বিপিএল খেলে কলিজাটা বড় হয়েছে: আরিফুল

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০১৮, ১৮:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

  আল-মামুন

আরিফুল হক-ফাইল ছবি

সদ্য শেষ হওয়া বিপিএলে বিদেশিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যারা পারফর্ম করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম আরিফুল হক। খুলনা টাইটান্সের হয়ে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখানো এই হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান যুগান্তর অনলাইনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তার সেই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল-মামুন 
 
যুগান্তর : বিপিএল কেমন কাটল? 

আরিফুল : বিপিএল ওভার-অল ভালোই কাটল। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। 

যুগান্তর : লক্ষ্য কি পূরণ করতে পেরেছেন?

আরিফুল : আমার লক্ষ্য ছিল ৩০০-৩৫০ রান করার। কিন্তু দুটা ম্যাচে ব্যাটিং করার সুযোগ পাইনি। আবার একদিন বৃষ্টির কারণে খেলা হয়নি। সেইদিক থেকে বললে টার্গেট সেভাবে ফিলাপ হয়নি।

যুগান্তর : দু-একটা ম্যাচে গেইল-স্টাইলে ব্যাটিং করে দলকে জয় উপহার দিয়েছেন।

আরিফুল : আমার প্লানই ছিল ওরকম। আমার সঙ্গে রিয়াদ ভাইয়ের (মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ) এমনই কথা ছিল। রিয়াদ ভাই শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, আগের বছর তুই যেভাবে নটআউট থাকার চেষ্টা করছিস, এবার তাই কর। আউট হবি না, শেষ পর্যন্ত খেলার চেষ্টা করবি। এরকমই পরিকল্পনা ছিল। উইকেটে যতক্ষণ থাকি চেষ্টা করি চালিয়ে যেতে। ম্যাচে হারি-জিতি পরের বিষয়। ফিনিশ করার চেষ্টা করেছি।

যুগান্তর : রাজশাহীর বিপক্ষে ১৯ বলে অপরাজিত ৪৩ রান, ম্যাচজয়ী ইনিংস।

আরিফুল : ওটা তো আসলে আমার জীবনের যদি কয়েকটা ম্যাচ থাকে, তার মধ্যে সেরা একটা ম্যাচ ছিল। একদম ফিনিশ করেই এসেছি। আমার সঙ্গে জুনায়েদ ছিল, আমার কাছে মনে হয়েছে জুনায়েদ ফেস করলে রেজাল্ট হবে না। বলও কম ছিল। আমার টার্গেট ছিল হয়তো ছক্কা হাঁকাবো; না হয় দুই রান নিয়ে স্ট্রাইক ধরে রাখব। জুনায়েদ ভাইয়ের সঙ্গে ব্যাটিং করায় আরও ভালো হয়েছে, উনি আমাকে অনেক সাহস জুগিয়েছেন।

যুগান্তর : বিপিএল হলো তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য জাতীয় দলের একটা সিঁড়ি, এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আরিফুল : বিপিএল হলো একটা বড় মঞ্চ। আপনি যদি ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলেন, সেখানে কিন্তু বিপিএলের মতো তারকা ক্রিকেটাররা খেলে না। ঘরোয়া ক্রিকেটে কোয়ালিটি ফুল খেলোয়াড় পাওয়া যায় না। বিপিএল খেললে আপনি সব বিদেশি ক্রিকেটারদের ফেস করবেন। ফেস করলে, ওদের সঙ্গে আপনি কম্পায়ার করতে পারবেন। ওদের তুলনায় কতটুকু আমি যোগ্য। বিপিএল খেললে নিজের লেভেলটা বোঝা যায়। ঘরোয়া ক্রিকেট খেললে ওই লেভেলটা বোঝা যায় না। বিপিএল খেলাতে কলিজাটা অনেক বড় হয়ে যায়। তখন কনফিডেন্টটা আসে। তখন মনে হয়, আমি তো ওদের ফেস করেছি, ওদের বিপক্ষে ভালো খেলেছি। তখন আত্মবিশ্বাস চাঙা হয়। এরকম আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য বিপিএলটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

যুগান্তর : তারকা ক্রিকেটারদের কাছ থেকে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা, পরামর্শ কি পেয়েছেন?

আরিফুল : আমি ব্রাথওয়েটকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি স্লোগের সময়, গোড়ার বল কীভাবে ছয় মার। ও আমায় একটা কথাই বলেছে, তোমার যদি ব্যালেন্স ঠিক থাকে তাহলে তুমি পারবে। ও আমায় বলেছে, যখন তুমি বলে হিট করবা তখন তোমার শরীর নড়াবা না। শরীর একদম স্টিল রাখবা। আর জোরে মারার জন্য তোমার ব্যালেন্স গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া মাহেলা জয়াবর্ধনে, কুমার সাঙ্গকারার সঙ্গেও কথা হয়েছে। সব সময়ই চেষ্টা করি ফরেনারদের কাছ থেকে কিছু নেয়ার।

যুগান্তর : বিপিএল ভালো করায়, আলোচনা হচ্ছে জাতীয় দলের আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারে। তবে নির্বাচকদের দাবি টি-টোয়েন্টি দিয়ে ওয়ানডের বিচার হয় না। আপনিও কি তাই মনে করেন?

আরিফুল : আপনি যদি টি-টোয়েন্টি খেলতে পারেন তাহলে ওয়ানডেও খেলতে পারবেন। আমার ব্যক্তিগত মত, টি-টোয়েন্টি ওয়ানডের মতই সেম একটা ফরমেট। আমি যেখানে খেলতে নামব হয়তো ১৫ ওভার বা ২০ ওভার, ওই সময়ে আমি যদি গোছায়ে খেলতে পারি তাহলে ওয়ানডে বলেন আর টি-টোয়েন্টি বলেন দুটোতেই সফল হওয়া যায়। আমার কাছে এই দুটা ফরমেট একই লাগে।

 

যুগান্তর : আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

আরিফুল : আমাকে যদি ক্রিকেট বোর্ড সুযোগ দেয়, তাহলে আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে খেলার চেষ্টা করব। আমি আমার জায়গা ধরে রেখে খেলার চেষ্টা করব। কখনই জায়গা ছাড়ব না। এমন মানসিকতা আমার মধ্যে আছে। আর জাতীয় দলে খেলার জন্য সেই ছোট বয়স থেকেই স্বপ্ন দেখে আসছি। জাতীয় দলে খেলা, অন্যরকম একটা ফিলিংস। দেশের জন্য খেলা আসলে অনেক গর্বের বিষয়। আর আমি সুযোগ পেলে, সেটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করব। 
 
 

যুগান্তর : আপনার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্পটা যদি বলেন?

আরিফুল : আমি ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলছি। ২০০২ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় স্কুল ক্রিকেট খেলেছি। তখন আমি অনেক ছোট। তখন আমি এত ছোট ছিলাম, আমার ব্যাট কোমরে এসে লাগত (হাসি)। এমন ছিল, আমি প্রথম যখন খেলি, তখন আমারই প্যাড পরা দেখে সবাই হাসছিল (হাসি)। ব্যাটিংয়ে নামার সময় সবাই তালি দিচ্ছিল।

 
 
যুগান্তর : আপনার পরিবারের কেউ কি খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে? বা খেলার জন্য পরিবার থেকে সমর্থন পেয়েছেন?

 

আরিফুল : না। আমার চৌদ্দপুরুষের কেউ ক্রিকেট, ফুটবল, হকি বা কোনো স্পোর্টসের সঙ্গে জড়িত না। আমি আসলে জড়িত হয়ে গেছি বলতে ছোটবেলায় টেপ টেনিস খেলতাম। টেপ টেনিসে খুব মারতাম। এই মারতে মারতেই বড় ভাইদের উৎসাহে ক্রিকেট বলে খেলা শুরু করি।  
 
 

যুগান্তর : ক্রিকেটে হাতেখড়ি কোথায়?

 

আরিফুল : হাতেখড়ি তেমন কিছু নেই। আমি স্কুলে ক্রিকেটে খেলার পর থেকে রংপুরে প্রাকটিস করতাম। এরপর ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৩ খেললাম। ২০০৮ সালে অনূধর্ব-১৯ দলের হয়ে খেলেছি। যুব বিশ্বকাপে আমার সঙ্গে খেলেছে- রুবেল হোসেন, নাসির হোসেন, মিঠুন, শুভাষিশ। 
 
 

যুগান্তর : আপনার সাঙ্গে যুব বিশ্বকাপে খেলা রুবেল, নাসিররা জাতীয় দলে নিয়মিত খেলছে। অথচ আপনার জায়গা হয়নি, এতে হতাশা লাগে না?

 

আরিফুল : অবশ্যই হতাশা কাজ করতেছে। এখনও মনে হয়, কবে জাতীয় দলে খেলব। আমি এদের কথা বলে হতাশ হই না। আমি বিরাট কোহলিকে দেখে আরও বেশি হতাশ হই। যে বিরাট আমাদের সঙ্গে যুব বিশ্বকাপে খেলল। সে এখন কোথায়!
 
 

যুগান্তর : কখনও সুযোগ আসবে, সেই প্রত্যাশা তো রাখেন? 

 

আরিফুল : জ্বি জ্বি, প্রত্যাশা রাখি। প্রত্যাশা রাখি অবশ্যই কখনও সুযোগ আসবে। সেই অপেক্ষায় আছি। এখনও সম্ভব। মানুষের লাক, কখন কী হয়ে যায় বলা মুশকিল। 
 
 

যুগান্তর : আপনার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে কোনো স্মরণীয় ঘটনা যদি বলেন?

 

আরিফুল : রংপুরে আমাদের বাসা, ওইদিকে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার। আমার বাবা ডিসি অফিসের গাড়ি চালান। আমার কেটস কেনার সামর্থ্য আসলে ছিল না। আমাদের এলাকার একটা ছেলের স্কুলের কেটস নিয়ে খেলতে যেতাম। ও বিকেলে আসত স্কুল থেকে, বাড়িতে এলে ওর কেটস নিয়ে প্রাকটিস করে আবার রাতেই ফেরত দিয়ে আসতাম। এভাবেই চলত প্রাকটিস। বেশ কিছুদিন এভাবেই চলছিল। মাঝে মাঝে অনেক দূর প্রাকটিসে যেতে হতো। আমার আব্বার বাইসাইকেল ছিল, কিন্তু তিনি তার সাইকেল ধরতে দিতেন না। তো এমনও হয়েছে, সাইকেলের চাবি চুরি করে নিয়ে তার পরে প্রাকটিসে যাইতাম। যখন খেলা শুরু করি তখন, ওইভাবে কেউই টেককেয়ার করেনি। মা খুব চিল্লাচিল্লি করত। যে খেলাধুলা করে কী হবে। খেলাধুলায় কোনো গ্যারান্টি আছে নাকি। পড়াশোনা করলে না একটা লাইফ সেটেল হবে। এ কারণে বাবার চেয়ে মার কাছ থেকেইই বেশি মার খেতে হয়েছে।