Logo
Logo
×
   

লাইফ স্টাইল

তরুণদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম

Icon

বাসস

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

তরুণদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম

সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সি তরুণদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্তের ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, অতিরিক্ত স্ক্রিন নির্ভরতা (মোবাইল ও কম্পিউটার চালানো), অনিয়মিত ঘুম এবং খাদ্যাভ্যাসকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসকদের মতে, একসময় ডায়াবেটিসকে কেবল মধ্যবয়সি বা বয়স্কদের রোগ মনে করা হলেও, এখন তরুণদের মধ্যেও এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। নগরজীবন ও ডিজিটাল নির্ভরতার কারণে জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তনই এর মূল কারণ।

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. আবু নাছির মোহিত বলেন, ‘তরুণদের মধ্যে খেলাধুলা বা শারীরিক পরিশ্রমের অভাব টাইপ-২ ডায়াবেটিস বাড়ার অন্যতম কারণ। তারা দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ বা মোবাইলের সামনে বসে থাকে। সেই সঙ্গে ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় গ্রহণ এবং অলস জীবনযাপন এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’ 

তিনি আরও জানান, রাত জেগে মোবাইল ব্যবহারের প্রবণতাও তরুণদের মধ্যে ডায়াবেটিস বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে। শরীর যখন পর্যাপ্ত এবং সময়মতো বিশ্রাম পায় না, তখন দেহে ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এটি সরাসরি রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে বাধা দেয় এবং ধীরে ধীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে; যা শেষ পর্যন্ত ডায়াবেটিসে রূপ নেয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করেছেন, ফাস্ট ফুড, জাঙ্ক ফুড গ্রহণ এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় পানের প্রবণতা বৃদ্ধি এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ায় তরুণরা মধ্যে স্থূলতা ও বিপাকজনিত নানা জটিলতা বাড়ছে। 

চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ায় গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কমে যায়। এতে প্রথমে প্রি-ডায়াবেটিস এবং পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

চিকিৎসকরা ‘প্রি-ডায়াবেটিস’ নিয়ে জনসচেতনতার অভাবের বিষয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটি এমন এক শারীরিক অবস্থা, যেখানে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ ডায়াবেটিসের পর্যায়ে পৌঁছায় না।

আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন (এডিএ)’র আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, খালি পেটে রক্তে শর্করার মাত্রা ১০০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটারের নিচে থাকলে তা স্বাভাবিক। ১০০ থেকে ১২৫ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার হলে তাকে প্রি-ডায়াবেটিস। আর ১২৬ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার বা তার বেশি হলে তাকে ডায়াবেটিস বলা হয়।

চিকিৎসকরা জানান, প্রি-ডায়াবেটিস অনেক সময় স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরে নীরবে বাসা বাঁধে। ফলে গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দেওয়ার আগ পর্যন্ত অনেক তরুণই তাদের এই শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন না। অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঝাপসা দৃষ্টি, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া এবং তীব্র ক্ষুধার মতো উপসর্গ দেখা দিলে তরুণদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, হরমোনজনিত রোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. শংকর বড়ুয়া সতর্ক করে বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের ডায়াবেটোলজি ও এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বড়ুয়া বলেন, ‘ডায়াবেটিস মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে। তরুণ রোগীদের ক্ষেত্রে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ। কারণ তাদের জীবনে অনেক আগেই এই রোগের জটিলতা শুরু হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা চলতে থাকে।’ 

তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে হৃদরোগ, কিডনি বিকল, লিভারের সমস্যা, স্নায়ুর ক্ষতি, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

বংশগত ও মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকির বিষয়ে ডা. বড়ুয়া বলেন, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে (জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস) আক্রান্ত মায়েদের সন্তানদের পরবর্তী জীবনে স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

তিনি আরও বলেন, ‘তবে গর্ভাবস্থায় যদি রক্তে শর্করার মাত্রা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তবে এই ঝুঁকি অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। শিশুদের ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাস বা বংশগতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইনসুলিন থেরাপি নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা প্রসঙ্গে ডা. বড়ুয়া বলেন, বহু রোগী অকারণে ইনসুলিন ভয় পান। অথচ অনেক ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা।

তিনি আশ্বস্ত করে জানান, ‘ইনসুলিন কোনো ক্ষতিকর বা আসক্তি তৈরি করার মতো ওষুধ নয়। এটি কেবল আমাদের শরীরে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া একটি হরমোনের কৃত্রিম রূপ মাত্র।’

ডা. বড়ুয়া আরও বলেন, ‘গর্ভাবস্থায় মুখে খাওয়ার অনেক ওষুধের চেয়ে ইনসুলিন তুলনামূলক নিরাপদ। কারণ এটি গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা ভেদ করে অনাগত সন্তানের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না।’

তিনি জানান, সঠিক সময়ে ইনসুলিন গ্রহণ করলে অগ্ন্যাশয়ের কার্যক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব এবং দীর্ঘমেয়াদে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রেও ভালো ফল পাওয়া যায়।

‘হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ বা রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত কমে যাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা। তারা এটিকে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সম্ভাব্য প্রাণঘাতী জরুরি অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তে শর্করার মাত্রা ৩.৯ মিলি মোল/লিটার বা ৭০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটারের নিচে নেমে গেলে সাধারণত হাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দেয়। এই রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে হঠাৎ ক্ষুধা লাগা, শরীর কাঁপা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা, বিভ্রান্তি ও অস্বাভাবিক আচরণ অন্যতম।

ডা. বড়ুয়া বলেন, ‘রোগী যদি সজাগ থাকেন, তবে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্লুকোজ বা চিনিযুক্ত পানি পান করাতে হবে। তবে রোগী যদি অচেতন হয়ে পড়েন, সেক্ষেত্রে মুখে কিছু দেওয়া যাবে না। দ্রুত তাকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।’

এই সংকট মোকাবিলায় চিকিৎসকরা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও সঠিক নিয়মে ওষুধ সেবনসহ নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের পরামর্শ দিয়েছেন।

চিকিৎসকরা চিনি, মিষ্টি এবং সাদা চাল ও প্রক্রিয়াজাত ময়দার মতো রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট (পরিশোধিত শর্করা) জাতীয় খাবার কমিয়ে আঁশযুক্ত খাবার, শাকসবজি এবং লাল চাল, গম ও শস্যজাতীয় খাবার বেশি খেতে বলেছেন।

পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত রোগ নির্ণয়, ব্যাপক জনসচেতনতা এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডায়াবেটিসের বিস্তার রোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .