ঘর দেয়ার নামে বাণিজ্য

পুঠিয়ার শিলমাড়িয়ায় বরাদ্দ না এলেও ৩০০ পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  কেএম রেজা, পুঠিয়া

রাজশাহীর পুঠিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প-২’-এর অধীনে ঘর দেয়ার নামে ক্ষমতাসিন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলায় প্রথম পর্যায়ে তিনটি ইউপিতে ‘জমি আছে ঘর নেই’ এমন দরিদ্রদের নামে ৩০৪টি ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়। পৌরসভাসহ উপজেলার ছয়টি ইউপিতে ঘর দেয়ার নামে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে জনপ্রতি পাঁচ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন। এসব ঘটনায় উপজেলা প্রশাসন ও খোদ ক্ষমতাসিন দলের নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী দফতর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর অধীনে উপজেলার তিনটি ইউপি এলাকায় মোট ৩০৪টি ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বানেশ্বর ইউপিতে ৫৫টি, বেলপুকুর ইউপিতে ১৮৮টি এবং জিউপাড়া ইউপিতে ৬১টি ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়। নীতিমালা অনুযায়ী টাস্কফোর্সের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। আর প্রতিটি ঘর নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এক লাখ টাকা। ইতিমধ্যে ওই ঘর নির্মাণের সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

তিন ইউপি এলাকা ঘুরে জানা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর অধীনে ঘর দেয়ার নামে উপজেলা যুব ও মহিলা লীগের সভানেত্রী পরীজান বিবি প্রতিটি ঘরের জন্য ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা হারে আদায় করেছেন। এছাড়া তিনি নিজ নামেও একটি ঘর বরাদ্দ নিয়েছেন। জিউপাড়া এলাকায় ঘর দেয়ার নামে অসহায় মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করেছেন ইউপি আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলু মেম্বার। ওই অর্থ আদায়ের বিষয়টি নিয়ে তার বিরুদ্ধে একজন ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগও করেছেন। পরবর্তীকালে ওই ভুক্তভোগীর কাছ থেকে নেয়া অর্থগুলো ফেরত দেন তিনি। বেলপুকুর এলাকায় একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার নির্দেশে ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দীন ও মাহাবুব হোসেন ঘরপ্রতি ১০ থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত টাকা আদায় করেছেন। এ ঘটনায় ৬ সেপ্টেম্বর উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে রাজশাহী জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদের দুই ইউপি সদস্যকে আটক করার নির্দেশ দেন। পরে ক্ষমতাসিন দলের নেতাকর্মীদের সুপারিশে আদায়কৃত টাকা ফেরত দেয়া শর্তে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।

উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম রিয়েল বলেন, উপজেলার শিলমাড়িয়া ইউনিয়নে বরাদ্দ না এলেও দলীয় নেতারা কমপক্ষে ২৫০ থেকে ৩০০টি পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেছে। আর ওই টাকাগুলো আদায় করেছেন ইউপি আওয়ামী লীগের সভাপতি রহিম মোল্লা, সম্পাদক শুকুর আলী ও ইউপি যুবলীগের সভাপতি শরিফুল ইসলাম সেন্টু।

শিলমাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন মুকুল বলেন, টাকা আদায়ের বিষয়টি জানার পর ওই নেতাকর্মীদের আদায়কৃত টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দিয়েছি। শিলমাড়িয়া ইউপি আওয়ামী লীগের সভাপতি রহিম মোল্লা বলেন, আমি ঘর দেয়ার নামে কারও কাছে থেকে কোনো টাকা-পয়সা নেইনি। আমার বিরুদ্ধে একটি চক্র ষড়যন্ত্র করছে। সাধারণ সম্পাদক শুকুর আলী বলেন, রাজনৈতিকভাবে আমাকে হয়রানি করার জন্য এলাকার কিছু লোকজন গুজব ছড়াচ্ছে।

ইউপি যুবলীগের সভাপতি শরিফুল ইসলাম সেন্টুর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে জিউপাড়া ইউপি আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান ঘরের তৈরির তালিকায় নাম দেয়ার বিনিময় অর্থ নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী পরীজান বিবি বলেন, বিভিন্ন এলাকা ঘুরে তালিকা তৈরি ও প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে তালিকা অনুমোদন পর্যন্ত অনেক টাকা ব্যয় হয়েছে। খরচাপাতির কারণে প্রতিটি ঘর দেয়ার বিনিময় প্রথমে দুই হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। অনেকই টাকা দেয়নি। তবে এখন আর নেয়া হয় না।

এ ব্যাপারে আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণের সভাপতি ইউএনও আবদুল্লহ আল মাহমুদ বলেন, ঘর দেয়ার নামে টাকা আদায়ের একাধিক অভিযোগ ইতিমধ্যে আমরা পেয়েছি। যারা ঘরের বিনিময় টাকা নিয়েছেন তাদের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সোমবার বেলপুকুর এলাকায় গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে টাকা ফেরত না দিলে ওই দিনই দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।