অনন্য মামুন বনাম বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি
jugantor
একুশের শুক্রবার
অনন্য মামুন বনাম বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি

  এফ আই দীপু  

২২ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিরোনামটা হওয়ার কথা ছিল ‘অনন্য মামুন বনাম বাংলাদেশ পুলিশ’। কারণ গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর অনলাইনে আই থিয়েটার নামে একটি অ্যাপে মুক্তিপ্রাপ্ত শাকিব খান অভিনীত ‘নবাব এলএলবি’ নামে একটি ছবিতে বিশেষ কিছু দৃশ্যের কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। পুলিশের অভিযোগ ছবিতে একটি দৃশ্যে ধর্ষণের শিকার এক নারী ও থানা পুলিশের মধ্যে কথোপকথনে পুলিশকে হেয় করা হয়েছে। এ অভিযোগে দৃশ্যটিতে অভিনয় করা সংশ্লিষ্ট অভিনেতাসহ ছবির পরিচালক অনন্য মামুনকেও গ্রেফতার করা হয়। দুই সপ্তাহের মতো কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পান অনন্য মামুন। মামলাটি এখনো বিচারাধীন। তাই এটি নিয়ে কথা বলা সমীচীন নয়। বিচারক নিশ্চয়ই বাদী-বিবাদী- দুই পক্ষের মতামত শুনে তার বিজ্ঞ রায় দেবেন। যেহেতু মামুনের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ, তাই এ লেখার শিরোনামটাও হওয়া উচিত ছিল ‘অনন্য মামুন বনাম বাংলাদেশ পুলিশ’। কিন্তু সেটা না হয়ে শিরোনাম হলো ‘অনন্য মামুন বনাম চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি’। কিন্তু কেন? কারণ, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি তাদের সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য অনন্য মামুনের সদস্য পদ বাতিল করেছে। তার অপরাধ, পুলিশকে হেয় করার কারণে সমিতির সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, পরিচালক সমিতিতে কিন্তু মামুনের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো লিখিত অভিযোগ দেয়নি। কোনো শিল্পীও এ ছবি নিয়ে অভিযোগ করেনি। এমনকি কোনো দর্শকও পরিচালক সমিতিতে গিয়ে জানায়নি, ‘আপনাদের এক সদস্যের কারণে আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে’। সমিতি স্বপ্রণোদিত হয়েই রাষ্ট্রের বিচারের আগেই নিজেদের রায় দিয়ে দিল। সমিতির সুনাম ক্ষুণ্ন হলে সেটি তারা দিতেই পারেন, হয়তো সেটি তাদের গঠনতন্ত্রেও উল্লেখ আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ গঠনতন্ত্র কি শুধু একজনের বেলায়ই প্রযোজ্য? অনন্য মামুন যদি অপরাধ করে থাকেন, সেটির বিচার রাষ্ট্র করবে। বিচারাধীনও বটে। সেখানে কোনো রকম লিখিত অভিযোগ ছাড়া একটি সংগঠন কীভাবে তাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে? এক সময় যারা অশ্লীল ছবি নির্মাণ করেছে, যেগুলোর কিছু কিছু দৃশ্য পর্নো ছবিকেও হার মানিয়েছে, সেসব নির্মাতার সদস্য পদ সমিতিতে এখনো বহাল রয়েছে। তারা সগর্বে এফডিসিতে ঘুরে বেড়ান এবং এখনো ছবি নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্র সমিতির বর্তমান সদস্য ও নেতাদের সঙ্গে তাদের হাসিমুখে প্রায়ই দেখা যায়। যাদের কারণে চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতিই এক সময় মানুষের ঘৃণার জন্ম নিয়েছে, তারা কি সমিতির সুনাম ক্ষুণ্ন করেননি? নাকি অশ্লীল ছবির নির্মাতারা, যাদের সদস্য পদ এখনো বহাল, তারা সমিতির মানসম্মান খুব উজ্জ্বল করেছেন?

অনন্য মামুন একটা উদাহরণ মাত্র। পরিচালক সমিতিকে প্রায়ই বয়কট, নিষিদ্ধ-এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। দেশের সেরা নায়ক শাকিব খানকেও তারা বয়কট করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেছে, তখনো সেই শাকিব খানের কাছে গিয়েই ছবি নির্মাণের জন্য বসেছিলেন অনেক পরিচালক। এতে কি সমিতির সম্মান খুব বড় হয়েছে? শাকিব খানের মতো অনন্য মামুনের সঙ্গেও সমিতির আচরণটাই বালখিল্য। মনে রাখতে হবে, পরিচালক সমিতিই কিন্তু এককভাবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নয়। পরিচালক সমিতির সদস্য না হলেও যে কেউ ছবি নির্মাণ করতে পারবেন এবং সেটি মুক্তিও দিতে পারবেন। সমিতির আচরণ বরং অনন্য মামুনের কাজকেও আরও একধাপ এগিয়ে দিল।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে যখন কাউকে তার সৃষ্টিশীলতায় বাধা দেওয়া হয়েছে, পরবর্তী সময়ে সে মহীরুহ হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। অনলাইনে একটি বিগ বাজেটের বাণিজ্যিক ছবি মুক্তি দিয়ে অনন্য মামুন চলচ্চিত্র শিল্পের যে নতুন দ্বার উন্মোচন করেছেন তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করা উচিত ছিল। সেটা না করে তার বিরুদ্ধে যাওয়াটা চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে হয় না। ‘নবাব এলএলবি’ ছবির ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ছিল, অর্থাৎ পুলিশ যে অভিযোগ করেছে, সেটি নিয়ে সমিতি তাকে ডাকতে পারত। সাবধান করে দিতে পারত। এমনিতেই ঢাকাই চলচ্চিত্রে পরিচালনা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পরিচালক সমিতিতে যদি সত্যিকার অর্থে এ মুহূর্তে সময়োপযোগী মেধাবী পরিচালক থাকত, তাহলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বায়োপিক বানাতে ভারতের শ্যাম বেনেগালের দরকার পড়ত না। বিষয়টি নিশ্চয়ই সমিতির বিজ্ঞ সদস্যরা অনুধাবন করতে পারছেন। আশা করি, ভবিষ্যতে পথচলার ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই তারা এটিকেও বড় উদাহরণ হিসাবে ধরে নিয়ে নিজেদের বিকশিত করবেন।

একুশের শুক্রবার

অনন্য মামুন বনাম বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি

 এফ আই দীপু 
২২ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিরোনামটা হওয়ার কথা ছিল ‘অনন্য মামুন বনাম বাংলাদেশ পুলিশ’। কারণ গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর অনলাইনে আই থিয়েটার নামে একটি অ্যাপে মুক্তিপ্রাপ্ত শাকিব খান অভিনীত ‘নবাব এলএলবি’ নামে একটি ছবিতে বিশেষ কিছু দৃশ্যের কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। পুলিশের অভিযোগ ছবিতে একটি দৃশ্যে ধর্ষণের শিকার এক নারী ও থানা পুলিশের মধ্যে কথোপকথনে পুলিশকে হেয় করা হয়েছে। এ অভিযোগে দৃশ্যটিতে অভিনয় করা সংশ্লিষ্ট অভিনেতাসহ ছবির পরিচালক অনন্য মামুনকেও গ্রেফতার করা হয়। দুই সপ্তাহের মতো কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পান অনন্য মামুন। মামলাটি এখনো বিচারাধীন। তাই এটি নিয়ে কথা বলা সমীচীন নয়। বিচারক নিশ্চয়ই বাদী-বিবাদী- দুই পক্ষের মতামত শুনে তার বিজ্ঞ রায় দেবেন। যেহেতু মামুনের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ, তাই এ লেখার শিরোনামটাও হওয়া উচিত ছিল ‘অনন্য মামুন বনাম বাংলাদেশ পুলিশ’। কিন্তু সেটা না হয়ে শিরোনাম হলো ‘অনন্য মামুন বনাম চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি’। কিন্তু কেন? কারণ, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি তাদের সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য অনন্য মামুনের সদস্য পদ বাতিল করেছে। তার অপরাধ, পুলিশকে হেয় করার কারণে সমিতির সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, পরিচালক সমিতিতে কিন্তু মামুনের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো লিখিত অভিযোগ দেয়নি। কোনো শিল্পীও এ ছবি নিয়ে অভিযোগ করেনি। এমনকি কোনো দর্শকও পরিচালক সমিতিতে গিয়ে জানায়নি, ‘আপনাদের এক সদস্যের কারণে আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে’। সমিতি স্বপ্রণোদিত হয়েই রাষ্ট্রের বিচারের আগেই নিজেদের রায় দিয়ে দিল। সমিতির সুনাম ক্ষুণ্ন হলে সেটি তারা দিতেই পারেন, হয়তো সেটি তাদের গঠনতন্ত্রেও উল্লেখ আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ গঠনতন্ত্র কি শুধু একজনের বেলায়ই প্রযোজ্য? অনন্য মামুন যদি অপরাধ করে থাকেন, সেটির বিচার রাষ্ট্র করবে। বিচারাধীনও বটে। সেখানে কোনো রকম লিখিত অভিযোগ ছাড়া একটি সংগঠন কীভাবে তাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে? এক সময় যারা অশ্লীল ছবি নির্মাণ করেছে, যেগুলোর কিছু কিছু দৃশ্য পর্নো ছবিকেও হার মানিয়েছে, সেসব নির্মাতার সদস্য পদ সমিতিতে এখনো বহাল রয়েছে। তারা সগর্বে এফডিসিতে ঘুরে বেড়ান এবং এখনো ছবি নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্র সমিতির বর্তমান সদস্য ও নেতাদের সঙ্গে তাদের হাসিমুখে প্রায়ই দেখা যায়। যাদের কারণে চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতিই এক সময় মানুষের ঘৃণার জন্ম নিয়েছে, তারা কি সমিতির সুনাম ক্ষুণ্ন করেননি? নাকি অশ্লীল ছবির নির্মাতারা, যাদের সদস্য পদ এখনো বহাল, তারা সমিতির মানসম্মান খুব উজ্জ্বল করেছেন?

অনন্য মামুন একটা উদাহরণ মাত্র। পরিচালক সমিতিকে প্রায়ই বয়কট, নিষিদ্ধ-এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। দেশের সেরা নায়ক শাকিব খানকেও তারা বয়কট করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেছে, তখনো সেই শাকিব খানের কাছে গিয়েই ছবি নির্মাণের জন্য বসেছিলেন অনেক পরিচালক। এতে কি সমিতির সম্মান খুব বড় হয়েছে? শাকিব খানের মতো অনন্য মামুনের সঙ্গেও সমিতির আচরণটাই বালখিল্য। মনে রাখতে হবে, পরিচালক সমিতিই কিন্তু এককভাবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নয়। পরিচালক সমিতির সদস্য না হলেও যে কেউ ছবি নির্মাণ করতে পারবেন এবং সেটি মুক্তিও দিতে পারবেন। সমিতির আচরণ বরং অনন্য মামুনের কাজকেও আরও একধাপ এগিয়ে দিল।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে যখন কাউকে তার সৃষ্টিশীলতায় বাধা দেওয়া হয়েছে, পরবর্তী সময়ে সে মহীরুহ হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। অনলাইনে একটি বিগ বাজেটের বাণিজ্যিক ছবি মুক্তি দিয়ে অনন্য মামুন চলচ্চিত্র শিল্পের যে নতুন দ্বার উন্মোচন করেছেন তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করা উচিত ছিল। সেটা না করে তার বিরুদ্ধে যাওয়াটা চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে হয় না। ‘নবাব এলএলবি’ ছবির ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ছিল, অর্থাৎ পুলিশ যে অভিযোগ করেছে, সেটি নিয়ে সমিতি তাকে ডাকতে পারত। সাবধান করে দিতে পারত। এমনিতেই ঢাকাই চলচ্চিত্রে পরিচালনা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পরিচালক সমিতিতে যদি সত্যিকার অর্থে এ মুহূর্তে সময়োপযোগী মেধাবী পরিচালক থাকত, তাহলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বায়োপিক বানাতে ভারতের শ্যাম বেনেগালের দরকার পড়ত না। বিষয়টি নিশ্চয়ই সমিতির বিজ্ঞ সদস্যরা অনুধাবন করতে পারছেন। আশা করি, ভবিষ্যতে পথচলার ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই তারা এটিকেও বড় উদাহরণ হিসাবে ধরে নিয়ে নিজেদের বিকশিত করবেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন