পুকুর খননের হিড়িক

নাটোরে চার বছরে আবাদি জমি কমেছে সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর

  মো. মাহফুজ আলম মুনী, নাটোর ০৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নাটোরে পুকুর খনন মহামারী আকার ধারণ করায় চার বছরে আবাদি জমি কমেছে সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর। জেলার সাতটি উপজেলায় পুকুর খননের হিড়িক পড়লেও কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে নির্বিচারে তিন ফসলি জমিতে পুকুর খনন করায় কমে যাচ্ছে আবাদি জমি। জলাবদ্ধতা সৃষ্টির পাশাপশি চাষাবাদেও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া রাস্তার ওপর দিয়ে মাটি বহনের কারণে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। উত্তরাঞ্চলের শস্যভাণ্ডারখ্যাত নাটোর জেলায় মাছ চাষ লাভজনক হওয়ায় জেলার সাতটি উপজেলাতেই পড়েছে পুকুর কাটার হিড়িক। এসব ব্যাপারে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা মাটি খননের কাজে ব্যবহৃত ভেকু মেশিন হিসেবে পরিচিতি এস্কেভেটর মেশিন পুড়িয়ে দিয়েছে। তারপরেও স্থানীয় প্রশাসনকে এ বিষয়ে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি অথচ আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা রয়েছে, জমির শ্রেণী পরিবর্তনসহ ফসলি জমিতে পুকুর খনন করতে হলে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদনের প্রয়োজন লাগবে। নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের হিসাবমতে, বিগত চার বছরে জেলায় আবাদি জমি কমেছে সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর। তিন ফসলি ও চার ফসলি এসব আবাদি জমি এমন আশঙ্কাজনকহারে কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাটোরের জেলা প্রশাসন এবং কৃষি বিভাগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে খাদ্য উদ্বৃত নাটোর জেলায় অচিরেই খাদ্যের সংকট দেখা দিতে পারে। তবে কি পরিমাণ পুকুর বাড়ছে সে হিসাব নেই কৃষি বিভাগ বা মৎস্য বিভাগের কাছে। গুরুদাসপুর উপজেলার বিয়াঘাট ইউনিয়নের দুর্গাপুর-বাবলাতলা গ্রামের কৃষক হারু প্রামাণিক, সাহাদ আলী, শামীম ইসলাম ও শীতলের প্রায় ১০ বিঘা জমি স্বল্পমূল্যে লিজ নিয়েছেন একই গ্রামের বাসিন্দা বদর আলী। হাঁড়িভাঙা বিলের লিজ নেয়া সেই জমিতেই শুরু করেন পুকুর খনন। পাশের ৯ বিঘা জমিতে আরেকটি পুকুর খনন চলছে। হাঁড়িভাঙা বিলে জমি আছে এমন অন্তত ১৫ জন কৃষক বলেন, বিল এলাকায় কমপক্ষে ২০টি পুকুর খনন করা হয়েছে। আরও ১০টি পুকুর খননের কাজ চলছে। এর মধ্যে ফিরোজ হোসেন তালুকদারের ১৪ বিঘা ও ছয় বিঘা আয়তনের দুটি, নজরুল ইসলামের ১২ বিঘা, ফজলুর রহমানের ১২ বিঘা এবং মিজানুর রহমান তালুকদারের ১০ বিঘা জমির পুরোটাই পুকুর করা হচ্ছে। আরও কিছু প্রভাবশালী জমির মালিকও পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছেন। বিলে পুকুর খনন বন্ধের দাবিতে স্থানীয় জমির শতাধিক মালিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ফলে উত্তেজিত জনতা ২৩ মার্চ রাতে মাটি কাটার জন্য ব্যবহৃত দুটি ভেকু মেশিন আগুন দিয়ে পুড়িয়েও দিয়েছেন। এরপরও গুরুদাসপুরে থেমে নেই মাটি কেটে পুকুর খননের কাজ। বিয়াঘাট ইউনিয়ন ছাড়াও চাপিলা ও ধারাবারিয়া ইউনিয়নে চলছে পুকুর কাটার কাজ। এ ব্যাপারে গুরুদাসপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, কৃষি জমিতে পুকুর খননের সুযোগ নেই। কেউ পুকুর করতে চাইলে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করে জমির শ্রেণী পরিবর্তন করা যেতে পারে কিন্তু হাঁড়িভাঙা বিলে পুকুর খননকারীরা সেই নিয়ম অনুসরণ করেননি। তিনি কৃষকদের লিখিত অভিযোগ পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এর সত্যতা পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুকুর খনন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। কৃষি জমিতে পুকুর খনন বন্ধে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে। এছাড়া সিংড়া উপজেলার সোনাপুর, পমগ্রাম, পুঠিমারী, কুশাবাড়ী, নীলচরা, পাটকান্দি, খাগোরবাড়িয়া, মটগ্রাম, ধুলিয়াডাঙ্গা, লারুয়া, বড়সাঁঔল, নলবাতা, দিঘোলগ্রাম, আরকান্দি, চৌগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সর্বত্রই তিন ফসলি ও দো-ফসলি জমিতে পুকুর কাটতে দেখা গেছে। এসব পুকুর কাটার সঙ্গে জরিত রয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। পুকুর কেটে মাটি বহনের কারণে আকস্মিক বৃষ্টিতে নাটোর-বগুড়া মহাসড়কে জমে থাকা মাটি পিচ্ছিল হওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আর এ ঘটনার সঙ্গে পুকুর খননকারী ও ইটভাটা মালিকদের দায়ী করছে স্থানীয় প্রশাসন। একইভাবে লালপুর উপজেলার ওয়ালিয়া, বিলমাড়িয়া, দুড়দুড়িয়া, লালপুর, দুয়ারিয়া, কদিমচিলান ইউনিয়নে চলছে পুকুর কাটা। এসব পুকুর কাটার ক্ষেত্রেও প্রশাসনের কোনো অনুমতি নেই। বড়াইগ্রাম উপজেলাতেও চলছে অনুমোদনহীন পুকুর খনন। এছাড়া নাটোর সদর উপজেলার আগদিঘা, মাঝদিঘা, মির্জাপুর দিঘা, শংকরভাগ, পিপরুল, বাঁশভাগ, সেনভাগ, শ্যামনগর ও লক্ষ্মীকোলসহ বিভিন্ন স্থানে চলছে পুকুর খননের কাজ। নাটোর সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মেহেদুল ইসলাম বলেন, যেভাবে পুকুর কাটা হচ্ছে তা যদি সর্বস্তরের জনগণের সহযোগিতায় বন্ধ করা না যায় তবে তা ভয়ঙ্কর রূপ নেবে। তিনি বলেন, কোনো জমি ফসল উৎপাদনের উপযোগী হতে প্রায় আড়াই লাখ বছর সময় লাগে। তাই অবহেলা করে আবাদি জমি কাউকে নষ্ট করতে দেয়া উচিত হবে না। নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বলেন, মানুষ কেন বুঝতে চাচ্ছে না যে আবাদি জমি কমে গেলে তাদের জীবন সংকাটপ্ন হবে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.