কুড়িগ্রামে বন্যায় কৃষিতে ক্ষতি ১৪০ কোটি টাকা
jugantor
কুড়িগ্রামে বন্যায় কৃষিতে ক্ষতি ১৪০ কোটি টাকা
বালুতে ঢেকে গেছে এক হাজার হেক্টর জমি

  কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি  

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কুড়িগ্রামে বন্যায় কৃষিতে ক্ষতি ১৪০ কোটি টাকা

বানের পানি নামলে অন্য বছরের মতো আমন আবাদের স্বপ্ন ছিল কৃষক দেলোয়ার হোসেনের। কিন্তু পানি নামার পর দেখা গেল তিন বিঘা জমির পুরাটাই বালুতে ঢেকে অনাবাদী হয়ে গেছে। পরিবারের খাবার জোগাতে বাধ্য হয়ে কাজের সন্ধানে ঢাকায় যেতে হয়েছে।

কুড়িগ্রাম সদরের চর সারডোবের দেলোয়ার হোসেনের মতো অনেক কৃষকের কপালে আসন্ন খাদ্য সংকটের আশঙ্কায় চিনমশার ভাঁজ। সরকারি তথ্য মতে জেলায় এক লাখ ৩৫ হাজার কৃষকের ফসল ক্ষতি হয়েছে ১৪০ কোটি টাকা মূল্যের।

সারডোব গ্রামের কৃষক দুখু মিয়া বলেন, ‘হামার টাকা পইসা নাই। বালা সরাই কেমন করি। সরকার সাহায্য করলে হামরা মিষ্টিকুমড়া আর ভুট্টা আবাদ করলোং হয়।’

ক্ষতিগ্রস্ত বর্গাচাষী রাবেয়া বেগম জানান, বালুজমিতে ফসল ফলাতে প্রচুর সেচের পানি দরকার। বর্তমান অবস্থায় তাদের পক্ষে সেচের অর্থ জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ গ্রামের কনছার আলী জানান, নদীভাঙনের তাণ্ডবে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন এ গ্রামের অনেকেই। তার ওপর বন্যায় পাট নষ্ট ও জমিতে বালুর কারণে আমন রোপণ করতে না পারায় এ এলাকার ঘরে ঘরে এখন হাহাকার। সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, এ বছর বন্যায় পানি, ভাঙন ও বাঁধ ভেঙে কুড়িগ্রামে কমপক্ষে এক হাজার হেক্টর আবাদী জমি ঢেকে গেছে বালুতে।

গত কয়েক বছরে এসব জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলিয়ে চরাঞ্চলের কৃষকরা অভাব মোচন করলেও এ বছর আমন চাষ করতে না পেরে খাদ্য সংকটের শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় কুড়িগ্রামে ১৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল বিনষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার কৃষক। সরকারিভাবে টাকার অংকে কৃষিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪০ কোটি টাকা। বন্যা-পরবর্তী সময়ে এক হাজার ২০০ কৃষককে এক বিঘা করে জমিতে মাষকালাই চাষ করার জন্য বীজ ও সার দেয়া হয়েছে।

এছাড়া প্রায় সাত হাজার কৃষককে আমনের চারা ও ১০ হাজার কৃষককে শাকসবজির বীজ দেয়া হয়েছে। তবে বালুজমিতে চাষযোগ্য ফসল আবাদের জন্য এখনও কোনো বরাদ্দ আসেনি। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সারডোব গ্রামে মধ্য জুলাইয়ে একটি বিকল্প বাঁধ ভাঙার কারণে শত শত একর আবাদী জমিতে তিন থেকে পাঁচ ফুট বালুতে ঢেকে গেছে।

একই অবস্থা পার্শ্ববর্তী জয়কুমর ও হলোখানা গ্রামেও। এসব এলাকার কৃষকরা এবার আমন চাষ করতে না পেরে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি বালুতে ঢেকে যাওয়ায় নষ্ট হয়েছে পাট, কলা, সবজি ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল। ফলে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে হাজার হাজার কৃষক।

হলোখানা গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমান জানান, গত বছর যে জমিগুলোতে আমনের বাম্পার ফলন হয়েছিল, এবার সবগুলো জমি বালুতে ঢাকা পড়েছে। তার ১০ বিঘা জমি বালুতে ঢাকা পড়েছে, এসব জমিতে কয়েক বছর ফসল ফলানো যাবে কীনা তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তিনি।

একই অবস্থা বাঙ্গর আলী, কলিম উদ্দিনসহ অনেক কৃষকের। বালুর কারণে আবাদ না হওয়ায় কৃষক ও দিনমজুর পরিবারগুলোতে আসন্ন খাদ্য সংকটের দুশ্চিন্তা ভর করেছে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা চান বালু জমিতে চাষের উপযোগী মিষ্টিকুমড়া, মিষ্টিআলু ও ভুট্টার মতো ফসল চাষ করতে। এক্ষেত্রে রয়েছে পুঁজির সংকট। তাই এ সংকট মেটাতে তারা চান সরকারি সহায়তা।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানান, বন্যায় জমি অনাবাদী ও ফসল নষ্টের বিষয়টি তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। কৃষি প্রণোদনার কোনো বরাদ্দ এলে ক্ষতি পোষাতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিভিন্ন সহায়তা দেয়া হবে।

কুড়িগ্রামে বন্যায় কৃষিতে ক্ষতি ১৪০ কোটি টাকা

বালুতে ঢেকে গেছে এক হাজার হেক্টর জমি
 কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি 
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
কুড়িগ্রামে বন্যায় কৃষিতে ক্ষতি ১৪০ কোটি টাকা
ফাইল ছবি

বানের পানি নামলে অন্য বছরের মতো আমন আবাদের স্বপ্ন ছিল কৃষক দেলোয়ার হোসেনের। কিন্তু পানি নামার পর দেখা গেল তিন বিঘা জমির পুরাটাই বালুতে ঢেকে অনাবাদী হয়ে গেছে। পরিবারের খাবার জোগাতে বাধ্য হয়ে কাজের সন্ধানে ঢাকায় যেতে হয়েছে।

কুড়িগ্রাম সদরের চর সারডোবের দেলোয়ার হোসেনের মতো অনেক কৃষকের কপালে আসন্ন খাদ্য সংকটের আশঙ্কায় চিনমশার ভাঁজ। সরকারি তথ্য মতে জেলায় এক লাখ ৩৫ হাজার কৃষকের ফসল ক্ষতি হয়েছে ১৪০ কোটি টাকা মূল্যের।

সারডোব গ্রামের কৃষক দুখু মিয়া বলেন, ‘হামার টাকা পইসা নাই। বালা সরাই কেমন করি। সরকার সাহায্য করলে হামরা মিষ্টিকুমড়া আর ভুট্টা আবাদ করলোং হয়।’

ক্ষতিগ্রস্ত বর্গাচাষী রাবেয়া বেগম জানান, বালুজমিতে ফসল ফলাতে প্রচুর সেচের পানি দরকার। বর্তমান অবস্থায় তাদের পক্ষে সেচের অর্থ জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ গ্রামের কনছার আলী জানান, নদীভাঙনের তাণ্ডবে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন এ গ্রামের অনেকেই। তার ওপর বন্যায় পাট নষ্ট ও জমিতে বালুর কারণে আমন রোপণ করতে না পারায় এ এলাকার ঘরে ঘরে এখন হাহাকার। সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, এ বছর বন্যায় পানি, ভাঙন ও বাঁধ ভেঙে কুড়িগ্রামে কমপক্ষে এক হাজার হেক্টর আবাদী জমি ঢেকে গেছে বালুতে।

গত কয়েক বছরে এসব জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলিয়ে চরাঞ্চলের কৃষকরা অভাব মোচন করলেও এ বছর আমন চাষ করতে না পেরে খাদ্য সংকটের শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় কুড়িগ্রামে ১৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল বিনষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার কৃষক। সরকারিভাবে টাকার অংকে কৃষিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪০ কোটি টাকা। বন্যা-পরবর্তী সময়ে এক হাজার ২০০ কৃষককে এক বিঘা করে জমিতে মাষকালাই চাষ করার জন্য বীজ ও সার দেয়া হয়েছে।

এছাড়া প্রায় সাত হাজার কৃষককে আমনের চারা ও ১০ হাজার কৃষককে শাকসবজির বীজ দেয়া হয়েছে। তবে বালুজমিতে চাষযোগ্য ফসল আবাদের জন্য এখনও কোনো বরাদ্দ আসেনি। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সারডোব গ্রামে মধ্য জুলাইয়ে একটি বিকল্প বাঁধ ভাঙার কারণে শত শত একর আবাদী জমিতে তিন থেকে পাঁচ ফুট বালুতে ঢেকে গেছে।

একই অবস্থা পার্শ্ববর্তী জয়কুমর ও হলোখানা গ্রামেও। এসব এলাকার কৃষকরা এবার আমন চাষ করতে না পেরে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি বালুতে ঢেকে যাওয়ায় নষ্ট হয়েছে পাট, কলা, সবজি ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল। ফলে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে হাজার হাজার কৃষক।

হলোখানা গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমান জানান, গত বছর যে জমিগুলোতে আমনের বাম্পার ফলন হয়েছিল, এবার সবগুলো জমি বালুতে ঢাকা পড়েছে। তার ১০ বিঘা জমি বালুতে ঢাকা পড়েছে, এসব জমিতে কয়েক বছর ফসল ফলানো যাবে কীনা তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তিনি।

একই অবস্থা বাঙ্গর আলী, কলিম উদ্দিনসহ অনেক কৃষকের। বালুর কারণে আবাদ না হওয়ায় কৃষক ও দিনমজুর পরিবারগুলোতে আসন্ন খাদ্য সংকটের দুশ্চিন্তা ভর করেছে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা চান বালু জমিতে চাষের উপযোগী মিষ্টিকুমড়া, মিষ্টিআলু ও ভুট্টার মতো ফসল চাষ করতে। এক্ষেত্রে রয়েছে পুঁজির সংকট। তাই এ সংকট মেটাতে তারা চান সরকারি সহায়তা।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানান, বন্যায় জমি অনাবাদী ও ফসল নষ্টের বিষয়টি তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। কৃষি প্রণোদনার কোনো বরাদ্দ এলে ক্ষতি পোষাতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিভিন্ন সহায়তা দেয়া হবে।