ক্রিকেটে ভালোবাসা থাকলে উন্নতি করা সম্ভব: তুষার ইমরান

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০১৮, ২১:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

  আল-মামুন

বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে ১০ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তুষার ইমরান। জাতীয় দলে প্রায় ‘সাবেক’ হয়ে যাওয়া এই ক্রিকেটার যুগান্তর অনলাইনের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। তার সেই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল- মামুন।   

যুগান্তর : প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে ১০ হাজার রানের কীর্তি গড়লেন। সেটা নিয়ে যদি কিছু বলেন?

তুষার ইমরান : আসলে ১০ হাজার রান করতে গেলে তো অনেক দিন ধরেই ক্রিকেট খেলা লাগে। এ জন্য ফিট থাকার পাশাপাশি রানও করা লাগে। করতে করতে হয়ে গেছে আরকি।

যুগান্তর: ফিটনেস নিয়ে বলছেন, জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর ফিট থেকে ধারাবাহিক পারফরম করাটা কতটা চ্যালেঞ্জিং?

তুষার ইমরান : জাতীয় দলে একটু খারাপ খেলার কারণে বাদ পড়ে যাই। এছাড়া ২০০৮-০৯ মৌসুমের দিকে আমি ইনজুরিতে পড়ছিলাম। একে তো খারাপ খেলা- অন্যদিকে ইনজুরি, এ কারণে দল থেকে বাদ পড়ে যাই। পরপর দুই বছরে আমার হাত ভাঙে। ইনজুরিতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে ক্রিকেটের ব্যাট-বল ধরতে পারিনি। জাতীয় টিম তো দূরে থাক! ইনজুরির কারণে ঘরোয়া ক্রিকেটেও খেলা হয়নি। সেখান থেকে রিকভারি করতে আমার তিন বছর সময় লাগছে। সব মিলিয়ে বললে ইনজুরির কারণে আমার ৫ বছর কেটে যায়। নিজের সঙ্গে ফাইট করতে অনেক সময় কেটে যায়। তার মধ্যে জাতীয় দলও ভালো করতে থাকে। আমার পরিবর্তে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া মাহমুদউল্লাহ রিয়াদও ভালো করতে থাকে। সে ইয়ংস্টার প্রোমেজিং প্লেয়ার। সেও ভালো খেলে। 

যুগান্তর : তার মানে পারফরমারদের ভিড়ে জাতীয় দলে ঢুকাটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে গেল?

তুষার ইমরান : আগে কিন্তু এ রকম পারফরমার ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে যেটা হয়ে থাকে। এখন অনেক বেশি কমপিটিশন চলছে। আগে এতটা ছিল না। এখন যেই জাতীয় দলে সুযোগ পাচ্ছে সেই চিন্তা করছে নিজের জায়গাটা পাকাপোক্ত করছে। খারপ করলেও তার জায়গা ছাড়তেই হবে। এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে খারাপ খেলবে- সে বাদ পড়বেই। আর  যে ভালো খেলবে, সে থেকেই যাবে। এ প্রতিযোগিতাটা গত তিন-চার বছর ধরে বেশি বাড়ছে। আমার জন্য কঠিন হয়ে গেছে। সর্বশেষ ৫ বছরে বিসিএল, প্রিমিয়ার লিগসহ ঘরোয়া ইভেন্টগুলো ধারাবাহিক পারফর্ম করে যাচ্ছি। ফাইট করে যাচ্ছি দলে ফেরার জন্য। 

যুগান্তর : ইনজুরি কাটিয়ে ফিরেই ঘরোয়া লিগে আগের চেয়েও বেশি ধারালো হওয়ার পেছনে রহস্য যদি বলেন?

তুষার ইমরান : আসলে এটা আমার জন্য কঠিন ছিল। তবে আমি ঘরোয়া প্রতিটি টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই প্ল্যান করতাম। ঘরোয়া ক্রিকেটে জাতীয় তারকা ক্রিকেটারের চেয়ে ভালো করার চ্যালেঞ্জিং নিয়ে খেলা শুরু করতাম। এই বিষয়টাতে বেশি গুরুত্ব দিতাম। আমার তখন টার্গেটই ছিল জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের চেয়ে ভালো করব। এজন্যই বলতে পারেন ধারাবাহিক রান করতে পেরেছি। 

যুগান্তর : ঘরোয়া ক্রিকেটে অনেক দিন ধরেই ভালো খেলছেন। বিশেষ করে লংগার ভার্সনে। আপনার কি মনে হয় জাতীয় দলে আরেকটা সুযোগ পাওয়া উচিত?

তুষার ইমরান : বলে তো আর হয় না বুঝছেন (হাসি)। এটা হয়তো একটা প্রেসার থাকতে পারে যদি কেউ খারাপ খেলে হয়তোবা সেকেন্ড চয়েজ হিসেবে আমাকে চুজ করতে পারে। আপাতত আমার সঙ্গে আমাকে কমপিটিশন করতেছি না। চেষ্টা করছি আজ হোক বা কাল হোক! আর নিলে তো নিবেই। তবে ওই চিন্তা মাথায় রাখি না, যে আমায় জাতীয় দলে ঢুকতেই হবে। তবে প্রতিযোগিতা থাকে। এখন যেমন জাতীয় দলে বাইরে থাকা কিছু খেলোয়াড় আমাদের সঙ্গে খেলতে আসছে তাদে সঙ্গে একটা কমপিটিশন থাকে। তো এটা আমাকে অনেক হেল্প করে। যে কমপিটিশন করে ক্রিকেট খেলছি। জাতীয় দলের জন্য তো কমপিটিশন করাই লাগবে। 

যুগান্তর : সামনে শ্রীলংকার বিপক্ষে হোমে টেস্ট সিরিজ আছে। হঠাৎ যদি জাতীয় দলে ডাক আসে, সেটার জন্য আপনি কতটা প্রস্তুত?

তুষার ইমরান : আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তুত। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলছি তো। টেস্ট খেলার জন্য যা যা লাগে আমার তা আছে। ১৫০ ওভার ফিল্ডিং করছি। ধরেন দুটি ম্যাচ গেল, দুই ম্যাচে দেড়শ দেড়শ ওভার ফিল্ডিং করেছি। প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকাও অসম্ভব। তার পাশাপাশি ব্যাটিংও করা লাগে, সবই করছি। তাছাড়া এখন তো আর ওই সিস্টেমটা নেই যে আমি ব্রেকে চলে গেলাম মাঠে আর ফিরলাম না। সব সময় মাঠে থাকার চেষ্টা করি। পাশাপাশি নিজের পক্ষ থেকে দলকে সাধ্যমতো দেয়ার চেষ্টা করি। আমি আমার জায়গা থেকে খেলার জন্য প্রস্তুত আছি। আমি যদি আবার আরো ভালো একটা ম্যাচ খেলতে পারি, হয়তোবা আমার বিবেচনায় আসতে পারব। 

যুগান্তর : তরুণ ক্রিকেটারের তুলনায় একটু ‘বুড়ো’ হয়ে যাওয়া ক্রিকেটারের দল থেকে বাদ পড়ার পর ফেরাটা কতটা চ্যালেঞ্জিং?

তুষার ইমরান : আমার কাছে মনে হয়, বয়সটা ডাজন্ট ম্যাটার। মানুষ তো। হ্যাঁ, বয়সের একটা ভার থাকবে। তবে যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করে যেতে হবে। তবে বয়সের সঙ্গে লড়াই করে আরও ফার্স্ট হওয়াটা আমার জন্য হয়তো কঠিন হবে। আমার সাধ্য যেগুলো আছে সেগুলো তো করতে পারি। আরও বেশি রান করে ফার্স্ট হতে। তবে তরুণ ক্রিকেটারদের সুযোগটা একটু বেশি থাকে। তারা আমার মতো পারফর্ম করলে টিম তাদের নিতে বাধ্য। আমাদের ক্ষেত্রে হয়তো একটু কঠিন। আমাদের নেয়ার আগে অনেক চিন্তাভাবনা করে। তারা হয়তো ভাবে আমাদের দেয়ার মতো আর কিছু নেই। তবে না দেয়ার মতো সবারই কিছু আছে। সব জায়গা থেকেই আছে। বয়স ৩৫ হোক আর ৩৬ হোক। বয়স ডাজন্ট ম্যাটার। আমি চেষ্টা করে যাই যদি কখনও সুযোগ আসে তখন কাজে লাগাব। 

যুগান্তর : ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফর্ম করে যাওয়ার পেছনে অভিজ্ঞতা কি কাজে দিচ্ছে নাকি অন্য কিছু?

তুষার ইমরান : আমি যদি আমার নিজের কথা বলি। ফার্স্ট ক্লাসের ৪ দিনের ম্যাচে আমার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে একটা সেঞ্চুরি মারি। আর ভারতে মনে হয় একটা ২০০ মারি। অভিজ্ঞতাটা, হয়তো তখন রক্ত গরম ছিল। ২০০১-০২ সালের দিকে সেভাবে বুঝতাম না, তখন আইডলও ভালো ছিল না। আবার খেলাও অত বেশি হতো না। আমার কাছে মনে হয় আমার টেস্ট ডেবুটা একটু আগে হয়েছে। এটা আরো ৫-৬ বছর সময় নিয়ে ডেবু হলে ভালো হতো। এই সময়ের মধ্যে ওয়ানডে খেলে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারলে ভালো হতো। ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি আপনি যখন তখন যাকে তাকে ডেবু করাতে পারেন। কিন্তু টেস্টে আরলি স্টেজে সার্ভাইভ করা একটু কঠিন। আপনি দেখবেন ওয়ানডে খেলতে খেলতে মুশফিক, সাকিব, তামিমরা উন্নতি করেছে। ওরাও টেস্টের শুরুর দিকে সেভাবে ভালো করতে পারেনি। ওয়ানডে খেলতে খেলতে টেস্টে ভালো শুরু করেছে। তা-ও অনেক দিন পর তিন-চার বছর হলো টেস্টে ভালো করা শুরু করেছে। 

যুগান্তর : আগের তুলনায় ঘরোয়া ক্রিকেটেও এখন অনেক রান হচ্ছে। এটার পেছনে মূল কারণ কী?

তুষার ইমরান : আগে ধরেন আমরা একটা ১০০ করলে সেটা নিয়ে হ্যাপি থাকতাম। আমি যেমন আমাকে দিয়েই বিচার করি, আন্তর্জাতিক ওয়ানডে অভিষেকের পরের ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৬৫, ৪৩, ২১ করে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হয়েছিলাম। তখন পাকিস্তান দলে সেরা বোলিং লাইনআপ ছিল, ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনুস ও শোয়েব আখতাররা ছিল। তারপর আমি যখন শ্রীলংকা সফরে যাই তখন একটা ফিফটি মারি। আমার কিন্তু বড় ইনিংস খেলার অপশন ছিল। সত্যি কথা বলছি তখন আমার মাথায় কাজ করেছে পাকিস্তান আমার পছন্দের টিম, তাদের সঙ্গে ৬৫ করেছি। সেটাই আমার বেস্ট রান থাকুক। এটা ভেবে শ্রীলংকার বিপক্ষে ‍বড় ইনিংস খেলার সুযোগ পেয়েও বড় করতে পারিনি। ৬১ রানে আউট হয়ে গেছি। আগে যেমন ১০০ হয়েছে মনে করতাম গুড এনাফ। এখন আউট হওয়ার সময় হয়েছে। তখন মারতে গিয়ে আউট হয়ে যেতাম। কিন্তু এখন তার উল্টোটা হয়েছে। সবাই চিন্তা করে, ১০০ হয়েছে সেটাকে কী করে আরও লম্বা করা যায়। এভাবে টার্গেট করে আগায়। আমরা তখন বুঝতাম না বলে করতে পারিনি। এখন যেমন রানের ক্ষুধা আছে, তখন এটা ছিল না। উইকেট যেমনই থাকুক না কেন। আমার মনে হয় বড় স্কোর গড়ার পেছনের মূল কারণ রানের ক্ষুধা। 

যুগান্তর : সামনে প্রিমিয়ার লিগ শুরু হবে সেটা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
তুষার ইমরান : এখন ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট নিয়ে আছি। যখন প্র্যাকটিস শুরু করব তখন প্ল্যানিং করব। এখন বিসিএলের থার্ড রাউন্ড শুরু হবে। সেটার দিকেই ফোকাস করতেছি। 

যুগান্তর : তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে কিছু বলেন?

তুষার ইমরান : তরুণদের উদ্দেশে বলব, তারা অনেকেই আছে যারা ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট পছন্দ করে না। অনেক তরুণের ভেতরই এখন অর্থের প্রতি মোহ চলে এসেছে। টি-টোয়েন্টি এবং ফ্রাঞ্জাইজি লিগগুলোতে অর্থের জুয়া থাকায় তারা সেখানে ঝুঁকে পড়ছে। তারা যদি টাকার অ্যামাউন্টের দিকে চিন্তা না করে ক্রিকেটকে ভালোবেসে যদি খেলতে থাকে তাহলে সব দিকে উন্নতি হবে। এতে করে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলার হ্যাবিটটা বাড়বে। লংগার ভার্সনে ভালো করলে আন্তর্জাতিকেও ভালো করতে পারবে। তাদের প্রতি আমার রিকোয়েস্ট থাকবে তারা যেন চার দিনের ক্রিকেটটা ভালো করে খেলে। 

যুগান্তর : সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দল অসাধারণ খেলছে। জাতীয় দলের বাইরে থেকে এই জয়ের আনন্দটা কতটা উপভোগ করছেন?

তুষার ইমরান : আসলে এটা অনেক ভালো লাগে। তবে টিমের সঙ্গে থাকলে সেই অনুভূতি আলাদা। তবে দলের জয়ে অবদান রাখতে পারলে ভালো লাগে। আমি দলে থাকাকালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের পেছনে অবদান রেখেছি। আমাদের ক্রিকেটাররা এখন অনেক পরিণত। এখন যে সেটআপে খেলা হচ্ছে সেটা আমার খুব পছন্দ। সাকিব তিনে ব্যাট করছে। সিনিয়র ক্রিকেটার হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছে। দলের ব্যাটিং লাইনআপও লম্বা হচ্ছে। যে যার জায়গা থেকে ভালো করার চেষ্টা করছে। 

যুগান্তর : সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

তুষার ইমরান : আপনার মাধ্যমে যুগান্তরের পরিবার ও পাঠকদেরও ধন্যবাদ।