ডেসটিনি, যুবক, ইউনিপে, হলমার্কের পর কি ইভ্যালী?
jugantor
ডেসটিনি, যুবক, ইউনিপে, হলমার্কের পর কি ইভ্যালী?

  যুগান্তর রিপোর্ট  

১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৭:৩৯:৩৪  |  অনলাইন সংস্করণ

ইভ্যালী। ছবি: যুগান্তর গ্রাফিক্স টিম
ইভ্যালী। ছবি: যুগান্তর গ্রাফিক্স টিম

বাংলাদেশের মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে হাজার কোটি টাকা নিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড, যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি (যুবক), ইউনিপে টু ইউ (বিডি) লিমিটেড, হলমার্ক গ্রুপ, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। সে তালিকায় কি যুক্ত হতে যাচ্ছে ই-কমার্স ভিত্তিক মার্কেটপ্লেস ইভ্যালী?

সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্ট অনেকেই এই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ই-কমার্স নিয়ে দেশে কোনো রেগুলেটরি কমিশন না থাকার কারণে বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলে নজরে আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

তবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ইভ্যালীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমা হয়েছে। আর সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা এই নিয়ে খোঁজ খবর রাখছে। যুগান্তর পরবর্তী প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে একমাত্র ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইভ্যালীতে ক্যাশ অন ডেলিভারি (সিওডি) বা পণ্য হাতে পাওয়ার পর পেমেন্ট পদ্ধতি নেই। ফলে এখানে পণ্য ক্রয় করতে হলে অবশ্যই আগে থেকে অনলাইনে পেমেন্ট দিতে হবে। পেমেন্ট দেয়ার কয়েকমাস পর পণ্য পাওয়া যায়।

মূলত বাজার মূল্যের চেয়ে কম টাকা বা ডিসকাউন্টে পণ্য দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অফার দেয়া হয় বলেই মানুষ এখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে ইভ্যালীতে কখনই নির্ধারিত সময়ে পণ্য ডেলিভারি দেয়া হয় না। এমনকি তিন চার মাস অপেক্ষায় রেখে গ্রাহককে বলা হয় স্টক আউট হওয়ার কারণে পণ্য দেয়া যাচ্ছে না।

আর যাদের পণ্য ডেলিভারি দেয়া হয় না তাদের সরাসরি টাকা ফেরত দেয়া হয় না। ইভ্যালীর ওয়েবসাইটে গ্রাহকের করা একাউন্টে এই টাকা থাকবে এবং পরবর্তীতে পণ্য কিনলে সেখানে অ্যাডজাস্ট করা হবে।

চোর গেলে বুদ্ধি বাড়ে। দেশে হায়হায় কোম্পানিগুলো টাকা মেরে বন্ধ হয়ে গেলে সেগুলো নিয়ে টেলিভিশনে টকশো হয়, মানববন্ধন হয়। কিন্তু এসব করার আগে উদ্যোগ নিলে লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। দুদক এ ব্যাপারে এখনই উদ্যোগ নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইভ্যালীর বিরুদ্ধে হয়রানী ও প্রতারণার অভিযোগ

অনলাইনে পণ্য বিক্রেতা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালীর বিরুদ্ধে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এক গ্রাহক তিনটি মোবাইল ফোন ক্রয়ের জন্য পেমেন্ট দিলেও তাকে যথা সময়ে ফোন না দেয়া, সঠিক হ্যাণ্ডসেট না দেয়া, বদলে দেয়ার কথা বলে অতিরিক্ত টাকা নেয়া এবং একটি ফোন ডেলিভারি দিয়ে তিনটি হ্যাণ্ডসেটের রিসিট দেয়ার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

শামীম রাফি নামের ওই গ্রাহক ফেসবুকে অভিযোগের বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, গত ৭ নভেম্বর ইভ্যালী নামক একটি অনলাইন মার্কেট থেকে একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় যে, মটোরলা ই৫ প্লাস মোবাইলের ওপর প্রায় ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্ট দেয়া হচ্ছে। সেখানে ‘প্রায়’ শব্দটি উল্লেখ থাকার কারণে সম্পূর্ণ ফিফটি পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট থাকা সত্ত্বেও তারা বর্তমান বাজার মূল্য পনেরো হাজার টাকার মোবাইলটি সাত হাজার ছয়শ নব্বই টাকা দামে দিচ্ছে।

আমি সেই বিজ্ঞাপনটি দেখে অনলাইনের মাধ্যমে তিনটি মোবাইল অর্ডার করি এবং তিনটি মোবাইলের জন্য তেইশ হাজার সত্তর টাকা বিকাশের মাধ্যমে পেমেন্ট করি। উল্লেখ থাকে যে তারা সেই মোবাইলগুলো ১৫ দিনের মধ্যে ডেলিভারি করবে, কিন্তু সাত থেকে আট দিন পরে তারা একটি ফেসবুক লাইভে এসে জানায় যে তাদের সেই মটোরোলা মোবাইলটি স্টকে নেই।

এই কারণে তারা ওই মোবাইলটি দিতে পারছে না এবং সেই মোবাইল না দেওয়ার কারণে তারা কি সিদ্ধান্ত নেবে, তা আরও দুইদিন পরে জানানো হবে। অতঃপর তারা দুইদিন পরে জানায় যে, যারা মটোরলা ই৫ প্লাস মোবাইলের জন্য যারা টাকা পেইড করে ফেলেছেন, তাদের টাকাটি রিফান্ড করা হবে অথবা যারা রিফান্ড নিতে চান না, তারা (এমআই রেডমি নোট ৭এস) নামক মোবাইল ফোনটি নিতে পারবেন। কিন্তু তার জন্য আরও তিন হাজার করে টাকা জমা দিতে হবে।

যেহেতু আমার তিনটি মোবাইলরই দরকার ছিল। সেজন্য আমি আরও নয় হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে তাদেরকে পেমেন্ট করি এবং তারা আমাকে ২২ নভেম্বর ‘পেপারফ্লাই’ নামক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মোবাইল ফোন ডেলিভারি করে। কিন্তু ডেলিভারিকৃত মোবাইল ও তার মানি রিসিপ্ট দেখে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে। কেননা তারা আমাকে যে ফোনটি ডেলিভারি করেছে সেখানে মাত্র একটি ফোন ছিল এবং আমি অর্ডার করেছিলাম তিনটি ফোন এবং সেই ডেলিভারি ফোনের মানি রিসিপ্টে ছিল সেখানে তারা আমার তিনটি মোবাইল ডেলিভারি দিয়েছে ও তিনটি ফোনের টাকা আমার পেইড হয়েছে বলে উল্লেখ থাকে।

তখন আমি চিন্তা করি যে, এই ফোন যদি আমি রিসিভ করি তাহলে আমাকে বলা হবে আমি তিনটি ফোনই রিসিভ করেছি। সে জন্য আমি তাৎক্ষনিক ইভ্যালীর কাস্টমার কেয়ারে ফোন দেই এবং তাদের কাছে জানতে চাই যে আমার সঙ্গে কেন এটা করা হয়েছে? তারা বলে যে যারা যারা অর্ডার করেছিলেন প্রত্যেককে একটি করে ফোন দেওয়া হবে আর আপনি তিনটি মোবাইল অর্ডার করেছিলেন তাই আপনাকে একটি মোবাইল দেওয়া হবে ও বাকি দুইটি মোবাইলের টাকা রিফান্ড করা হবে।

কিন্তু এই কথাটি তারা আমাকে আগে জানায়নি যখন আমি মটোরোলা মোবাইলটি না পেয়ে আরও তিন হাজার করে টাকা পেমেন্ট করি। তখন যদি তারা আমাকে এই জিনিসটি উল্লেখ করত তাহলে অবশ্যই আমি একটি মোবাইলের জন্য তিন হাজার  টাকা পেমেন্ট করতাম এবং বাকি টাকা নেওয়ার জন্য আমি চেষ্টা করতাম। উল্টো তারা জালিয়াতি করে তিনটি মোবাইলের মানির রিসিপ্ট দেখিয়ে একটি মোবাইল হাতে ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করে।

ইভ্যালীর এ কেমন রিফান্ড পদ্ধতি?

ইভ্যালীতে অগ্রিম পেমেন্ট করা ছাড়া পণ্য পাওয়ার সুযোগ নেই। আবার পেমেন্ট করার পরেও অধিকাংশ মানুষ পণ্য না। কয়েকমাস আটকিয়ে রেখে পণ্য নেই বলে টাকা রিফান্ড করা হবে বলা হলেও সে টাকা রিফান্ড করা হয় না। সম্প্রতি শামীম রাফি নামের একজন ইভ্যালী গ্রাহক অভিযোগ করে বলেন, আমাকে পণ্য না দিয়ে রিফান্ড দেয়া হবে বলে জানানো হলো।

কিন্তু রিফান্ডকৃত টাকাটি তাদেরই ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্টে জমা হবে বলে জানানো হয়, যা আমি শুধু দেখতে পারবো কিন্তু সেই টাকা দিয়ে কিছুই করতে পারবো না। একমাত্র তাদের কাছে থেকে যদি কোন প্রোডাক্ট কেনা হয় তাহলেই কেবল সেই টাকাটি ব্যবহার করা যাবে। সেই প্রোডাক্ট কেনার জন্য অর্ডার দেয়া হলে কবে পাওয়া যাবে তার যেমন ঠিক নেই আবার প্রোডাক্ট নেই বললে সেই একই ফাঁকিতে পড়তে হবে।

অর্থাৎ তাদের ভার্চুয়াল একাউন্টে টাকাটা পরে থাকবে। রাফি বলেন, ওই টাকাটি যদি আমি যেই মাধ্যমে দিয়েছি সেই মাধ্যমে ফেরত পেতে চাই তাহলে তাদের রিফান্ডের শর্ত থাকে যে, যেহেতু তাদের কাছে অনেক অর্ডার জমা হয়েছে তাই তাদের সেই টাকা রিফান্ড করতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

শামীম রাফির চার অভিযোগ

শামীম রাফি তার অভিযোগগুলো বিস্তারিত লিখে সঙ্গে ডকুমেন্টস, ভিডিও, কিছু স্ক্রিনশট ও মানি রিসিপ্টের ছবিগুলো শেয়ার করেন। একইসঙ্গে তিনি চারটি পয়েন্ট উল্লেখ করেন-

১। প্রথমত মটোরলা ই৫ প্লাস মোবাইলটি ১০০ ভাগ গ্যারান্টি দিয়ে ১৫ দিন সময় নিয়ে তারা সে কমিটমেন্ট পূরণ করেনি। এমনকি যে মোবাইলটি দেওয়ার কথা ছিল সেটাও দেয়নি।

২। তারা কোনপ্রকার পূর্বশর্ত ও কোনপ্রকার পূর্বে অবগত ছাড়াই টাকা আটকে রাখছে ও হেনস্তা করছে। তারা রিফান্ডের নামে বিভিন্ন ছলচাতুরির মাধ্যমে জনগণের টাকা মাসের পর মাস আটকে রেখে জনগণকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এক কথায় তাদের কাছে জিম্মি করে ফেলছে।

৩। এখন আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি তাদের এই স্টক শেষ হয়ে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা বা অনিচ্ছাকৃত কোন ভুল নয়; বরং তারা এই টাকা ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রেখে মানুষের টাকা দিয়ে ব্যবসা করছে। জনগণকে এভাবে আর্থিক ও মানসিকভাবে হেনস্থা করার কোন অধিকার তাদের থাকতে পারে না।

৪। আনুমানিক একটি গাণিতিক হিসাব আমি দিতে চাইবো যে তারা কত টাকা জনগণের কাছ থেকে কিভাবে আটকে রাখে এবং কত দিন আটকে রাখলে কত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মোটামুটি তার একটা আনুমানিক ধারণা করবো। অতঃপর পরবর্তীতে অবশ্য আমি আমার সেই মোবাইলটি রেখে দিই এবং ডেলিভারি বয়ের কাছ থেকে সাক্ষী স্বরূপ ভিডিও ফুটেজ রেখে দিই। এমনকি মানি রিসিটে উক্ত বক্তব্য উল্লেখ করে ডেলিভারি বয়ের স্বাক্ষর রেখে দিই।

কেননা আমি ভাবলাম যে, এই মোবাইলটিও যদি আমি ফেরত দিয়ে দিই তাহলে আরও না পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আমার এখন জানতে চাওয়ার বিষয়বস্তু হচ্ছে আমি এবং আমার মত সাধারণ জনগণ কিভাবে এই আধুনিক জালিয়াতি ও প্রতারণার হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে পারি? আমি কোথায় গেলে এর সঠিক বিচার পাবো ও আমি কিভাবে আমার বাকি টাকাগুলো অল্প সময়ের মধ্যে ফেরত পেতে পারি?
 

আমার দেখা সবচেয়ে ফালতু সাইট ইভ্যালী

ই-কমার্স প্লাটফর্ম ইভ্যালীর ওয়েবসাইট নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। অনেকের মধ্যে নাজমুল নাহিদ নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, অনলাইন জাতির ত্রাণকর্তা ইভ্যালী ১০ টাকায় ১৬ জিবি পেনড্রাইভ বিতরণ করতেছে। তাই তাদের সাইট আজ হ্যাং করেছে। অবশ্য এর আগেও জীবনের প্রথম একবার ক্লিক করেছিলাম পরীক্ষামূলকভাবে। তখন তাদের ১০০% নাকি কয়শো পার্সেন্ট একটা অফার চলছিল। 

সেদিনও সাইট লোড হয় নাই। মানে আমার মতো গরীবদের পক্ষে আজ অবধি ইভ্যালী সাইটটা দেখার সৌভাগ্য হয় নাই। যেমনটা কোরবানির গোশত নিতে আসা গরীবের দল কাড়াকাড়ি করে বড়লোকের বাড়ির দরজার বাইরে, অনেকটা তেমন মনে হয় আমার কাছে এই সাইটটাকে। আপনারা ই-কমার্স, তাই না? নাকি আপনারা ত্রাণ বিতরণকারী কোনো এনজিও? কয়েক সপ্তাহ পর পর ত্রাণ দিবেন আর অনলাইন জনতা এসে হুমড়ি খেয়ে পড়বে! 

সারারাত সাইটে ক্লিক করবে কখন সাইট লোড হবে আর কখন তারা একটা ত্রাণ নিতে পারবে! সাইটই যদি লোড না হয়, তাহলে কীসের ব্যবসা আপনাদের? খালি গল্প শুনি কোটি টাকার। খালি গল্প আর বয়ানবাজি। আমার দেখা সবচেয়ে ফালতু সাইট ইভ্যালী। কারো ব্যথা লাগলে স্যরি।


অর্ডার করেছি একটা দিয়েছে অন্যটা

শারমিন নাহার নামে একজন ইভ্যালীর গ্রাহক মনিটর ও মাউস অর্ডার করে প্রতারিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ইভ্যালী আমার পিসি শপ থেকে একটি মনিটর ও মাউস অর্ডার করেছিলাম। গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রোডাক্ট হাতে পেয়েছি। ত

বে আমি মনিটর যেটা অর্ডার করেছি সেটা তারা দেয়নি। মনিটরের জন্য পেমেন্ট করছি ১০,৬০০ টাকা, আর দিছে অন্য মডেল যেটার দাম ইভ্যালীতেই ৯৯০০ টাকা। মাউসের জন্য পেমেন্ট করছি ৯৯০ টাকা। মাউস দিছে ৮৫০ টাকার। এখনো আমার টাকা ফেরত দেয়নি গত ৪ দিনে। এভাবে প্রতারিত করলে মানুষ ই-কমার্সের ওপর আকৃষ্ট হবে না। এ ব্যাপারে ইভ্যালী ও ই-ক্যাব কর্তৃপক্ষের মন্তব্য জানতে চাই।

এত ডিসকাউন্ট কীভাবে দেয় ইভ্যালী?

ইভ্যালী থেকে বিদায় নেয়া একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ইভ্যালী মূলত অন্য মানুষের টাকায় ব্যবসা করছে। প্রথম দিকে গিফট কার্ড বিক্রি করে পণ্য দেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগ করলেও দ্বিতীয় দফা থেকে আর বিনিয়োগ করার প্রয়োজন হয়নি। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, আজ যে অফার দিয়ে টাকা তুলে নিল সে পণ্য ১৫ দিন থেকে শুরু করে তিন চার মাস পর দেয়া হবে। আগামী সপ্তাহে যে অফার দিয়ে টাকা তোলা হবে সেটাও একই পদ্ধতিতে দেয়া হবে।

মানুষ দেরিতে হলেও পণ্য বা রিফান্ড পাচ্ছে। মানুষের বিশ্বাস বাড়ছে। এরপর সে আরও বড় অর্ডার দিচ্ছে। তার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদেরও অর্ডার করতে উৎসাহ দিচ্ছে। সবাই অগ্রিম পেমেন্ট ইভ্যালীতে টাকা দিয়ে রাখছে। তিন মাস আগে যদি মার্কেট থেকে ১০ কোটি টাকা ওঠে তাহলে পণ্য ডেলিভারি দেয়ার পরপরই নতুন অফারে দ্বিগুণ তিনগুণ টাকা উঠছে। ফলে প্রতিনিয়ত টাকা ইভ্যালীর কাছে জমা হচ্ছে। ফলে গ্রাহকের টাকা দিয়েই গ্রাহককে সার্ভ করা হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, শুধু গ্রাহক থেকে অগ্রিম টাকা নেয়া হচ্ছে এমন নয়। ভেন্ডর কোম্পানিগুলো থেকেও দীর্ঘ মেয়াদী বাকিতে পণ্য নেয়া হচ্ছে। ফলে ইভ্যালীতে নতুন করে বিনিয়োগ করার প্রয়োজন হচ্ছে না। তিনি বলেন, দেখে মনে হচ্ছে অনেক বিনিয়োগ হচ্ছে। আসলে ইভ্যালী কৈ এর তেল দিয়ে কৈ নয়; ইলিশ মাছ ভাজছে।

ইভ্যালীর নামে নানান অভিযোগের প্রেক্ষিতে সে বিষয়ে কমেন্ট নিতে ইভ্যালীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রাসেলের সঙ্গে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। কয়েকদিন একাধিকবার তাকে ফোন দেয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এরপর যুগান্তরের পরিচয় দিয়ে এসএমএস করা হলেও রিপ্লাই দেননি। অবশেষে গত ১০ ডিসেম্বর ১৬টি প্রশ্ন লিখে রাসেলের মেইলে পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

ইভ্যালীর বক্তব্য 

সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার পর ইভ্যালীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেল এ বিষয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইভ্যালী অর্ডারগুলো কনফার্ম করার জন্য এই পেমেন্ট নেয়। ই-কমার্সে সেলার প্রোডাক্ট রিটার্ন নিতে চায় না, তাই অর্ডার কনফার্মেশন প্রসেস এটা। 

রিফান্ড ইস্যুতে বলেন, রিফান্ড নেয়ার জন্য রিকুয়েস্ট করলে ৭-১৫ দিনের মধ্যে যে যেভাবে পেমেন্ট করে সেভাবেই পেমেন্ট রিফান্ড পায়। 

তিনি বলেন, সাধারণত আমরা কাস্টমারের দিকে একটা প্রোডাক্ট দেই। অনেক রিসেলার আমাদের থেকে কিনে মার্কেটে সেল করে, তাই প্রসেসটা দেওয়া। আমাদের করপোরেট কাস্টমারের সাথে ভাল ডিল করা, তাই আমরা সেরা অফার দিতে পারি। বড় ভর্তুকি দিতে হয় না। 

সেলারদের থেকে ক্রেডিট পাওয়ার বিষয়টি সত্য। যা আমরা প্রতিশ্রুতি দেয়া সময়ের মধ্যে পেমেন্ট করি। আমরা গ্লোবাল ই-কমার্স ট্রেন্ড ফলো করে আগাচ্ছি। আমাদের দেশি বিনিয়োগ রয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ খুব শিগগির পাবো। আলিবাবার মতো বড় কিছু কোম্পানির সঙ্গে আমাদের কথা হচ্ছে। 

ডেসটিনি, যুবক, ইউনিপে, হলমার্কের পর কি ইভ্যালী?

 যুগান্তর রিপোর্ট 
১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৫:৩৯ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
ইভ্যালী। ছবি: যুগান্তর গ্রাফিক্স টিম
ইভ্যালী। ছবি: যুগান্তর গ্রাফিক্স টিম

বাংলাদেশের মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে হাজার কোটি টাকা নিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড, যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি (যুবক), ইউনিপে টু ইউ (বিডি) লিমিটেড, হলমার্ক গ্রুপ, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। সে তালিকায় কি যুক্ত হতে যাচ্ছে ই-কমার্স ভিত্তিক মার্কেটপ্লেস ইভ্যালী?

সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্ট অনেকেই এই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ই-কমার্স নিয়ে দেশে কোনো রেগুলেটরি কমিশন না থাকার কারণে বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ মহলে নজরে আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ইভ্যালীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমা হয়েছে। আর সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা এই নিয়ে খোঁজ খবর রাখছে। যুগান্তর পরবর্তী প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে একমাত্র ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইভ্যালীতে ক্যাশ অন ডেলিভারি (সিওডি) বা পণ্য হাতে পাওয়ার পর পেমেন্ট পদ্ধতি নেই। ফলে এখানে পণ্য ক্রয় করতে হলে অবশ্যই আগে থেকে অনলাইনে পেমেন্ট দিতে হবে। পেমেন্ট দেয়ার কয়েকমাস পর পণ্য পাওয়া যায়।

মূলত বাজার মূল্যের চেয়ে কম টাকা বা ডিসকাউন্টে পণ্য দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অফার দেয়া হয় বলেই মানুষ এখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে ইভ্যালীতে কখনই নির্ধারিত সময়ে পণ্য ডেলিভারি দেয়া হয় না। এমনকি তিন চার মাস অপেক্ষায় রেখে গ্রাহককে বলা হয় স্টক আউট হওয়ার কারণে পণ্য দেয়া যাচ্ছে না।

আর যাদের পণ্য ডেলিভারি দেয়া হয় না তাদের সরাসরি টাকা ফেরত দেয়া হয় না। ইভ্যালীর ওয়েবসাইটে গ্রাহকের করা একাউন্টে এই টাকা থাকবে এবং পরবর্তীতে পণ্য কিনলে সেখানে অ্যাডজাস্ট করা হবে।

চোর গেলে বুদ্ধি বাড়ে। দেশে হায়হায় কোম্পানিগুলো টাকা মেরে বন্ধ হয়ে গেলে সেগুলো নিয়ে টেলিভিশনে টকশো হয়, মানববন্ধন হয়। কিন্তু এসব করার আগে উদ্যোগ নিলে লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। দুদক এ ব্যাপারে এখনই উদ্যোগ নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইভ্যালীর বিরুদ্ধে হয়রানী ও প্রতারণার অভিযোগ

অনলাইনে পণ্য বিক্রেতা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালীর বিরুদ্ধে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এক গ্রাহক তিনটি মোবাইল ফোন ক্রয়ের জন্য পেমেন্ট দিলেও তাকে যথা সময়ে ফোন না দেয়া, সঠিক হ্যাণ্ডসেট না দেয়া, বদলে দেয়ার কথা বলে অতিরিক্ত টাকা নেয়া এবং একটি ফোন ডেলিভারি দিয়ে তিনটি হ্যাণ্ডসেটের রিসিট দেয়ার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

শামীম রাফি নামের ওই গ্রাহক ফেসবুকে অভিযোগের বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, গত ৭ নভেম্বর ইভ্যালী নামক একটি অনলাইন মার্কেট থেকে একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় যে, মটোরলা ই৫ প্লাস মোবাইলের ওপর প্রায় ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্ট দেয়া হচ্ছে। সেখানে ‘প্রায়’ শব্দটি উল্লেখ থাকার কারণে সম্পূর্ণ ফিফটি পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট থাকা সত্ত্বেও তারা বর্তমান বাজার মূল্য পনেরো হাজার টাকার মোবাইলটি সাত হাজার ছয়শ নব্বই টাকা দামে দিচ্ছে।

আমি সেই বিজ্ঞাপনটি দেখে অনলাইনের মাধ্যমে তিনটি মোবাইল অর্ডার করি এবং তিনটি মোবাইলের জন্য তেইশ হাজার সত্তর টাকা বিকাশের মাধ্যমে পেমেন্ট করি। উল্লেখ থাকে যে তারা সেই মোবাইলগুলো ১৫ দিনের মধ্যে ডেলিভারি করবে, কিন্তু সাত থেকে আট দিন পরে তারা একটি ফেসবুক লাইভে এসে জানায় যে তাদের সেই মটোরোলা মোবাইলটি স্টকে নেই।

এই কারণে তারা ওই মোবাইলটি দিতে পারছে না এবং সেই মোবাইল না দেওয়ার কারণে তারা কি সিদ্ধান্ত নেবে, তা আরও দুইদিন পরে জানানো হবে। অতঃপর তারা দুইদিন পরে জানায় যে, যারা মটোরলা ই৫ প্লাস মোবাইলের জন্য যারা টাকা পেইড করে ফেলেছেন, তাদের টাকাটি রিফান্ড করা হবে অথবা যারা রিফান্ড নিতে চান না, তারা (এমআই রেডমি নোট ৭এস) নামক মোবাইল ফোনটি নিতে পারবেন। কিন্তু তার জন্য আরও তিন হাজার করে টাকা জমা দিতে হবে।

যেহেতু আমার তিনটি মোবাইলরই দরকার ছিল। সেজন্য আমি আরও নয় হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে তাদেরকে পেমেন্ট করি এবং তারা আমাকে ২২ নভেম্বর ‘পেপারফ্লাই’ নামক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মোবাইল ফোন ডেলিভারি করে। কিন্তু ডেলিভারিকৃত মোবাইল ও তার মানি রিসিপ্ট দেখে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে। কেননা তারা আমাকে যে ফোনটি ডেলিভারি করেছে সেখানে মাত্র একটি ফোন ছিল এবং আমি অর্ডার করেছিলাম তিনটি ফোন এবং সেই ডেলিভারি ফোনের মানি রিসিপ্টে ছিল সেখানে তারা আমার তিনটি মোবাইল ডেলিভারি দিয়েছে ও তিনটি ফোনের টাকা আমার পেইড হয়েছে বলে উল্লেখ থাকে।

তখন আমি চিন্তা করি যে, এই ফোন যদি আমি রিসিভ করি তাহলে আমাকে বলা হবে আমি তিনটি ফোনই রিসিভ করেছি। সে জন্য আমি তাৎক্ষনিক ইভ্যালীর কাস্টমার কেয়ারে ফোন দেই এবং তাদের কাছে জানতে চাই যে আমার সঙ্গে কেন এটা করা হয়েছে? তারা বলে যে যারা যারা অর্ডার করেছিলেন প্রত্যেককে একটি করে ফোন দেওয়া হবে আর আপনি তিনটি মোবাইল অর্ডার করেছিলেন তাই আপনাকে একটি মোবাইল দেওয়া হবে ও বাকি দুইটি মোবাইলের টাকা রিফান্ড করা হবে।

কিন্তু এই কথাটি তারা আমাকে আগে জানায়নি যখন আমি মটোরোলা মোবাইলটি না পেয়ে আরও তিন হাজার করে টাকা পেমেন্ট করি। তখন যদি তারা আমাকে এই জিনিসটি উল্লেখ করত তাহলে অবশ্যই আমি একটি মোবাইলের জন্য তিন হাজার টাকা পেমেন্ট করতাম এবং বাকি টাকা নেওয়ার জন্য আমি চেষ্টা করতাম। উল্টো তারা জালিয়াতি করে তিনটি মোবাইলের মানির রিসিপ্ট দেখিয়ে একটি মোবাইল হাতে ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করে।

ইভ্যালীর এ কেমন রিফান্ড পদ্ধতি?

ইভ্যালীতে অগ্রিম পেমেন্ট করা ছাড়া পণ্য পাওয়ার সুযোগ নেই। আবার পেমেন্ট করার পরেও অধিকাংশ মানুষ পণ্য না। কয়েকমাস আটকিয়ে রেখে পণ্য নেই বলে টাকা রিফান্ড করা হবে বলা হলেও সে টাকা রিফান্ড করা হয় না। সম্প্রতি শামীম রাফি নামের একজন ইভ্যালী গ্রাহক অভিযোগ করে বলেন, আমাকে পণ্য না দিয়ে রিফান্ড দেয়া হবে বলে জানানো হলো।

কিন্তু রিফান্ডকৃত টাকাটি তাদেরই ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্টে জমা হবে বলে জানানো হয়, যা আমি শুধু দেখতে পারবো কিন্তু সেই টাকা দিয়ে কিছুই করতে পারবো না। একমাত্র তাদের কাছে থেকে যদি কোন প্রোডাক্ট কেনা হয় তাহলেই কেবল সেই টাকাটি ব্যবহার করা যাবে। সেই প্রোডাক্ট কেনার জন্য অর্ডার দেয়া হলে কবে পাওয়া যাবে তার যেমন ঠিক নেই আবার প্রোডাক্ট নেই বললে সেই একই ফাঁকিতে পড়তে হবে।

অর্থাৎ তাদের ভার্চুয়াল একাউন্টে টাকাটা পরে থাকবে। রাফি বলেন, ওই টাকাটি যদি আমি যেই মাধ্যমে দিয়েছি সেই মাধ্যমে ফেরত পেতে চাই তাহলে তাদের রিফান্ডের শর্ত থাকে যে, যেহেতু তাদের কাছে অনেক অর্ডার জমা হয়েছে তাই তাদের সেই টাকা রিফান্ড করতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

শামীম রাফির চার অভিযোগ

শামীম রাফি তার অভিযোগগুলো বিস্তারিত লিখে সঙ্গে ডকুমেন্টস, ভিডিও, কিছু স্ক্রিনশট ও মানি রিসিপ্টের ছবিগুলো শেয়ার করেন। একইসঙ্গে তিনি চারটি পয়েন্ট উল্লেখ করেন-

১। প্রথমত মটোরলা ই৫ প্লাস মোবাইলটি ১০০ ভাগ গ্যারান্টি দিয়ে ১৫ দিন সময় নিয়ে তারা সে কমিটমেন্ট পূরণ করেনি। এমনকি যে মোবাইলটি দেওয়ার কথা ছিল সেটাও দেয়নি।

২। তারা কোনপ্রকার পূর্বশর্ত ও কোনপ্রকার পূর্বে অবগত ছাড়াই টাকা আটকে রাখছে ও হেনস্তা করছে। তারা রিফান্ডের নামে বিভিন্ন ছলচাতুরির মাধ্যমে জনগণের টাকা মাসের পর মাস আটকে রেখে জনগণকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এক কথায় তাদের কাছে জিম্মি করে ফেলছে।

৩। এখন আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি তাদের এই স্টক শেষ হয়ে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা বা অনিচ্ছাকৃত কোন ভুল নয়; বরং তারা এই টাকা ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রেখে মানুষের টাকা দিয়ে ব্যবসা করছে। জনগণকে এভাবে আর্থিক ও মানসিকভাবে হেনস্থা করার কোন অধিকার তাদের থাকতে পারে না।

৪। আনুমানিক একটি গাণিতিক হিসাব আমি দিতে চাইবো যে তারা কত টাকা জনগণের কাছ থেকে কিভাবে আটকে রাখে এবং কত দিন আটকে রাখলে কত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মোটামুটি তার একটা আনুমানিক ধারণা করবো। অতঃপর পরবর্তীতে অবশ্য আমি আমার সেই মোবাইলটি রেখে দিই এবং ডেলিভারি বয়ের কাছ থেকে সাক্ষী স্বরূপ ভিডিও ফুটেজ রেখে দিই। এমনকি মানি রিসিটে উক্ত বক্তব্য উল্লেখ করে ডেলিভারি বয়ের স্বাক্ষর রেখে দিই।

কেননা আমি ভাবলাম যে, এই মোবাইলটিও যদি আমি ফেরত দিয়ে দিই তাহলে আরও না পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আমার এখন জানতে চাওয়ার বিষয়বস্তু হচ্ছে আমি এবং আমার মত সাধারণ জনগণ কিভাবে এই আধুনিক জালিয়াতি ও প্রতারণার হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে পারি? আমি কোথায় গেলে এর সঠিক বিচার পাবো ও আমি কিভাবে আমার বাকি টাকাগুলো অল্প সময়ের মধ্যে ফেরত পেতে পারি?

আমার দেখা সবচেয়ে ফালতু সাইট ইভ্যালী

ই-কমার্স প্লাটফর্ম ইভ্যালীর ওয়েবসাইট নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। অনেকের মধ্যে নাজমুল নাহিদ নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, অনলাইন জাতির ত্রাণকর্তা ইভ্যালী ১০ টাকায় ১৬ জিবি পেনড্রাইভ বিতরণ করতেছে। তাই তাদের সাইট আজ হ্যাং করেছে। অবশ্য এর আগেও জীবনের প্রথম একবার ক্লিক করেছিলাম পরীক্ষামূলকভাবে। তখন তাদের ১০০% নাকি কয়শো পার্সেন্ট একটা অফার চলছিল।

সেদিনও সাইট লোড হয় নাই। মানে আমার মতো গরীবদের পক্ষে আজ অবধি ইভ্যালী সাইটটা দেখার সৌভাগ্য হয় নাই। যেমনটা কোরবানির গোশত নিতে আসা গরীবের দল কাড়াকাড়ি করে বড়লোকের বাড়ির দরজার বাইরে, অনেকটা তেমন মনে হয় আমার কাছে এই সাইটটাকে। আপনারা ই-কমার্স, তাই না? নাকি আপনারা ত্রাণ বিতরণকারী কোনো এনজিও? কয়েক সপ্তাহ পর পর ত্রাণ দিবেন আর অনলাইন জনতা এসে হুমড়ি খেয়ে পড়বে!

সারারাত সাইটে ক্লিক করবে কখন সাইট লোড হবে আর কখন তারা একটা ত্রাণ নিতে পারবে! সাইটই যদি লোড না হয়, তাহলে কীসের ব্যবসা আপনাদের? খালি গল্প শুনি কোটি টাকার। খালি গল্প আর বয়ানবাজি। আমার দেখা সবচেয়ে ফালতু সাইট ইভ্যালী। কারো ব্যথা লাগলে স্যরি।


অর্ডার করেছি একটা দিয়েছে অন্যটা

শারমিন নাহার নামে একজন ইভ্যালীর গ্রাহক মনিটর ও মাউস অর্ডার করে প্রতারিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ইভ্যালী আমার পিসি শপ থেকে একটি মনিটর ও মাউস অর্ডার করেছিলাম। গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রোডাক্ট হাতে পেয়েছি। ত

বে আমি মনিটর যেটা অর্ডার করেছি সেটা তারা দেয়নি। মনিটরের জন্য পেমেন্ট করছি ১০,৬০০ টাকা, আর দিছে অন্য মডেল যেটার দাম ইভ্যালীতেই ৯৯০০ টাকা। মাউসের জন্য পেমেন্ট করছি ৯৯০ টাকা। মাউস দিছে ৮৫০ টাকার। এখনো আমার টাকা ফেরত দেয়নি গত ৪ দিনে। এভাবে প্রতারিত করলে মানুষ ই-কমার্সের ওপর আকৃষ্ট হবে না। এ ব্যাপারে ইভ্যালী ও ই-ক্যাব কর্তৃপক্ষের মন্তব্য জানতে চাই।

এত ডিসকাউন্ট কীভাবে দেয় ইভ্যালী?

ইভ্যালী থেকে বিদায় নেয়া একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ইভ্যালী মূলত অন্য মানুষের টাকায় ব্যবসা করছে। প্রথম দিকে গিফট কার্ড বিক্রি করে পণ্য দেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগ করলেও দ্বিতীয় দফা থেকে আর বিনিয়োগ করার প্রয়োজন হয়নি। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, আজ যে অফার দিয়ে টাকা তুলে নিল সে পণ্য ১৫ দিন থেকে শুরু করে তিন চার মাস পর দেয়া হবে। আগামী সপ্তাহে যে অফার দিয়ে টাকা তোলা হবে সেটাও একই পদ্ধতিতে দেয়া হবে।

মানুষ দেরিতে হলেও পণ্য বা রিফান্ড পাচ্ছে। মানুষের বিশ্বাস বাড়ছে। এরপর সে আরও বড় অর্ডার দিচ্ছে। তার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদেরও অর্ডার করতে উৎসাহ দিচ্ছে। সবাই অগ্রিম পেমেন্ট ইভ্যালীতে টাকা দিয়ে রাখছে। তিন মাস আগে যদি মার্কেট থেকে ১০ কোটি টাকা ওঠে তাহলে পণ্য ডেলিভারি দেয়ার পরপরই নতুন অফারে দ্বিগুণ তিনগুণ টাকা উঠছে। ফলে প্রতিনিয়ত টাকা ইভ্যালীর কাছে জমা হচ্ছে। ফলে গ্রাহকের টাকা দিয়েই গ্রাহককে সার্ভ করা হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, শুধু গ্রাহক থেকে অগ্রিম টাকা নেয়া হচ্ছে এমন নয়। ভেন্ডর কোম্পানিগুলো থেকেও দীর্ঘ মেয়াদী বাকিতে পণ্য নেয়া হচ্ছে। ফলে ইভ্যালীতে নতুন করে বিনিয়োগ করার প্রয়োজন হচ্ছে না। তিনি বলেন, দেখে মনে হচ্ছে অনেক বিনিয়োগ হচ্ছে। আসলে ইভ্যালী কৈ এর তেল দিয়ে কৈ নয়; ইলিশ মাছ ভাজছে।

ইভ্যালীর নামে নানান অভিযোগের প্রেক্ষিতে সে বিষয়ে কমেন্ট নিতে ইভ্যালীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রাসেলের সঙ্গে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। কয়েকদিন একাধিকবার তাকে ফোন দেয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এরপর যুগান্তরের পরিচয় দিয়ে এসএমএস করা হলেও রিপ্লাই দেননি। অবশেষে গত ১০ ডিসেম্বর ১৬টি প্রশ্ন লিখে রাসেলের মেইলে পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

ইভ্যালীর বক্তব্য

সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার পর ইভ্যালীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেল এ বিষয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইভ্যালী অর্ডারগুলো কনফার্ম করার জন্য এই পেমেন্ট নেয়। ই-কমার্সে সেলার প্রোডাক্ট রিটার্ন নিতে চায় না, তাই অর্ডার কনফার্মেশন প্রসেস এটা।

রিফান্ড ইস্যুতে বলেন, রিফান্ড নেয়ার জন্য রিকুয়েস্ট করলে ৭-১৫ দিনের মধ্যে যে যেভাবে পেমেন্ট করে সেভাবেই পেমেন্ট রিফান্ড পায়।

তিনি বলেন, সাধারণত আমরা কাস্টমারের দিকে একটা প্রোডাক্ট দেই। অনেক রিসেলার আমাদের থেকে কিনে মার্কেটে সেল করে, তাই প্রসেসটা দেওয়া। আমাদের করপোরেট কাস্টমারের সাথে ভাল ডিল করা, তাই আমরা সেরা অফার দিতে পারি। বড় ভর্তুকি দিতে হয় না।

সেলারদের থেকে ক্রেডিট পাওয়ার বিষয়টি সত্য। যা আমরা প্রতিশ্রুতি দেয়া সময়ের মধ্যে পেমেন্ট করি। আমরা গ্লোবাল ই-কমার্স ট্রেন্ড ফলো করে আগাচ্ছি। আমাদের দেশি বিনিয়োগ রয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ খুব শিগগির পাবো। আলিবাবার মতো বড় কিছু কোম্পানির সঙ্গে আমাদের কথা হচ্ছে।