ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল

ডাক্তার সংকট ও দালালের দৌরাত্ম্য

প্রকাশ : ২৭ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মোঃ শফিকুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

দালাল ও বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের দৌরাত্ম্য, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও শয্যা না থাকায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে রোগীরা কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে এ হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ ও অর্থপেডিক বিশেষজ্ঞ না থাকায় রোগীদের বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে ৫৭ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে ৪৭ জন চিকিৎসক। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের দু’জন শিশু বিশেষজ্ঞ, একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও ১ জন অর্থপেডিক্স বিশেষজ্ঞের পদ খালি রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বর্তমানে প্রতিদিন হাসপাতালে গড়ে এক হাজার দুইশ’ থেকে দেড় হাজার রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। এর মধ্যে তিন থেকে সাড়ে তিনশ’ রোগীকে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে ২৫০টি শয্যা থাকায় বাকি রোগীকে হাসপাতালের ফ্লোরে চাটাই ফেলে থাকতে হয়।

হাসপাতালের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দালাল। প্রতিদিন সকাল ৮টার পর থেকেই চিহ্নিত দালালরা এসে হাসপাতাল কম্পাউন্ডে জড়ো হয়। রোগীরা টিকিট কাটার জন্য কাউন্টারে দাঁড়ালে অনেক সময় রোগী বেশি চোরেরা তাদের পকেট কাটে। এছাড়া দালালদের খপ্পরে পড়ে গ্রামের সহজ-সরল লোকেরা বিভিন্ন সময় প্রতারিত হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দালালদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও হাসপাতালে কমছে না দালালদের দৌরাত্ম্য। অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কয়েকজন কর্মচারী এই দালালীর সঙ্গে জড়িত। এছাড়া হাসপাতালে রয়েছে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য। তারা ডিউটি চলাকালীন বিভিন্ন চিকিৎসকের চেম্বারে বসে চিকিৎসকদের বিভিন্ন ধরনের উপহার দিয়ে তাদের কোম্পানির ওষুধ লিখতে প্রভাবিত করেন। বিক্রয় প্রতিনিধিরা রোগীদের প্রেসক্রিপশন নিয়ে টানাটানি করে। হাসপাতাল কম্পাউন্ডে থাকা নার্সিং ইন্সটিটিউটের অ্যাম্বুলেন্সচালক মো. রফিকের (ড্রাইভার রফিক) নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন। ড্রাইভার রফিকের আছে নিজস্ব চারটি অ্যাম্বুলেন্স। তিনি একটি প্রভাবশালী চক্রকে নিয়ে এই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ীরা রোগীদের কাছ থেকে নিজেদের মনগড়া মতো ভাড়া আদায় করেন। তবে এ ব্যাপারে অ্যাম্বুলেন্সচালক মো. রফিকের (ড্রাইভার রফিক) মুঠোফোনে কল দিলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় জানার সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে দেন।

সিন্ডিকেটের কারণে কেউ ইচ্ছে করলে বাইরে থেকে অ্যাম্বুলেন্স এনে রোগী পরিবহন করতে পারে না। এছাড়া হাসপাতালে রয়েছে রক্ত ব্যবসায়ী গ্রুপ। ২০-২৫ জন রক্ত ব্যবসায়ী রোগীদের কাছে চড়া দামে রক্ত বিক্রি করে। এই রক্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে অধিকাংশই মাদকসেবী।

সরেজমিন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের বাথরুমগুলোর অবস্থা একেবারেই করুণ। পর্যাপ্ত লাইটিংয়ের অভাবে রাতে হাসপাতালে ভুতুড়ে অবস্থার সৃষ্টি হয়। রোগী ও তাদের আত্মীয়স্বজন জানান, হাসপাতালের বাথরুমগুলো ব্যবহার অনুপযোগী। তারা বলেন, হাসপাতাল থেকে ৩০ প্রকার ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করার কথা থাকলে ১০-১২ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শওকত হোসেন জানান, টিকিট কাউন্টারের জায়গা ছোট হওয়ায় রোগীরা টিকিট কাটতে কষ্ট করে। হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্স আছে। বাইরে থেকেও প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগী পরিবহন করা হচ্ছে। হাসপাতালে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রোগী ও তাদের স্বজনরা থাকায় বাথরুমগুলোর ওপর চাপ পড়ছে। এছাড়া বাথরুমগুলো পুরনো হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। বাথরুমগুলো সংস্কার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা নিয়মিত ডিউটি করেন। ডা. শওকত হোসেন আরও বলেন, হাসপাতালে ৩০ ধরনের ওষুধ রোগীদের বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে এছাড়া বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের সপ্তাহে দু’দিন রোববার ও বুধবার দুপুর ১২টার পর ভিজিট করতে বলা হয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহ আলম বলেন, ড্রাইভার রফিকের ব্যাপারে অনেকে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি দেখা হবে।