‘কেংকরি হামেরা ঈদ করিমো’

ধানের দাম না থাকায় দিনাজপুরে কৃষক পরিবারে হতাশা

  একরাম তালুকদার, দিনাজপুর ০৩ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘কেংকরি (কেমন করে) হামেরা ঈদ করিমো? ধার-মাহাজন করি বোরো ধান আবাদ করিছেনো। বাজারত যে ধানের দাম, তাতে ধান বেচিয়া ঠিকমত ধার-মাহাজনেই শোধ করিবা পারিনাই। বাড়ি থাকি যেইলা টাকা লাগাইছেনো, ওইলার তো কুনো খবরেই নাই। টাকা না থাকিলে ঈদত বৌ-ছওয়ার (স্ত্রী-সন্তান) নয়া কাপড় তো দুরত থাউক, কি খামো? এই চিন্তায় বাঁচিনা। এই অবস্থায় ঈদের কথা হামেরা ভাবিবায় পারেছি নাই।’ ঈদের কথা জানাতে গিয়ে যুগান্তরের কাছে এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছিলেন দিনাজপুর সদর উপজেলার নশিপুর গ্রামের কৃষক বাবুল হোসেন। বাবুল হোসেন জানান, একমাত্র কৃষির ওপরই নির্ভরশীল তার পরিবার। প্রতিবারের মতো এবারও বাকিতে সার, কীটনাশকসহ অন্য সরঞ্জামাদি নিয়ে চার বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন তিনি। এর ওপর ধান কাটা-মাড়াই করতে বাড়তি টাকা গুনতে হয়েছে। কিন্তু বাজারে ধানের দাম না থাকায় ধান বিক্রি করে যা টাকা পেয়েছেন, তা দিয়ে ঠিকমতো ধার-দেনাই শোধ করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় ঈদের আনন্দ তো দূরের কথা, সামনের দিনগুলো চলবে কিভাবে- এমন হতাশা নিয়েই দিন অতিবাহিত হচ্ছে তার। শুধু বাবুল হোসেন নন, ধানের জেলা দিনাজপুরের অধিকাংশ কৃষকের এবার একই অবস্থা। আর মাত্র দু’দিন পরেই ঈদ। কিন্তু জেলার কৃষক পরিবারগুলোতে নেই ঈদের আনন্দ।

বরং হতাশার মধ্যে রয়েছে তারা। এবারে ধান আবাদ করে যে পরিমাণ লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকরা, তাতে করে ঈদের রং তাদের কাছে ফ্যাকাশে। জেলায় যে তিন লাখ ৯৩ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক পরিবার রয়েছে তাদের মধ্যে বেশিরভাগই এবারে ঈদের কাপড় ক্রয় করতে পারেনি। আর বাকি যে ৮৭ হাজার ধনাঢ্য কৃষক পরিবার রয়েছে তাদের পোশাক হলেও মনঃপুত না। দিনাজপুর সদর উপজেলার রাজারামপুর এলাকার কৃষক নয়ন ইসলাম এবার বোরো আবাদ করেছেন দুই বিঘা জমিতে। ফলন হয়েছে ভালো, কিন্তু দাম না থাকায় ঈদের কেনাকাটা করতে পারেননি। তিনি জানান, দুই বিঘা জমিতে বপন, রোপণ, সেচ, সার-কীটনাশক, কাটা-মাড়াই করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। ধান হয়েছে ৬৪ মণ। বাজারে ৬৪ মণ ধানের দাম প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। এক হাজার টাকা লোকসান, সঙ্গে শ্রম ও বিনিয়োগ বেকার। ধান বিক্রি করে ঈদের পোশাক কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু লোকসান গুনে এখনও ঈদের পোশাক কেনা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ কৃষক সমিতি দিনাজপুর শাখার সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল বলেন, আনন্দ-উৎসব নয়, বরং কৃষকরা এখন মহাবিপদে রয়েছেন। অনেকেই রয়েছেন যারা ঋণ নিয়ে আবাদ করেছেন, কিন্তু ধানের দাম না থাকায় ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। আমরাও কৃষকদের বিষয়টি বিবেচনা করে ধানসহ কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যেপ্রাপ্তির দাবিতে আন্দোলন করছি। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম বলেন, সরকারিভাবে কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় অভিযান শুরু হয়েছে। তবে সরকারিভাবে ধান ক্রয় করা হলেও এর পরিমাণ অনেক কম। জেলায় মাত্র ৫ হাজার ৪৮ টন ধান ক্রয় করা হবে যেখানে আবাদ হয়েছে কয়েক লাখ টন ধান। ধান ক্রয়ের যে বরাদ্দ তা বৃদ্ধির জন্য আমরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি এবং আগামী জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও বিষয়টি উত্থাপন করা হবে। যাতে করে কৃষকরা ধানসহ তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান সেদিকে আমরা খেয়াল রাখছি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×