স্থলবন্দর বেনাপোলকে ঘিরে চোরাচালানি সিন্ডিকেট সক্রিয়
jugantor
স্থলবন্দর বেনাপোলকে ঘিরে চোরাচালানি সিন্ডিকেট সক্রিয়
ভারতীয় ট্রাক ব্যবহার করে চোরাচালানি পণ্য আনা হচ্ছে বন্দরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায়

  বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি  

২২ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্থলবন্দর বেনাপোলকে ঘিরে চোরাচালানি সিন্ডিকেট সক্রিয়

দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলকে ঘিরে একটি শক্তিশালী চোরাচালানি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ভারতীয় ট্রাক ব্যবহার করে বিভিন্ন চোরাচালানি পণ্য আনা হচ্ছে বন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায়।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বেনাপোলের বেশ কিছু চিহ্নিত ট্রাক ড্রাইভার প্রতিদিন অবৈধভাবে রফতানিবোঝাই পণ্য নিয়ে ভারতে যায়।

ফেরার পথে ভারতের বনগাঁও ও কলকাতার ট্রাক চালকদের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশি চালকরা ভারতীয় ওষুধ, কসমেটিকস, মাদকদ্রব্য, পোশাক, শাড়ি, থ্রি-পিস, খাদ্যদ্রব্যসহ বিভিন্ন পণ্য ভারতীয় ট্রাকের কেবিনে লুকিয়ে বহন করে বেনাপোল বন্দরে নিয়ে আসছে।

মাঝে মধ্যে আমদানিকৃত বৈধ মালের সঙ্গে এসব মালামালও আনা হচ্ছে। কখনও বন্দরের ট্রাক টার্মিনাল থেকে আবার কখনও বন্দরের অভ্যন্তর থেকে চোরাচালানি এসব পণ্য বাইরে বের করে দেয়া হচ্ছে।

বৈধ আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে আনা এসব চোরাচালানি পণ্য বহনের কারণে বড় ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন দেশের নামিদামি আমদানিকারকরা।

ফলে আতঙ্ক বিরাজ করছে আমদানিকারকদের মাঝে। ৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় কাই গ্রুপের ঢাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এ্যালটেক অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড ভারত থেকে ১২ টন ৯০৮ কেজি অ্যালুমিনিয়াম ইনগড আমদানি করে।

যার বি/ই নম্বর সি-৫৩০/৭৮। পণ্য চালানটি কায়িক পরীক্ষা করে ৪৮ লাখ টাকার রাজস্ব পরিশোধ করে বন্দর থেকে ১৪টি ট্রাকে করে খালাস নেয়ার সময় বন্দরের অভ্যন্তরে থাকা চোরাচালানি সিন্ডিকেট সদস্য শাহীন হাওলাদার ১৩ বান্ডেল ইনগড বোঝাই ঢাকা-মেট্রো : ট ১৬-৮১৬৩ নম্বরের ট্রাক ড্রাইভার লালন মিয়ার সঙ্গে ভাড়া চুক্তি করে ১৪ বেল কাপড় লোড দেয়।

ড্রাইভার লালন মিয়া মালের কাগজপত্র চাইলে বলা হয় আধাঘণ্টা পরে দেয়া হবে। এরই মধ্যে শুল্ক গোয়েন্দা টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে মালের কাগজপত্র চাইলে লালন মিয়া শাহীনকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকে।

ততক্ষণে পালিয়ে যায় শাহীন। কাস্টমস বৈধ পণ্যের মধ্যে অবৈধপণ্য পাওয়ায় সব পণ্য আটক করে। আমদানিকারক বছরে ৩০০ কোটি টাকার ভ্যাট প্রদান করেন সরকারকে।

অথচ চোরাচালানি সিন্ডিকেটের কারণে আজ তাকে বড় ধরনের হয়রানির শিকার হতে হল। অন্যদিকে গত ১৮ নভেম্বর ভারত থেকে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত আমদানিকারক বিআরবি কেবল লিমিটেড, পিডি লাইফ লিমিটেড ও পাওয়ারম্যান বাংলাদেশ লিমিটেডের ছয়টি চালান নিয়ে ডাব্লিউবি-২৩বি ১২৪৫ নম্বরের একটি ভারতীয় ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করে।

পাঁচটি পণ্য চালান বন্দরের ৯নং শেডে আনলোডের পর পাওয়ারম্যান বাংলাদেশ লিমিটেডের পাঁচটি ইনট্যাক কাঠের পেডি চালানটি বন্দরের ৪০নং শেডে আনলোডের জন্য যাওয়ার সময় বন্দরের সামনের সড়ক থেকে বিজিবি ভারতীয় ট্রাকটি আটক করে কেবিন তল্লাশি করে বাজারের ব্যাগে রক্ষিত ক্রিম, চকলেট, মদ, জিরা, কিশমিশ পাওয়ায় সেটি জব্দ করে বিজিবি ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

যার ওজন ১৫ কেজি। তল্লাশির সময় ট্রাক ড্রাইভারকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন যৌথ টিমের সদস্যরা। বৈধ রুটে বৈধ পণ্যের সঙ্গে আসা চালাটির পাঁচটি কাঠের পেডি খুলে তল্লাশি করে কোনো অবৈধ পণ্য পাওয়া যায়নি।

অথচ আমদানিকারকের চালানটি আটক করা হয়। আমদানিকারক এখন পর্যন্ত কোনো সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নিয়োগ দেয়নি পণ্য চালান খালাসের জন্য। এ ধরনের চোরাচালানি সিন্ডিকেটের কারণে বৈধ আমদানিকারকরা প্রতিনিয়তই নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

ফলে অনেক আমদানিকারকই বেনাপোল বন্দর থেকে পণ্য আমদানি না করে চট্টগ্রামে চলে গেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো।

ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ডাইরেক্টর মতিয়ার রহমান জানান, চোরাচালানি সিন্ডিকেটের কারণে বৈধ রুটে আমদানি করা ট্রাকে ড্রাইভারের কেবিনের ভেতর থাকা চোরাচালানি পণ্য বহনের কারণে কেন বৈধ পণ্য আটক হবে।

কেনই বা নামিদামি আমদানিকারকরা হয়রানির শিকার হবে। আমরা এর প্রতিকার চাই। বন্দরের ভেতর প্রতিটি শেডে অবৈধ বহিরাগত লোকজন আছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এ্যালটেক অ্যালুমিনিয়ামের সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান ট্রিম ট্রেডের মালিক জিয়া উদ্দিন জানান, বন্দর একটি বৈধ বন্ডেড এরিয়া, এখানে কীভাবে চোরাচালানি সিন্ডিকেট গড়ে উঠল আর সরকারকে ৪৮ লাখ টাকা রাজস্ব পরিশোধ করে কেনই বা আমাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

জরুরি ভিত্তিতে বন্দরের অভ্যন্তরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আন-অথরাইজড লোকজনকে আটক করতে হবে।

বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মো. আজিজুর রহমান জানান, চোরাচালানি সিন্ডিকেটের কারণে বৈধ আমদানিকারকরা প্রতিনিয়তই নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বন্দরে। বিষয়টি নিয়ে জরুরি একটি কমিটি গঠন করে তদন্ত করা হবে।

কাস্টমসের পক্ষ থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে।

স্থলবন্দর বেনাপোলকে ঘিরে চোরাচালানি সিন্ডিকেট সক্রিয়

ভারতীয় ট্রাক ব্যবহার করে চোরাচালানি পণ্য আনা হচ্ছে বন্দরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায়
 বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি 
২২ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
স্থলবন্দর বেনাপোলকে ঘিরে চোরাচালানি সিন্ডিকেট সক্রিয়
ফাইল ছবি

দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলকে ঘিরে একটি শক্তিশালী চোরাচালানি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ভারতীয় ট্রাক ব্যবহার করে বিভিন্ন চোরাচালানি পণ্য আনা হচ্ছে বন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায়।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বেনাপোলের বেশ কিছু চিহ্নিত ট্রাক ড্রাইভার প্রতিদিন অবৈধভাবে রফতানিবোঝাই পণ্য নিয়ে ভারতে যায়।

ফেরার পথে ভারতের বনগাঁও ও কলকাতার ট্রাক চালকদের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশি চালকরা ভারতীয় ওষুধ, কসমেটিকস, মাদকদ্রব্য, পোশাক, শাড়ি, থ্রি-পিস, খাদ্যদ্রব্যসহ বিভিন্ন পণ্য ভারতীয় ট্রাকের কেবিনে লুকিয়ে বহন করে বেনাপোল বন্দরে নিয়ে আসছে।

মাঝে মধ্যে আমদানিকৃত বৈধ মালের সঙ্গে এসব মালামালও আনা হচ্ছে। কখনও বন্দরের ট্রাক টার্মিনাল থেকে আবার কখনও বন্দরের অভ্যন্তর থেকে চোরাচালানি এসব পণ্য বাইরে বের করে দেয়া হচ্ছে।

বৈধ আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে আনা এসব চোরাচালানি পণ্য বহনের কারণে বড় ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন দেশের নামিদামি আমদানিকারকরা।

ফলে আতঙ্ক বিরাজ করছে আমদানিকারকদের মাঝে। ৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় কাই গ্রুপের ঢাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এ্যালটেক অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড ভারত থেকে ১২ টন ৯০৮ কেজি অ্যালুমিনিয়াম ইনগড আমদানি করে।

যার বি/ই নম্বর সি-৫৩০/৭৮। পণ্য চালানটি কায়িক পরীক্ষা করে ৪৮ লাখ টাকার রাজস্ব পরিশোধ করে বন্দর থেকে ১৪টি ট্রাকে করে খালাস নেয়ার সময় বন্দরের অভ্যন্তরে থাকা চোরাচালানি সিন্ডিকেট সদস্য শাহীন হাওলাদার ১৩ বান্ডেল ইনগড বোঝাই ঢাকা-মেট্রো : ট ১৬-৮১৬৩ নম্বরের ট্রাক ড্রাইভার লালন মিয়ার সঙ্গে ভাড়া চুক্তি করে ১৪ বেল কাপড় লোড দেয়।

ড্রাইভার লালন মিয়া মালের কাগজপত্র চাইলে বলা হয় আধাঘণ্টা পরে দেয়া হবে। এরই মধ্যে শুল্ক গোয়েন্দা টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে মালের কাগজপত্র চাইলে লালন মিয়া শাহীনকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকে।

ততক্ষণে পালিয়ে যায় শাহীন। কাস্টমস বৈধ পণ্যের মধ্যে অবৈধপণ্য পাওয়ায় সব পণ্য আটক করে। আমদানিকারক বছরে ৩০০ কোটি টাকার ভ্যাট প্রদান করেন সরকারকে।

অথচ চোরাচালানি সিন্ডিকেটের কারণে আজ তাকে বড় ধরনের হয়রানির শিকার হতে হল। অন্যদিকে গত ১৮ নভেম্বর ভারত থেকে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত আমদানিকারক বিআরবি কেবল লিমিটেড, পিডি লাইফ লিমিটেড ও পাওয়ারম্যান বাংলাদেশ লিমিটেডের ছয়টি চালান নিয়ে ডাব্লিউবি-২৩বি ১২৪৫ নম্বরের একটি ভারতীয় ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করে।

পাঁচটি পণ্য চালান বন্দরের ৯নং শেডে আনলোডের পর পাওয়ারম্যান বাংলাদেশ লিমিটেডের পাঁচটি ইনট্যাক কাঠের পেডি চালানটি বন্দরের ৪০নং শেডে আনলোডের জন্য যাওয়ার সময় বন্দরের সামনের সড়ক থেকে বিজিবি ভারতীয় ট্রাকটি আটক করে কেবিন তল্লাশি করে বাজারের ব্যাগে রক্ষিত ক্রিম, চকলেট, মদ, জিরা, কিশমিশ পাওয়ায় সেটি জব্দ করে বিজিবি ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

যার ওজন ১৫ কেজি। তল্লাশির সময় ট্রাক ড্রাইভারকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন যৌথ টিমের সদস্যরা। বৈধ রুটে বৈধ পণ্যের সঙ্গে আসা চালাটির পাঁচটি কাঠের পেডি খুলে তল্লাশি করে কোনো অবৈধ পণ্য পাওয়া যায়নি।

অথচ আমদানিকারকের চালানটি আটক করা হয়। আমদানিকারক এখন পর্যন্ত কোনো সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নিয়োগ দেয়নি পণ্য চালান খালাসের জন্য। এ ধরনের চোরাচালানি সিন্ডিকেটের কারণে বৈধ আমদানিকারকরা প্রতিনিয়তই নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

ফলে অনেক আমদানিকারকই বেনাপোল বন্দর থেকে পণ্য আমদানি না করে চট্টগ্রামে চলে গেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো।

ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ডাইরেক্টর মতিয়ার রহমান জানান, চোরাচালানি সিন্ডিকেটের কারণে বৈধ রুটে আমদানি করা ট্রাকে ড্রাইভারের কেবিনের ভেতর থাকা চোরাচালানি পণ্য বহনের কারণে কেন বৈধ পণ্য আটক হবে।

কেনই বা নামিদামি আমদানিকারকরা হয়রানির শিকার হবে। আমরা এর প্রতিকার চাই। বন্দরের ভেতর প্রতিটি শেডে অবৈধ বহিরাগত লোকজন আছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এ্যালটেক অ্যালুমিনিয়ামের সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান ট্রিম ট্রেডের মালিক জিয়া উদ্দিন জানান, বন্দর একটি বৈধ বন্ডেড এরিয়া, এখানে কীভাবে চোরাচালানি সিন্ডিকেট গড়ে উঠল আর সরকারকে ৪৮ লাখ টাকা রাজস্ব পরিশোধ করে কেনই বা আমাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

জরুরি ভিত্তিতে বন্দরের অভ্যন্তরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আন-অথরাইজড লোকজনকে আটক করতে হবে।

বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মো. আজিজুর রহমান জানান, চোরাচালানি সিন্ডিকেটের কারণে বৈধ আমদানিকারকরা প্রতিনিয়তই নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বন্দরে। বিষয়টি নিয়ে জরুরি একটি কমিটি গঠন করে তদন্ত করা হবে।

কাস্টমসের পক্ষ থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে।