সুরস্রষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল স্মরণে

অসংখ্য জনপ্রিয় গানের গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল গতকাল ভোরবেলায় পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সংস্কৃতি অঙ্গনে। এ সুরস্রষ্টাকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে তার রাজধানীর আফতাবনগরের বাসায় ছুটে যান অনেকে। সঙ্গীতে অবদানের জন্য আহমদে ইমতিয়াজ বুলবুল একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন। তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন তারই কয়েকজন সহকর্মী।

  যুগান্তর ডেস্ক    ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিল্পীকে স্বাধীনতা দিয়ে কাজ করত বুলবুল : রুনা লায়লা

বুলবুলের সুর-সঙ্গীতে আমার প্রথম গান ছিল ‘ও বন্ধুরে প্রাণও বন্ধুরে, কবে যাবো তোমার বাড়ি পিন্দিয়া গোলাপী শাড়ি’ গানটি। প্রথম গানটিই সেই সময় বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এরপর আরও অনেক গান গেয়েছি বুলবুলের সুর-সঙ্গীতে। যেহেতু বুলবুল নিজেই গান লিখত। তাই তার প্রতিটি গানের সুর-সঙ্গীতায়োজন একটু অন্যরকমই হতো। সে তার নিজের সুরে আমার একটি অ্যালবামও করেছিল। একজন শিল্পীকে

স্বাধীনতা দিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

যে কারণে শিল্পী অনায়াসে গান গাইতেন। প্রয়াত চাষী নজরুল ইসলাম ছবিতে একটি উর্দু গান ছিল ‘তেরি জুলফে’। একটি ভার্সনে কণ্ঠ দিয়েছিলেন সুবীর নন্দী ও শাকিলা জাফর। আরেকটি ভার্সনে আমি গেয়েছিলাম। তার এই অকালে চলে যাওয়ায় সত্যিই আমাদের সঙ্গীতাঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।

যদি তার সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা বলতে পারতাম : সৈয়দ আব্দুল হাদী

বুলবুলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। মাত্র তিন দিন আগেই তাকে ফোন দিয়েছিলাম আমার এক আত্মীয়কে হাসপাতালে ভর্তি করাব বলে। তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছিলাম। সে আমাকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিল, আমার সেই আত্মীয়কে বিদেশে চিকিৎসা নিতে। আমি এখনও যাইনি। অথচ আমাকে পরামর্শ দিয়ে সে চলে যাবে না ফেরার দেশে, এটা ভাবিনি। খুব কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, যদি আরও কিছুক্ষণ কথা বলতাম। তার মতো গুণী মানুষের জন্ম আর হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। এক জীবনে বুলবুল যা দিয়ে গেছে সেগুলো চর্চা করলেই সঙ্গীতের সাগরে ভাসবেন অনেকেই। বুলবুলকে আল্লাহ জান্নাত দান করুন এটাই কামনা করি।

অসুস্থ হয়েও গানের প্রতি মনোযোগী ছিলেন তিনি : কনকচাঁপা

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাইকে আমি বাংলা গানের ‘বুলবুল’ বলি। সিনেমায় আমার গানের পরিচিতি, আমার সাফল্য শুধু তার জন্যই। আমি সিনেমায় যে গানগুলো গেয়ে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি এর মধ্যে একটি গান ছাড়া সবগুলোই বুলবুল ভাইয়ের করা। এ গুণী শিল্পীর সঙ্গে আমার শেষ একটি স্মৃতি না বলতে পারলে খুব কষ্ট হবে। শেষ যখন তার হার্টে প্লাস্টিক সার্জারি করা হয় তার আগের দিন আমি দেখতে যাব বলে তাকে ফোন দেই। তিনি আমার ফোন ধরেই বলেন, ‘কনক, ওই গানটি একটু ধরেন না, আমি শুনি। আমি বললাম কোন গানটি ভাই? পরে তিনি বলে ওঠেন, ‘অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন...।’ আমি প্রথমে গানটি গাইতে পারছিলাম না। আমার কেমন যেন লাগছিল। আমার স্বামী তখন আমাকে বলেন, ভাই বলছেন গেয়ে শুনাও। পরে বুলবুল ভাইকে বললাম আপনি প্রথম শুরু করেন। বুলবুল ভাই গাইতেই আমিও গাওয়া শুরু করি। ফোনে এ প্রথম তাকে গান শুনাই। যেখানে আমার একটু সমস্যা হতো তিনি বলে উঠতেন, ‘এই কলিটা এভাবে গান।’ বুলবুল ভাই অসুস্থ ছিলেন, তবুও গানের বিষয়ে ছিলেন তখনও মনোযোগী। ফোনে শুনেও তিনি আমার গাওয়া গান ঠিক করে দিতেন। তার সঙ্গে এই স্মৃতি আমাকে এখন পোড়ায়। যদি আরও কয়েকটি গান গেয়ে তাকে শুনাতাম ভালোই হতো। বুলবুল ভাই এখন আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি এমন একজন শিল্পী ছিলেন যার করা সব গানই সুপারহিট। তার সুরে যারা গান করেছে তারা আজ সুপরিচিত, খ্যাতিমান। বুলবুল ভাইকে আল্লাহ জান্নাতবাসী করুক- এটাই কামনা করছি।

তার কোনো গান ফ্লপ হয়নি : খুরশীদ আলম

সকালে ঘুম থেকে উঠেই বুলবুল ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ পেলাম। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও মেনে নিতে হচ্ছে, তিনি আর নেই। কিন্তু এভাবে চলে যাবেন, সেটা প্রত্যাশা কখনও করিনি। বিভিন্ন পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে দেখেছিলাম, তিনি নিজেকে গৃহবন্দি হিসেবে আবিষ্কার করেছেন। একজন সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য এটা অনেক বড় বেদনা। বড় ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। বাংলা গানে তিনিই একজন সঙ্গীতজ্ঞ, তার কোনো গান ফ্লপ হয়নি। সব গানই সুপারহিট। তিনি অসময়ে চলে গেছেন, এটা বলব না। কারণ আল্লাহ কখন কাকে কীভাবে নিয়ে যাবেন, সেটা একমাত্র তিনিই জানেন। তবে তার চলে যাওয়া সঙ্গীত জগতের জন্য বড়ই ক্ষতি।

এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। আমাদের দেশে বুলবুল ভাই একজনই ছিলেন। তিনি চলে গেলেন।

আর আসবেন না। তার জন্য দোয়া করা ছাড়া আর কিছু নেই

আমার কাছে।

তিনি ছিলেন সঙ্গীতের এক বিশাল ভাণ্ডার : কুমার বিশ্বজিৎ

বুলবুল ভাই আমার অনেক সিনিয়র। কিন্তু তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক এমন হয়ে গিয়েছিল যে, তাকে আমি ‘তুই’ সম্বোধন করতাম। কিছুদিন আগেও তার

সঙ্গে কথা হয়েছে।

তার শারীরিক অবস্থার খবর নিয়েছিলাম। কিন্তু হুট করে এভাবে চলে যাবেন, তা ভাবিনি। তার চলে যাওয়া সঙ্গীতের একটি ঝড়ের মতো। বড় অসময়ে চলে গেলেন তিনি। তার নতুন সৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে শ্রোতারা। এক এক করে অভিভাবকহারা হচ্ছি আমরা। কি বলব তাকে নিয়ে, কিছু বলতে পারছি না।

তিনি ছিলেন সঙ্গীতের এক বিশাল ভাণ্ডার। তার সম্পর্কে কোনো কিছু বলে শেষ করা যাবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে দেশপ্রেমের গান তৈরি পর্যন্ত তার যে আবেগ দেখেছি দেশ নিয়ে তা অসাধারণ। যেখানে থাক বুলবুল ভালো থাক- এটাই শেষ কথা

বলতে চাই।

বাবা নেই ভাবতে কষ্ট হচ্ছে : সালমা

খবরটা শোনার পর থেকেই আমি নিজেকে স্থির রাখতে পারছি না। আমি আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল স্যারকে বাবা বলে ডাকতাম। বাবা নেই, ভাবতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আর কখনও তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ‘মা’ বলে ডেকে উঠবেন না। মহান এই সঙ্গীতজ্ঞের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ক্লোজআপ ওয়ান অনুষ্ঠানে। আমার গান শুনে তিনি সিট থেকে উঠে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে মা ডেকেছিলেন। সেই তখন থেকেই তিনি আবার আরেকটা বাবা হিসেবে হৃদয়ের আসনে বসে আছেন। দু’তিন দিন আগেও বাবার

খবর নিতে ফোন দিয়েছিলাম।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×