জীবনযুদ্ধ
লড়াকু সেতুমণির অদম্য যাত্রা
এনামুল হক বশির
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকা শহরে কত ব্যস্ত মানুষ, কত বিচিত্র তার প্রকাশ। রাতের শেষে সূর্য ওঠার মধ্যদিয়ে শুরু হয় এক একটি কর্মমুখর দিন। শুরু হয় নিরন্তর ছুটে চলা। তারই মাঝে একটু অবসর। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হাসি-কান্না, আনন্দ-বিশাদ-সবখানেই এক কাপ চা নিয়ে আসে গভীর তৃপ্তি।
সেই তৃপ্তি নিতেই কথা হয় উত্তরায় ১০ নম্বর সেক্টরে IUBAT-এর সামনে লাভ প্যালেস টং দোকানের মালিক সেতুমণির সঙ্গে। প্রেম করে ছাত্রী অবস্থায় বিয়ে করেন। প্রথম বছরেই গর্ভে নতুন প্রাণের স্পন্দন। কিন্তু রাখতে পারেনি শেষ পর্যন্ত। এরপর দেশের অনেক ডাক্তার দেখিয়েছেন, এমনকি ভারতেও গিয়েছেন, কোথাও কোনো সুখবর পাচ্ছিলেন না। তারপর হঠাৎ ২০২৪ সালের রমজানের ঈদের পর আবারও টের পান গর্ভে নতুন প্রাণের অস্তিত্ব। কিন্তু এবারও রাখতে পারলেন না। সিজার করে ফেলে দিতে হলো। একটোপিক প্রেগনেন্সি ectoptic pregnancy বলে এটিকে। বেবি তো পেলেনই না, বরং সিজারও করতে হলো তাকে। এবার মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েন সেতুমণি। কোনো বাচ্চা দেখলে বা কেউ তার বাচ্চাকে আদর করতে দেখলে, খুব কান্না করতেন। এমন পরিস্থিতিতে স্বামী একটি টি-শপের ব্যবস্থা করে দেন। কোনো একটা কাজে ব্যস্ত থাকলে মন কিছুটা শান্ত হবে। এমন সময় স্বামীর কোম্পানির অবস্থাও হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। বেতন পাচ্ছিলেন না ঠিকমতো। সেতুমণি যখন দোকান নিয়ে বসেন, কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না তার। কিন্তু বাঁচতে হলে কিছু একটা করতে হবে। এ তাড়নায় প্রতিদিন দোকানে যেতেন। প্রথম সাত দিন শূন্য হাতে এসেছিলেন, যে খাবারগুলো নিয়ে যেতেন, সেগুলো ফেলে দিয়ে আসতে হতো। তখন মনটা আরও খারাপ হয়ে যায়, মনে হয় তাকে দিয়ে হয়তো কিছুই হবে না। স্বামী বোঝাতেন। সাত দিন পর গিয়ে প্রথম ২৫০ টাকা বিক্রি করেন। এখন তার সময় কোন দিক দিয়ে চলে যায়, তার জানা নেই। আর মানসিকভাবেও খুব ভালো আছেন সেতুমণি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে হওয়ায় প্রচুর ছাত্রছাত্রী তার এখানে আসে। সারা দিন ওরা তাকে আপু বলেই ডাকেন।
এমনকি তার দোকানের নাম Love place হওয়া সত্ত্বেও সবাই আপুর টং দোকান বলেই জানেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললে একটু সুস্থবোধ করেন তিনি, মা না হওয়ার কষ্টটা ভুলে থাকেন। জীবনের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে হাজার রকমের বাধা-বিপত্তি আর অদৃশ্য শত্রুতে ভরা। বাধা-বিপত্তিগুলোকে সংগ্রামের মাধ্যমে মোকাবিলা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারলে জীবনের সফলতা। পৃথিবীতে প্রায় সব মানুষের জীবনে প্রতিকূলতা আসে। যারা এ প্রতিকূলতা ধৈর্যসহকারে মোকাবিলা করতে পেরেছেন, তারাই সফলতা অর্জন করেছেন। সেতুমণিও দুঃখ ভুলে এগিয়ে যেতে চান। হতে চান অন্য নারীদের জন্য প্রেরণার উৎস।
প্রশিক্ষণ ছাড়া যুদ্ধে জয়লাভ করা হয়তো অসম্ভব। কিন্তু জীবনযুদ্ধে আমরা কেউই প্রশিক্ষিত নই। তাই টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য আর কৌশল। যে কোনো ধরনের সাফল্যের জন্য দৃঢ় মনোবল থাকতে হয়। সেই মনোবল নিয়েই এগিয়ে যেতে চান সেতুমণি। তাই তিনি আজ সফল উদ্যোক্তা।
