২০ কোটি টাকা লোপাটের পাঁয়তারা

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন সার্কেলের জরুরি সংস্কার

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  বিলাস দাস, পটুয়াখালী (দ.) ও মজিবুল হক কিসলু, বরগুনা (দ.)

অপরিকল্পিতভাবে বেড়িবাঁধ নির্মাণ, দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে প্রতি বছর পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন সার্কেলের আওতায় কোটি কোটি টাকা লোপাট করার অভিযোগ উঠেছে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি, বরং ফনীর অজুহাতে বরাদ্দ আরও বেড়েছে। সদ্য পটুয়াখালীর উপকূলে মৃদু আঘাত হানা ফনীর অজুহাতে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন সার্কেলের আওতায় ৩টি বিভাগীয় দফতরের অধীনে অন্তত ২০ কোটি টাকা লোপাটের পাঁয়তারা চলছে। ইতিমধ্যে পাউবোর পছন্দের ঠিকাদার জরুরি ঘোষণাকৃত বিধ্বস্ত বাঁধে কাজ শুরু করে দিয়েছে। অথচ ওইসব বিধ্বস্ত বাঁধের বেশ কিছু অংশে চলমান ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মেরামত কাজ করা হয়েছে, যার মেয়াদ এখনও চলমান এবং সেসব কাজের অনুকূলে চূড়ান্ত বিল এখনও পরিশোধ করা হয়নি। এ সুযোগে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পটুয়াখালী পাউবো সার্কেলের অধীনে আপদকালীন জরুরি কাজের নামে ৩টি বিভাগের আওতায় প্রায় অন্তত ৮ কোটি টাকার মেরামত কাজ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অনুন্নয়ন চূড়ান্ত খাতের আওতায় আরও প্রায় ৮ কোটি টাকার কাজ করা হয়েছে। চলতি মাসেই সেসব কাজের চূড়ান্ত বিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হবে। কলাপাড়া পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কলাপাড়া বিভাগে আন্দারমানিক নদীর তীরবর্তী নিজামপুরে ৫টি প্যাকেজে প্রায় ২০০ মিটার বিকল্প বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। বাঁধের অনুকূলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট নকশানুসারে নদী থেকে নিরাপদ দূরত্বে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ, দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং সঠিক তদারকি না হওয়ায় ঠিকাদার তার ইচ্ছামতো কাজ সম্পন্ন করেছে। ওই কাজের অনুকূলে এলাকাবাসীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে- নির্মিত বাঁধের উচ্চতা কম, উপরিভাগের প্রশস্ততা কম, নদী ও গ্রামের দিকের ঢাল নির্দিষ্ট নকশানুসারে করা হয়নি। মাটির চাকা ভেঙে বাঁধ নির্মাণ করার কথা থাকলেও সরেজমিন দেখা যায় চাকা না ভেঙেই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। বড় বড় মাটির চাকা এখনও দৃশ্যমান। সামান্য বৃষ্টি হলেই বড় চাকার মাঝে ফাঁকা দিয়ে বাঁধে গর্তের সৃষ্টি হলে বাঁধ ধসে যায়। এমনকি বাঁধের গোড়া থেকে অতি গভীর করে মাটি কেটে ওই বাঁধে ব্যবহার করায় নির্মিত বাঁধটি হুমকির মুখে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে কলাপাড়া পাউবোর উপসহকারী মিজানুর রহমান ও তারিক বলেন, সব কিছু সঠিকভাবে করা সম্ভব নয়। টুকিটাকি গরমিল থাকতে পারে। আপনি একদিন সময় করে কলাপাড়াতে আসেন। বিস্তারিত সাক্ষাতে হবে।

পটুয়াখালী পাউবো সার্কেলের অধীনে আপদকালীন জরুরি কাজের নামে বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা, রূহিতা ও জিনতলাতে প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ মেরামত কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। অথচ ওই স্থানগুলোতে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে আপদকালীন জরুরি কাজের আওতায় এবং অনুন্নয়ন রাজস্ব খাতের আওতায় প্রায় ৪ কোটি টাকার কাজ করা হয়েছে। যার মেয়াদ এখনও চলমান এবং চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়নি। এভাবে একই স্থানে একাধিকবার কাজের নামে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে পাউবোর কর্মকর্তা এবং তাদের পছন্দের ঠিকাদার। পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ড সার্কেল অফিস জানান, পটুয়াখালী বিভাগ থেকে ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা, কলাপাড়া ৩ কোটি ৮২ লাখ এবং বরগুনা জেলায় ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়ে কাজ করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে পটুয়াখালী, কলাপাড়া এবং বরগুনা জোনের অনুকূলে আরও চাহিদা পাঠানো হবে বলে জানান পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের সার্কেল। এদিকে বরগুনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক কুমার দাস বলেন, এ জেলায় ২২টি পোল্ডারে ৫৯ প্যাকেজে জরুরি মেরামতের আওতায় প্রাথমিকভাবে ৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। তবে কাজের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি অস্বীকার করে জানান, অভিযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু কোনো অনিয়ম হয়নি।

এ প্রসঙ্গে পটুয়াখালী পাউবোর সার্কেল তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মজিবুর রহমান যুগান্তরকে জানান, কাজে অনিয়ম হয়েছে এমন অভিযোগ সত্য নয়। তবে মাঠ পর্যায়ে খোঁজখবর নিয়ে দেখতে হবে। এরকম কিছু হলে ব্যবস্থা নেব। জরুরি কাজের মেয়াদ শেষ না হলে ওই প্রকল্পের দায়দায়িত্ব ঠিকাদারের, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায়ভার ঠিকাদারের- এমন নিয়ম নাই। সঠিক নিয়মেই কাজ হচ্ছে। তবে জরুরি মেরামতের জন্য তিনটি বিভাগে কি পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ আসছে, সে তথ্য চাইলে তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী তথ্য অধিকার আইনের বাধা রয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিষেধ রয়েছে বলে অপারগতা প্রকাশ করেন।