তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র দর্শন

  যুগান্তর ডেস্ক    ১৩ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র দর্শন
প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার তারেক মাসুদ

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার তারেক মাসুদ। ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার নুরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ২০০২ সালে ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হন। এরপর আরও কয়েকটি ছবি নির্মাণ করেন।

পাবনায় তার নতুন ছবির লোকেশন দেখে ফেরার সময় ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান এই খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার। আজ তার ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী। তার স্মরণে লিখেছেন আফতাব হোসেন

প্রতিটি চলচ্চিত্র নির্মাতার যেমন থাকে তার নিজস্ব চলচ্চিত্র নির্মাণের ভাষা বা গল্প বলার কৌশল তেমনই প্রত্যেক নির্মাতার থাকে নিজের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণের পেছনের গল্প। যা অনেক সময় ছাড়িয়ে যায় তার চলচ্চিত্রের গল্পকেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের প্রথম চলচ্চিত্র ‘আদম সুরত’ নির্মাণের বিহাইন্ড দ্যা সিনের গল্প কিন্তু অনেকটা সে রকমই।

সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে তখন তারেক মাসুদ একজন চলচ্চিত্র প্রেমিক ও সক্রিয় চলচ্চিত্র কর্মী। চলচ্চিত্র ও সংগঠন নিয়ে চলছে তার তারুণ্যের সময়গুলো।

ভারতের পুনেতে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়াতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনার স্বপ্ন যখন এরশাদ সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের শিক্ষার্থী বৃত্তি বাতিলের কারণে ভেস্তে গেল, তখন তিনি প্রস্তুতি নিলেন নিউইয়র্ক গিয়ে পড়াশোনা করবেন চলচ্চিত্র বিষয়ে।

এরপর একদিন খবর পেলেন শিল্পী সুলতান অসুস্থ। শিল্পী সুলতানকে নিয়ে একটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের যে চিন্তাটা অনেক আগে থেকেই ছিল, সেটি যেন আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তারপর আমেরিকা যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে পড়াশোনার জন্য যে অর্থকড়ি জমিয়েছিলেন তা নিয়ে লেগে গেলেন শিল্পী সুলতানের ওপর প্রামাণ্যকরণের কাজে। সঙ্গে ক্যামেরার পেছনে ছিলেন বন্ধু মিশুক মুনীরসহ অনেকেই। এভাবেই শুরু হয় তারেক মাসুদের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণের গল্প।

শিল্পী সুলতান ও তার বর্ণাঢ্য জীবন বা খ্যাতি নয়, আদম সুরতের প্রতিপাদ্য হল, শিল্পী সুলতানের শিল্পদর্শন, ব্যক্তি সুলতানের বিচিত্র জীবনযাপন নয়। আদম সুরত বলে সুলতানের সঙ্গে বাংলার গ্রাম ও কৃষকের আত্মিক সম্পর্কের কথা।

একদল তরুণ দিনের পর দিন কাজ করে গেছেন আর ঘুরে বেড়িয়েছেন সুলতানের সঙ্গে। নতুন করে নিজেদের আবিষ্কার করেছেন বাংলার পথ-ঘাট ও মানুষের সঙ্গে। দেখেছেন নিজের মাতৃভূমিকে শিল্পী সুলতানের চোখে। যেখানে সুলতান বলেছেন, বাংলার কৃষক আরও যত বেশি নির্যাতিত-নিপীড়িত হবে আমি তাদের আরও তত বেশি শক্তিশালী পেশিবহুল দেখাব আমার আঁকা ছবিতে।

আদম সুরত ছবির কাজ যখন তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীর শুরু করেন, তখন তারা জানতেন না, কীভাবে সিনেমা বানাতে হয় আর কীভাবেই বা ক্যামেরা চালাতে হয়। কিছুটা তাত্ত্বিক জ্ঞান ও মিশুক মুনীরের কাছে থাকা আমেরিকান সিনেম্যাটোগ্রাফার’স ম্যানুয়েল নিয়ে বাসে চিত্রা নদীর পাড়ে সুলতানের উদ্দেশে যেতে যেতেই তাদের হয়ে যায় প্রথম ক্যামেরা চালানোর শিক্ষা। যে ক্র্যাঙ্ক ক্যামেরাটি একবারে একশ ফিটের বেশি ফিল্ম শুট করতে পারত না।

তখন বাংলাদেশে আজকের মতো এত প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগেনি। আর চলচ্চিত্রে তো আরও অনেক পরের কথা। সিঙ্ক সাউন্ড ক্যামেরা তখনও বাংলাদেশে আসেনি। একটি বিবিসির দল বাংলাদেশে কাজ করতে আসে আর সেই দলের সঙ্গে কাজের সময় তারেক মাসুদ পরিচিত হন সিঙ্ক সাউন্ড (যেখানে কথা ও চিত্র একসঙ্গে রেকর্ড করা যায়) ক্যামেরার সঙ্গে।

পারিশ্রমিকের বদলে সিঙ্ক সাউন্ড ক্যামেরাটি তিনি চেয়ে নেন স্বল্প সময়ের জন্য, যা দিয়ে শিল্পী সুলতানের সাক্ষাৎকার নেয়া হয় ঢাকায় বসে। এরপর তিনি যখন চলচ্চিত্রটির সম্পাদনার কাজ শুরু করেন, তখন প্রায় প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন সম্পাদনা জানতেন না বলে। অনেক কিছুই করা সময় সাপেক্ষ বা কষ্টসাধ্য বলে তাকে শুনতে হয়েছে ‘এটি সম্ভব নয়’।

এই শিক্ষাগুলো থেকেই তরুণ নির্মাতা তারেক মাসুদ উপলব্ধি করেন, শুধু চলচ্চিত্র বা এর গল্প বলা নয়, এ শিল্পে কাজ করতে হলে বা নির্মাতা হতে হলে জানতে হবে একাধারে চিত্রনাট্য, ক্যামেরা ও লাইটের কারিগরি দিক এবং সর্বশেষ সম্পাদনার কাজ। যাতে একজন নির্মাতা তার স্বপ্নপূরণের পথে কখনও শুনতে না হয় এটি কারিগরি দিক থেকে সম্ভব নয়।

তার পরবর্তী নির্মাণগুলোর মধ্যে আমরা পেয়েছি সেই অনুভবের সমাধান। যেখানে নির্মাতা ‘অন্তর্যাত্রা’ বা ‘রানওয়ে’ চলচ্চিত্রে দেখিয়েছেন কারিগরি দিকের ব্যবহার। আর তার শৈশব অবলম্বনে ‘মাটির ময়না’ হয়ে আছে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হয়ে। যেখানে একাধারে তিনি তাত্ত্বিক ও কারিগরি দিক থেকে দিয়েছেন নিজের সর্বোচ্চ দিকটুকু।

মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে হারিয়ে না গেলে আমরা এখনও পেতাম তার নির্মাণ কৌশলের জ্ঞানের অলোকচ্ছটা। তার চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারণা ও জ্ঞানের আলোয় আজ আরও অনেক তরুণ ও ভবিষ্যৎ নির্মাতা হয়তো বলতে পারত চলচ্চিত্র নির্মাণে কীভাবে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবকিছুই জানতে হয়।

লেখক : প্রভাষক, সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter