দুর্নীতির ‘স্বর্গ’ ফেনী বিআরটিএ

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যতন মজুমদার, ফেনী

ফেনী বিআরটিএ অফিসের দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করেছে বলে পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘুষ ছাড়া মোটরযান রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না এ অফিসে। জেলার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী শতাধিক আনফিট গাড়িকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ফিটনেস সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছে। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে আসা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়। এ ব্যাপারে কেউ মোটা অংকের টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে নানা হয়রানির শিকার হতে হয় এমন অভিযোগ রয়েছে ওই অফিসের বিরুদ্ধে। দালাল ছাড়া কোনো কাজ হয় না। কোনো গাড়ির মালিক বা চালক নিজ উদ্যোগে কাজ করতে গেলেই তাদেরকে কাগজপত্রের অজুহাতে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস। এছাড়া বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে আসা সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রতিদিন। তাদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে বিআরটিএ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। ফলে দিন দিন সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েই চলছে ফেনী বিআরটিএ অফিসে। ফেনী বিআরটিএ অফিসে কয়েক দিন সরেজমিন অনুসন্ধানকালে মোটরযান রেজিস্ট্রেশন করতে আসা একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রত্যেকটি মোটরযান রেজিস্ট্রেশনের সময় সরকারি ফিস ছাড়াও অতিরিক্ত দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং ক্ষেত্রবিশেষ আরও বেশি টাকা নেয়া হয়ে থাকে। অফিসের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সব কর্মচারী ওই অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। তারা সিন্ডিকেট করে লাখ লাখ টাকা অবাধে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। ফেনীর এক গাড়ি ব্যবসায়ী সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ফেনীতে পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি নামে যে ব্যক্তি দায়িত্বে রয়েছেন তিনি ছাড়া তার কমিটির কোনো সদস্য নেই। গত এক যুগের বেশি সময় কোনো প্রকার নির্বাচন বা মনোনয়ন ছাড়াই সভাপতি সেজে বিআরটিএ অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে টাকা ভাগাভাগি করছেন। তারা জানান, সিএনজি থেকে শুরু করে প্রতিটি মোটরযানের সব কাগজপত্র তৈরি করতে গেলেই পরিবহন মালিক গ্রুপের নামে মোটা অংকের টাকা আদায়ের খাত দেখানো হয়। আর এ টাকা কথিত সভাপতি ও বিআরটিএ অফিসের কর্মকর্তারা ভাগবাটোয়ারা করে নেন। এছাড়া ওই কথিত সভাপতি সীতাকুণ্ডের এস্ক্রেল ও কুমিল্লা থেকেও টাকার ভাগ আদায় করছেন বলে জানানো হয়। ওই সভাপতি দীর্ঘ সময় বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে অর্থ জোগানদাতার দায়িত্ব পালন করলেও ২০১৪ সাল থেকে নিজেকে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা দাবি করে বিভিন্ন জনকে হুমকি দেন বলে দাবি করেন ফেনী বিআরটিএ অফিসের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী। ফেনী উত্তরা, অশোক লেল্যান্ড, টাটা গাড়ি ও বিভিন্ন মোটরসাইকেল শোরুমের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বললে তারা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ফেনী বিআরটিএর সহকারী পরিচালকের বিশ্বস্ত লোক হিসেবে কয়েক জন দালাল এ কাজগুলো করে আসছে। এতে কিছু পারসেন্টেজ জমা হয় মালিক গ্রুপের নামে। এছাড়া লার্নার বা ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গেলেও সরকার নির্ধারিত টাকার বাইরে বিআরটিএ অফিসের লোকজনকে টাকা দিতে হয়। চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিলে লাইসেন্স পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ করেছেন বেসরকারি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি দিদারুল আলম মাসুদ। ফেনী বিআরটিএ অফিসের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করে বলেন, মোটরযান চালকদের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ওরিয়েন্টেশন বাবদ প্রতি বছর ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা সরকারিভাবে বরাদ্দ দেয়া হলেও কোনো প্রশিক্ষণ ও ওরিয়েন্টেশন করা হয় না। ভুয়া বিল-ভাউচার করে সহকারী পরিচালক পার্কন চৌধুরী তা আত্মসাৎ করেন। এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চলছে টানাপোড়েন। পরিবহন মালিক গ্রুপের কথিত সভাপতি গোলাম নবী জানান, তার বিরুদ্ধে একটি চক্র মিথ্যা অপপ্রচার করছে। কমিটির বিষয়ে বলেন, ২০০৭ সালের পর ফেনীর বর্তমান এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী ২০১৭ সালের শেষ দিকে নির্বাচন ছাড়াই তাকে পুনরায় সভাপতি ও গিয়াস উদ্দিন বুলবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি করে দিয়েছেন। এখনও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়নি। ফেনী বিআরটিএ অফিসের সহকারী পরিচালক পার্কন চৌধুরী তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অফিসের ভেতরের একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। অফিসে বিভিন্ন পদ শূন্য থাকায় কয়েক যুবক গাড়ির কাগজপত্র তৈরি করতে আসা অনভিজ্ঞ মানুষদের সহযোগিতা করছে।