প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ চলচ্চিত্র শিল্পে অশনিসংকেত

  এসএম শাফায়েত ০৩ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুরো অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ার কারণে বিশ্বের অনেক দেশ লকডাউন শিথিল করতে শুরু করেছে। একইভাবে লকডাউন শিথিল করে সীমিত পরিসরে গণপরিবহন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অফিস খোলার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। খুলে দেয়া হয়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ হাট-বাজার। নাগরিকরা কাজকর্মে যেতে শুরু করেছেন। অথচ এখনও বন্ধ দেশের সব সিনেমাহলগুলো। করোনাভাইরাসের মহামারী ঠেকাতে ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে দেশের সব ধরনের প্রেক্ষাগৃহ। তালাবদ্ধ, দর্শকশূন্য, নিস্তব্ধ ছবিঘরে স্মরণকালে এই প্রথমবার নীরবে একটি ঈদ কেটে গেল। আর এভাবেই কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনছেন হল মালিকরা। এমনিতেই নানা সংকটে গত কয়েক বছর ধরে সিনেমা হল ও চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি চরম দুর্দিন পার করছে। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে এই শিল্পের কফিনে যেন শেষ পেরেক ঠোকা হল। সম্প্রতি যুগান্তরকে এমনটিই বলেছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি ও মধুমিতা সিনেমা হলের কর্ণধার ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ। তিনি বলেন, ‘এখন মানুষ আতঙ্কে আছেন। দিনে দিনে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যুর তালিকা বেড়েই যাচ্ছে। এখন সবকিছু খুলে দেয়ার কারণে কিন্তু আরও বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে ভালো ছবি না এলে আমরা হল খুলব না। পুরান ছবি দিয়ে আমরা হল চালাব না। এমনিতেই হলের অবস্থা তিন-চার বছর ধরে খারাপ যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের কারণে আরও বেশি খারাপ হয়ে গেল। এক কথায় এই শিল্পের কফিনে যেন শেষ পেরেক ঠোকা হল। আমাদের এখান থেকে উত্তরণ করতে হবে। এর জন্য অনেক সময় লাগবে। ভালো ভালো ছবি না এলে হলের ব্যবসা দাঁড়াবে না, আগের মতো হবে না। এর মধ্যে ২০-২৫টি হল বন্ধ হয়ে যাবে। আর খুলবেই না।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিনেমা হল মালিক বলেছেন, ‘আগে যত খারাপ অবস্থা ছিল, এখন আরও খারাপ। আমাদের লোকাল ছবি তো চলেই না। ভারতীয় ছবি যদি ছাড়ে তাহলে হলগুলোতে মানুষ আসবে, না হলে আসবে না। এই ব্যবসা ভুলে যেতে হবে, ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে। এ ব্যাপারে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি প্রয়োজন। তিনি যদি ভারতীয় ছবি মুক্তির নির্দেশ দেন, সিনেমা হলগুলো বাঁচাতে উদ্যোগ নেন তবে কিছুটা লোকসান কাটিয়ে ওঠা যেতে পারে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু বলেন, ‘২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি শুরু হলেও ১৮ মার্চ থেকেই সব রকম শুটিং, এডিটিং, ডাবিং, সিনেমা হল, ছবি মুক্তি সব বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এমনিতেই চলচ্চিত্রের ব্যবসা সারা বছর করেও আমাদের তেমন লাভ হয় না। আমরা মূলত কয়েকটা উৎসবের দিকে তাকিয়ে থাকি। এর মধ্যে ঈদুল আজহা, ঈদুল ফিতর, নববর্ষ ও দুর্গাপূজা অন্যতম। এই লকডাউনের মধ্যে আমাদের নববর্ষ ও ঈদুল ফিতর চলে গেল। সিনেমা হলের দরজা না খোলায় আমরা কোনো ছবি মুক্তি দিতে পারিনি। আর অন্য যে ছবিগুলো সারা দেশের বিভিন্ন হলে চলছিল, সেগুলো বন্ধ হয়ে গেল।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিছু কাজ বা শুটিং অর্ধেক হয়ে বন্ধ হয়ে গেল। কিছু কাজ ছিল এডিটিং পর্যায়ে। এই একটা জ্যাম লেগে গেল। নববর্ষ ও ঈদ মিলে ১৫-২০টি ছবি মুক্তি প্রতীক্ষিত ছিল, রেগুলার রিলিজের এ রকম ২০টি ছবি ছিল। সব আটকে গেল, রিলিজ হল না। এখনও পর্যন্ত সবকিছু মিলিয়ে ৩শ’ কোটি টাকা লোকসান হল আমাদের।’

