খেলা,শক্তির নয়। মাথা (বুদ্ধি) দিয়ে পা কে ব্যবহার করেই জয় ছিনিয়ে আনতে হয়। তাছাড়া তিনি তার অসাধারণ সম্মোহনী ক্ষমতা দিয়ে প্লেয়ারদের মনোবল চাংগা করতে পারতেন অদ্ভুতভাবে, সবাই মোটিভেশন করে অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে নিয়ে যাওয়ায় পারদর্শী ছিলেন তিনি।

মেটসোর সাফল্যের রহস্য

খেলার আগে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সব খেলার ভিডিও ফুটেজ নিয়ে বসতেন তিনি সব প্লেয়ারের সঙ্গে। দেখিয়ে দিতেন প্রতিপক্ষের প্রত্যকটি খেলোয়াড়ের দুর্বল দিকগুলো। আর কিভাবে সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা যায় তাই বাতলে দিতেন তিনি।

মেটসোর শেষ দিনগুলো

ব্রনোমেটসো ২০১৩ সালে মারা যান ক্যন্সারে। মৃত্যুর আগের কয়েকটা দিন তিনি তার ফ্রান্সের নিজ গ্রামের অধিবাসীদের সঙ্গে কাটানোর অভিপ্রায় হয়। যার ফলে তিনি তার স্ত্রী তিন পুত্র কন্যা সন্তানসহ ফ্রান্সের জন্ম ও বেড়ে ওঠার গ্রামে কিছুদিন বসবাস করেন।

মৃত্যুর পর আব্দুল করিম মেটসোকে সমাহিত করা হয় সেনেগালে। সেনেগালে প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, সচিব, ফুটবল ফেডারেশনের সব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ হাজার হাজার সেনেগালবাসী তার জানাযা ও দাফন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন।তার চলে যাওয়াকে কেউই মানতে পারছিলেন না। অনেকের চোখের কোণে ছিল তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার অশ্রু! লেখক: ডা. মো. সাঈদ এনাম

সাইকিয়াট্রিস্ট ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও প প কর্মকর্তা সিলেট।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter