আমি চাই ইন্ডাস্ট্রিটা যেন ধ্বংস করা না হয়

  হাসান সাইদুল ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাক্ষাৎকারে কুমার বিশ্বজিৎ
জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ

শ্রোতাপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ। গান করে চলেছেন তিন যুগ ধরে। গেল ভালোবাসা দিবসে প্রকাশ হয় ছেলের নির্দেশনায় তার নতুন গানের মিউজিক ভিডিও। সমসাময়িক প্রসঙ্গ ও বর্তমান ব্যস্ততা নিয়ে আজকের ‘হ্যালো...’ বিভাগে কথা বলেছেন তিনি

*যুগান্তর: সম্প্রতি ছেলের নির্দেশনায় মিউজিক ভিডিওতে কাজ করলেন। কেমন লেগেছে?

** কুমার বিশ্বজিৎ: এ গান আমার জন্য অন্যরকম অভিজ্ঞতা। কারণ এর ভিডিও নির্মাণ করেছে আমার ছেলে নিবিড়। ছেলের নির্দেশনায় কাজ, যারা এ পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয়েছেন তারা অনুভব করতে পারবেন না। কাজটিতে বাড়তি যত্ন ছিল। সেই সঙ্গে আবেগও জড়িয়ে ছিল।

* যুগান্তর: বর্তমান সঙ্গীত জগৎ নিয়ে আপনার অভিমত কী?

** কুমার বিশ্বজিৎ: আমাদের দেশের অডিও বাজার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। আগে সিডি রাইটার দিয়ে কপি করে মানুষ সহজেই গান পেয়ে যেত। এখন গান শুনতে হলে নির্দিষ্ট একটি সাইটে ঢুকে টাকা খরচ করে গান ডাউনলোড করতে হচ্ছে। ফলে অর্থের বিষয়টিও নিশ্চিত হয়েছে। সবকিছু মিলিয়েই পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম কম প্রকাশ হলেও লাভের অংশ নিশ্চিতভাবে বের হয়ে আসছে বলে আমি মনে করি।

* যুগান্তর: বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে যারা জনপ্রিয় হচ্ছেন এই জনপ্রিয়তা কি তারা ধরে রাখতে পারবেন?

** কুমার বিশ্বজিৎ: আসলে সঙ্গীত এমন একটা বিষয় এটা প্রচার দিয়ে হয় না। এটা অভিজ্ঞতার ব্যাপার। মেশিন দিয়ে মেশিনগান হতে পারে, গান নয়। মানুষের হৃদয়ে পৌঁছতে হলে গান শিখে আসতে হবে। গান-বাজনা করতে মাল-মসলা লাগে। শুধু আরেক গানের অনুকরণ করে কাটিং করে গান হবে না। আমি বলব এত লাফালাফি না করে বসে থাকেন, সময় বলে দেবে। ভিউয়ার্স মানে তো দেখা। আর ভিউয়ার্স দিয়ে তো জনপ্রিয়তা পরিমাপ করা যায় না। কারণ এখন প্রযুক্তির ব্যবহারে ভিউয়ার্সও বাড়ানো যায়।

* যুগান্তর: সঙ্গীত সত্যিই কি যন্ত্রনির্ভর হয়ে যাচ্ছে?

** কুমার বিশ্বজিৎ: লাতিন, স্প্যানিশ, জ্যামাইক্যানসহ পৃথিবীর বিশেষ কিছু টাইপ আছে, তার সঙ্গে সংস্কৃতির একটা সংমিশ্রণ ঘটানোর চেষ্টা করি। সবচেয়ে বড় সম্পদ হল আমার আবেগ, আমার কাব্য, আমার সাহিত্য আমার সংস্কৃতি। কিন্ত এটার সঙ্গে সংমিশ্রণ হবে। এমনটা সারা বিশ্বেই ঘটে। এখন আবেগটা কম বেশি আছে। আমরা এত বেশি যান্ত্রিক হয়ে গেছি, সবকিছুর মধ্যেই যন্ত্র খোঁজার চেষ্টা করি। এখন অনেকেই যে কোনো কিছুতেই তাৎক্ষণিক বহিঃপ্রকাশ করতে চায়। শিল্প-সংস্কৃতিতে তাৎক্ষণিক বহিঃপ্রকাশ বলে কোনো কিছু নেই। এটা অনেক গভীরভাবে চিন্তা ও সময় দেয়ার বিষয় আছে।

* যুগান্তর: এখন গানের কথার প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় না...

** কুমার বিশ্বজিৎ: এ সমস্যাটা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই একই সমস্যা। এখন ব্রায়ান অ্যাডামস, লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোসলের মতো শিল্পী কোথায়? পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌরি প্রসন্ন মজুমদার, গুলজারের গীতিকবি কোথায়? এরপর তো আর কাউকে দেখছি না। উনারা যা করে গেছেন, সেটা ভেঙেই খেতে হবে। সৃষ্টি যা শেষ, এখন সেটিকে মডিফাই করে খেতে হবে। আমার কাছে মনে হয় সবচেয়ে বড় সংকট যেটা, তা হল ভালো গীতিকবির অভাব। যারা এখনও লেখার মতো তাদের দিয়ে লেখানো হয় না। যারা এখনও গাওয়ার মেতো তাদের দিয়ে গাওয়ানো হয় না। আমি যা-ই করলাম, তা একটা গোষ্ঠীভিত্তিক। তবে সেটি কিন্তু অল্প সময়ের জন্য। এদের পেছনের শক্তিগুলো অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী, যার জন্য তারা এ কাজগুলোতে হয়তো বিচরণ করতে পারবে। এ সুযোগ তারা যদি নিতে পারে, তা হলে ভালো। যদি আমরা এই বিশ্বায়নের দৌড়ে, বিশ্বায়নের যুগে হেরে যাই, সেটি হবে একটা বুমেরাং।

* যুগান্তর: এখন তো মিউজিক ভিডিও ছাড়া গান প্রকাশ ভাবাই যায় না...

** কুমার বিশ্বজিৎ: গানের ব্যাপারে আমার মনে হয় বেশি নজর দেয়া উচিত। একবার মানুষকে যদি আমরা কিছু গিলিয়ে ফেলি, তখন তার চেয়ে কিন্তু নিচে নামা যায় না। প্রত্যেকটি প্রডাকশন হাউস আগে যে রকম ভিডিও বের করেছে এখন আর সে রকম করছে না। কারণ ওই টাকা ফেরত আসছে না। যে পরিমাণ বুস্ট করছে গানের পেছনে, সে পরিমাণ রিটার্ন কোথায়? লাভ যদি না হয় তা হলে কোটি কোটি ভিউয়ার্স দিয়ে কী হবে?

* যুগান্তর: তা হলে ভিউয়ার্স প্রসঙ্গে কী বলবেন?

** কুমার বিশ্বজিৎ: সরি টু সে- অনেক গান আছে, আমার মনে হয়, যিনি শিল্পী তার আশপাশের লোক ছাড়া অন্য কেউ সেই গান শুনছে কিনা। শব্দটা কিন্তু ভিউয়ার্স, শ্রোতা নয়। যদি গান মানুষ দেখে তা হলে সেটার ক্রেডিট ভিডিও পরিচালকের। শিল্পীর ক্রেডিট নয়। যত কম খরচে আমরা গান বের করে আনতে পারি সেটিই আমাদের জন্য লাভ হবে।

* যুগান্তর: এখনকার শিল্পীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

** কুমার বিশ্বজিৎ: সবার কাছে অনুরোধ, নিজেরা গান বানাও। বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে আরও সম্ভার করতে নিজেদের গান বাড়াও। নিজের পরিচিতি বাড়বে, শিল্পী হিসেবেও স্থায়িত্ব বাড়বে। মৃত্যু সবারই আছে। এটা কিন্তু ব্যবসায়িক জায়গা নয়। সঙ্গীত সৃষ্টিশীল জায়গা। হাজার হাজার গান করে কোনো লাভ নেই। দুটি ভালো গান গেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো। আমার ডিমান্ড থাকতেই অবসরে যাব। আমি আমার কথা বলছি না, আমি চাই পুরো ইন্ডাস্ট্রি ভালো থাকুক। ৩৬ বছর ধরে দৌড়াচ্ছি। শ্রোতাদের ভালোবাসা পেয়েছি। এই কৃতজ্ঞতা আমার রক্ত দিয়েও শোধ করা যাবে না। আমি চাই এই ইন্ডাস্ট্রিটা যেন ধ্বংস না করা হয়, কারো ব্যক্তিস্বার্থে।

 

 

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.