ক্রিকেট ঠেকাতে গিয়ে ফুটবল নিজেই জনপ্রিয়তা হারিয়েছে

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ১৭:২৯ | অনলাইন সংস্করণ

  আল-মামুন

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি

একটা সময়ে দেশের জনপ্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। এই ফুটবল খেলা ঘিরেই একত্র হতেন দেশের ক্রীড়ামোদী মানুষ। ফুটবলের জোয়ারে ভাটা পড়ার আশঙ্কা থেকেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে ক্রিকেটের প্রচলনে। অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে ক্রিকেটারদের। এমনও হয়েছে ক্রিকেট মাঠের উইকেট শাবল দিয়ে খুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ঠেকাতে গিয়ে ফুটবল নিজেই এখন পথ হারিয়ে অন্ধকারের হাবুডুবু খাচ্ছে।

ক্রিকেটের সঙ্গে এমন বিমাতাসুলভ আচরণ, এ দেশে ক্রিকেটে প্রচার এবং প্রসারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যুগান্তর অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বিসিবির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকা ক্রিকেটের এই অন্তপ্রাণ মানুষটির একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল-মামুন

যুগান্তর : এ দেশের ক্রিকেটের ইতিহাস-ঐতিহ্যজুড়েই রয়েছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম। বঙ্গবন্ধু থেকে ক্রিকেট মিরপুরে চলে আসার ইতিহাস যদি বলেন।
 

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি : বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম যা আগে ঢাকা স্টেডিয়াম হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৫০ সালের দিকে ঢাকা স্টেডিয়ামের কাজ শুরু হয়। এই স্টেডিয়ামকে ক্রিকেটের আদলে তৈরি করা হয়। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের স্ট্র্যাকচার দেখলেই তা বোঝা যায়। এটি ক্রিকেটের জন্য আদর্শ ভেন্যু। এখানকার ড্রেসিংরুম এমনভাবে করা, যেখানে বসে থেকে ভালোভাবে খেলা দেখা যায়।  বোলারদের গতি নির্ণয়সহ ভ্যারিয়েশন লক্ষ করা যায়। দেশ বিভাজনের আগে যখন পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচ খেলা শুরু করে, তখন থেকেই এই স্টেডিয়ামের কাজ শুরু হয়। তাছাড়া পাকিস্তানের প্রথম টেস্ট ম্যাচটিও ঢাকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। আরেকটি মজার বিষয় হলো- পাকিস্তান ও  বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট ম্যাচ ঢাকা স্টেডিয়ামে হয়। সে হিসেবে ঢাকা স্টেডিয়ামকে হোম অব ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে ভাবা হতো। এখানে অনেক খেলা হয়েছে, অনেক ইতিহাস আছে। আরেকটি  বিষয় হলো- যে কোনো দেশের টেস্ট ম্যাচ, তাদের নিজস্ব ভেন্যুতেই হয়। কিন্তু নিরপেক্ষ টেস্ট ভেন্যু হিসেবে ঢাকা স্টেডিয়ামই প্রথম হয়। সে হিসেবে এটার ঐতিহ্য এটার তুলনা অন্য কোনো ভেন্যুর সঙ্গে হয় না। এটার সঙ্গে আমাদের অনেক ইতিহাস অনেক আবেগ জড়িত আছে। সেই হিসেবে আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুতে ক্রিকেট স্টেডিয়াম থাকলে ভালো হতো। ২০০০-০১ মৌসুমে দেশের রাজনীতির পটপরিবর্তন হলে তখন ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচিত কমিটিকে সরিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে ক্রিকেট বোর্ডকে অবৈধভাবে দখল করে নেয় একটি গ্রুপ। তারা চায়নি দেশের আইকন একটি খেলার নামের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নামটা প্রচার হোক। আর মিরপুরে যে ফুটবল মাঠ ছিল, সেটার অবয়ব, সেটার আদল। সব কিছুই ছিল ফুটবলের আদলে গড়া। ফুটবল খেলার জন্যই মূলত মিরপুর স্টেডিয়াম তৈরি করা হয়। প্রতিনিয়ত ক্রিকেটের উন্নতিতে মুগ্ধ কিছু কর্মকর্তার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ক্রিকেটের জন্য আলাদা একটা ভেন্যু তৈরির প্রস্তাবনা ওঠে।

যুগান্তর: মিরপুর স্টেডিয়ামকে কেন ফুটবল ভেন্যু করা হলো না?
 

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি: ওই যে বলছিলাম ক্রিকেটের কথা যতবারই লেখা হবে ততবার বঙ্গবন্ধুর নাম আসবে; এটা কারো কারো সহ্য হয়নি। যে কারণে মিরপুরে ক্রিকেটকে নিয়ে আসা। মিরপুরের ড্রেসিংরুম ফুটবলারদের কথা চিন্তা করেই করা হয়েছে। মাটির সঙ্গে মেশানো ড্রেসিংরুম। ক্রিকেটের ড্রেসিংরুম একটু ওপরে থাকে। যাতে করে প্লেয়াররা বসে বলের গতিসহ বলের মুভমেন্ট যেন বুঝতে পারেন। উদ্ভট একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্রিকেটকে নিয়ে আসা হলো মিরপুর। যদিও এটা নিয়ে পরবর্তীতে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করার চেষ্টাও কেউ কেউ করেছেন। এটা কোনো পারপাসই সার্ভ হয়নি। আমি তো মনে করি মিরপুর না হয়ে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা হলে আমরা আরো ভালো করতাম। ক্রিকেটের আদি টেস্ট ভেন্যু হিসেবে বিশ্বের সাবেক তারকা ক্রিকেটাররা বঙ্গবন্ধুকেই চেনে। সব কিছু মিলিয়ে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের আলাদা একটা গুরুত্ব, আলাদা ঐতিহ্য আছে। সেই ইতিহাস ম্লান হয়ে যায় মিরপুরে ক্রিকেট ভেন্যু চলে যাওয়ায়। এটা আমাদের ক্রিকেটের সঙ্গে বড় ধরনের একটা অন্যায় হয়েছে। এটা ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

যুগান্তর: কীভাবে শেরেবাংলা নামকরণ করা হলো?
 

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি: বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম তো ঢাকা স্টেডিয়াম হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে সম্ভবত এরশাদ সরকারের আমলে এটার নাম দেয়া হয় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম। আর মিরপুর স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয় শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের নামে। তিনি দেশের জন্য অসামান্য অবদান রেখেছেন। এটা ক্রিকেট বোর্ডের দ্বারা নাম করা হয়নি। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মাধ্যমে হয়েছে।

যুগান্তর: যখন মিরপুরে ফুটবল লিগ হতো তখনও কি শেরেবাংলা নামে পরিচিত ছিল?
 

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি: না, আমি তো বললাম একসময় এটা মিরপুর স্টেডিয়াম নামে ছিল। সম্ভবত নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা স্টেডিয়ামের পরিবর্তে নাম রাখা হয় বঙ্গবন্ধু। মিরপুরও একইভাবে নামকরণ করা হয়।

যুগান্তর: ক্রিকেটের জোয়ার শুরুর পরই কি আলাদা ভেন্যু করা হয়?
 

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি: ঢাকা স্টেডিয়াম একটা সময়ে হকি খেলাও হয়েছে। এখানে ন্যাশনাল অলিম্পিকও হয়েছে। অ্যাথলেটিকস হয়েছে। তখন আর কোনো মাঠ ছিল না। তবে এটা ভুললে চলবে না; ঢাকা স্টেডিয়ামটা ছিল ক্রিকেটের জন্য। স্বাভাবিকভাবে বিবেচনা করলে তা বুঝা যায়। আমরা যেহেতু বিভিন্ন ইভেন্টে উন্নতি করেছি সেহেতু প্রত্যেকটি খেলার জন্য আলাদা ভেন্যু থাকা আবশ্যক। সেই হিসেবে ক্রিকেটের জন্য মিরপুরকে প্রধান ভেন্যু হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আমার ধারণা তখন ফুটবলসংশ্লিষ্ট যারা ছিলেন তারা ক্রিকেটের উন্নতি সেভাবে নিতে পারেননি। আমাদের এখানে ক্রিকেটের সিজনে অনেক দেনদরবার করে ক্রিকেট খেলাগুলো চালাতে হতো। কেউ কেউ হয়তো ক্রিকেটের উন্নতি দেখতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম থেকে ক্রিকেট ভেন্যু মিরপুরে নিয়ে আসার পেছনে হয়তো কারও কারও ইন্ধন থাকতে পারে।

যুগান্তর: একটা সময়ে তো মিরপুর স্টেডিয়ামে বড় বড় ফুটবল ম্যাচ হতো...
 

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি: কাজী সালাহউদ্দিনের (জাতীয় দলের সাবেক তারকা ফুটবলার) একটা ফার্মের মাধ্যমে মিরপুর স্টেডিয়াম তৈরির কাজ শুরু হয়। তখন আমরা জানতাম যে এখানে ফুটবল স্টেডিয়াম হবে। তখন হতো কি, প্রায়ই দেখা যেত এখানে বড় বড় ফুটবল ম্যাচ হতো। নিজস্ব মাঠ থাকলে হয়তো রেগুলার খেলা হবে সেই চিন্তা থেকে মিরপুর স্টেডিয়াম তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে কমলাপুরে একটা স্টেডিয়াম করা হয়। ফুটবল তো সারা বিশ্বের জনপ্রিয় খেলা। সেটার জন্য স্থাপনা থাকা উচিত। কিন্তু ক্রিকেটকে সড়িয়ে দিয়ে ফুটবলের জন্য দখল করে নেয়াটা দুঃখজনক। এটা আমাদের ক্রিকেটের প্রতি এবং দেশের ইতিহাসের প্রতি বড় অন্যায় করা হয়েছে।

যুগান্তর: দেশে ফুটবল মরে যাওয়ার পরই কি ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বেড়ে গেল- নাকি ক্রিকেট নিজের জায়গা থেকে জনপ্রিয় হয়ে উঠল?
 

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি: আপনিই আমার উত্তর দিয়ে দিয়েছেন। ক্রিকেট নিজের বৈশিষ্ট্য নিজের সক্রিয়তা থেকেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আমাদের একটা অ্যাডভান্টেজ ছিল। উপমহাদেশে তো ক্রিকেট অন্যতম বড় খেলা। সেই থেকে আমাদেরও ক্রিকেটের ঐতিহ্য ছিল। পাকিস্তান আমলে আমাদের এখানে টেস্ট ম্যাচ হতো। তাছাড়া টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর থেকে আমাদের সফলতার যে মাপকাঠি সেটা দর্শক টানতে বেশি ভূমিকা রেখেছে। ফুটবল তার জায়গা থেকে নিজের মহিমায়ই আছে। ফুটবল পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু গুণগত ভুল হয়েছে বলে আমি মনে করি। ফুটবল পরিচালনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের হয়তো একটা ভুল ধারণা ছিল, ফুটবলের যত রকম অ্যাক্টিভিস হবে তা হবে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামকে ঘিরে। ফুটবলকে জাগিয়ে রাখার জন্য হয়তো তারা এটা করেছে। তবে এটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। ফুটবল একটা বিশ্বব্যাপী খেলা, এটা যদি দেশের বাইরে ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে সেখানেও জনপ্রিয়তা পাবে। মানুষ খেলা দেখতে যাবে আকৃষ্ট হবে। সেটা না করে এক জায়গায় রাখাটা একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আরো একটা মজার বিষয় হলো যেটা শুনলে মানুষ আমার ওপর রাগও হতে পারে। একটা লিগের বেশির ভাগ খেলাই হচ্ছে পাতানো। আর সেই পাতানো খেলা দেখতে দর্শক কেন যাবে। আমি আগেই যদি জানি ওরা জিতবে তাহলে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে, সময় নষ্ট করে কে খেলা দেখতে যাবে। এর সঙ্গে কোচ যিনি থাকবেন তিনি যদি আগেই জানেন দল খেলার আগেই জিতে আছে। তাহলে তিনি ভালোভাবে কোচিং করাতে পারবেন না। প্লেয়ারদেরও আগ্রহ থাকবে না। এসব কিছু মিলেই আমার মনে হয় ফুটবলে সমস্যাটা হয়ে গেছে। তবে এটা একেবারেই শেষ না। এটা উত্তরণ করতে পারলে ফুটবল সেই আগের জায়গায় ফিরে যাবে।

যুগান্তর: আমরা শুনেছি, একটা সময়ে নাকি ক্রিকেটাররা খেলার জন্য মাঠও পেতেন না। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। ফুটবলাররা মাঠ ছাড়লে লেখার সুযোগ পেতেন।
 

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি: অনেক দুঃখের কথাই আছে। একটা কথা বলি, ক্রিকেট নিয়ে কিছু কিছু মানুষের আক্রোশ বা জেদ ছিল। তারা চাননি ক্রিকেট জনপ্রিয় হয়ে উঠুক। হয়ত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মাঠ ভাগ করে দিত। এমনও হয়েছে ক্রিকেট খেলা মাত্র শেষ হয়েছে, তখন ফুটবল ফেডারেশন থেকে কর্মকর্তাসহ লেবার নিয়ে এসে শাবল-কোদাল দিয়ে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ক্রিকেটের উইকেট খুঁড়িয়ে মাটি অনেক দূরে নিয়ে ফেলা হয়েছে। যাতে করে সেই মাটি কুড়িয়ে না আনতে পারে। আপনারা জানেন ক্রিকেটের পিচ তৈরি করতে অনেক সময় লাগে। এই যে ক্রোধ আক্রোশ একটা বিমাতাসুলভ আচরণ। এসব কিছু মিলিয়ে বাজে পরিবেশ তৈরি হতো। তাদের এ মানসিকতার জন্য আমাদের ক্রিকেট কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; উল্টো তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।