বিকল্প মাধ্যমে ছবি মুক্তি দেয়া যায় কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘সিনেমা হলের বিকল্প তো কিছু নেই। তার পরেও এখন অনলাইনে অনেক ছবি মুক্তি দেয়া হচ্ছে। শাহরুখ খানের ছবি পর্যন্ত নেটফ্লিক্সে মুক্তি দেয়া হচ্ছে। তার পরেও বলব সিনেমা হলের বিকল্প কিছু নেই আসলে। বর্তমানে এই বৈশ্বিক মহামারীতে সবচেয়ে বড় গণমাধ্যম কিন্তু চলচ্চিত্র। এমন পরিস্থিতিতে কোনো প্রযোজক রিস্ক নিয়ে ছবি বানাবেন কিনা, দর্শক হলে আসবেন কিনা, টাকা উঠবে কিনা এসব হিসাব করতে আরও সময় লাগবে। এসব চিন্তাভাবনা করে অনেক কালক্ষেপণ হবে। তার পরেও তো শুরু করতে হবে, হলও চালু করতে হবে। অবশ্যই সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে। এই মুহূর্তে যারা ঘরে বসা তাদের জন্য প্রয়োজন সরকারের প্রণোদনা। আমরা কোনো সাহায্য চাইছি না। প্রণোদনা দিলে আমাদের প্রযোজকরা আবার ঘুরে দাঁড়াবে। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। ২০-২৫টি ছবি সরকারি অর্থায়নে নির্মাণ করে মুক্তি দিতে হবে। সেগুলো দিয়ে দর্শকদের হলে আনার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। এভাবে দর্শক আসা শুরু হলে একজন প্রযোজক তার ছবি মুক্তি দেয়া কিংবা বানানোর রিস্ক নেবে। সেক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতেই হবে।’

তবে আবার শুটিংয়ে ফেরা ও নতুন ছবি মুক্তি দেয়া নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। শিগগিরই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে এক বক্তব্যে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউনে পুরো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি হুমকির মুখে পড়ে গেছে। এই কয় মাসে কম করে হলেও আমাদের প্রায় ১০০ কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাই আমরা প্রযোজক সমিতি ও পরিচালক সমিতি একটা মিটিং আহ্বান করেছি। আমরা একসঙ্গে বসে আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্ত জানাব।’ তিনি আরও বলেন, ‘চলচ্চিত্রের যে চরম ক্ষতি হয়ে গেল তা থেকে আমরা কবে, কীভাবে উত্তরণ করতে পারব তা বুঝতে পারছি না। এখন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই পারেন এর থেকে উদ্ধার করতে।’

এদিকে ঝুঁকি নিয়ে যেমন ছবি বানানোর অর্থলগ্নিতে নিরুৎসাহিত প্রযোজকরা তেমনি পরিচালকরাও ভাবছেন ক্ষতির কথা। পাশাপাশি শিল্পীরাও রয়েছেন হুমকির মধ্যে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে শুটিংয়ে ফিরতে অনীহা তাদেরও। শুটিংয়ে না ফিরলে সিনেমা হবে না। সিনেমা না থাকলে হল বন্ধ থাকবে। এ প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও নায়ক জায়েদ খান বলেন, ‘সিনেমা বানালে তো তা বিপণনের মাধ্যম লাগবে। তার জন্য রয়েছে সিনেমাহল। তা যদি বন্ধ থাকে আর প্রদর্শন না করা যায় তবে তো সিনেমা বানিয়ে কোনো লাভ নেই। আগে সিনেমা হল বাঁচাতে হবে। সিনেমা হল বাঁচলেই তো সিনেমা বাঁচবে। সিনেমা বানানোর সঙ্গে সিনেমা বিপণন জরুরি। সবগুলোই একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পৃক্ত, একে অপরের পরিপূরক। এখন লকডাউন ভেঙে যেভাবে কাজে ফিরছে এভাবে সিনেমাহল খোলা সম্ভব না। করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যু পরিস্থিতির ক্রমবর্ধমান এমন পরিস্থিতিতে মানুষ সিনেমা হলে যাবে, এটা আত্মঘাতী ব্যাপার। করোনাভাইরাসের কারণে অন্যান্য সেক্টর তাদের লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারলেও সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো। সামনে যে বাজেট আসছে সেই বাজেটে যদি বড় আকারের একটা ফান্ড চলচ্চিত্রের জন্য বরাদ্দ না করে সেক্ষেত্রে চলচ্চিত্র শিল্পের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।’

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত