Logo
Logo
×

সুরঞ্জনা

সফল উদ্যোক্তা

ফ্রিল্যান্সিংয়ে আসমাউল হোসনার বাজিমাত

Icon

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ফ্রিল্যান্সিংয়ে আসমাউল হোসনার বাজিমাত

এইচএসসি পরীক্ষার পর বিয়ে হয়ে যায় আসমাউল হোসনার। কতই বা বয়স তখন তার। ডানামেলে উড়ে বেড়ানোর সময় এক নতুন পরিবেশে পাড়ি জমালেন তিনি। বসলেন বিয়ের পিঁড়িতে। সব কিছু মানিয়ে নিতে কষ্ট হলেও পাশে পেলেন প্রিয় স্বামীকে। যিনি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্য। আসমাউল হোসনার আজকের এ অবস্থানের নেপথ্যে তার স্বামী হলেন এক নীরব শক্তি। যিনি সবসময় পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছেন। হোসনার বাড়ি পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারের সাগরকন্যাখ্যাত কুতুবদিয়ার লেমশীখালিতে। দুই কন্যাসন্তানের জননী তিনি।

প্রকৃতির নিবিড় নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা কুতুবদিয়ার সহজ-সরল, শিক্ষিত মানুষের মাঝেই কেটেছে তার শৈশব। ২০১৫ সালে লেমশীখালি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে চট্টগ্রামের এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পাশ করেন তিনি। পরে গণিতে অনার্সে স্নাতক শেষ করেন। অনার্স শেষে জীবনের লক্ষ্য নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তবে ছোটবেলা থেকেই তার মনে ছিল নিজের কিছু করার ইচ্ছা-আর সেই ইচ্ছাই ধীরে ধীরে রূপ নেয় উদ্যোগে।

প্রথমে কিছুদিন অনলাইনে মেয়েদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বেচাকেনা করেছেন। কিন্তু তার সব ভাবনা যেন ঘুরিয়ে দিল ফেসবুকে ‘কিছু করতে চাই’ গ্রুপ। এ গ্রুপে যুক্ত হয়ে মেয়েদের সফলতার গল্প দেখে তিনি নিজেকে অন্যভাবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। আর তার এ সিদ্ধান্তের অন্যতম অনুপ্রেরণা হলেন ফ্রিল্যান্সার সিনথিয়া অক্তার লিজা। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে লিজার ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফলতার ভিডিও দেখে তিনি লিডিং লাইট নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কোর্সে ভর্তি হন। সময়টা ছিল ২০২৪ সাল।

অবাক করার মতো এক ঘটনা-কোর্স চলাকালেই তিনি কাজ পেয়ে যান নেদারল্যান্ডসের এক ক্লায়েন্টের কাছ থেকে। সে সময় তিনি শারীরিকভাবে প্রচণ্ড অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু এর মধ্যেও দায়িত্ব ঠিকই পালন করেন। আর যখন প্রথম আয়ের বার্তা আসে, আনন্দে তার হৃদয় ভরে ওঠে। প্রথম আয় ছিল মাত্র ৪৫ ডলার, কিন্তু তার মূল্য ছিল জীবনের প্রথম বড় প্রাপ্তি। সেই মুহূর্ত থেকেই তিনি বুঝে যান-এটাই তার পথ। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

এখন ইউক্রেন, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৪ স্থায়ী বায়ার তার। তিনটি গ্লোবাল সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির ম্যানেজার হিসাবে তিনি বিদেশিদের মন জয় করে চলেছেন। মূলত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, ফেসবুক/ইনস্টাগ্রাম ক্যাম্পেইন, ওয়েবসাইট তৈরিসহ নানা রকম কাজ তার। যখন যেটা করেন তখন সেটাতেই সর্বোচ্চ মনোযোগ থাকে তার। বর্তমানে প্রতি মাসে তার আয় ১২০০ থেকে ১৫০০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। আয়ের চেয়েও তিনি নিজের স্কিল বাড়াতে তৎপর বেশি। তার ভাষায়, ‘দক্ষ হলে আয় বাড়বে বই কমবে না।’ অক্লান্ত পরিশ্রম করলে সফলতা কখনোই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে না-এর জীবন্ত উদাহরণ হোসনা নিজেই। কাজের প্রতি তার নিষ্ঠা, সময়ানুবর্তিতা ও পেশাদারি বায়ারদের মুগ্ধ করেছে। ফলে শুধু প্রশংসাই নয়, কয়েকজন বিদেশি ক্লায়েন্ট তাকে আলাদা বোনাসও দিয়েছেন। ফ্রিল্যান্সিং তো অনেকেই করেন, কিন্তু এমন আস্থা ও সম্মান অর্জন করা ভাগ্যবানদের মধ্যেই একজন হয়ে উঠেছেন তিনি।

গৃহবধূ হিসাবে ফ্রিল্যান্সিং করতে গিয়ে হোসনাকে নানা চ্যালেঞ্জ ফেস করতে হয়েছে। দুই কন্যাসন্তানের মা। তার ওপর যৌথ পরিবার, পাশাপাশি আছে নিজের পড়াশোনাও। অবশ্য বুদ্ধি করে সবকিছুই তিনি সামলে নিয়েছেন সফলভাবে। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি যদি ইচ্ছা থাকে, তাহলে সবই সম্ভব। ধৈর্য ধরে কাজ করে গেলে এবং শিখতে থাকলে কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়।’

যারা ফ্রিল্যান্সিংয়ে একদম নতুন, তাদের জন্য হোসনার পরামর্শ হলো, ‘ধৈর্য ধরে সঠিকভাবে শিখতে থাকুন। প্রথমে কঠিন লাগবে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সহজ হয়ে যাবে। সফলতা কেবল সময়ের ব্যবধানমাত্র। শেখার কোনো শেষ নেই।’

ভবিষ্যতে হোসনা এমন একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চান, যেখানে গ্রামের মেয়েরা ঘরে বসে ডিজিটালি আয়ের পথ তৈরি করতে পারবে। কারণ শিক্ষা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব। তিনি নিজেকে এ পেশায় আরও দক্ষ করে গড়ে তোলার পাশাপাশি অন্য মেয়েদেরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে চান, যাতে তারা পরিবার এবং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে অবদান রাখতে পারেন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম