‘ঘুষের রাজ্য’ সাবরেজিস্ট্রি অফিস
jugantor
‘ঘুষের রাজ্য’ সাবরেজিস্ট্রি অফিস
তানোরে অসহায় সাধারণ দলিল লেখক ও সেবাপ্রার্থীরা

  তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি  

২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘ঘুষের রাজ্য’ সাবরেজিস্ট্রি অফিস

করোনাকালে ‘ঘুষের রাজ্যে’ পরিণত হয়েছে তানোর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিস। আর বড় বৈষম্য সাধারণ দলিল লেখকদের সঙ্গে সমিতির প্রভাবশালী নেতাদের।

এছাড়া রেজিস্ট্রি দলিল পেতে ও নকল দলিলে মোহরারদের ঘুষ আদায় বেপরোয়া। এসব অনিয়ম-দুর্নীতিতে অসহায় সাধারণ দলিল লেখক ও সেবাপ্রার্থীরা।

এখানে ঘুষ ছাড়া সরকারি নিয়মে কোনো কাজ হয় না। সরকারি ফির বাইরে প্রায় তিনগুণ টাকা ঘুষ দিতে হয় সেবাপ্রার্থীদের। সর্বশেষ সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নকল সরবরাহে সরকারি ফি ৩০০ শব্দবিশিষ্ট এক পৃষ্ঠা ১৬ টাকা।

তবে চার পৃষ্ঠার অধিক হলে প্রতি পৃষ্ঠার জন্য ১৫ টাকা হারে অতিরিক্ত ফি দিতে হবে। সে মতে ১০ পৃষ্ঠার নকল দলিলে ৪৫০ টাকার বিপরীতে সেবাগ্রহীতাদের গুনতে হয় ১২০০ থেকে দেড় হাজার টাকার ওপরে।

আর সরকারি ফির বাইরে পুরোটাই যায় সাবরেজিস্ট্রার ও মোহরার পকেটে। ওই অফিসে এমন ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন তানোর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী।

অভিযোগে সাবরেজিস্ট্রি অফিস কার্যালয়ের নৈশপ্রহরী মোজাফফর হোসেনসহ মোহরার সাইফুল ইসলাম ও বেলাল হোসেনের দুর্নীতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে মোজাফ্ফর হোসেন স্থানীয় দাপটে আবারও এমন দুর্নীতি শুরু করেছেন।

নিয়ম মতে দলিল রেজিস্ট্রির পর দায়িত্বের জায়গা থেকে দলিল লেখক রসিদ সংগ্রহ করে থাকেন। মেয়াদ শেষে দলিল সংগ্রহ করে ক্রেতাকে পৌঁছে দেন।

কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন ফির নামে সাধারণ দলিল লেখককে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের রসিদ ও দলিল পেতে হয়রানি করা হচ্ছে। পরে দাবিকৃত ঘুষ দেয়া হলে দলিল ও রসিদ দেয়া হয়।

মূলত অফিসের মোহরাররা এ দুর্নীতির কাজে সম্পৃক্ত। অভিযোগে জানা গেছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের হেবা ঘোষণা দলিলের মূল্য যতই হোক না কেন, সরকারি ফি সর্বোচ্চ ৬৫০ টাকা।

কিন্তু এক্ষেত্রে এক শতক থেকে ১০ শতক পর্যন্ত সাড়ে চার হাজার টাকা সমিতির সেরেস্তা বাবদ ঘুষ দিতে হচ্ছে সেবাগ্রহীতাদের। আর জমির পরিমাণ এক একর পর্যন্ত রেজিস্ট্রি হলে সমিতিসহ অন্য ফি বাবদ ১৬ হাজার টাকা আদায় করে থাকেন বর্তমান সমিতির প্রভাবশালী আহ্বায়ক ও বিএনপি নেতা ফাইজুল মুহুরী।

তবে এর ঊর্ধ্বে মূল্য হলে প্রতি শতকে ২০০ টাকা হারে বেশি নেয়া হয়। ভুক্তভোগী অনেক ক্রেতা-বিক্রেতা অভিযোগে জানান, সাফ কবলা বা এককালীন দানপত্র দলিলের মূল্য এক হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত হলে আনুপাতিক হারে ঘুষ দিতে হয়।

সরকারি ফির বাইরে সমিতি বাবদ লাখে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। আর যদি দলিলের মূল্য এক লাখ টাকা বা তার অধিক হয় তাহলে প্রতি লাখে আনুপাতিক হারে বেশি দিতে হয়।

দলিলের মূল্য এক হাজার ধরে সরকার নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফি শতকরা ২০ টাকা, স্থানীয় কর ৩০ টাকা ও স্ট্যাম্প শুল্ক ১৫ টাকা। এছাড়া উৎসে কর, ভ্যাট ইত্যাদি পরিশোধ করতে হয়।

আগে রেজিস্ট্রেশন ফি ছিল দলিলে উল্লিখিত সম্পত্তির মূল্যের শতকরা ২% টাকা। সরকার এ ফি কমিয়ে বর্তমানে ১% টাকা করেছে, যা গত ৫ জুলাই থেকে কার্যকর হয়।

সেই সঙ্গে ব্যাংক চালান সংযুক্ত ২৬০ টাকা। তবে দলিল প্রতি নগদ ২৪০ টাকা নেয়ার নিয়ম রয়েছে। এক্ষেত্রে এসব সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে দাখিলা (সাবরেজিস্ট্রি) নামে কবলা ও এককালীন দানপত্র দলিল প্রতি ৯০০ ও হেবা ঘোষণা দলিল প্রতি ১৭শ’ টাকা ঘুষ আদায় করা হয়।

এছাড়া দলিলে স্বাক্ষর ও টিপসহি নেয়ার সময় কৌশলে দলিল প্রতি ৫০ থেকে ৮০ টাকা ঘুষ আদায় করেন অফিসের নৈশপ্রহরী মোজাফ্ফর হোসেন।

এ ব্যাপারে তানোর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নৈশপ্রহরী মোজাফ্ফর হোসেন, মোহরার সাইফুল ও বেলাল হোসেন বলেন, শুধু এ অফিস নয় সব অফিস একই নিয়মে চলে।

এ ব্যাপারটি ডিআর নয়, আইজিআরসহ মন্ত্রণালয়ও অবগত। আপনি দু’কলম লিখে লাভ নেই বলে দম্ভোক্তি করেন মোজাফ্ফর ও সাইফুল।

তানোর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক সমিতির আহ্বায়ক ফাইজুল মুহুরী বলেন, সরকারি ফি ছাড়া সামান্য টাকা সমিতির নামে আদায় করা হয়। কিন্তু ওই টাকা দলিল লেখকের কোয়ালিটি বুঝে শেয়ার হয়। এতে কারও ক্ষেত্রে বৈষম্য হলে কিছু করার নেই।

সাবরেজিস্ট্রার মমতাজ বেগম বলেন, এসব অনিয়মের ব্যাপারে তিনি অবগত নন। সম্প্রতি তিনি এখানে যোগদান করেছেন। তবে এ ব্যাপারে লিখিত নয়, মৌখিকভাবে তাকে অবগত করা হয়েছে। তারপরও বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

‘ঘুষের রাজ্য’ সাবরেজিস্ট্রি অফিস

তানোরে অসহায় সাধারণ দলিল লেখক ও সেবাপ্রার্থীরা
 তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি 
২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
‘ঘুষের রাজ্য’ সাবরেজিস্ট্রি অফিস
ছবি: যুগান্তর

করোনাকালে ‘ঘুষের রাজ্যে’ পরিণত হয়েছে তানোর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিস। আর বড় বৈষম্য সাধারণ দলিল লেখকদের সঙ্গে সমিতির প্রভাবশালী নেতাদের।

এছাড়া রেজিস্ট্রি দলিল পেতে ও নকল দলিলে মোহরারদের ঘুষ আদায় বেপরোয়া। এসব অনিয়ম-দুর্নীতিতে অসহায় সাধারণ দলিল লেখক ও সেবাপ্রার্থীরা।

এখানে ঘুষ ছাড়া সরকারি নিয়মে কোনো কাজ হয় না। সরকারি ফির বাইরে প্রায় তিনগুণ টাকা ঘুষ দিতে হয় সেবাপ্রার্থীদের। সর্বশেষ সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নকল সরবরাহে সরকারি ফি ৩০০ শব্দবিশিষ্ট এক পৃষ্ঠা ১৬ টাকা।

তবে চার পৃষ্ঠার অধিক হলে প্রতি পৃষ্ঠার জন্য ১৫ টাকা হারে অতিরিক্ত ফি দিতে হবে। সে মতে ১০ পৃষ্ঠার নকল দলিলে ৪৫০ টাকার বিপরীতে সেবাগ্রহীতাদের গুনতে হয় ১২০০ থেকে দেড় হাজার টাকার ওপরে।

আর সরকারি ফির বাইরে পুরোটাই যায় সাবরেজিস্ট্রার ও মোহরার পকেটে। ওই অফিসে এমন ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন তানোর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী।

অভিযোগে সাবরেজিস্ট্রি অফিস কার্যালয়ের নৈশপ্রহরী মোজাফফর হোসেনসহ মোহরার সাইফুল ইসলাম ও বেলাল হোসেনের দুর্নীতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে মোজাফ্ফর হোসেন স্থানীয় দাপটে আবারও এমন দুর্নীতি শুরু করেছেন।

নিয়ম মতে দলিল রেজিস্ট্রির পর দায়িত্বের জায়গা থেকে দলিল লেখক রসিদ সংগ্রহ করে থাকেন। মেয়াদ শেষে দলিল সংগ্রহ করে ক্রেতাকে পৌঁছে দেন।

কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন ফির নামে সাধারণ দলিল লেখককে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের রসিদ ও দলিল পেতে হয়রানি করা হচ্ছে। পরে দাবিকৃত ঘুষ দেয়া হলে দলিল ও রসিদ দেয়া হয়।

মূলত অফিসের মোহরাররা এ দুর্নীতির কাজে সম্পৃক্ত। অভিযোগে জানা গেছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের হেবা ঘোষণা দলিলের মূল্য যতই হোক না কেন, সরকারি ফি সর্বোচ্চ ৬৫০ টাকা।

কিন্তু এক্ষেত্রে এক শতক থেকে ১০ শতক পর্যন্ত সাড়ে চার হাজার টাকা সমিতির সেরেস্তা বাবদ ঘুষ দিতে হচ্ছে সেবাগ্রহীতাদের। আর জমির পরিমাণ এক একর পর্যন্ত রেজিস্ট্রি হলে সমিতিসহ অন্য ফি বাবদ ১৬ হাজার টাকা আদায় করে থাকেন বর্তমান সমিতির প্রভাবশালী আহ্বায়ক ও বিএনপি নেতা ফাইজুল মুহুরী।

তবে এর ঊর্ধ্বে মূল্য হলে প্রতি শতকে ২০০ টাকা হারে বেশি নেয়া হয়। ভুক্তভোগী অনেক ক্রেতা-বিক্রেতা অভিযোগে জানান, সাফ কবলা বা এককালীন দানপত্র দলিলের মূল্য এক হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত হলে আনুপাতিক হারে ঘুষ দিতে হয়।

সরকারি ফির বাইরে সমিতি বাবদ লাখে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। আর যদি দলিলের মূল্য এক লাখ টাকা বা তার অধিক হয় তাহলে প্রতি লাখে আনুপাতিক হারে বেশি দিতে হয়।

দলিলের মূল্য এক হাজার ধরে সরকার নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফি শতকরা ২০ টাকা, স্থানীয় কর ৩০ টাকা ও স্ট্যাম্প শুল্ক ১৫ টাকা। এছাড়া উৎসে কর, ভ্যাট ইত্যাদি পরিশোধ করতে হয়।

আগে রেজিস্ট্রেশন ফি ছিল দলিলে উল্লিখিত সম্পত্তির মূল্যের শতকরা ২% টাকা। সরকার এ ফি কমিয়ে বর্তমানে ১% টাকা করেছে, যা গত ৫ জুলাই থেকে কার্যকর হয়।

সেই সঙ্গে ব্যাংক চালান সংযুক্ত ২৬০ টাকা। তবে দলিল প্রতি নগদ ২৪০ টাকা নেয়ার নিয়ম রয়েছে। এক্ষেত্রে এসব সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে দাখিলা (সাবরেজিস্ট্রি) নামে কবলা ও এককালীন দানপত্র দলিল প্রতি ৯০০ ও হেবা ঘোষণা দলিল প্রতি ১৭শ’ টাকা ঘুষ আদায় করা হয়।

এছাড়া দলিলে স্বাক্ষর ও টিপসহি নেয়ার সময় কৌশলে দলিল প্রতি ৫০ থেকে ৮০ টাকা ঘুষ আদায় করেন অফিসের নৈশপ্রহরী মোজাফ্ফর হোসেন।

এ ব্যাপারে তানোর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নৈশপ্রহরী মোজাফ্ফর হোসেন, মোহরার সাইফুল ও বেলাল হোসেন বলেন, শুধু এ অফিস নয় সব অফিস একই নিয়মে চলে।

এ ব্যাপারটি ডিআর নয়, আইজিআরসহ মন্ত্রণালয়ও অবগত। আপনি দু’কলম লিখে লাভ নেই বলে দম্ভোক্তি করেন মোজাফ্ফর ও সাইফুল।

তানোর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক সমিতির আহ্বায়ক ফাইজুল মুহুরী বলেন, সরকারি ফি ছাড়া সামান্য টাকা সমিতির নামে আদায় করা হয়। কিন্তু ওই টাকা দলিল লেখকের কোয়ালিটি বুঝে শেয়ার হয়। এতে কারও ক্ষেত্রে বৈষম্য হলে কিছু করার নেই।

সাবরেজিস্ট্রার মমতাজ বেগম বলেন, এসব অনিয়মের ব্যাপারে তিনি অবগত নন। সম্প্রতি তিনি এখানে যোগদান করেছেন। তবে এ ব্যাপারে লিখিত নয়, মৌখিকভাবে তাকে অবগত করা হয়েছে। তারপরও বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।