Logo
Logo
×

সুরঞ্জনা

সিডও সনদ: সামাজিক বাস্তবতা

Icon

রুকাইয়া সাওম লীনা

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সিডও সনদ: সামাজিক বাস্তবতা

১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ গৃহীত হয়। যা সংক্ষেপে সিডও সনদ নামে পরিচিত। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সনদটি কার্যকর হতে শুরু করে। তখন থেকে সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো প্রতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সিডও দিবস হিসাবে পালন করে আসছে। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালের ৬ নভেম্বর এ সনদ অনুমোদন করে। অনুমোদনকালে বাংলাদেশ সরকার ২, ১৩ (ক) এবং ১৬(১) (গ) ও (চ) ধারাগুলো আপত্তিসহ স্বাক্ষর করে। পরে জাতীয় পর্যায়ে গঠিত রিভিউ কমিটির সুপারিশক্রমে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ১৩ (ক) ও ১৬(১) (চ) ধারা থেকে বাংলাদেশ তার আপত্তি প্রত্যাহার করে নেয়। তবে বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন।

সিডও সনদ বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছে অনুমোদনকারী দেশগুলোকে নিুলিখিত পদক্ষেপ নিতে হবে :

১. নারীর অধিকারকে সম্মান করা।

২. নারীদের বৈষম্য থেকে রক্ষা করা।

৩. লিঙ্গ সমতাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে নারীর মানবাধিকার পূরণ করা।

১৯৮৪ সাল থেকে CEDAW আমাদের দেশে কতটা কার্যকর হয়েছে? CEDAW সনদ দেশের নারী আন্দোলনে কেমন প্রভাব ফেলেছে? CEDAW নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় কতটা কার্যকরী হয়েছে? ভবিষ্যতে CEDAW নারী অধিকার বাস্তবায়নে আরও কী কী ভূমিকা রাখতে পারে? কিংবা আমাদের সামাজিক বাস্তবতা কী বার্তা দিচ্ছে আমাদের? এমন নানা প্রশ্ন প্রাসঙ্গিকভাবেই আলোচনার দাবি রাখে। এসব প্রশ্ন নিয়ে আমরা কথা বলি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী ডা. ফওজিয়া মোসলেমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সিডও-এর তিনটি নীতি ছাড়া বাকিগুলো তো এখনো সংরক্ষণ করা হয়নি। ওই তিনটি নারীর ব্যক্তিগত অধিকার, পারিবারিক অধিকার এগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ওটা সংরক্ষণ প্রত্যাহার না হলে সিডও সনদের কার্যকারিতা বোঝা যাবে না। অর্থাৎ নারীর ব্যক্তিগত অধিকার যা সিডও-এর প্রাণ, এটা প্রত্যাহার না করা হলে সিডও কার্যকর হবে না। এটাই সিডও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য কিছু কিছু বিষয় বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মূল জায়গায় হাত দেওয়া হচ্ছে না। ফলে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের জায়গায় আমরা কোনো অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়, কতজন সিডও সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন বা কতজন রাখেন না। তবে এটি বলা যায় আগের তুলনায় নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন। নারীর নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী বিভিন্ন জায়গায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি করে নিচ্ছে। এসব থেকে বলা যায়, সামগ্রিকভাবে নারীর জীবনের পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে তাতে সিডও সনদের ভূমিকা রয়েছে। সিডও সনদের প্রচারণার বাস্তব ফলাফল এটা। সিডও যদি আমরা আলোচনা করি, তবে বলতে হয় সমাজে শুধু নারীর চিন্তাধারার পরিবর্তন হলে তো হবে না। সিডওকে কার্যকরী করার জন্য আমরা যদি আরও কাজ করতে পারি তাহলে সমাজটাকেও আমরা নারীবান্ধব করে গড়ে তুলতে পারব। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নারী একা সংবেদনশীল হলে তো হবে না। সমাজকে, রাষ্ট্রকে সংবেদনশীল হতে হবে। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে আমাদের আরও কাজ করতে হবে। সিডও সম্পর্কে সবাই তো জানেন না। এমনকি আইন প্রণেতারা জানেন না, আইনজীবীরা জানেন না, আইন প্রয়োগকারীরা জানেন না। সিডও-এর নাম হয়তো অনেকে জানেন। কিন্তু সিডও ব্যবহার করে কীভাবে নারীকে সুরক্ষা দেবে বিষয়টি সবাই জানেন না। তাই আমার মনে হয় এ বিষয়টা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আরও ভালোভাবে আলোচনা হওয়া উচিত। সিডও নিয়ে সর্বস্তরে শিক্ষার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। বর্তমানে সিডওকে আরও পরিপূরক করার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। সেখানে নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলের কাজ, বৈষম্য দূরীকরণের কাজ, আমরা জানি সিডও-এর মূল লক্ষ্য হলো নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ। সেখানে সহিংসতা হচ্ছে বৈষম্য দূরীকরণের সবচেয়ে বড় বাধা। সেই জায়গাতে আমাদের সিডওকে আলাদাভাবে সমৃদ্ধ করার দরকার হবে বলে আমি মনে করি। ভবিষ্যতে যা ভালো ফল আনবে বলে আশা রাখি।’

এ বিষয়ে নারীপক্ষের সভানেত্রী গীতা দাস বলেন, ‘আমরা জানি বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে সিডো সনদের ২ নম্বর এবং ১৬(১)(গ) নম্বর ধারা সংরক্ষণ দেখে অনুমোদন করেছে। তবে বিগত সরকারগুলোকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে পারি এজন্য যে, সিডও (CEDAW) সনদ বাস্তবায়নে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। উদ্যোগ নিয়েছে। প্রকল্প নিয়েছে। দুয়েকটা আইনও সংস্কার করা হয়েছে। আমি সেই তালিকা এখানে উল্লেখ করছি না। কিন্তু ৪২ বছরেও সংরক্ষণ থেকে আপত্তি উঠিয়ে না নেওয়াসহ সিডও সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য একটি ‘অভিন্ন পারিবারিক আইন’ প্রণয়নের প্রয়োজন, যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এখনো অভিন্ন পারিবারিক আইনের বিষয়টি জনসমক্ষে আলোচনা ঝুঁকিপূর্ণ; কারণ আমরা এবার নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর এমন চিত্রই পেয়েছি। তা ছাড়া সনদে যেসব রাষ্ট্র স্বাক্ষর করেছে তাদের প্রতি চার বছর পর পর সনদের বাস্তবায়নের অগ্রগতির পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। বাংলাদেশ সরকার সনদের দশম প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এতেই বোঝা যায় বাংলাদেশ সরকারের কাছে সিডও সনদ কী ধরনের গুরুত্ব বহন করে।

CEDAW সনদ শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী নারী আন্দোলনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নারী আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে, আইনি ভিত্তি দিয়েছে। নারী আন্দোলনের দাবিনামা উপস্থাপনে শক্তিশালী রেফারেন্স হিসাবে কাজ করে। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার জন্য নারী আন্দোলন রাষ্ট্রকে চাপ প্রয়োগ করতে পারে।

নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় CEDAW সনদের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু সিডও সনদে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের যে প্রতিশ্রুতি ছিল সে হিসাবে সরকারগুলো তাদের দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করেনি। এটা সনদের সমস্যা নয়, সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক কারণে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটের সমর্থন হারাতে পারে বলে সরকারগুলোর অনীহা ও অনিচ্ছা এবং নারী অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব।

নারী অধিকার বাস্তবায়নের CEDAW-এর ভূমিকার কথা তো আগেই বলা হয়েছে। এটি নির্ভর করে সরকারের প্রতিশ্রুতির ওপর। অঙ্গীকারের ওপর। যে দেশে সরকার কর্তৃক গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে এত নেতিবাচক প্রচারণা, সেখানে সিডও সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা তো বাহুল্য আলাপ আলোচনা। যা হোক, সিডো সনদের ২ নম্বর এবং ১৬(১)(গ) নম্বর ধারা সংরক্ষণ উঠিয়ে নিতে হবে।

সংক্ষেপে বলা যায়-নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বিভিন্ন মেয়াদের সুপারিশ করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনে সিডওসহ বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের দাবিনামা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কাজেই এ প্রতিবেদনের সুপারিশমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নিলেই সিডও সনদ বাস্তবায়ন করার পথে আমরা হাঁটছি বলে বিবেচিত হবে।’

সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে যেতে হলে নারী-পুরুষের একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। এর বিকল্প কিছু নেই। সেক্ষেত্রে নারীর অগ্রযাত্রায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির যেমন পরিবর্তনও জরুরি, তেমনি জরুরি সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা। নারী-পুরুষ ভেদাভেদ নয়, সমতার দৃষ্টিতে তার নাগরিকদের দেখতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজকে। তবেই সব রকম বৈষম্য থেকে নারীকে সুরক্ষা প্রদান সম্ভব হবে। আমরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য সেই নিরাপদ সমাজ ও রাষ্ট্রকে দেখতে চাই।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম