মহড়ায় সীমাবদ্ধ সংস্কৃতিচর্চা
jugantor
মহড়ায় সীমাবদ্ধ সংস্কৃতিচর্চা
রাবিতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেই প্রাণচাঞ্চল্য

  রাজশাহী ব্যুরো  

১১ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সংস্কৃতিচর্চার খ্যাতি ছিল দেশব্যাপী। কেবল সংস্কৃতিচর্চাই নয়, দেশের যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে ও শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে সব সময় সরব থেকেছেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। আগে ব্যাপকভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করত সংগঠনগুলো। কিন্তু নানামুখী সংকটে সংস্কৃতিচর্চার সেই পুরনো ঐতিহ্য ক্রমেই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। নিয়মিত মহড়া হলেও বিভিন্ন দিবসকেন্দ্রিক কিছু অনুষ্ঠান ছাড়া তাদের সাংস্কৃতিক আয়োজন চোখে পড়ে কদাচিৎ। ফলে চার দেয়ালেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপকরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আগের মতো সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর এমন স্থবিরতা ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয়েছে। একটি সংগঠনের বিকাশে বেশ কিছু নিয়ামক রয়েছে। তার মধ্যে আদর্শ, কর্মী, আর্থিক স্বচ্ছলতা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বর্তমানে এ সবকটিতে সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবার একদিকে সংগঠনগুলোর অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসিসিতে সংস্কৃতিচর্চার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। বর্তমান শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতিচর্চার প্রতি আগ্রহ আগের তুলনায় অনেক কম। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ক্লাস সময় থাকায় শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ঠিকভাবে সময় দিতে পারছেন না। সংগঠনগুলো হয়তো নিয়মিত মহড়া করছে, কিন্তু সেটা কেবল চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১৮টি সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে অনুশীলন নাট্যদল, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, অরণি সাংস্কৃতিক সংসদ, সমকাল নাট্যচক্র, তীর্থক নাটক, উদীচী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ড্রামা অ্যাসোসিয়েশন (রুডা), অ্যাসোসিয়েশন ফর কালচার অ্যান্ড এডুকেশন, বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার রাজশাহী, গণশিল্পী সংস্থা, স্বনন উল্লেখযোগ্য। হাতেগোনা দু-একটি সংগঠন ছাড়া বাকিগুলো নামসর্বস্ব হয়ে পড়েছে। এমনকি নানামুখী সমস্যা ও কর্মী সংকটের কারণে আবহমান, ঐকতান, মুক্ত পাঠক দল, মুক্ত চিন্তা পরিষদ, সমগীত সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাবেক সাংস্কৃতিক কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হলগুলোতে আগে ব্যাপকভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বার্ষিক নাটক, রাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংখ্যা বেড়ে যায় তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট গঠন করা হয়। এটি দেশের প্রথম সাংস্কৃতিক জোট। তখন সংগঠনগুলোর মধ্যে কে কত ভালো অনুষ্ঠান করবে তা নিয়ে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা বিদ্যমান ছিল। বিগত প্রায় ১০ বছর ধরে এ রমরমা অবস্থা অনেকটা উল্টো স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে। কর্মীরাও অনিয়মিত, আবার তাদের মধ্যে আন্তরিকতারও ঘাটতি রয়েছে।

সংগঠনগুলোর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার কারণ হিসেবে বিশিষ্ট নাট্যজন অধ্যাপক মলয় ভৌমিক বলেন, নিষ্ক্রিয়তার কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, পরিবারগুলোতে সংস্কৃতিচর্চা নেই। বর্তমানে পরিবারে সন্তানদের জোর করে লেখাপড়া করানো হচ্ছে। সংস্কৃতিচর্চায় পারিবারিক যে ঐতিহ্য ছিল সেটি হারিয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, ছোটবেলা থেকে শিক্ষাব্যবস্থা পাল্টে গেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালগুলোর লেখাপড়ার যে পদ্ধতি সেটিও সংস্কৃতিবিমুখ। তৃতীয়ত, নিউ মিডিয়ার প্রতি শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ। এ ব্যাপার কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি আবদুল মজিদ অন্তর বলেন, দেশে চলমান যে কোনো ধরনের অনিয়ম এবং দুর্নীতির প্রতিবাদ করতেন সবার আগে সাংস্কৃতিক কর্মীরা। কিন্তু বর্তমানে এ ধরনের প্রতিবাদ খুব কমই দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক সংগঠন আছে কিন্তু তাদের কর্মী ও আর্থিক সংকট প্রকট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক হাসিবুল আলম প্রধান বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে অভাবগুলো ছিল তা সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু অবকাঠামো সংকটের যে বিষয়টি তা সমাধান করা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

মহড়ায় সীমাবদ্ধ সংস্কৃতিচর্চা

রাবিতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেই প্রাণচাঞ্চল্য
 রাজশাহী ব্যুরো 
১১ মার্চ ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সংস্কৃতিচর্চার খ্যাতি ছিল দেশব্যাপী। কেবল সংস্কৃতিচর্চাই নয়, দেশের যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে ও শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে সব সময় সরব থেকেছেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। আগে ব্যাপকভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করত সংগঠনগুলো। কিন্তু নানামুখী সংকটে সংস্কৃতিচর্চার সেই পুরনো ঐতিহ্য ক্রমেই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। নিয়মিত মহড়া হলেও বিভিন্ন দিবসকেন্দ্রিক কিছু অনুষ্ঠান ছাড়া তাদের সাংস্কৃতিক আয়োজন চোখে পড়ে কদাচিৎ। ফলে চার দেয়ালেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপকরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আগের মতো সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর এমন স্থবিরতা ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয়েছে। একটি সংগঠনের বিকাশে বেশ কিছু নিয়ামক রয়েছে। তার মধ্যে আদর্শ, কর্মী, আর্থিক স্বচ্ছলতা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বর্তমানে এ সবকটিতে সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবার একদিকে সংগঠনগুলোর অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসিসিতে সংস্কৃতিচর্চার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। বর্তমান শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতিচর্চার প্রতি আগ্রহ আগের তুলনায় অনেক কম। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ক্লাস সময় থাকায় শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ঠিকভাবে সময় দিতে পারছেন না। সংগঠনগুলো হয়তো নিয়মিত মহড়া করছে, কিন্তু সেটা কেবল চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১৮টি সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে অনুশীলন নাট্যদল, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, অরণি সাংস্কৃতিক সংসদ, সমকাল নাট্যচক্র, তীর্থক নাটক, উদীচী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ড্রামা অ্যাসোসিয়েশন (রুডা), অ্যাসোসিয়েশন ফর কালচার অ্যান্ড এডুকেশন, বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার রাজশাহী, গণশিল্পী সংস্থা, স্বনন উল্লেখযোগ্য। হাতেগোনা দু-একটি সংগঠন ছাড়া বাকিগুলো নামসর্বস্ব হয়ে পড়েছে। এমনকি নানামুখী সমস্যা ও কর্মী সংকটের কারণে আবহমান, ঐকতান, মুক্ত পাঠক দল, মুক্ত চিন্তা পরিষদ, সমগীত সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাবেক সাংস্কৃতিক কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হলগুলোতে আগে ব্যাপকভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বার্ষিক নাটক, রাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংখ্যা বেড়ে যায় তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট গঠন করা হয়। এটি দেশের প্রথম সাংস্কৃতিক জোট। তখন সংগঠনগুলোর মধ্যে কে কত ভালো অনুষ্ঠান করবে তা নিয়ে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা বিদ্যমান ছিল। বিগত প্রায় ১০ বছর ধরে এ রমরমা অবস্থা অনেকটা উল্টো স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে। কর্মীরাও অনিয়মিত, আবার তাদের মধ্যে আন্তরিকতারও ঘাটতি রয়েছে।

সংগঠনগুলোর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার কারণ হিসেবে বিশিষ্ট নাট্যজন অধ্যাপক মলয় ভৌমিক বলেন, নিষ্ক্রিয়তার কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, পরিবারগুলোতে সংস্কৃতিচর্চা নেই। বর্তমানে পরিবারে সন্তানদের জোর করে লেখাপড়া করানো হচ্ছে। সংস্কৃতিচর্চায় পারিবারিক যে ঐতিহ্য ছিল সেটি হারিয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, ছোটবেলা থেকে শিক্ষাব্যবস্থা পাল্টে গেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালগুলোর লেখাপড়ার যে পদ্ধতি সেটিও সংস্কৃতিবিমুখ। তৃতীয়ত, নিউ মিডিয়ার প্রতি শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ। এ ব্যাপার কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি আবদুল মজিদ অন্তর বলেন, দেশে চলমান যে কোনো ধরনের অনিয়ম এবং দুর্নীতির প্রতিবাদ করতেন সবার আগে সাংস্কৃতিক কর্মীরা। কিন্তু বর্তমানে এ ধরনের প্রতিবাদ খুব কমই দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক সংগঠন আছে কিন্তু তাদের কর্মী ও আর্থিক সংকট প্রকট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক হাসিবুল আলম প্রধান বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে অভাবগুলো ছিল তা সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু অবকাঠামো সংকটের যে বিষয়টি তা সমাধান করা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন