‘অবৈধ’ বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতিতে প্রশাসক বসছে!

  এম. মিজানুর রহমান সোহেল ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:০৪ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস)
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস)

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি ‘অবৈধ’ বিবেচনা করে সেখানে প্রশাসক বসানোর চিন্তা করছে সরকার। বর্তমান কমিটি বিধি বহির্ভূতভাবে গঠন করায় উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৫ সেপ্টেম্বর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়য়ের পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. ওবায়দুল আজম স্বাক্ষরিত এক পত্রে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি কর্তৃক সংঘবিধি লঙ্ঘন ও অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংগঠনের ২০১৮ সালের ১০ মার্চ তারিখের নির্বাচন বাতিলপূর্বক বাণিজ্য সংগঠন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ১০ ধারা অনুযায়ী কেন প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না তার জবাব পত্র প্রাপ্তির ৭ কার্যদিবসের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হলো।’

পত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কারণ দর্শানোর জবাব প্রেরণে ব্যর্থ হলে বা জবাব প্রেরণ না করলে তার বা তাদের কোনো বক্তব্য নেই মর্মে গণ্য হবে। সে ক্ষেত্রে বিধি মোতাবেক পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৮ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সৈয়দা নাহিদা হাবিবা স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে জানানো হয়, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি বিধি বহির্ভূতভাবে গঠন করা হয়েছে। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে ১২ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১১টায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়য়ের পরিচালক মো. ওবায়দুল আজম বলছেন, শুনানিতে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির নির্বাচন বোর্ডের সভাপতি স্বদেশ রঞ্জন সাহা যে জবাব দিয়েছেন তা সন্তোষজনক বিবেচিত হয়নি।

বিসিএস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১০ মার্চ ২০১৮-২০ মেয়াদকালে বিসিএস নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সভাপতি হন ইঞ্জি. সুব্রত সরকার। দুই বছর মেয়াদী এই দায়িত্ব নিলেও গত ২ এপ্রিল নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. শাহিদ-উল-মুনীর। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এক মেয়াদে দুই সভাপতি আইন বহির্ভূত। আর প্রথম সভাপতি বলছেন, ‘আমি অব্যাহতি পত্র দেইনি। আমাদের নিজেদের মধ্যে যে সমঝোতা ছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে মো. শাহিদ-উল-মুনীরকে সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়।’

বিসিএস-এর অগঠনতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন অনিয়ম বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে চারটি লিখিত অভিযোগ করেন সংগঠনের সদস্য (সদস্য নং ৫৮) এটিএম শফিক উদ্দিন আহমেদ। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং সে কমিটির পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত প্রতিবেদন গত ১৯ আগস্ট জমা দেয়া হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ৮ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সৈয়দা নাহিদা হাবিবা স্বাক্ষরিত একপত্রে সংশ্লিষ্টদের ১২ সেপ্টেম্বর শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযোগকারী লিখিত অভিযোগে বলেছেন, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সংঘবিধির বিধি ১৯(খ) অনুযায়ী ২০১৮ সালের ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনের ভোট গণনা শেষে ফলাফল প্রকাশের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে নবনির্বাচিত সদস্যরা তাদের মধ্য হতে সভাপতি, সহ-সভাপতি, মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব এবং কোষাধ্যক্ষ দুই বছরের জন্য নির্বাচন করার কথা।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ২০১৮ সালের ১২ মার্চ নির্বাচন কমিশন দুই বছর মেয়াদী কমিটির পরিবর্তে এক বছর মেয়াদী দুটি কমিটি ঘোষণা করে; যা আইনত অবৈধ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির লিখিত প্রতিবেদনে ‘সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিধি পর্যালোচনা’ অংশে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির ২০১৮-২০২০ মেয়াদকালের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের জন্য স্বদেশ রঞ্জন সাহা নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং খন্দকার আতিক-ই-রাব্বানী ও কামরুল ইসলাম নির্বাচন বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।’

‘বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা ১৯৯৪ এর বিধি ২১(১) অনুযায়ী ফেডারেশন ব্যতীত অন্য বাণিজ্য সংগঠনের মেয়াদ হবে দুই বছর অথবা বিকল্প হিসেবে উক্ত সংগঠন, উপবিধি (৩) এর বিধান সাপেক্ষে এর কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ তিন বছর নির্ধারণ করতে পারবে।’

এসব বিষয় উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদনের শেষ দিকে বলা হয়েছে, ‘অভিযোগটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, বাণিজ্য সংগঠন ১৯৯৪ এর ২১(১) বিধি এবং বিসিএস-এর সংঘবিধির ১৯(খ) বিধি অনুযায়ী এক বছর মেয়াদী দুই কমিটি গঠন করার কোনো সুযোগ নেই। বিধি ভঙ্গ করে কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

‘অবৈধ’ বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির বর্তমান কমিটি বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে কমিটিতে সভাপতি হিসেবে নতুন দায়িত্ব নেয়া মো. শাহিদ-উল-মুনীর যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখনও চিঠি হাতে পাইনি। চিঠি পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত জানাতে পারবো।’

২০১৮-২০ মেয়াদকালে বিসিএস নির্বাচনে সভাপতি ইঞ্জি. সুব্রত সরকার যুগান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের (এক মেয়াদি দুই কমিটির) সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। আমি এটা কখনই গ্রহণযোগ্য মনে করিনি। এজিএমেও এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে আমাদের নিজেদের মধ্যে যে কমিটমেন্ট ছিল সেটার প্রেক্ষিতেই আমার দায়িত্ব আরেকজনের কাছে হস্তান্তর করেছি। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত ১ তারিখে দায়িত্ব হস্তান্তর করার কথা থাকলেও আমি ২ তারিখে করেছি।’

প্রসঙ্গত, গত ১১ সেপ্টেম্বর যুগান্তর অনলাইনে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির বর্তমান কমিটি ‘অবৈধ’, কাল শুনানি শিরোনামে বিসিএস-এর একজন সাবেক সভাপতির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশ করেছিল, ‘বিসিএস সভাপতি ইস্যু নিয়ে জটিল প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এসব নিয়ে যদি সমস্যা অব্যাহত থাকে তাহলে সরকার প্রশাসক বসিয়ে দিতে পারেন। আর প্রশাসক বসিয়ে দিলে এ খাতের ব্যবসায়ী ও সংগঠনের জন্য দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই বড় দুর্যোগ আসার আগেই বিধিসম্মতভাবে সভাপতির দায়িত্ব দিতে হবে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ১২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত শুনানি থেকে সে সিদ্ধান্তই এলো। ১৫ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা ‘শুনানির সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রেরণ’ নামে এক নোটিশে সে আশংকা আরও স্পষ্ট হলো। এখন পত্র প্রাপ্তির সাত কার্য দিবস পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর জানা যাবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হলো।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×