সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকের আখড়া

  শান্তিনগর প্রতিনিধি ১৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ছবি: যুগান্তর

দেশব্যাপী মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকলেও নগরীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রকাশ্যে চলছে মাদক সেবন ও ব্যবসা। প্রতিদিন বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে জমজমাট হয়ে ওঠে মাদকসেবীদের মিলন মেলা।

আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে অভিজাত শ্রেণীর লোকজনও। অমর একুশে গ্রন্থমেলা চলাকালীন পুলিশের তৎপরতা থাকলেও মাদক সেবন বন্ধ ছিল না। মাঝেমধ্যে উদ্যানের ভেতরে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করতে আসার আগে আনসার সদস্যদের মাধ্যমে খবর পেয়ে যেত মাদকসেবীরা।

চাইলে আনসার সদস্যদের মাধ্যমেও মাদক ক্রয় করা যায়। মাদক বিক্রেতাকে পুলিশ গ্রেফতার করলে প্রভাব খাটিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে মাদকসেবীরাই। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উদ্যানে মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশ করলেও অনেককেই বাধা দেয় না আনসার সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কিছুই বলা যায় না।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, উদ্যানের গেটে বসে আছে চারজন পুলিশ সদস্য ও একজন আনসার। পরিচয় গোপন রেখে কথা হয় আনসার সদস্যের সঙ্গে। হঠাৎ একজন লোক গায়ে কোট পরা মাথায় টাক প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে একজন হকার মহিলা এগিয়ে এলো।

ভদ্রলোক পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকা বের করে দিয়েছে, কর্তব্যরত আনসার বসা থেকে উঠে সামনের দিকে এগিয়ে গেলে তাকে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে চলে যায় উদ্যানের অগ্নিশিখার দিকে, যাওয়ার পথে তার সঙ্গে আরও তিনজন একত্রিত হয়ে বসে মাদক সেবনে।

কিসের টাকা দিল আনসার সদস্যদের কাছে জানতে চাইলে বলেন, উনি এখানে নিয়মিত (মাদক) খেতে আসে, আমরা কিছু সুযোগ-সুবিধা দিই। তাই প্রতিদিন যাওয়ার পথে ৫০-১০০ টাকা বকশিশ দেয়, সে অনেক বড়লোক। কয়েকটা কোম্পানির মালিক।

পুলিশ কতদিন পর পর অভিযান চালায় এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বই মেলা চলছে, তাই এখন সবসময়ই পুলিশ থাকে। রেইড দেয় না, মেলা শেষ হলে আবার দেবে। স্যাররা আসার আগে আমাদের বলে দেয় গেটে থাকার জন্য।

চাকরির ভয় তো সবার আছে, আমরা আগে থেকে প্রস্তুত থাকি আপনাদের মতো যারা পরিচিত আছে তাদের বলে দিতে। তখন তারা চলে যায়। মাদক ম্যানেজ করে দেয়া যাবে কিনা এমন প্রস্তাব দেয়া হলে বলেন, ‘আরও আগে আসতেন, আজকে সে চলে গেছে। আমি নতুন তো, ব্যবসায়ী সবার সঙ্গে তেমন পরিচয় নেই।

কালকে আইসেন ব্যবস্থা করে দেয়া যাবে। আমার মোবাইল নম্বর নিয়ে যান, পরদিন মাদকের জন্য কল দেয়া হয়, মামা আজকে আসব, আসলে পাব তো?’

আনসার সদস্য বলেন, আরে মামা ওই হালা সকালে আসছে, আজকে আমার সঙ্গে দেখা না করে চলে গেছে। আপনি বিকালে আইসেন, আসার পর একটু দূরে দাঁড়াইয়েন, আরও লোক আছে তাদের দিয়ে আমি ব্যবস্থা করে দিবনে। আনসার সদস্যের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথার রেকর্ড সংরক্ষিত আছে।

উদ্যানের বেশির ভাগ জায়গায় নতুন মাটি ফেলার পর গাছতলায় বসার জায়গা অনেকটা কমে এসেছে, চারুকলার গেট থেকে টিএসসি পর্যন্ত উদ্যানের পশ্চিম পাশে দলবদ্ধ হয়ে কেউ আড্ডায় দাঁড়িয়ে, আবার কেউবা গানের তালে তালে গাঁজা সেবন করছে। কিছু গ্রুপ খেলছে জুয়া। হাত বাড়ালেই মাদক মিলছে।

সেবনকারীদের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আছে বহিরাগতরাও। উদ্যান আনসার ক্যাম্পের পেছনে নার্সারির সামনেও দেখা যায় মাদকসেবীদের আড্ডা ও মাদক সেবনের দৃশ্য। অনেকে মোটরসাইকেল নিয়ে এলে গেট খুলে দিচ্ছে আনসার সদস্য। মোটরসাইকেল নিয়ে উদ্যান থেকে বের হওয়ার সময় দশ-বিশ টাকা বকশিশ দিচ্ছে।

উদ্যানে ঘুরতে আসা মাহমুদুল করিম বলেন, এখানে পরিবার-পরিজন নিয়ে আসতে পারি না একমাত্র মাদকসেবীদের কারণে। দেখছেন কী গন্ধ! তার সাথে আরেক সমস্যা হাঁটার জায়গা দিয়ে স্পিডে বাইক চালাচ্ছে, ওরা মনে করছে এটা বিশ্বরোড।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আনসার ক্যাম্পের প্লাটুন কমান্ডার আবদুল হান্নান বলেন, এ উদ্যানে যারা মাদক সেবন করে তাদের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের বিরুদ্ধে আমরা তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি না। তার পরেও চেষ্টা করি। না পারলে ওসি সাহেবকে বলি।

উদ্যানে মাদকের সাথে জড়িয়ে যাওয়ার কারণে আমরা দু’জন আনসারকে বদলি করেছি। আমার জানা মতে, এখানে মাদকের সঙ্গে কেউ সম্পৃক্ত নেই, যদি প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উদ্যানের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদফতরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আমান উল্লাহ বলেন, উদ্যানের কোনো আনসার যদি মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আমার জানা মতে কেউ উদ্যানে বাইক নিয়ে প্রবেশ করতে পারে না, মন্দিরের গেট দিয়ে অনেকে প্রবেশ করে। সেটির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শাহবাগ থানার ওসি মো. আবুল হাসান বলেন, উদ্যানটি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হওয়ায় অন্যান্য এলাকার মতো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আমার নির্দেশ ছিল উদ্যানের সব গেট বন্ধ রাখা। তারপরেও আগের তুলনায় মাদক বহুগুণ কমেছে।

তা প্রায় সময় অভিযান চালানোর কারণে। এখানে অনেক অভিজাত শ্রেণীর লোক গাঁজা খায়। অনেককে গ্রেফতার করেছি। কোনো মাদক ব্যবসায়ীকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। উদ্যানের বেশিরভাগ ব্যবসায়ী বাইরের। উদ্যানে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা আমার থানার অধীনে না।

মাঝখানে এক আনসার মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় অভিযোগ করেছি। তাকে বদলি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×