পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দি মানুষ

ভাঙন আতঙ্কে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন নদীপারের বাসিন্দারা

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদী তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে মানুষ। যুগান্তর প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

লালমনিরহাট : লালমনিরহাটে আতঙ্ক ছড়িয়ে নেমে যাচ্ছে তিস্তার পানি। সোমবার রাত ৯টায় জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যারাজে পয়েন্টে পানি বিপদসীমার প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার (৫২.৭৫) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও মঙ্গলবার বেলা ৩টায় তা বিপদসীমার প্রায় ১৬ সেন্টিমিটার (৫২.৪৪) নিচে নেমে আসে। ফলে লালমনিরহাট জেলায় কোথাও পানিবন্দি পরিবারের খবর নেই বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ।

এদিকে মঙ্গলবার সকাল থেকে পানি কমতে থাকলেও অনেকে এলাকায় পানিবন্দি পরিবার রয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন জনপ্রতিনিধি।

নীলফামারী : সোমবার হতে উজানের ঢলের কারণে নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি দফায় দফায় বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার থেকে ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে তিস্তার পাড়ের নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা। অপরদিকে তিস্তা নদীর এই ভয়াবহ অবস্থায় জেলার ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ি এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বালুর বাঁধটি হুমকির মুখে পড়েছে। ইতিমধ্যে বাঁধটির ৪০০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়া একই উপজেলার খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের দোহলপাড়া নামক স্থানে তিস্তা নদীর ডানতীরের চার নম্বর স্পারবাঁধের সামনের অ্যাপ্রোচ সড়কের ১০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমারসহ প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদ-নদীর অববাহিকায় ২০টি ইউনিয়নের অর্ধশত চরগ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এক হাজার পরিবারের ৫ হাজার মানুষ। মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের মাস্টারের হাট এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে আবদুস ছাত্তার নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় ধরলায় ১২৩ সেমি. ব্রহ্মপুত্রে ৭ সেমি. ও দুধকুমারে ২০ সেমি. ও তিস্তায় ৩৮ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। ধরলা নদীর অববাহিকার হলোখানা, ভোগডাঙা, মোঘলবাসা, বড়ভিটা, শিমুলবাড়ি, বেগমগঞ্জ, পাঁচগাছিসহ ২০টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ।

কাউনিয়া (রংপুর) : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারেজের সবগুলো গেট খুলে দেয়ায় রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার কাছ দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছে। নদীতে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির ফলে কাউনিয়া উপজেলার চরাঞ্চল ও নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের ১১টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, ভারতের গজলডোবার দোমহনী পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তার ডালিয়া ব্যারেজ পয়েন্টে পানি হু হু করে বাড়ছে। সোমবার রাতে ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে ৫২ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার মাত্রায় প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার কাছ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজানে নদীর পানির প্রবল স্রোতের কারণে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেট খুলে দেয়া হয়েছে। ফলে ভাটিতে পানি বাড়ায় ব্যারেজ এলাকার ভাটির চরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অপরদিকে তিস্তায় পানি বৃদ্ধির কারণে কাউনিয়ার চরাঞ্চল ও তীরবর্তী গ্রামগুলো তিস্তার পানি প্রবেশ করায় সৃষ্ট বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) : আকস্মিকভাবে উজানের কাদা মিশ্রিত পাহাড়ি ঢলে ধরলার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ধরলা পাড়ের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অন্যদিকে কাদা মিশ্রিত পানি প্রবেশের ফলে ধরলা অববাহিকাসহ বারোমাসিয়া, নীল কমল, বানিদাহ নদীর তীরবর্তী এলাকার রোপণকৃত আমন ধান ক্ষেতের ক্ষতির সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত কয়েকশ’ একর জমিতে কাদা মিশ্রিত পানি প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে।

গঙ্গাচড়া (রংপুর) : রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সোমবার পানি বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হলেও মঙ্গলবার দুপুরে তা বেড়ে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ কারণে উজানের ঢল সামাল দিতে খুলে রাখা হয়েছে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট।

ডিমলা (নীলফামারী) : গর্জে ওঠা তিস্তা নদীর পানি মঙ্গলবার সকাল ৯টায় বিপদসীমার দুই সেন্টিমিটার নিচে নেমে এসেছে। ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে সোমবার সন্ধ্যা ৬টার পর দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা ৫২ দশমিক ৬০ মিটার অতিক্রম করে রাত ১১টা পর্যন্ত দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ ডালিয়া পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার (৫২ দশমিক ৮০ মিটার) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করেন ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল আলম চৌধুরী। তিনি জানান, উজানের ঢল কমে আসায় পরিস্থিতি উন্নতি ঘটছে। তবে সতর্কতায় তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।

এদিকে উজানে ঢলে ভারী বর্ষণে তিস্তা নদীর এ ভয়াবহ বন্যায় বিভিন্ন এলাকার বসতভিটা বন্যার পানি প্রবেশ করে। এছাড়া ক্ষতির সম্মুখীন হয় বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ সড়ক।

এলাকাবাসী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, সোমবার সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। নদীর পানি ক্ষণে ক্ষণে বাড়তে থাকলে জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গয়াবাড়ি, জলঢাকা উপজেলার, গোলমুণ্ডা, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের তিস্তা নদী বেষ্টিত প্রায় ১৫টি চর গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়ে।

ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের দোহলপাড়া নামক স্থানে তিস্তা নদীর ডানতীরের চার নম্বর স্পার বাঁধের সামনের অ্যাপ্রোচ সড়কের ১০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।