বাচ্চা ফোটে কাগজে-কলমে
jugantor
মাগুরায় আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন কেন্দ্র
বাচ্চা ফোটে কাগজে-কলমে
চাকরি বহাল রাখতে আজগুবি তথ্য দিচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারী

  আবু বাসার আখন্দ, মাগুরা  

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মাগুরায় আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন কেন্দ্র

মাগুরায় বাচ্চা ফোটে না একশ’ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত আঞ্চলিক সরকারি হাঁস প্রজনন কেন্দ্রে। বছরের পর বছর ধরে নষ্ট এ প্রজনন কেন্দ্রের ইনকিউবেটর।

অথচ দাফতরিক কাগজপত্রে গত ৬ মাসে সেখানে উৎপাদিত হয়েছে ১১ হাজার ৩৮২টি বাচ্চা। শুধু তাই নয়, সেসব বাচ্চা বিক্রি থেকে পাওয়া যাচ্ছে অর্থ। এমন গায়েবি তথ্য উপস্থাপন করে প্রজনন কেন্দ্রটিকে উৎপাদনশীল দেখাচ্ছে মাগুরার প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

ফলে এর সুফল থেকে একেবারেই বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় হাঁস খামারিরা। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০২ সালে মাগুরা-ফরিদপুর মহাসড়কের পাশে বেলনগর এলাকায় ৩ একর ১৮ শতাংশ জমির ওপর স্থাপিত হয় ‘মাগুরা হাঁস পালন কেন্দ্র’।

প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত খামারে জনবল সংকট থাকায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অথচ ২০১৩ সালে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

এ অবস্থায় আরও প্রায় ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে এটিকে ‘আঞ্চলক হাঁস প্রজনন কেন্দ্র’ নামে নতুন প্রকল্প চালু করা হয়। ইতোমধ্যে কেন্দ্রটিকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

কিন্তু অবস্থা সেই আগের মতোই। চালু করা যায়নি বাচ্চা উৎপাদনের ইনকিউবেটর মেশিন। বিধায় স্থানীয় খামারিরা মাগুরার বাইরে দূরদুরান্তের বেসরকারি খামার থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

মাগুরার সদর উপজেলার চানপুর গ্রামের হাঁস খামারি সোহেল আহমেদ। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ৪শ’ হাঁস নিয়ে নিজ গ্রামে একটি খামার করেন। তিনি বলেন, ‘মাগুরার সরকারি হাঁস প্রজনন কেন্দ্রে গিয়েছিলাম।

কিন্তু মেশিন নষ্টের কথা বলে তারা বাচ্চা দেয়নি। বাধ্য হয়ে খুলনা থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করতে হয়েছে।’ একই অভিযোগ মঘি গ্রামের হাঁস খামারি আকিদুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‘এক হাজার হাঁস দিয়ে খামার তৈরি করেছি।

কিন্তু সরকারি প্রজনন কেন্দ্র থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। অনেক খরচ করে বাচ্চা আনতে হয় দর্শনা থেকে।’ শহরের পারনান্দুয়ালি এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম সবুজ বলেন, এখানে শুধু ডিম বিক্রি চলে। বাচ্চা ফোটানো হয় না।

কেউ চাহিদা দিলে বাইরে থেকে বাচ্চা এনে দেয়া হবে বলে জানান তারা। আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বরত সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আনোয়ারুল করিম এসব অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেন।

নিয়মিত বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে এমন একটি হিসাব খাতাও তিনি উপস্থাপন করেন। গত মার্চ মাসের ১৪ তারিখ থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৩৮২টি বাচ্চা উৎপাদিত হয়েছে বলে ওই নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এর অনুকূলে সরকারি কোষাগারে ২ লাখ ২৭ হাজার ৬৪০ টাকাও ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এদিকে সরজমিনে মাগুরা আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন কেন্দ্রে গেলে স্থানীয় খামারিদের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়।

দেখা গেছে, ১১টি ছোট-বড় ভবনের অধিকাংশই পরিত্যক্ত। বিভিন্ন কক্ষে হাঁস থাকলেও বাচ্চার নমুনা নেই কোথায়ও। ইনকিউবেটর কক্ষটি অন্ধকার। পরিত্যক্ত পড়ে আছে। বাচ্চা উৎপাদনের বিষয়ে সেখানে কর্মরতদের সঙ্গে কথা বলে নানা অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

হ্যাচারি অ্যাটেনডেন্ট জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাকে থামিয়ে দেন দায়িত্বরত উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু সোহেল মোহাম্মদ আরিফ। তবে মনির হোসেন নামে অপর একজন কর্মচারী বলেন, ‘গত বছর ডিসেম্বরের ৪ তারিখে প্রজনন কেন্দ্রে যোগদান করেছি। কিন্তু মেশিন নষ্ট থাকায় একদিনও বাচ্চা উৎপাদন হয়নি।’

অন্যদিকে কেন্দ্রটিতে ৫শ’ হাঁস পালনের অনুমোদন এবং খাদ্য বরাদ্দ দেয়া হলেও সেখানে ৬শ’ হাঁসের বেশি রেখে ডিম উৎপাদন করা হচ্ছে বলে স্বীকার করেন সেখানে কর্মরত আশরাফুল ইসলামসহ অপরাপর কর্মচারীরা। তবে মাগুরা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এখানে অনুমোদনের বাইরে অধিক সংখ্যক হাঁস পালন করা হচ্ছে।

যা থেকে পাওয়া অতিরিক্ত ডিম বিক্রির অর্থ সরকারি খাতায় বাচ্চা বিক্রির বলে সমন্বয় করা হচ্ছে। নিজেদের চাকরি বহাল রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব আজগুবি তথ্য উপস্থাপন করে সরকারের সঙ্গে প্রতারণা করছে।

ঠকিয়ে আসছে সাধারণ মানুষকেও। মাগুরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাদিউজ্জামানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি অধিক মাত্রায় ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেন। হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের কাজের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই উল্লেখ করলেও এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন তিনি।

মাগুরায় আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন কেন্দ্র

বাচ্চা ফোটে কাগজে-কলমে

চাকরি বহাল রাখতে আজগুবি তথ্য দিচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারী
 আবু বাসার আখন্দ, মাগুরা 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
মাগুরায় আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন কেন্দ্র
ফাইল ছবি

মাগুরায় বাচ্চা ফোটে না একশ’ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত আঞ্চলিক সরকারি হাঁস প্রজনন কেন্দ্রে। বছরের পর বছর ধরে নষ্ট এ প্রজনন কেন্দ্রের ইনকিউবেটর।

অথচ দাফতরিক কাগজপত্রে গত ৬ মাসে সেখানে উৎপাদিত হয়েছে ১১ হাজার ৩৮২টি বাচ্চা। শুধু তাই নয়, সেসব বাচ্চা বিক্রি থেকে পাওয়া যাচ্ছে অর্থ। এমন গায়েবি তথ্য উপস্থাপন করে প্রজনন কেন্দ্রটিকে উৎপাদনশীল দেখাচ্ছে মাগুরার প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

ফলে এর সুফল থেকে একেবারেই বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় হাঁস খামারিরা। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০২ সালে মাগুরা-ফরিদপুর মহাসড়কের পাশে বেলনগর এলাকায় ৩ একর ১৮ শতাংশ জমির ওপর স্থাপিত হয় ‘মাগুরা হাঁস পালন কেন্দ্র’।

প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত খামারে জনবল সংকট থাকায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অথচ ২০১৩ সালে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

এ অবস্থায় আরও প্রায় ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে এটিকে ‘আঞ্চলক হাঁস প্রজনন কেন্দ্র’ নামে নতুন প্রকল্প চালু করা হয়। ইতোমধ্যে কেন্দ্রটিকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

কিন্তু অবস্থা সেই আগের মতোই। চালু করা যায়নি বাচ্চা উৎপাদনের ইনকিউবেটর মেশিন। বিধায় স্থানীয় খামারিরা মাগুরার বাইরে দূরদুরান্তের বেসরকারি খামার থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

মাগুরার সদর উপজেলার চানপুর গ্রামের হাঁস খামারি সোহেল আহমেদ। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ৪শ’ হাঁস নিয়ে নিজ গ্রামে একটি খামার করেন। তিনি বলেন, ‘মাগুরার সরকারি হাঁস প্রজনন কেন্দ্রে গিয়েছিলাম।

কিন্তু মেশিন নষ্টের কথা বলে তারা বাচ্চা দেয়নি। বাধ্য হয়ে খুলনা থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করতে হয়েছে।’ একই অভিযোগ মঘি গ্রামের হাঁস খামারি আকিদুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‘এক হাজার হাঁস দিয়ে খামার তৈরি করেছি।

কিন্তু সরকারি প্রজনন কেন্দ্র থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। অনেক খরচ করে বাচ্চা আনতে হয় দর্শনা থেকে।’ শহরের পারনান্দুয়ালি এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম সবুজ বলেন, এখানে শুধু ডিম বিক্রি চলে। বাচ্চা ফোটানো হয় না।

কেউ চাহিদা দিলে বাইরে থেকে বাচ্চা এনে দেয়া হবে বলে জানান তারা। আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের দায়িত্বরত সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আনোয়ারুল করিম এসব অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেন।

নিয়মিত বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে এমন একটি হিসাব খাতাও তিনি উপস্থাপন করেন। গত মার্চ মাসের ১৪ তারিখ থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৩৮২টি বাচ্চা উৎপাদিত হয়েছে বলে ওই নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এর অনুকূলে সরকারি কোষাগারে ২ লাখ ২৭ হাজার ৬৪০ টাকাও ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এদিকে সরজমিনে মাগুরা আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন কেন্দ্রে গেলে স্থানীয় খামারিদের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়।

দেখা গেছে, ১১টি ছোট-বড় ভবনের অধিকাংশই পরিত্যক্ত। বিভিন্ন কক্ষে হাঁস থাকলেও বাচ্চার নমুনা নেই কোথায়ও। ইনকিউবেটর কক্ষটি অন্ধকার। পরিত্যক্ত পড়ে আছে। বাচ্চা উৎপাদনের বিষয়ে সেখানে কর্মরতদের সঙ্গে কথা বলে নানা অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

হ্যাচারি অ্যাটেনডেন্ট জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাকে থামিয়ে দেন দায়িত্বরত উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু সোহেল মোহাম্মদ আরিফ। তবে মনির হোসেন নামে অপর একজন কর্মচারী বলেন, ‘গত বছর ডিসেম্বরের ৪ তারিখে প্রজনন কেন্দ্রে যোগদান করেছি। কিন্তু মেশিন নষ্ট থাকায় একদিনও বাচ্চা উৎপাদন হয়নি।’

অন্যদিকে কেন্দ্রটিতে ৫শ’ হাঁস পালনের অনুমোদন এবং খাদ্য বরাদ্দ দেয়া হলেও সেখানে ৬শ’ হাঁসের বেশি রেখে ডিম উৎপাদন করা হচ্ছে বলে স্বীকার করেন সেখানে কর্মরত আশরাফুল ইসলামসহ অপরাপর কর্মচারীরা। তবে মাগুরা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এখানে অনুমোদনের বাইরে অধিক সংখ্যক হাঁস পালন করা হচ্ছে।

যা থেকে পাওয়া অতিরিক্ত ডিম বিক্রির অর্থ সরকারি খাতায় বাচ্চা বিক্রির বলে সমন্বয় করা হচ্ছে। নিজেদের চাকরি বহাল রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব আজগুবি তথ্য উপস্থাপন করে সরকারের সঙ্গে প্রতারণা করছে।

ঠকিয়ে আসছে সাধারণ মানুষকেও। মাগুরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাদিউজ্জামানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি অধিক মাত্রায় ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেন। হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের কাজের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই উল্লেখ করলেও এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন তিনি।