সর্বস্বান্ত অসংখ্য মানুষ
jugantor
কাশিয়ানীতে চাকরি দেয়ার নামে শিক্ষকের প্রতারণা
সর্বস্বান্ত অসংখ্য মানুষ
টাকা ফেরত চাওয়ায় কেউ খেটেছেন জেল আবার কেউ করেছেন আত্মহত্যা

  লিয়াকত হোসেন লিংকন, কাশিয়ানী (গোপালগঞ্জ)  

০৩ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পেশায় স্কুল শিক্ষক হলেও নেশা চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা করে মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়া। যার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন অসংখ্য বেকার, দরিদ্র ও অসহায় মানুষ।

অনেকে চাকরির জন্য টাকা দিয়ে ফেরত চেয়ে উল্টো লাঞ্ছিত হয়েছেন, জেলও খেটেছেন অনেকে। আবার কেউ চাকরির জন্য টাকা দিয়ে ফেরত না পেয়ে মানসিক চাপে আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি বিকাশচন্দ্র দাস নামে এমন এক প্রতারক শিক্ষককে (ভগবান স্যার) গ্রেফতার করেছে কাশিয়ানী থানার রামদিয়া তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ।

তিনি কাশিয়ানী উপজেলার রামদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার করগাতি গ্রামের মৃত ঘাগরচন্দ্র দাসের ছেলে।

বিকাশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানা ও আদালতে কয়েক ডজন প্রতারণা এবং অর্থ আত্মসাৎ মামলা রয়েছে। চাকরি দেয়ার কথা বলে ২৮ লাখ টাকা নিয়েও চাকরি না দিয়ে উল্টো গালিগালাজ ও অপমান করায় ৩০ আগস্ট কাশিয়ানী উপজেলার রামদিয়া গ্রামের আশীষ কুমার মৈত্র নামে এক যুবক আত্মহত্যা করেন।

এ ঘটনায় ওই যুবকের বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অসীম কুমার মৈত্র বাদী হয়ে ঘটনার দিন শিক্ষক বিকাশচন্দ্র দাসকে আসামি করে থানায় একটি মামলা করেন।

মামলায় স্কুল শিক্ষক বিকাশ দাসকে গ্রেফতার করে পুলিশ আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায়। মামলা সূত্রে জানা গেছে, ওই শিক্ষা কর্মকর্তার ছেলে আশীষ বিশ্বাসকে চাকরি দেয়ার কথা বলে বিকাশচন্দ্র দাস ২৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। চাকরি না দিয়ে টাকা ফেরত দিতে নানা টালবাহানা করে।

এমনকি ঘটনার দিন আশীষকে অকথ্য ভাষা গালিগালাজ ও অপমান করা হয়। টাকার জন্য মানসিক চাপ ও অপমান সহ্য করতে না পেরে তিনি নিজ ঘরে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেন।

এরপর থেকে কথিত ভগবান শিক্ষক বিকাশ দাসের শিক্ষকতার চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রতারণার কথা বেরিয়ে আসে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষক বিকাশচন্দ্র দাস ১৯৮৭ সালে কাশিয়ানী উপজেলার রামদিয়া এলাকায় আসেন। সেখানে তিনি কোচিং ব্যবসা শুরু করেন।

১৯৯৮ সালে রামদিয়ার ঠিকানা ব্যবহার করে রামদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কোচিং ব্যবসাকে চাঙ্গা করতে তিনি পাবলিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন স্কুলের সাময়িক ও বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তার কোচিংয়ের শিক্ষার্থীদের দিতেন।

এভাবে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে ‘জনপ্রিয়’ হয়ে ওঠেন। সবার কাছে তিনি ‘ভগবান স্যার’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিকাশ দাস ও তার স্ত্রী সুপ্রীতি দাস দু’জনে শিক্ষকতা করেন।

এ শিক্ষকতাকে পুঁজি করে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী, খুলনার ডুমরিয়া, বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা, ফুলতলা, বরিশালের গৌরনদী, আগৈলঝাড়া, ফরিদপুরের বোয়ালমারী ও নড়াইলের লোহাগড়া, কালিয়া উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চাকরি দেয়ার কথা বলে ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এলাকায় বিকাশ দাসের রয়েছে একটি ভাড়াটিয়া লাঠিয়াল বাহিনী। তাকে কেউ কিছু বললে এ বাহিনীর হাতে নাজেহাল হতে হয়।

কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. মোক্তার হোসেন বলেন, বিকাশচন্দ্র দাস শিক্ষক নামের একজন প্রতারক। কাশিয়ানী তথা শিক্ষক সমাজের জন্য কলঙ্ক। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি।

চাকরি দেয়ার নামে ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। টাকা হাতিয়ে নেয়া আর নিরীহ মানুষকে মামলা দিয়ে হয়রানি করাই তার নেশা।

তিনি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সরকারি চাকরি দেয়ার কথা বলে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

রামদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফিরোজা বেগম অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বিকাশচন্দ্র দাস শিক্ষক সমাজকে কলুষিত করছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ পেয়েছি।

কিন্তু তাকে ম্যানেজিং কমিটির সাপোর্টের কারণে আমার একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব হয় না। তবে আমি বিষয়টি ইউএনও ও শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানিয়েছি।

কাশিয়ানী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহফুজা বেগম বলেন, ‘আমি বিকাশচন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ পেয়েছি। তিনি শিক্ষক সমাজের কলঙ্ক। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

কাশিয়ানীতে চাকরি দেয়ার নামে শিক্ষকের প্রতারণা

সর্বস্বান্ত অসংখ্য মানুষ

টাকা ফেরত চাওয়ায় কেউ খেটেছেন জেল আবার কেউ করেছেন আত্মহত্যা
 লিয়াকত হোসেন লিংকন, কাশিয়ানী (গোপালগঞ্জ) 
০৩ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পেশায় স্কুল শিক্ষক হলেও নেশা চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা করে মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়া। যার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন অসংখ্য বেকার, দরিদ্র ও অসহায় মানুষ।

অনেকে চাকরির জন্য টাকা দিয়ে ফেরত চেয়ে উল্টো লাঞ্ছিত হয়েছেন, জেলও খেটেছেন অনেকে। আবার কেউ চাকরির জন্য টাকা দিয়ে ফেরত না পেয়ে মানসিক চাপে আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি বিকাশচন্দ্র দাস নামে এমন এক প্রতারক শিক্ষককে (ভগবান স্যার) গ্রেফতার করেছে কাশিয়ানী থানার রামদিয়া তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ।

তিনি কাশিয়ানী উপজেলার রামদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার করগাতি গ্রামের মৃত ঘাগরচন্দ্র দাসের ছেলে।

বিকাশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানা ও আদালতে কয়েক ডজন প্রতারণা এবং অর্থ আত্মসাৎ মামলা রয়েছে। চাকরি দেয়ার কথা বলে ২৮ লাখ টাকা নিয়েও চাকরি না দিয়ে উল্টো গালিগালাজ ও অপমান করায় ৩০ আগস্ট কাশিয়ানী উপজেলার রামদিয়া গ্রামের আশীষ কুমার মৈত্র নামে এক যুবক আত্মহত্যা করেন।

এ ঘটনায় ওই যুবকের বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অসীম কুমার মৈত্র বাদী হয়ে ঘটনার দিন শিক্ষক বিকাশচন্দ্র দাসকে আসামি করে থানায় একটি মামলা করেন।

মামলায় স্কুল শিক্ষক বিকাশ দাসকে গ্রেফতার করে পুলিশ আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায়। মামলা সূত্রে জানা গেছে, ওই শিক্ষা কর্মকর্তার ছেলে আশীষ বিশ্বাসকে চাকরি দেয়ার কথা বলে বিকাশচন্দ্র দাস ২৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। চাকরি না দিয়ে টাকা ফেরত দিতে নানা টালবাহানা করে।

এমনকি ঘটনার দিন আশীষকে অকথ্য ভাষা গালিগালাজ ও অপমান করা হয়। টাকার জন্য মানসিক চাপ ও অপমান সহ্য করতে না পেরে তিনি নিজ ঘরে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেন।

এরপর থেকে কথিত ভগবান শিক্ষক বিকাশ দাসের শিক্ষকতার চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রতারণার কথা বেরিয়ে আসে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষক বিকাশচন্দ্র দাস ১৯৮৭ সালে কাশিয়ানী উপজেলার রামদিয়া এলাকায় আসেন। সেখানে তিনি কোচিং ব্যবসা শুরু করেন।

১৯৯৮ সালে রামদিয়ার ঠিকানা ব্যবহার করে রামদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কোচিং ব্যবসাকে চাঙ্গা করতে তিনি পাবলিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন স্কুলের সাময়িক ও বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তার কোচিংয়ের শিক্ষার্থীদের দিতেন।

এভাবে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে ‘জনপ্রিয়’ হয়ে ওঠেন। সবার কাছে তিনি ‘ভগবান স্যার’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিকাশ দাস ও তার স্ত্রী সুপ্রীতি দাস দু’জনে শিক্ষকতা করেন।

এ শিক্ষকতাকে পুঁজি করে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী, খুলনার ডুমরিয়া, বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা, ফুলতলা, বরিশালের গৌরনদী, আগৈলঝাড়া, ফরিদপুরের বোয়ালমারী ও নড়াইলের লোহাগড়া, কালিয়া উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চাকরি দেয়ার কথা বলে ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এলাকায় বিকাশ দাসের রয়েছে একটি ভাড়াটিয়া লাঠিয়াল বাহিনী। তাকে কেউ কিছু বললে এ বাহিনীর হাতে নাজেহাল হতে হয়।

কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. মোক্তার হোসেন বলেন, বিকাশচন্দ্র দাস শিক্ষক নামের একজন প্রতারক। কাশিয়ানী তথা শিক্ষক সমাজের জন্য কলঙ্ক। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি।

চাকরি দেয়ার নামে ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। টাকা হাতিয়ে নেয়া আর নিরীহ মানুষকে মামলা দিয়ে হয়রানি করাই তার নেশা।

তিনি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সরকারি চাকরি দেয়ার কথা বলে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

রামদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফিরোজা বেগম অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বিকাশচন্দ্র দাস শিক্ষক সমাজকে কলুষিত করছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ পেয়েছি।

কিন্তু তাকে ম্যানেজিং কমিটির সাপোর্টের কারণে আমার একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব হয় না। তবে আমি বিষয়টি ইউএনও ও শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানিয়েছি।

কাশিয়ানী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহফুজা বেগম বলেন, ‘আমি বিকাশচন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ পেয়েছি। তিনি শিক্ষক সমাজের কলঙ্ক। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’